অনেকে বলেন, রক্তের সম্পর্কই নাকি সবচেয়ে বড় সম্পর্ক; বংশের ধারাবাহিকতায় যাদের রক্ত আমরা শিরায় বহন করছি তারাই হলেন সত্যিকারের আপনজন। বংশপরম্পরায় কি শুধু আপন-পর নির্ধারণের মাপকাঠি হতে পারে? হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক থেকে অজানা, অচেনা মানুষের দেয়া রক্ত শিরায় ধারণ করে আমরা নতুন জীবন পাচ্ছি, সুস্থ হয়ে উঠছি। এভাবে নিজের অজান্তে সম্পূর্ণ অচেনা, ভিন্জাতির মানুষের সাথে আমাদের প্রতিনিয়ত নতুন রক্তের সম্পর্কের সূচনা হচ্ছে। যারা এই অমূল্য রক্ত দান করছেন তারা কি আমাদের আপনজন হতে পারেন না?

যে কোনো দুর্ঘটনায় শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে সেই রক্তশূন্যতা পূরণের জন্য বাড়তি রক্তের প্রয়োজন হয়। আবহমান কাল ধরে আমাদের দেহের জন্য রক্তদান ও গ্রহণ করার প্রক্রিয়া চলে আসছে। বিশ্বে এমন অনেকেই আছেন যারা মানবতার সেবায় নিয়মিত রক্তদান করছেন। জীবন রক্ষাকারী এই দানের স্বীকৃতি দেয়া এবং পাশাপাশি সবাইকে রক্তদানে উৎসাহিত করার জন্য প্রতি বছরের ১৪ জুন পালিত হয় বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। রক্তের এ, বি এবং ও গ্রুপের আবিস্কারক বিজ্ঞানী কার্র ল্যান্ডেস্টেইনারের জন্মদিনে ২০০৪ সাল থেকে সারা বিশ্বে এই দিনটি পালিত হয়ে আসছে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী সারা বিশ্বে প্রতি বছর চৌদ্দ কোটি ইউনিটেরও বেশি রক্ত স্বেচ্ছায় দান করা হয়। এর প্রায় ৬০% সংগৃহীত হয় উন্নত দেশ থেকে, যেখানে বাস করে বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ২০% মানুষ। রক্তের প্রয়োজন হলে আমরা সাধারণত পরিবারের সদস্য এবং বন্ধু-বান্ধবদের রক্তদানের উপর নির্ভর করি। অনেক সময় পরিবারের আপন মানুষটিও রক্ত দিতে আগ্রহী হয় না ফলে রক্তের জন্য বাইরে রক্তদাতা খুঁজতে হয়। প্রায় সব দেশেই কিছু পেশাদার রক্তদাতা রয়েছেন যারা অর্থের বিনিময়ে নিয়মিত রক্তদান করে থাকেন।

রক্তদানের ব্যাপারে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পিছিয়ে থাকার কারণ হচ্ছে রক্তদান সম্পর্কে ভুল ধারণা এবং ভীতি। আমি নিজেও প্রথমবার রক্তদান করার সময় দ্বিধান্বিত ছিলাম। ভাবছিলাম, শরীর থেকে রক্ত হারিয়ে ফেললে কোনো গুরুতর সমস্যা হবে না তো? একটি সূত্রমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে রক্তের চাহিদা প্রায় তিন লাখ ব্যাগ। এর মধ্যে যোগান রয়েছে মাত্র দুই লাখ ব্যাগের। রক্তদান কেবল অন্যের জীবনই বাঁচায় না, রক্তাদাতা নিজেও এ থেকে অনেক উপকৃত হন। নিয়িমত রক্তদানের যে উপকারিতা সেটা সম্পর্কে সবাই সচেতন হলে রক্তের অভাবে মানুষ মারা যেতো না।

নিয়মিত রক্তদানকারীর রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক কম হয়; জটিল ও দুরারোগ্য রোগ-ব্যাধি থেকে তারা প্রায়ই মুক্ত থাকেন। ডাক্তারী মতে একজন সুস্থ মানুষ তিন থেকে চার মাস অন্তর রক্তদান করতে পারে। এতে কোনো শারীরিক ক্ষতির সম্ভাবনা নেই।

একজন মানুষের শরীরে প্রায় ৫ থেকে ৬ লিটার রক্ত রয়েছে। রক্তদান করার সঙ্গে সঙ্গে শরীর নতুন কণিকা তৈরির জন্য উদ্দীপ্ত হয় এবং শরীর খুব তাড়াতাড়ি সেই ঘাটতি পূরণ করে নেয়। নিয়মিত রক্তদান দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়, জেনেটিক ডিসর্ডার সম্পর্কিত জটিল রোগ প্রতিরোধে এবং শরীরের বাড়তি ক্যালোরি পোড়াতে সাহায্য করে। রক্তদান একটি মহৎ কাজ, বাঁচাতে পারে জীবন। একজন মানুষের জীবন রক্ষায় সহায়ক হতে পারার মতো মানসিক তৃপ্তি কি আর কোনো কাজে পাওয়া যায়?

নিরাপদ রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য রক্তাদাতার কিছু যোগ্যতার প্রয়োজন রয়েছে। রক্তদান করতে হলে রক্তদাতার বয়স ১৮ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে হতে হবে; ওজন হতে হবে কমপক্ষে ৫০ কেজি। তাকে মোটামুটি শারীরিকভাবে সুস্থ হতে হবে। রক্তাদাতা যদি বিগত ছয় মাসের মধ্যে কোনো ম্যালেরিয়াপ্রবণ দেশে ভ্রমণ করে থাকেন তাহলে তিনি রক্ত দিতে পারবেন না। তবে যারা রক্তাচাপজনিত রোগে ভুগছেন রক্তদানের সময় তাদের উচ্চ চাপ ১০০-১৬০ এবং নিম্নচাপ ৬০ থেকে ১০০ পয়েন্টের মধ্যে থাকতে হবে; শরীরের তাপমাত্রা থাকতে হবে ৩৭.৫ সেন্টিগ্রেডের নিচে।

যেসব ডায়াবেটিক রোগী মুখে ঔষধ খাচ্ছেন কিন্তু ইনসুলিন নিচ্ছেন না তারাই কেবল রক্তদান করতে পারবেন। মহিলাদের মধ্যে গর্ভবতী নন এবং যাদের মাসিক চলছে না তারাও এই মহৎ কাজে শামিল হতে পারবেন। এছাড়া রক্তদানের আগে প্রতিটি রক্তদাতাকে তার স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কিছু ব্যক্তিগত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হয়। রক্তাদাতাকে অকপটে সঠিক উত্তর দিতে হবে নাহলে যিনি রক্ত গ্রহণ করবেন তার জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে।

রক্তদান করার সময় মনে রাখতে হবে, যে রক্ত আপনি দিচ্ছেন সেটা যাতে বিশুদ্ধ হয় এবং অন্যের কাজে লাগে। তাই রক্তদান করার আগের দিন ভালো করে ঘুমিয়ে নিন এবং ধূমপানের অভ্যাস থাকলে কমপক্ষে দু’ঘণ্টা আগে ধুমপান বন্ধ করুন। সেন্টারে যাবার সময় কাতারী আইডি কার্ড, হেল্থ কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্স সাথে করে নিয়ে যেতে ভুলবেন না।

রক্ত কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা যায় না। একজন মানুষই কেবল অন্যকে রক্ত দিতে পারে। ৪৫০ মিলিলিটারের এক ব্যাগ রক্ত বাঁচাতে পারে একটি জীবন, ফিরিয়ে আনতে পারে একটি পরিবারের হাসি-আনন্দ। চিকিৎসা বিষয়ক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জীবদ্দশায় আমাদের প্রতি তিনজনের মধ্যে একজনের রক্তের প্রয়োজন হয়। আর একবার রক্তদান কমপক্ষে তিনটি মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।

পৃথিবীতে অনেক মহৎ কাজ রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে স্বেচ্ছায় রক্তদান। আসুন, হামাদ হাসপাতালের রক্তভান্ডারে রক্তদান করি, নিজে সুস্থ থাকি এবং জীবন বাঁচাই। কাতারের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে সংহতি এবং সহমর্মিতা প্রকাশ করার জন্য এর চেয়ে উত্তম কোনো পথ আর আছে কি?