ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশ। ফিলিস্তিনদের মুক্তির জন্য কবিতার ভাষা দিয়ে তিনি লড়েছেন। কবির ক্ষুরধার কলম দিয়ে নিঃসৃত প্রতিবাদের ফুলকি দখলদার ইসরাইলীদের তখত তাউসে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। সত্তর দশকে তাঁর লেখা কবিতা ‘আমাকে ছেড়ে যেও না’ ‘পরিচয় পত্র’ আলোড়িত করেছিল আমার মতো অনেক তরুণের হৃদয়। ফিলিস্তিনিদের মুক্তি সংগ্রাম হয়ে উঠেছিল আমাদের লড়াই। ফিলিস্তিনি নেতা ইসারিত আরাফাত ও কবি মাহমুদ দারবিশ হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বের তাবত নিপীড়িত মানুষের মুক্তির প্রতীক।
ফিলিস্তিনিদের সাথে আমি স্বপ্ন দেখতাম, একদিন মুক্ত হবে প্যালেস্টাইন। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সাত দশক কেটে গেছে। তারুণ্যের টগবগে দিনগুলো পেরিয়ে আমি এখন প্রৌঢ়ত্বের দ্বারগোড়ায়। কিন্তু ফিলিস্তিন এখনো শৃঙ্খলমুক্ত হয়নি। মুক্ত ফিলিস্তিন এখনো নির্বাসিত স্বপ্ন হয়ে মাহমুদ দারবিশের কবিতার পংক্তিমালায় কেঁদে মরছে। কিন্তু কেন?
১৯৬৭ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত ২৪২ নং প্রস্তাবে অধিকৃত ফিলিস্তিনে ইসরাইলের ইহুদি বসতি নির্মাণ বেআইনি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু গত পাঁচ দশক ধরে জাতিসংঘে গৃহীত প্রস্তাব ও আন্তর্জাতিক অভিমত উপেক্ষ করে অধিকৃত ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। ফলে উজাড় হচ্ছে এক একে ফিলিস্তিনি জনপদ, বাড়ি-ঘর ও জলপাইয়ের বাগান।
ফিলিস্তিনিদের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করার জন্য ইসরাইলের অন্যতম কৌশল হচ্ছে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাস দমনের অজুহাতে বুলডোজার দিয়ে ফিলিস্তিনিদের বাড়ি-ঘর গুড়িয়ে দেয়া। তবে জবরদখলের পাশাপাশি ভূমি দখলের জন্য সুদূরপ্রসারী কৌশলও প্রয়োগ করা হচ্ছে। আর এই নীলনকশা বাস্তবায়নের জন্য দখলদার ইসরাইলী কর্তৃপক্ষের সাথে একাট্টা হয়ে কাজ করছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রভাবশালী ইহুদি জনগোষ্ঠি।
যেমন আকাশচুম্বী মূল্যের বিনিময়ে জেরুজালেমের বসতবাটি বিক্রি করে আমেরিকা, ইউরোপসহ উন্নত দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য প্রলুব্ধ করা হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের। ওইসব দেশের স্থায়ী ভিসা কিংবা পাসপোর্ট করে দেয়ার গ্যারান্টিও দিচ্ছে প্রভাবশালী ইহুদিরা। ইসরাইলী দখলদার বাহিনীর নির্যাতনে অতিষ্ট ও হতাশাগ্রস্ত বহু ফিলিস্তিনি ভূসম্পত্তি বিক্রি করে আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। ফলে বৈধ ও আইনগত প্রক্রিয়ায় জেরুজালেমের বিশাল অংশ ইসরাইলীদের দখলে চলে যাচ্ছে। এভাবে ইহুদিদের সুপরিকল্পিত পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফিলিস্তিনিরা স্বদেশের ভূমি তুলে দিচ্ছেন ইসরাইলের হাতে।
গত পাঁচ দশকে ভূমি জবরদখল করে প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ ইহুদি অবৈধভাবে বসতি গেড়েছে ফিলিস্তিনে; নির্মিত হয়েছে ২৭০টি উপ-শহর। পূর্ব জেরুজালেমের ৮৬ শতাংশ এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের ৪২% জমি এখন অবৈধ ইহুদি বসতির দখলে। তাই পূর্ব জেরুজালেমকে প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী করার যে স্বপ্ন দেখা হচ্ছিল, এখন হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। যে পূর্ব জেরুজালেমের প্র্রায় পুরোটাই ইহুদিদের দখলে তা ফিলিস্তিনের রাজধানী হয় কি করে? শুধু তাই নয়, শোনা যাচ্ছে, পিএলও নিয়ন্ত্রিত বাকি অঞ্চলগুলো খুব সহসা বিশেষ আইনের আওতায় ইসরাইল সরকার দখল করে নেবে।
তেলআবিব থেকে আমেরিকার দূতাবাস অধিকৃত জেরুজালেমে সরিয়ে নেবার সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার ভিত্তিতে নেয়া হয়েছে বলে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি। এ নিয়ে দ্বিমত পোষণের অবকাশ নেই। গত পাঁচ দশক ধরে আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদদে ইসরাইল যেরকম সুপরিকল্পিত পদ্ধতিতে সমগ্র ফিলিস্তিনজুড়ে অবৈধ বসতি নির্মাণ করে চলেছে তাতে সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গড়ার মতো বাস্তবতা যেন আর নেই।
ফিলিস্তিনিদের ভূসম্পত্তি জবরদখল ঠেকানোর জন্য নতুন কৌশল নিতে ব্যর্থ হওয়ায় ফিলিস্তিনি নেতৃবৃন্দের উপর সাধারণ মানুষ যারপরনাই ক্ষুব্ধ। দুঃখজনক হলেও সত্য, ফিলিস্তিনি নেতৃবৃন্দ এখন জাতীয় স্বার্থ রক্ষার চেয়ে ক্ষমতা আকঁড়ে ধরে থাকতেই যেন বেশি আগ্রহী। প্রশাসনের সাথে সম্পর্কযুক্ত কিছু মানুষ পাচ্ছেন রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা আর উপেক্ষিত হচ্ছে সাধারণ জনতা। ১৯৯৩ সালের ইসরাইল-ফিলিস্তিনের মধ্যে দুই রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু সেই চুক্তি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। গাজ্জা ভুখন্ডে ক্ষমতাসীন হামাসের সাথে চলমান দ্বন্দ্ব এবং ইরাইলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ব্যাপারে পিএলও’র নিষ্ক্রিয়তা ইসরাইলের হাতকেই শক্তিশালী করছে।
শান্তি চুক্ষির নামে কালক্ষেপন করে ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করাই হচ্ছে ইসরাইলের অন্যতম কৌশল। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক ব্যবস্থা যে বহু আগেই ব্যর্থ হয়ে গেছে তা বর্তমান পিএলও’র নেতৃবৃন্দ মানতে রাজি নন। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য তাঁরা এখনো সেই ব্যর্থ চুক্তির শবদেহকে আঁকড়ে ধরে আছেন। পিএলও’র প্রতি ফিলিস্তিনিরা আস্থা হারিয়ে ফেলছে। পিএলও নেতৃত্বের উচিত ইসরাইলী দখলদারিত্ব মোকাবিলা করার জন্য সহসা নতুন রূপরেখা তৈরি করা।
ফিলিস্তিনিদের হতাশা এবং ক্ষোভ এখন চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নিহত একজন ফিলিস্তিনির অন্ত্যেষ্টক্রিয়ার অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীন ফাতাহ দলের সিনিয়র নেতা আজ্জাম আল-আহমদকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, ২২ বছর বয়স্ক ফিলিস্তিনির মৃত্যুর জন্য আজ্জামই দায়ী। ইসরাইলী নিরাপত্তা বাহিনীকে সরবরাহকৃত আজ্জামের তথ্যের সূত্র ধরেই খুন হয়েছে ওই ফিলিস্তিনি যুবক। উল্লেখ্য, অসলো চুক্তি অনুযায়ী ইসরাইলের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সশস্ত্র হামলার গোয়েন্দা তথ্য পিএলওকে সরবরাহ করতে হয়। ইসরাইল-ফিলিস্তিনের মধ্যেকার এই নিরাপত্তা চুক্তি ক্ষেপিয়ে তুলছে ফিলিস্তিনিদের।
নিজেদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল এবং বিভক্তির জন্যই দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারছে না ফিলিস্তিনিরা। ফিলিস্তিনে সমান্তরলভাবে কাজ করছে দু’টো প্রশাসন। গাজা ভূখন্ডে হামাস আর পশ্চিম তীরে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন পিএলও। বহু চেষ্টা করেও গাজা ভূখন্ডে হামাসের আধিপত্য খর্ব করতে পারেনি পিএলও। ২০১৪ সালে হামাস ও ইসরাইলে মধ্যেকার সংঘর্ষে প্রায় দুই হাজারের মতো গাজাবাসী নিহত হন। এই যুদ্ধের নেপথ্যে পিএলও নেতা মাহমুদ আব্বাসের হাত রয়েছে বলে অনেকের ধারণা। কারণ ইসরাইলের হাত দিয়ে পরোক্ষভাবে হামাসকে নিষ্ক্রিয় করা গেলে গাজা ভূখন্ডেও পিএলও’র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। পিএলও এবং হামাসের মধ্যে সমঝোতা না হলে সামনে এগুবার কোনো পথ দেখছি না।
ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিলিস্তিন-ইসরাইল সমস্যার স্থায়ী নিষ্পত্তি করে দেবেন বলে হুংকার দিচ্ছিলেন। এজন্য মধ্যস্থতাকারী হিসাবে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন নিজেরই জামাতা নিউউয়র্কের রিয়েল এস্টেট এজেন্ট ৩৬ বছর বয়স্ক জারড ক্রুশনারকে। ক্রুশনার, যার নেই কোনো কুটনৈতিক অভিজ্ঞতা, তাকে কি করে এমন একটি জটিল সংঘাত মেটানোর দায়িত্ব দেয়া হল তা ভেবে সবাই হতবাক!
তবে সম্প্রতি আমেরিকার দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নেবার ঘোষণা দেয়ার পর ট্রাম্পের মুখোশ খুলে পড়েছে। তিনি ইসরাইলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেই যেন বদ্ধপরিকর চান। ট্রাম্প ও ক্রুশনারের নতুন ছক অনুযায়ী পশ্চিম তীরের প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকা ছেড়ে দেয়া হবে ইসরাইলকে। পশ্চিম তীরের যে সব শহর ঘিরে ইসরাইলী অবৈধ আবাসন নির্মাণের কাজ চলছে সেগুলো জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। ক্ষতিপূরণ হিসাবে গাজা সংলগ্ন মিসরের উত্তর সিনাইয়ের একটি অংশ ফিলিস্তিনিদের দেয়া হবে। আর এই উদ্ভট আকারের দেশটির রাজধানী হবে জেরুজালেমের উপকন্ঠে অবস্থিত মাত্র তের হাজার মানুষের ছোট্ট শহর আবু দিজ। ফলে এতদিন ধরে ফিলিস্তিনীরা যে স্বাধীন রাষ্টের স্বপ্ন দেখছিল তার কোনো অস্তিত্বই থাকবে না।
ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকার সব প্রশাসনই ইসরাইলবান্ধব। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি হচ্ছে, যেকোনো মূল্যে ইসরাইলের স্বার্থরক্ষা করা এবং জাতিসংঘে ইসরাইলবিরোধী প্রস্তাবে ভেটো দেয়া। তবে এবারের ট্রাম্প প্রশাসনের ইসরাইলপ্রীতি আগের সব প্রশাসনকে ছাড়িয়ে গেছে। ভয়ংকর কথা হল, তার সাথে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা, মুসলিম বিদ্বেষ ও বর্ণবাদ। প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আজ যারা সমাসীন তাদের অনেকেই শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ব ফোবিয়ায় আক্রান্ত। তাই এই প্রশাসন থেকে কোনোভাবেই ফিলিস্তিন সমস্যার ন্যায্য সমাধান আশা করা যায় না।
