মুক্তির স্বাদ পেতে চার দশকেরও বেশি যুদ্ধ করেছে ভিয়েতনামের লড়াকু মানুষ। পরাশক্তি আমেরিকার সাথে দীর্ঘ ১১ বছর লড়াই করে বিজয়ী হয়েছে। জেনে হতবাক হয়েছি, ভিয়েতনাম যুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি বোমা বর্ষিত হয়েছে, যা মাথাপিছু ৫০০ কিলোগ্রাম।

১৯৭৫ সালে সাইগনের (হো চি মিন সিটি) আমেরিকান দূতাবাসের ছাদে উঠে হেলিকপ্টারে করে পরাজিত আমেরিকানদের পলায়নের দৃশ্য আমার স্মৃতিতে এখনো ভাস্বর হয়ে আছে। এই লড়াকু জাতিকে কাছ থেকে দেখার ইচ্ছা ছিল বহুদিনের। সেই সূত্রেই ভিয়েতনামে যাওয়া।

হ্যানয়ে পা দেওয়ার পর প্রথম শ্রদ্ধা জানাতে যাই ভিয়েতনামের জাতীয় বীর ও বিপ্লবী নেতা হো চি মিন-এর সমাধিসৌধে। সমাধিসৌধের অভ্যন্তরে একটি বিশাল কক্ষের আলো-আঁধারিতে এক ছোট্ট বিছানায় রাখা আছে হো চি মিনের নশ্বর দেহ। বিনম্র ভালোবাসায় নতজানু হয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছিলেন সবাই। দেশ ও জাতির জন্য কি না করেছেন এই মহান নেতা! কারাগারে বসেও তাঁর হৃদয়জুড়ে ছিল কেবল মাতৃভূমি। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে লিখেছিলেন কবিতা:

আমি ভাবি আমার মাতৃভূমির কথা
আমি উড়ে যাই দূর বহুদূর আমার স্বপ্নের ভেতরে।
আমি স্বপ্ন দেখি পথ হারিয়ে
আটক হয়েছি বেদনার জালে।
এখানে শেষ হয়ে এল একটি বছর
কি অপরাধ ছিল আমার?
অশ্রুসজল লিখছি আমি
আরো একটি জেলের কবিতা।

হ্যানয়ের নৈ বাই এয়ারপোর্টে নামার আগে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলাম। কমিউনিস্ট দেশ, না জানি কি হয়! তবে বিমানবন্দরের এরাইভ্যাল লাউঞ্জে পা দিতেই মনটা হালকা হয়ে গেল। খুবই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন চারদিক, কিছু দূর পর পর নরম গদির বসার জায়গা, সারি সারি রকমারি খাবারের দোকান। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমানবন্দরের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। ওয়াশরুমে গিয়ে রীতিমত হোঁচট খেলাম। বিমানবন্দরে এমন ঝকঝকে, পরিচ্ছন্ন টয়লেট কখন দেখেছি মনে পড়ে না। হাত ধোয়ার বেসিন সংলগ্ন দেয়ালটি কংক্রিটের বদলে স্বচ্ছ কাঁচ দিয়ে তৈরি। টয়লেটে ঢুকলেই দৃষ্টির সীমানায় ভেসে ওঠে হ্যানয় শহরের ১৮০ ডিগ্রি মনোরম দৃশ্য।

ভিসা ফরম আর দুই কপি ছবি নিয়ে অভিবাসনে গেলাম। খুব বেশি ভিড় নেই। ফরম জমা দিতে গিয়ে দেখি, আমার স্ত্রীর পাসপোর্ট সাইজের ছবি আনা হয়নি। শুনেছি, ইমিগ্রেশানে ছবি তোলার মূল্য প্রতি কপি ৫ ডলার এবং তাতে অনেক সময়ও লেগে যেতে পারে। ফরম জমা নিয়ে আমাদের বসতে বলা হল। একটু পরেই যাক আসল। তবে ছবি তোলার কোনো কথা না তুলেই ভিসা দিয়ে দিল তারা। বিমানবন্দর হচ্ছে একটি দেশের প্রবেশদ্বার। বিমানবন্দরের প্রথম অভিজ্ঞতা একজন যাত্রীকে ওই দেশ সম্পর্কে একটা চট্জলদি ধারণা দিয়ে দেয়। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে মনে হচ্ছিল, আসছে দিনগুলো খুব একটা মন্দ কাটবে না।

এয়ারপোর্টে নেমে মোবাইল ফোনের জন্য একটা স্থানীয় সিম কিনে নিলাম। লাগেজ নিয়ে বাইরে বেরুতেই হোয়াট্সঅ্যাপে হোটেল থেকে টেক্সট এলো, তোমাদের গাড়ি হাজির। হোটেলের পাঠানো গাড়িতে উঠে ট্যাক্সিচালকের সাথে গুগল ট্রান্সলেট দিয়ে আলাপ জুড়ে দিলাম আমরা সবাই। মুচকি হেসে বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন তিনি। ৩০ মিনিটের মধ্যে হ্যানয়ের ‘বাদিন’ এলাকায় ভাড়া করা সার্ভিস্ড অ্যাপার্টমেন্টে চলে এলাম। ট্যাক্সি বিদায় দেওয়ার আগে চালক আমার মোবাইল ফোনে মুখ রেখে ভিয়েতনামীজ ভাষায় কি জানি বললেন। পরক্ষণেই মোবাইল ফোনের পর্দায় গুগল ট্রান্সলেটরে ভেসে উঠলো -Welcome to Hanoi (হ্যানয়ে স্বগতম)!

তাৎক্ষণিক মিলিয়নিয়ার হতে চাইলে ভিয়েতনাম আসুন। এ দেশের মুদ্রার নাম ডং। এক আমেরিকান ডলারে প্রায় ২২ হাজার ৭০০ ডং পাওয়া যায়। মাত্র ৫০ ডলার ভাঙালেই হয়ে যাবেন মিলিয়নিয়ায়। ভিয়েতনামে জিনিসপত্রের দামও খুব বেশি নয়। তবে হাজার, লক্ষ ডং দিয়ে বিল দিতে গিয়ে প্রথমে বেশ ভড়কে গিয়েছিলাম। যেমন এককাপ কাপুচিনর দাম ৭৫ হাজার ডং, একটি পাউরুটি ৪০ হাজার ডং ইত্যাদি। তবে ভিয়েতনামের দিনগুলো একজন মিলিওনিয়ার হিসাবে কাটবে ভেবে বেশ পুলকিত হচ্ছিলাম।

হ্যানয়ে থাকার জন্য হোটেলের বদলে একটা সার্ভিসড অ্যাপর্টমেন্টে বেছে নিয়েছিলাম। সত্যি বলতে কি, অ্যাপার্টমেন্টের রান্নাঘরটা খুব কাজে দিয়েছিল। অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে দেখি, বিশেষ পোশাকে সজ্জিত হোটেলের প্রথাগত বয়-বেয়ারার বদলে রয়েছে একঝাঁক স্মার্ট তরুণ-তরুণী। সবাই সুশিক্ষিত, অনেকে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাও শেষ করেনি। সবাই ইংরেজিতে দক্ষ। আর সেবা দেয়ার জন্য তাদের হাতে রয়েছে মুঠোফোন। কোনো কিছুর জন্য রিসিপশনে ফোন করার দরকার নেই। হোয়াট্সঅ্যাপে ম্যাসেজ দিলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সব হাজির। টিপস নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। আচার-ব্যবহারে বিনয়ী, পারলে ওরা আকাশের তারা আপনার হাতের মুঠো এনে দেবে। বিশ্বের বড় বড় হোটলে ওয়াই-ফাই সংযোগ একটা সমস্যা। কিন্তু হ্যানয়ের অ্যাপার্টমেন্টে বেগবান নেটের গতি মুগ্ধ করলো আমাদের। হ্যানয়ে রাস্তার ধারে ঝুপড়ি দোকানেও রয়েছে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সংযোগ।

পরদিন আগে থেকে বুকিং করে রাখা ডে ট্যুরে বেরুলাম। নির্ধারিত সময়ের ঠিক পাঁচ মিনিট আগে গাড়ির নাম্বার সহ খুদে বার্তা আসল, আমাদের নিতে ট্যুর গাইড হোটেল লবিতে অপেক্ষা করছে। ভিয়েতনামে যতদিন ছিলাম, কোথাও সময়ের ব্যাত্যয় হতে দেখিনি। নির্ধারিত সময়ের আগে চলছে ওরা। হ্যানয় শহর ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামঞ্চলে গিয়েছি। রাস্তার দু’পাশে অবারিত সবুজ ফসলের ক্ষেত, সারি সারি কলা গাছ, মেঠো পথ, মনে হচ্ছিল এ যেন সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ। দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ার সব দেশেই বরফ-চা এবং কফি খুবই জনপ্রিয়। গ্রামের একটি দোকানে স্থানীয় মানুষদের সাথে বসে বরফ-চা খেলাম। দোকানে টেবিলের পাশে থাকে বিশেষ ধরনের হুক্কা, চায়ের সঙ্গে সবাই হুক্কায় সুখটান দিচ্ছেন।

আমাদের ট্যুর গাইডের নাম সিন। ইংরেজিতে পারদর্শী। অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিল। নিজের দেশের কথা বলতে গিয়ে সিন-এর চোখে মুখে দেশের প্রতি গভীর মমত্ববোধের ফুটে উঠছিলো। আমাদের ট্যুর শেষ হওয়ার কথা বিকেল সাড়ে পাঁচটায়, কিন্তু সিন আমাদের সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত ঘোরাল। পথে গাড়ি থামিয়ে কেনাকাটার মতো আমাদের ছোটখাট আবদার অকুন্ঠচিত্তে পূরণ করার চেষ্টা করছিল। সিনের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হলাম সবাই।।

হ্যানয়ের রাস্তাজুড়ে শুধু মোটরবাইক। সিগন্যাল ছাড়লেই মনে হয় নর-নারী, জোয়ান-বুড়ো সবাই যেন মোটরবাইকের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। তবে চালকদের মধ্যে মারমুখী ভাব নেই। ভিয়েতনামে প্রতি তিনজনের রয়েছে একটি করে মোটর বাইক। চীনসহ দক্ষি-পশ্চিম এশিয়ার দেশে এই দৃশ্য খুব চোখে পড়ে। হ্যানয়ে ট্রাফিক জ্যাম না থাকার হয়তো এটাও একটা কারণ।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের নিদর্শন নিয়ে হ্যানয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি যাদুঘর। তবে যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন বেশি রয়েছে ভিয়েতনামের দক্ষিণে হো চি মিন সিটিতে। হ্যানয়ে আছে হোয়া লো প্রিজন। পায়ে লোহার বেড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হত যুদ্ধবন্দিদের। যা দেখলে গা শিঁউরে ওঠে। আরো আছে মুন্ডচ্ছেদনের জন্য গিলোটিন। সামরিক যাদুঘরের উন্মুক্ত উঠোনে দেখলাম যুদ্ধে ব্যবহৃত কামান ও অস্ত্রশস্ত্র। এছাড়া আমেরিকার বি-৫২ বোমারু বিমানের ভগ্নাবশেষ। বি-৫২ বিমানকে আমেরিকানরা বলত ফ্লাইং ফোট্রেস বা ‘উড়ন্ত দুর্গ’। এই ধরনের কয়েকটা বিমান ধ্বংস হবার পর আমেরিকানদের মনোবলে চিড় ধরে।

আমেরিকানদের ঝেটিয়ে বিদায় করলেও ডং-এর পাশাপাশি আমেরিকান ডলারই রাজত্ব করছে ভিয়েতনামে। ছোটখাটো দোকান ছাড়া প্রায় সবখানেই ডলারেই বিল দেয়া যায়। পর্যটক ফেরি করার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় বাহন দেখলাম আমেরিকার ফোর্ড কোম্পানির ১০ সিটের ভ্যান। ডলারের মতো ভিয়েতনামের রাস্তাও ফোর্ড কোম্পানির গাড়ির দখলে!

আমাদের ভিয়েতনাম সফরের হাইলাইট হচ্ছে হা-লং বে’র বোট ক্রুজ। নৌকার মধ্যে দুইরাত, তিন দিন কাটাবো ভাবতেই রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম। হ্যানয় থেকে হা-লং বে’তে গাড়িতে যেতে প্রায় তিন ঘন্টা লাগে। প্রায় দুই হাজার ছোট ছোট দ্বীপের সমাহার হচ্ছে এই হা-লং বে। হা-লং বে’তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাথুরে পাহাড়গুচ্ছ। হ্যা-লংয়ের অর্থ হল ভূমিতে নেমে আসা ড্রাগন। পুরাকালে এই এলাকার মানুষকে দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই নাকি স্বর্গ থেকে ঈশ্বর পাঠিয়েছিলেন পাঠিয়েছিলেন ড্রাগন পরিবার। ড্রাগন পরিবারের দেহের টুকরো বিভিন্ন আকৃতির পাহাড় হয়ে ছড়ানো রয়েছে হা-লং বে’তে। পানি সরে গেলেই জেগে উঠবে ড্রাগন।

আমাদের বোটের নাম এলিসা ক্রুজ, চারতলা বোট। রয়েছে টয়লেটসহ অত্যাধুনিক কক্ষ। দুটি চেয়ার ও টেবিল সহ ছোট্ট একটি বারান্দা। পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলছিল আমাদের তরী। যতদূর চোখ যায় দেখছি, সমুদ্রের নীলাভ জলরাশির মধ্যে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের সারি। তরীতে কর্মকাণ্ডের শেষ নেই। খুব ভোরে চারতলার ছাদে তাই-চি ক্লাস দিয়ে শুরু হয় দিন। তার পর রান্না ক্লাস, মাছ ধরা ও ছোটো নৌকা নিয়ে কাইকিং, মুক্তো চাষের খামারে যাওয়া ইত্যাদি আরো কত কিছু! দুপুরে বোটে রান্না হল সুস্বাদু ভিয়েতনামি খাবার।

ডাইনিং রুমে আমাদের জন্য একটি টেবিল নির্ধারিত ছিল। বুফে মেনুতে ভেজিটারিয়ান খাবার থাকলেও হালাল খাবারের আরজি ছিল বলে আমাদের জন্য আলাদা করে খাবার রান্না করে টেবিলে দেওয়া হচ্ছিল। শেফ নিজে এসে আমরা কি চাই, তা জেনে নিচ্ছিলেন বারবার। নুডল সুপটাও সব্জি স্টক দিয়ে রান্না করা হল। ক্রুজের ব্যস্থাপক ও শেফ শুধু আমাদের টেবিলে এসে তদারকি করছিলেন সব ঠিক আছে কিনা। তাদের বিনয় এবং যে কোনো মূল্যে অতিথিদের খুশি রাখার প্রচেষ্টা দেখে বিস্মিত হয়েছি।

ক্রুজের ব্যবস্থাপক থেকে শুরু করে শেফসহ সব কর্মচারীরা সব ধরনের কাজ করছে। শেফ কেবল রান্না করেই ক্ষান্ত হননি। রান্না শেষে সবার সঙ্গে অন্যান্য কাজও করছেন। সব সময় হাসি লেগে আছে সবার মুখে। কোনো ক্লেশের চিহ্ন নেই কোথাও। মনে হলো নিজের পারিবারিক ব্যবসা চালাচ্ছে। জাহাজ ছেড়ে আসার সময় মনে হল, পর্যটকরা আবার যাতে ভিয়েতনাম ফিরে আসেন, সেটা নিশ্চিত করেই যেন সবাইকে বিদায় দিচ্ছে।

ভিয়েতনামে উবারের মতো রয়েছে GRAB. মোবাইলে ডাক দিলে চট্ করে চলে আসে। ভাড়াও সহনীয়। তবে কিছু প্রাইভেট ট্যাক্সি রয়েছে যেগুলো থেকে দূরে থাকাই ভালো। হ্যানয়ের ‘ওল্ড কোয়ার্টার’ এলাকায় শপিং শেষে দিনের ব্যস্ত সময়ে GRAB পেতে সময় নিচ্ছিল। তাই ভাবলাম প্রাইভেট ট্যাক্সি নিয়েই হোটেলে ফিরে যাই। ট্যাক্সিতে উঠে দেখি মিটার শুরুই হল এক লক্ষ ডং দিয়ে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে ড্রাইভার বলল, হোটেলে যাবার পথটা এখন ওয়ানওয়ে, তিনি আর যাবেন না। বাকি পথটুকু আমাদের হেঁটেই যেতে হবে। বুঝতে পারলাম রাম ধরা খেয়েছি।

তর্ক করে ফায়দা হল না। ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়ানো যাচ্ছিল না। ভাড়া দেখে চক্ষু চড়কগাছ! এটুকু পথ, দিতে হবে ৪ লাখ ডং। অথচ গ্রাব কিংবা ট্যাক্সি নিলে ভাড়া হতো বড়জোর ৭৫ হাজার ডং। ভিয়েতনামে দেখে শুনে ট্যাক্সিতে উঠা উচিত। নির্ভরযোগ্য ট্যাক্সিক্যাব চেনার উপায় একটু গুগল করলেই জানা যায়। তবে এ ঘটনায় আমি খুব একটা বিচলিত হইনি। হ্যানয়ে আসার পর একটা ঘোরের মধ্যে দিন কাটছিল। সবকিছু এতটা নিখুঁত, অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। অবশ্য ৪ লাখ ডং ট্যাক্সি ভাড়া দিয়ে শূন্য থেকে যেন মর্ত্যে নেমে এলাম, ভিয়েতনামিরাও মানুষ!

ভিয়েতনাম থেকে বিদায় নেবার সময় সমাগত। ভ্রমণের জন্য বরাদ্দ করা দিনগুলো এক টুকরো মিষ্টি স্বপ্নের মতো কেমন করে মতো দ্রুত শেষ হয়ে গেল বুঝতে পারিনি। উৎসবের আমেজ নিয়ে ঘুরে-ফিরে দেখার মতো অনেক কিছুুই রয়েছে রংবেরঙের বর্ণিল এই হ্যানয় শহরে। আমার পরিবারের সবার মুখে বেদনার লঘু ছায়া। ইশ, আরো ক’টা দিন যদি থাকা যেতো?

লাগেজ গুছাতে গিয়ে ভাবছিলাম, বাংলাদেশটা কেন এমন হয় না? কাপ্তাই লেক, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, সিলেটের চা বাগান, রানি ভবানী, রাতারগুল, ময়নামতি, মহাস্থানগড়, কক্সবাজার, কুয়াকাটাসহ অনেক দর্শনীয় স্থান তো রয়েছে বাংলাদেশে। যদিও এইসব আকর্ষণীয় স্থানে এখন দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে অনেক। কিন্তু নিরাপত্তা, স্যানিটেশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিদেশি পর্যটকবান্ধব পরিবেশ এখনো তৈরি করতে পারিনি আমরা।

কিছুুদিন আগেও হ্যানয়ের রাস্তা ততটা নিরাপদ ছিল না। কিন্তু পাল্টে গেছে সেই দিন। আমি রাত দশটার দিকে কেনাকাটা করার জন্য হোটেল থেকে বাইরে যেতে চাচ্ছিলাম। আমার ইতস্তত ভাব দেখে নিরাপত্তাকর্মী বললেন, ‘ভয় নেই, তুমি যে কোনো সময় রাস্তায় বেরুতে পারবে।’ ভিয়েতনামের একজন নাগরিক আমার মতো বিদেশি পর্যটককে নিরাপত্তার এমন গ্যারান্টি দিচ্ছে। বুঝতে বাকি রইল না, কেন এখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছে হাজারো লাখ পর্যটক।

বাংলাদেশের সেরা আকর্ষণ কক্সবাজারের কথাই ধরা যাক। গাড়ি নিয়ে যাবার পথে বিশ্রামের জন্য লোহাগড়ায় রয়েছে বড় একটি রেস্তোরাঁ। রেস্তেরাঁর ওয়াশরুমের করুণ দশা দেখলে বিদেশি কেন অনেক দেশীয় পর্যটকও দ্বিতীয়বার পা দিতে চাইবে না। দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার অধিকাংশ দেশে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি একটি বড় সমস্যা। অথচ হ্যানয় শহর থেকে ভিয়েতনামের গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত যেখানেই গিয়েছি রাস্তা-ঘাট আর টয়লেটের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা চমকপ্রদ এবং অনুকরণীয়।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে কেবল নাপাম বোমাই ফেলা হয়েছিল প্রায় ৪ লাখ টন। আঠাল অগ্নিদাহ্য কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি এই বোমার আঘাতে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল গ্রামের পর গ্রাম আর নিরীহ মানুষ। এছাড়া আকাশ থেকে অরেঞ্জ কেমিক্যাল ছড়ানোর ফলে উজাড় হয়ে গিয়েছিল ভিয়েতনামের বনাঞ্চল আর খেত-খামার। এর প্রভাবে জন্ম নিয়েছিল লাখ লাখ বিকলাঙ্গ শিশু, ত্রিশ লাখেরও বেশি মানুষ ভুগছে লিউকোমিয়া, ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিতে। কিন্তু এর পরও ছাইভস্ম থেকে দাঁড়িয়ে গেছে ভিয়েতনাম।

আমি হতাশ নই। আমার বিশ্বাস, এমন একদিন আসবে যেদিন আমার মতো কেউ বাংলাদেশ ঘুরে গিয়ে ফেসবুক কিংবা সোস্যাল মিডিয়ার পাতায় বারবার ফিরে আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করবে। আর বাংলাদেশ ভ্রমণে আসা বিদেশি পর্যটকদের স্বদেশী কোনো ট্যুর গাইড দেশ ও জাতির কথা বলতে গিয়ে চোখে মুখে খাঁটি দেশপ্রেমের দীপ্ত অহংকার নিয়ে বলবে, ‘ইনহাস্ত ওয়াতানম’ এই তো আমার জন্মভূমি।

(ভিয়েতনামে পারিবারিক ভ্রমণ নিয়ে লেখা)