আমরা সবাই সুখের অন্বেষণে ছুটছি। কিন্তু সুখটা আসলেই কি? কিভাবে সুখকে হাতের মুঠোয় পাওয়া যায়? এইসব প্রশ্নের উত্তর কি আমাদের জানা আছে? একজন দিনমজুর থেকে শুরু করে বিত্তশালী, সুখী হবার জন্য সবার প্রচেষ্টার যে অন্ত নেই। কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে’র তাঁর একটি গানে যথার্থই বলেছেন, ‘সবাই তো সুখী হতে চায়, কেউ সুখী হয় কেউ হয় না।’

সুখকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য কিছু সূচক নির্ধারণ করে প্রতি বছর বেশ কিছু জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে একটি হল ইউরোপভিত্তিক প্রতিষ্ঠান (The Organization for Economic Co-operation and Development (OECD) পরিচালিত ‘বেটার লাইফ ইনডেক্স’ জরিপ। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে করা ২০১৭ সালে এই জরিপের তথ্যানুযায়ী সবচেয়ে সুখী দেশ হিসাবে নির্বাচিত হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। মাথাপিছু আয়, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, জীবনযাত্রার মান ইত্যাদি বিবেচনা করে সুখের মানদন্ড স্থির করা হয়েছে এই জরিপে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অস্ট্রেলিয়া উন্নত দেশগুলোর মধ্যে বেশ এগিয়ে আছে; তুলনামূলকভাবে বেকারত্বের হারও কম।

জাতিসংঘ প্রতিবছর World Happiness Report নামের একটি জরিপ চালায়। প্রতিটি দেশের দুই থেকে তিন হাজার নাগরিককে তারা তাদের জীবনধারা নিয়ে সন্তুষ্ট কিনা এই প্রশ্ন করা হয়। ২০১৮ সালের World Happiness Report -মতে সবচেয়ে সুখী দেশ হিসাবে নির্বাচিত হয়েছে ফিনল্যান্ড। সুখী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের স্থান হচ্ছে ১২৪তম। এই রিপার্টে পাকিস্তান আমাদের উপরে স্থান পেলেও প্রতিবেশী দেশ ভারতের স্থান ১৩৩তম। অবশ্য লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স পরিচালিত World Happiness Survey নামের একটি জরিপে ২০০৫ সালে একবার বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশের শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ।

এবার অন্য একটি জরিপের কথা ধরা যাক। যুক্তরাজ্যের নিউ ইকনমিক্স ফাউন্ডেশন ২০০৬ সাল থেকে ‘হ্যাপি প্ল্যানেট ইনডেক্স’ প্রকাশ করে আসছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত তালিকায় সুখী দেশ হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬১ দেশের মধ্যে ৮ম। প্রথম স্থানে রয়েছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ কোস্টারিকা। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, আমেরিকার স্থান ১০৯তম!

এদিকে ২০১০ সালে ভুটানের সাধারণ মানুষের ওপর চালানো একটি জরিপে বলা হয়েছে, সেখানকার ৪১ শতাংশ মানুষ সুখী। ‘গড় জাতীয় সুখ’-এর মানদন্ডে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে ভুটান। এই ফলাফল দেখে জরিপ বিশেষজ্ঞদের আক্কেলগুড়ুম হবার দশা। ভুটান পৃথিবীর একটি অন্যতম দরিদ্র দেশ। অথচ ওই দেশের মাটিতে বসত গেড়েছে সুখ। জরিপে জানা যায়, ভুটানের মানুষের কাছে অপার্থিব এবং আধ্যাত্মিক সুখ অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। মোটামুটিভাবে বিভিন্ন জরিপে ব্যবহৃত সুখের সূচকগুলো প্রায় একইরকম হলেও জরিপ থেকে বেরিয়ে আসছে অদ্ভুত ফলাফল, যা দেখে হিসাব মেলানো সত্যিই মুশকিল।

‘বেটার লাইফ ইনডেক্স’ জরিপে অস্ট্রেলিয়ার নাম এসেছে সবার শীর্ষে। এই জরিপের ফলাফল দেখে অনুন্নত দেশের অনেকেই হয়তো সুখের সন্ধানে তালিকার শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর দিকে ছুটবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অস্ট্রেলিয়ার মানুষ কি আসলেই সুখী? সুখ হলো আপেক্ষিক। দরিদ্রতম দেশের একটি হলেও বাংলাদেশের মানুষ অল্প আয়ে যেরকম তুষ্ট থাকেন, বড় আকারের ব্যাংক ব্যালেন্স নিয়েও উন্নত দেশের অনেকে তেমন তৃপ্ত নন।

বাংলাদেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো নিরাপত্তা। বাড়ি থেকে বেরুবার পর নিরাপদে ঘরে ফিরবেন এমন নিশ্চয়তা চান সবাই। কিন্তু তাই বলে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করলেই যে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে যাবে এমন গ্যারান্টিও দেয়া যায় না। সেখানেও ক্রাইম হচ্ছে, তবে আইন প্রয়োগকারী বহিনীর দক্ষতার জন্য তা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। পরিসংখ্যান দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি আট মিনিটে একটি করে গাড়ি চুরি হয়, আর প্রতি দেড় মিনিটে গাড়ির ভেতর থেকে কোনো না কোনো মূল্যবান সামগ্রী চুরি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রতি মিনিটেই একটি বাড়িতে চুরি হচ্ছে। আমার গাড়িও একবার চোরের কবলে পড়েছিল। এছাড়া এলার্ম সিস্টেম থাকার পরও তা উপড়ে ফেলে দিয়ে ঘরে চোর ঢুকছে। এছাড়া রাত গভীর হলে সিডনি শহরে ট্রেন স্টেশনগুলো খুব একটা নিরাপদ নয়।

বিভিন্ন জরিপের ফলাফল থেকে যে সত্যটি বেরিয়ে এসেছে তা হলো, টাকা দিয়ে আর যাই কেনা যাক না কেন, সুখ কেনা যায় না। আর উন্নত দেশ হলেই সেই দেশের নাগরিকরা বেশি সুখী হবেন, এ কথাও সঠিক নয়। উন্নত দেশের নাগরিকদের সুখী কিংবা অসুখী হবার কারণ অনুন্নত দেশের মানুষদের চেয়ে ভিন্নতর। যা সোজাসুজি তুলনা করা যায় না। টাকার মানের জন্য নাগরিকদের আয় বাংলাদেশের মানুষের চেয়ে অনেক বেশি হলেও জীবনযাত্রার মান উঁচু হওয়ায় ওই সব দেশে দৈনন্দিন জীবনের খরচও অনেক বেশি। ফলে বছরের শেষে অনেকের হাতে খুব একটা সঞ্চয় থাকে না।

অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার সুযোগ খুবই কম। তাই আয়ের একটা বড় অংশ ট্যাক্স হিসাবে চলে যায় সরকারি তহবিলে। উন্নত দেশের সামর্থ্যবান প্রায় সবারই একটি ফ্ল্যাট কিংবা বাড়ি রয়েছে যা আবার ঋণের জন্য ব্যাংকের কাছে বন্ধক দেয়া। তাই প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ঋত পরিশোধের জন্য ব্যাংকে ঢালতে হয়। জীবিকা নির্বাহের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী দু’জনকেই কাজ করতে হয়। আমাদের দেশের মতো কাজের মানুষ রাখার সাধ্য খুব কম লোকেরই থাকে যে বসে থেকে আয়েশ করবেন। ঘর ও বাইরের সব কাজ তাই নিজেকেই করতে হয়। চাপের মধ্যে জীবন যাপন করতে গিয়ে পরিবারের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে যা মানুষকে ধীরে ধীরে অসুখী করে তুলতে পারে।

সত্যিকার অর্থে প্রগাঢ় পারিবারিক বন্ধন, সুস্বাস্থ্য, সুন্দর কর্মক্ষেত্র ইত্যাদি মানুষকে মানসিক প্রশান্তি দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পারিবারিক জীবনে ভাঙ্গন, একাকিত্ব, প্রিয়জনের কাছ হতে বিচ্ছিন্ন হবার ভয় মানুষকে খুব সহজেই অসুখী করতে পারে। সুখ নিয়ে সবসময় হা-হুতাশ করলে সুখী হওয়া যায় না। নিজের চেয়ে অসচ্ছল কিংবা বিপদগ্রস্ত কারো দিকে তাকালে নিজের সুখটা বড় হয়ে চোখে পড়ে, নিজেকে তখন সহজেই সুখী মনে হয়।

একজন বিত্তশালী শিল্পপতির কথাই ধরা যাক; যার গাড়ি, বাড়ি, সম্পদের প্রাচুর্য, বলতে গেলে সব কিছুই রয়েছে। আপতঃদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ওই শিল্পপতির চেয়ে সুখী আর কে আছে! কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, যাদের রয়েছে সম্পদের পাহাড়, তাদের সম্পদ রক্ষার দুঃশ্চিন্তারও নেই শেষ। রাতে এক মুঠো নিশ্চিন্ত ঘুমের জন্য আঁকুপাকু করে তাদের মন। কিন্তু জীবনের কাছে প্রত্যাশা কম থাকে বলে একজন সাধারণ মানুষ দরিদ্র হলেও জীবনের ছোটখাট পাওয়ার মধ্যে তৃপ্তি খুঁজে পান, চলার পথের ক্ষুদ্র অর্জনগুলোকেও অনেক বেশি তারা কদর করেন। সারাদিন হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে একজন রিক্সাচালক যখন তার বস্তিঘরে ঘুমুতে যান তখন কাল কি হবে সে নিয়ে তার তেমন কোনো ভাবনা থাকে না। কারণ বেঁচে থাকাটাই হলো তার জন্য বিশাল বোনাস। তাই বাংলাদেশ ও ভুটানের মানুষ উন্নত অনেক দেশের নাগরিকদের চেয়ে বেশি সুখী, জরিপে পাওয়া এ ধরনের তথ্য সঠিক বলেই মনে হয়।