ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজ সার্ধশত বর্ষে পদার্পণ করেছে। ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মাস্টার দা সূর্য সেন, প্রীতিলতা, মাহবুবুল আলম চৌধুরী, শহীদ অধ্যাপক অবনীমোহন দত্তের মতো কিংবদন্তির পদচারণায় মুখরিত এই কলেজের আমিও একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ভেবে শিহরিত হই। কলেজের সেই সোনালি দিনগুলোর কথা লিখতে গিয়ে এত স্মৃতিকথা মনে ভীড় জমাচ্ছে যে কি লিখবো ভেবে পাচ্ছি না।
মনে পড়ছে চট্টগ্রাম কলেজ ক্যাম্পাসের প্রথম দিনটির কথা। কলেজে ভর্তি হবার জন্য লিখিত পরীক্ষায় বসেছি। বাংলা প্রশ্নপত্রে ‘পরীক্ষার সকাল’ এই ধরনের একটি বাংলা রচনা লিখতে বলা হয়েছিল। শিরোনামটা ঠিক মনে করতে পারছি না। তখন আমার লেখনীতে বাংলা সৃজনশীলতার বসন্ত এসে গেছে। কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙে ছেয়ে গেছে ভাবনার আঙ্গিনা। বাড়ি থেকে পরীক্ষার্থীদের দুরু দুরু বক্ষে পরীক্ষা হলের দিকে যাত্রাকে শোকে মুহ্যমান, গোরস্থানগামী শব্দহীন শবযাত্রার সাথে তুলনা করে একটি বড় রচনা লিখে ফেলেছিলাম। পরবর্তীতে মৌখিক পরীক্ষায় সময় স্যারেরা লেখাটির বেশ প্রশংসা করেছিলেন, যা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
সি সেকশনে জায়গা পেলাম। ঘাটফরহাদবেগ খলিফা পট্টি এলাকা থেকে নিয়মিত কলেজে যাতায়াত করতাম। কখনো আব্দুস সাত্তার রোড ধরে গনি বেকারির সমুখ দিয়ে দিয়ে কলেজে যেতাম কিংবা সিরাজউদ্দৌলা রোড ধরেই কলেজে ঢুকতাম। কলেজে যাবার পথে সিরাজদ্দৌলা রোডের উপর চন্দনপুরা মসজিদের একটু আগে ছিল ‘নানা ভিলা’। হেঁটে যাবার সময় বাড়ির নাম কি করে ‘নানা’ হয় সে নিয়ে বন্ধুদের সাথে বহু ঠাট্টা মস্করা করতাম। কিন্তু এই বাড়ির একটি মেয়েই যে আমার জীবনসঙ্গীনী হবে তা ভাবিনি কখনো। হ্যাঁ, এই নানা ভিলাই হচ্ছে আমার শ্বশুরবাড়ি। নোয়াখালীতে খুব কাছের বন্ধুকে নানা বলা হয়। আমার শ্বশুর ও তাঁর একজন বন্ধু মিলে তৈরি করেন এই বাড়ি। তাঁদের বন্ধুত্বের বন্ধনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বাড়ির নামকরণ করা হয় ‘নানা ভিলা’।
টুকটাক লেখালেখির সুবাদে চট্টগ্রাম কলেজে উঠতি কবি হিসাবে একটু নাম ধামও হয়েছিল। ওই সময় যারা কাব্যচর্চা করত তাদের পায়জামা, পাঞ্জাবী, পায়ে চপ্পল আর এলামেলো চুল নিয়ে ঘুরাফেরা করাই ছিল চূড়ান্ত ফ্যাশন। আমিও মাঝে মধ্যে সেরকম গেটআপ নিয়ে ভাব ধরতাম। কলেজের অডিটোরিয়ামে বাছাই করা কবিদের স্বরচিত কবিতা নিয়ে নিয়মিত কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান হত। অধীর আগ্রহে অপক্ষো করতাম কখন আমার ডাক আসবে, মঞ্চে গিয়ে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করবো। তেমন একটি কবিতার কথা এখনো মনে পড়ে, ‘তুমি ছিলে হৃদয় নীলে আমোঘ ব্যথার মতো, হঠাৎ কখন হারিয়ে গেলে বুকে আমার ক্ষত, সেই ব্যথারই দহন জ্বালায় জ্বলছি অহর্নিশ, আর দিও না তুমি আমায় ওমন ধরণ বিষ।’
প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী নকীব খান ছিলেন আমার চট্টগ্রাম কলেজের সহপাঠী। আমার লেখা এবং নকীব খানের সুরে বেশ কিছু বিখ্যাত গানের সৃষ্টি হয়েছিল এই ক্যম্পাসেই। কলেজের অদূরে কাজেম আলী হাই স্কুলের নিচের তলাতে ছিল নকীবের বাসা। সোলসের বাদ্যযন্ত্রগুলো ওর বাড়িতেই থাকতো। দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকে প্রায় ওর বাসায় গিয়ে আড্ডা দিতাম। নতুন নতুন সুর করা গান শোনাতো নকীব। গানের কথায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সুর তৈরি করার বিরল প্রতিভা ছিল নকীবের।
নকীবের একটা ১৯৬৮ সালের ডাইরী ছিল। সব নতুন গান নকীব ওই ডাইরীতে তারিখসহ লিখে রাখতো। সত্যি বলতে কি, নকীবের অনুপ্রেরণাতেই গান লেখা শুরু করি। নকীবের সেই বিখ্যাত ডাইরীর থেকে আমার লেখা দু’টো বিখ্যাত গানের পান্ডুলিপির ছবি দিলাম।
কলেজের শ্রেণীকক্ষে বসেই লিখেছিলাম ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে (১৩ ফেব্রুয়ারি ’৭৭)’, ‘ওরে ছোট্ট বেলার সাথী’, ‘ভুলে গেছো তুমি (৩০ নভেম্বর ’৭৭)’ ‘আমার মনে হল (১২ জানুয়ারি ’৭৭)’-এর মতো গান।
আমার অধিকাংশ গানই চট্টগ্রাম কলেজের ২য় বর্ষে পড়াকালীন ১৯৭৭ সালে লেখা। কলেজের সায়েন্স গ্যালারিতে বসে লেখা কয়েকটি কিছু অসংলগ্ন পদ্য বন্ধু নকীব খানের সুরের দীপ্তিতে যে কালজয়ী গান হয়ে যাবে সে কখনো ভাবিনি। সত্যি বলতে কি, চট্টগ্রাম কলেজ ক্যাম্পাসের ব্যতিক্রমী ও স্বপ্নময় পরিবেশই ছিল আমার গীতিকবিতার অনুপ্রেরণা।
কলেজের মাসিক বেতন দেয়ার স্মৃতি এখনো মনে পড়ে। মূল বিল্ডিংয়ের একটি কক্ষের জানালা দিয়ে বেতন দিতে হতো। অনেক সময় ঠেলাঠেলি করে লাইনে দাঁড়িয়ে কত তাড়াতাড়ি বেতন দেয়া যায় সে নিয়ে চলতো প্রতিযোগিতা। ভীড় এড়াবার জন্য অনেক সময় দুই ক্লাসের ফাঁকে দে ছুট বলে দৌড় দিয়ে বেতন দিয়ে আসতাম। কখনো কাছের কোনো বন্ধুকে আমার হয়ে বেতন দিয়ে দেয়ার জন্য অনুনয় বিনয় করে টাকাটা হাতে ধরিয়ে দিতাম।
যতদূর মনে পড়ে, আমাদের সময় মানবিক বিভাগের বেতন ছিল ৮ টাকা আর বিজ্ঞানে বিভাগের বেতন একটু বেশি অর্থাৎ ৯ টাকা। একাউন্ট্যান্ট জনাব কামাল সাহেব বেতনের টাকা সংগ্রহ করতেন। বেশ কিছুদিন হল তিনি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। তবে বন্ধুদের কাছ থেকে জেনেছি, তিনি চুক্তিভিত্তিক কাজ নিয়ে আবারো কলেজে ফিরেছেন।
কলেজ গ্যালারির ক্লাসগুলোর প্রতি আমাদের একটা বিশেষ আকর্ষণ ছিলো। কারণ ওই গ্যালারিতে বসেই করা হত যতসব দুষ্টুমি। কলেজ গ্যালারির ক্লাসগুলোর প্রতি আমাদের একটা বিশেষ আকর্ষণ ছিলো। কারণ ওই গ্যালারিতে বসেই করা হত যতসব দুষ্টুমি। বিশেষ করে বাংলা ক্লাসের শিক্ষককে উদ্ভট প্রশ্ন করে আমরা বিব্রত করার চেষ্টা করতাম। আমাদের প্রশ্ন শুনে ক্লাসের সবাই উদ্বেলিত হত আনন্দে আর প্রশ্নকারী বন্ধু খেতো স্যার কিংবা ম্যাডামের ঝারি-ঝুরি ও বকা। সেই মজার দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনো হেসে খুন হই।
একবার অঙ্কের ম্যাডাম একবার ক্লাসে জিজ্ঞাস করেছিলেন, Infinity মানে কি? উত্তর পেয়েছিলেন, ‘ম্যাডাম, ডান্ডা বাই আন্ডা’। বন্ধু ইকবাল হোসেনকে underground modified stem এর উদাহরণ দিতে বলেছিলেন এক ম্যাডাম। সে সরল মনে উনার সামনে হাত গোল করে বলেছিল, ‘গোল আলু, ম্যাডাম’। ইকবালের উত্তর সঠিক হওয়া সত্ত্বেও উনি ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন। তবে দয়াপরবশ হয়ে ৮ নম্বর দিয়ে পাশ করিয়ে দিয়েছিলেন। আরেকজন বিখ্যাত ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন যার নাম ছিল সাধন চন্দ্র পাল, যিনি কেউ দুষ্টুমি করলে শাস্তিস্বরূপ বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে রাখতেন।
কলেজের ছাত্রীরা এখন সাদা এপ্রন পরে ক্লাসে আসে। তবে মেয়েদের জন্য এই এপ্রন চালু হবার পেছনের ইতিহাস হয়তো অনেকেই জানে না। সেই গল্পই এখন বলছি। গ্যালারির ক্লাসে আমাদের কিছু দুষ্ট বন্ধু শেষের বেঞ্চ থেকে মার্বেল গড়িয়ে দিতো। সেই মার্বেল গ্যালারি পেছন থেকে টক-টক শব্দ করে গড়িয়ে এসে সামনের সারি ছাত্রীদের কাছে এসে থেমে যেতো। সিরাজুল ইসলাম স্যার সি সেকশানে অজৈব রসায়ন পড়াতেন। কেমিস্ট্রি গ্যালারির একটি ঘটনা। যথারীতি পেছনের সারি থেকে মার্বেল গড়িয়ে পড়ছে। স্যার বেশ কয়েকবার আড় চোখে তাকিয়ে দেখে হঠাৎ করে পড়ানো বন্ধ করে দিলেন।
সেদিন ক্লাসের একজন বান্ধবী টি-শার্ট পড়ে এসেছিলো। তাতে বন্ধুরা খুব উচ্ছ্বসিত ছিল বলে মার্বেল গড়িয়ে দেয়ার মাত্রাও বেড়ে গিয়েছিল। স্যার হয়ত কারণটা বুঝতে পেরেছিলেন। স্যার তখন ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন, ‘আপনারা এমন কোনো পোশাক পরবেন না, যা দেখে এই অল্প বয়সের যুবকদের মতিভ্রম হয়, লেখাপড়া ব্যাহত হয়। আমরা চাই না তারা ক্ষতিগ্রস্ত হোক।’ পুরো ক্লাসে পিন-পতন নীরবতা। মার্বেল বন্ধুগণ নির্বাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো। এই ঘটনার সপ্তাহখানেক পর নোটিশ বোর্ডে একটা বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়ল। প্রত্যেক ছাত্রীকে কলেজে বাধ্যতামূলক সাদা রঙের এপ্রন পড়ে আসতে হবে। যা পরবর্তীতে সব কলেজে প্রচলন হয়। এরপর বন্ধুরা সাময়িক মার্বেল ছোঁড়া বন্ধ রাখলেন।
কলেজের প্রধান ফটক থেকে এখন বিদায় নিয়েছে আইয়ুব খান (AK)। গেইটটি নির্মিত হয় আনুমানিক ১৯৬৯ সালে যখন আইয়ুব খান ছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। জানা যায়, তাঁকে খুশি করার জন্যই নাকি প্রেসিডেন্টর নামের অদ্যাক্ষর কলেজ গেইটের ডিজাইনে ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে এ নিয়ে অনেকে দ্বিমত পোষণ করে থাকেন।
যেমন আমাদের ডাকসাইটে ইংরেজি শিক্ষক রঞ্জিত চক্রবর্তীর মুখে শুনেছিলাম গেইটে ব্যবহৃত অক্ষর দুটোর মানে হচ্ছে acquire knowledge. জানি না কোনটা সঠিক। নাম যাই হোক না কেন, আগের গেইটটি যে দৃষ্টিনন্দন ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আইয়ুব খানের নাম মনে পড়লে বুকের মধ্যে যেমন একটা কাঁটা বিধতো তেমনি আবার আজ গেইটটি ভেঙ্গে ফেলার কথা শুনে নষ্টালজিক ভাবনায় ডুবে যাচ্ছি।
আমার দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে কম সময় কাটিয়েছি চট্টগ্রাম কলেজে, যা কিনা দু’বছরেরও কম। অথচ এখন জীবনের পড়ন্ত বেলায় দাঁড়িয়ে হিসাব কষে দেখি, সবকিছু ছাপিয়ে ৭৭-এ লেখা কয়েকটি গানের গীতিকার হিসাবেই সবাই আমাকে মনে রেখেছে।
স্মৃতির মিউজিয়ামে সযত্নে তুলে রাখা চট্টগ্রাম কলেজের আনন্দ-বেদনার কথা-মালা এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ইচ্ছে করে সবার অগোচরে ফিরে যেতে সেই দিনগুলোতে। আর বন্ধুদের সাথে নিয়ে আড্ডার ঘুড়ি হয়ে নীলিমায় ভাসতে। এখনো চোখ বুজলে দেখতে পাই স্মৃতির তারাগুলো হৃদয়ের ধূসর আকাশে কেমন করে জ্বলে আর নেভে। রবি ঠাকুর যথার্থই বলেছেন, ‘রাতের সব তারাই আছে, দিনের আলোর গভীরে।’
