বনাঞ্চলের দাবানল অস্ট্রেলিয়ায় নতুন কিছু নয়। তবে ২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে চারমাস ব্যাপী চলমান দাবানলের তান্ডব অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সব দাবানলকে ছাড়িয়ে গেছে। দাবানলে মারা গেছেন ২৫ জন, ধ্বংস হয়েছে আড়াই হাজার বাড়ি। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২০ জন। আগুনের শিখায় ঝলসে গেছে অসংখ্য কোয়ালা, ন্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী। শুধু নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যেই প্রায় আট হাজার কোয়ালার মৃত্যু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিরলতম প্রজাতির এই প্রাণীর অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। স্মরণকালের এই ভয়ংকর দাবানলে শুধু নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যে পুড়ে গেছে প্রায় দুই কোটি একর এলাকা, যার পরিমাণ গত বছরের ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানলে পুড়ে যাওয়া জমির চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। আগুনের সৃষ্ট ছাই ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় সিডনি শহরের আকাশ তামাটে বর্ণ ধারণ করেছিল।

গ্রীষ্মের শুরুতেই শুষ্ক ও উচ্চ তাপমাত্রার কারণে অস্ট্রেলিয়াজুড়ে গড়ে ৫০ হাজারেরও বেশি ছোট-বড় দাবানল হয়। অস্ট্রেলিয়ায় ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত দাবানলে পুড়ে নিহত হয়েছে ২০০ জন। দাবানলের জন্য প্রতি বছর বাড়ি-ঘর, ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ২ বিলিয়ন ডলার। দাবানলের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ অংক কষে বের করা সম্ভব নয়। তবে দাবানল যে কেবল ধ্বংস করেই চলে তা নয়, বন-বাদাড়ের জন্য কিছু কল্যাণও বয়ে আনে। যেমন আগুনে বনাঞ্চল পুড়ে গেলেও ওই এলাকায় নতুন গাছ, লতাপাতার পুনর্জন্ম হয়, প্রকৃতি নতুন রূপে সাজে। এছাড়া দাবানলের উষ্ণতায় ইউকেলিপ্ট এবং ব্যাঙ্কসিয়া প্রজাতির বেশ কিছু গাছপালার বীজ খোসা ছেড়ে অংকুরিত হয়। দাবানল বলতে গেলে প্রাকৃতিক কালচক্রেরই একটি অধ্যায়।

বিভিন্ন কারণে দাবানলের সৃষ্টি হয়। যেমন বনাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ডাল-পালা, শুকনো পাতায় উষ্ণ আবহাওয়া কিংবা বজ্রপাতের কারণে খুব সহজে আগুন ধরে যেতে পারে। ইউকেলিপ্ট গাছের মধ্যে যে তেল রয়েছে তা দহনপ্রক্রিয়ার জ্বালানি হিসাবে কাজ করে বলে বনাঞ্চলের আগুন সহজেই নির্বাপিত হয় না। অস্ট্রেলিয়ানরা ঘরের বাইরে, বনাঞ্চলে বার্বিকিউ এবং ক্যাম্পিং করতে খুব পছন্দ করে। এজন্য অনেক সময় আশ-পাশের গাছপালায় আগুন লেগে যায়। তাছাড়া কৃষি এবং ওয়েল্ডিং-এর কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিও দাবানলের অন্যতম কারণ।

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যই দাবানলের তীব্রতা বাড়ছে বলে দাবি করেছে অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা সংস্থা CSIRO. উল্লেখ্য, গত দুই দশকে অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়ার লক্ষণীয় পরিবর্তন হয়েছে। সিডনি আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যানুযায়ী এ বছরের অক্টোবর মাসের তাপমাত্রা গত ১৫০ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার তাপমাত্রা গত এক শতকে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। যার প্রভাবে অস্ট্রেলিয়ার উত্তারঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে যেমন বন্যার সৃষ্টি করছে তেমনি অধিকাংশ জনবসতির এলাকা দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে কমে গেছে বৃষ্টিপাত।

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরের তাপামাত্রা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। গত ৪ জানুয়ারি সিডনির পশ্চিমে পেনরিথ শহরের তাপমাত্রা ৪৮.৯ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উঠে যায়। ওই দিন বিশ্বের আর কোথাও এর চেয়ে বেশি তাপামাত্রা রেকর্ড করা হয়নি। যা দেখে মনে হচ্ছে সিডনি শহরের আবহাওয়া মধ্যপ্রাচ্যের মরু অঞ্চলের শহরগুলোকে হার মানাবে।

সম্প্রতি জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক প্রধান সিডনির দক্ষিণাঞ্চলের মারাত্মক দাবানলের সাথে বিশ্ব উষ্ণায়নের সম্পর্ক রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য একদিকে ভূপৃষ্ঠ ও বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি সমুদ্রের পানির তাপগত স্ফীতিও ঘটছে। অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চল হল গ্রীষ্মপ্রধান, দক্ষিণাঞ্চল নাতিশীতোষ্ণ এবং মধ্যাঞ্চল জুড়ে রয়েছে শুষ্ক মরু অঞ্চল। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া ঘিরে রয়েছে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর। এই দুই মহাসাগরের নিরন্তর পরিবর্তনশীল জলপ্রবাহের প্রভাবে অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া খুবই পরিবর্তনশীল ও অত্যন্ত বৈচিত্রপূর্ণ।

বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরের জলের তাপমাত্রা হ্রাস-বৃদ্ধির জন্য ‘এল নিনো লানিনা’ ও ‘ইন্ডিয়ান ওসেন ডাইপোল’ নামের দুটো অবস্থার সৃষ্টি হয়। এর ফলে বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার পরিবতর্ন দেখা দেয়। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই দুই পরিস্থিতির প্রভাবে অস্ট্রেলিয়ায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে গিয়ে খরার সৃষ্টি হচ্ছে। আর দীর্ঘ সময় ধরে চলা খরা মারাত্মক দাবানলের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

বায়ুমন্ডলে ক্ষতিকারক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে, বাড়ছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা। চীন ও আমেরিকার তুলনায় অস্ট্রেলিয়ার মোট কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ খুবই কম যেমন মাত্র ১.৩ শতাংশ। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রতি কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গমনের হার হচ্ছে ২৪ টন যা চীন, ভারত ও আমেরিকার চেয়ে বেশি। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২০০৫ সালের চেয়ে ২৮ শতাংশ কমিয়ে আনার কথা। কিন্তু কয়লা রপ্তানি ব্যাহত হবে বলে সেই অঙ্গীকার পূরণ করতে অস্ট্রেলিয়া খুব একটা আগ্রহী নয়। কয়লা রপ্তানির উপর নির্ভরশীল অস্ট্রেলিয়া ক্ষতিকারক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে দ্বিধান্বিত। তবে এখন থেকে লাগাম টেনে না ধরলে আগামীতে দাবানল পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে।

খরা, উচ্চ তাপমাত্রা, প্রকৃতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনাকে যদিও দাবানলের কারণ বলে মানা হচ্ছে, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ক্রিমিনলজীর গবেষণা বলছে অন্য কথা। গবেষণার ফলাফল বলছে, শতকরা ৫০ ভাগ ক্ষেত্রেই কিছু কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষের স্বেচ্ছায় অগ্নিসংযোগের জন্যই দাবানলের সৃষ্টি হয়। বিশ্বাস হয়নি। নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের পুলিশ সম্প্রতি ১৮৩ জনকে পাকড়াও করার পর মেনে নিতে হচ্ছে গবেষণার ফলাফল। এদের মধ্যে ২৪ জনের বিরুদ্ধে বনাঞ্চলে আগুন লাগানোর জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে, অন্য ৪৭ জনের বিরুদ্ধে জ্বলন্ত সিগারেট ও দিয়াশলাইয়েল কাঠি মাটিতে ফেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। সবচেয়ে গোলমেলে হচ্ছে অভিযুক্তদের মধ্যে ৪০ জন হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক।

অস্ট্রেলিয়ার আইনে স্বেচ্ছায় অগ্নিসংযোগের জন্য শাস্তি হল ১০ থেকে ২৫ বছরের জেল। অপরাধী যদি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী হয় তাহলে যাবজ্জীবন কারাদন্ডও ভোগ করতে পারে। কিন্তু আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু নরাধম প্রতিবছরই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

দুঃখজনক হল, প্রকৃত অপরাধী খুব কমই ধরা পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা অপ্রাপ্তবয়স্ক হবার কারণে খুব সহজেই পার পেয়ে যায়। নিউ সাউথ ওয়েলেস দাবানলের সময় বেশ কিছু কিশোরের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছায় আগুন লাগানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। যাদের মধ্যে একজনের বয়স মাত্র ৮ বছর! নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও মানুষ নিয়ম ভেঙ্গে আগুন নিয়ে খেলতে দ্বিধা করছে না। গত নভেম্বরে নিউ সাউথ ওয়েলস গ্রামীণ ফায়ার সার্ভিসের একজন সেচ্ছাসেবকের বিরুদ্ধে সেচ্ছায় অগ্নিসংযোগের সন্দেহে সাতটি অভিযোগ আনা হয়।

তবে দাবানলের মতো জাতীয় বিপর্যয়ের সময় দল-মত নির্বিশেষে অস্ট্রেলিয়ার জনগণ যেভাবে পুনর্বাসনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন তা সত্যিই অনুপ্ররেণাদায়ক এবং অনুকরণীয়। দমকল বাহিনীর কর্মী ছাড়াও সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিক স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে কাজ করার জন্য জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও এগিয়ে আসেন। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীদের নিজ নিজ অফিস থেকে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করার জন্য ছুটি দেয়া হয়। এবার দমকল বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ৪০ হাজারেও বেশি স্বেচ্ছাসেবক দাবালন নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করেছেন।

এবারের ভয়ংকর দাবানলের পর সময় সিডনির বিভিন্ন জনকল্যাণ ও কম্যুনিটি সংগঠনগুলো দাবানলে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তহবিল সংগ্রহে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কমিউনিটিও হাত খুলে দান করছে। বিভিন্ন এলাকার রোটারী ক্লাব, স্পোর্টস ক্লাব যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করছে। সিডনির একটি জনপ্রিয় পত্রিকা তাদের প্রতিটি বিক্রীত সংখ্যা থেকে অর্জিত অর্থ হতে এক ডলার করে বুশ ফায়ার তহবিলে দান করার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া তহবিল সংগ্রহ করছে রেডক্রস, সেলভেশন আর্মি, ভিন্সেন্টে দ্য পল সোসাইটির মতো দাতব্য সংস্থা। কোল্স, উলওয়ার্থ এবং টার্গেট-এর মতো মেগা ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বীমা কোম্পানিগুলোও নেই বসে। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের আবেদন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হচ্ছে যাতে বীমার অর্থ দিয়ে নতুন করে তারা বসতবাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারেন।

উন্নয়নের ঘোড়দৌড়ে এগিয়ে থাকার জন্য প্রকৃতিকে ধ্বংস করে বিশ্বব্যাপী যে উন্নয়নের কাজ চলছে তাতে গ্রিনহাউস গ্যাসনিঃসরণ এবং ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই জলবায়ুতে পরিবর্তন আসছে। আর এজন্য প্রকৃতি নয় আমরাই দায়ী। প্রকৃতির সাথে সহ-অবস্থান করে অর্থনীতির বিস্তার ঘটাতে ব্যর্থ হলে জলবায়ু পরিবর্তনের দাবানলে সবাইকে একদিন পুড়তে হবে।