বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হল ফুটবল। প্রায় ৪ বিলিয়ন মানুষ ফুটবল ভলোবাসে। আরবদের মধ্যেও জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে ফুটবল। ২০১৮ সালে রাশিয়ার পর ২০২২ সালে আবার বিশ্বকাপের পর্দা উঠবে মরুর দেশ কাতারে।

আরববিশ্বের সর্বপ্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক হিসাবে বিশ্বকে চমকে দেয়ার মতো সৃজনশীল নকশার ফুটবল স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে কাতার। কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলেছে। বিশ্বকাপের আয়োজনকে ষোলকলায় পূর্ণ করতে সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে তৈরি করছে অনিন্দ্য সুন্দর সব স্টেডিয়াম।

মোট ৩২টি দল ১২টি ভ্যেনু ৬৫টি ম্যাচ খেলবে। মূল দোহা শহরকে ঘিরে ৫০ কিলোমটিারের মধ্যেই নির্মিত হচ্ছে আটটি আধুনিক স্টেডিয়াম (ছবি দেখুন)। প্রায় ৩০ হাজার লোক দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে এই সেক্টরে। আরব ইতহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে মিল রেখে এই স্টেডিয়ামের নকশা করা হয়েছে। আকর্ষণীয় ডিজাইনের স্টেডিয়াম, সুযোগ সুবিধা অন্যান্য বৈশিষ্ট্য আগের সব বিশ্বকাপকে ছাড়িয়ে যাবে বলে দাবি করেছে কাতার।

কয়েকটি স্টেডিয়াম ইতিমধ্যে চালু হলেও ২০২১ সালের মধ্যে সব স্টেডিয়ামের নির্মাণ সম্পন্ন হবে। শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, স্টেডিয়ামগুলো একইসাথে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিরও সর্বোত্তম ব্যবহার করবে। সেগুলো হবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, শূন্যভাগ কার্বন নিঃসরণকারী এবং পরিবেশবান্ধব। অধিকাংশ স্টেডিয়ামের অংশবিশেষ তৈরি হবে স্থানান্তরযোগ্যভাবে, যেন বিশ্বকাপ শেষে সেগুলো বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে স্থানান্তর করে আরো ২২টি স্টেডিয়াম তৈরি করা সম্ভব হয়। বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে কাতারে যেসব স্টেডিয়াম তৈরি হচ্ছে নিচে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিচ্ছি।

খালিফা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম: কাতারের অ্যাসপায়ার উদ্যানে অবস্থিত এই স্টেডিয়াম নির্মিত হয় ১৯৭৬ সালে। কাতারের সবচেয়ে পুরোনো স্টেডিয়ামগুলোর মধ্যে একটি এটি কাতারের ক্রীড়াজগতের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে এসেছে। এর নামকরণ করা হয়েছিল কাতারের সাবেক আমির খালিফা বিন হামাদ আল থানির নামানুসারে।

সম্প্রতি ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করে এই স্টেডিয়ামকে বিশ্বকাপের জন্য সংস্কার করা হয়েছে। এটিই বিশ্বের প্রথম কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ফুটবল স্টেডিয়াম যেখানে খোলা আকাশের তলায়ও এয়ারকন্ডিশন কাজ করবে। বিশ্বকাপের পাঁচ বছর আগেই প্রস্তুত হয়ে গেছে স্টেডিয়ামটি। খেলা চলার সময়ে দর্শক এবং মাঠের খেলোয়াড় সবাই শক্তিশালী শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে থাকবেন। ফলে তীব্র গরমের মৌসুমেও আরামে খেলতে পারবেন সবাই। ইতিমধ্যে খলিফা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এই আধুনিক ও নতুন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির কার্যকারিতা সাফল্যের সাথে প্রমাণ করেছে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে খলিফা স্টেয়িামে বিশ্ব ক্রীড়া প্রতিযোগিতা দেখার সুযোগ হয়েছিল। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এতই শক্তিশালী ছিল যে, এক পর্যায়ে গায়ে জ্যাকেট পরতে হয়েছিল।

৪০ হাজার দর্শকাসন বিশিষ্ট এই স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালেরও বেশ কিছু ম্যাচ আয়োজন করা হবে। খলিফা স্টেডিয়ামে ইতোপূর্বে গাল‌ফ কাপ, এএফসি এশিয়ান, ২০০৬ এশিয়ান গেমসসহ বিভিন্ন জাতীয় ও অন্তর্জাতিক খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে। স্টেডিয়ামটির সাথেই রয়েছে ২০০৬ সালে এশিয়া কাপের সময় নির্মিত বিশাল টর্চ বা অ্যাসপায়ার টাওয়ার, যা ১৫তম এশিয়ান গেমসে একটি বিশাল টর্চ হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এই টাওয়ারটি মুলত ৩০০ মিটার উঁচু একটি পাঁচতারা হোটেল যার ৪৭তম তলায় রয়েছে একটি ঘূর্ণায়মান রেস্তোঁরা। রাতের বেলোয় টর্চ টাওয়ার ও স্টেডিয়ামের দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জায় পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ।

আল জানুব স্টেডিয়াম (আল ওয়াকরাহ): কাতারের দক্ষিণাঞ্চলীয় ওয়াকরাহ শহরে অবস্থিত স্টেডিয়ামটির দর্শক ধারণ ক্ষমতা ৪০ হাজার। এখানেও কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত ম্যাচের আয়োজন করা হবে। ইরাকি-আমেরিকান স্থপতি জাহা হাদিদের একটি নান্দনিক সৃষ্টি এই স্টেডিয়াম। আরব উপসাগরের বুকে ঢেউয়ের স্রোতে ভেসে চলার সময় স্থানীয় ‘দাউ’ নৌকার ফুলে ওঠা পালের আকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই জাহা হাদিদ এই স্টেডিয়ামটির নকশা তৈরি করেছেন। স্টেডিয়ামটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটিতে ছাদ থাকবে, যা আবার প্রয়োজনে গুটিয়ে রাখা যাবে।

আল-বায়েত (আলখোর): কাতারের উত্তর পূর্বাঞ্চলের উপকূলীয় শহর আলখোরে নির্মিত হচ্ছে এই স্টেডিয়াম, যার দর্শক ধারণ ক্ষমতা ৬০,০০০। বাইত শব্দটির অর্থ বাড়ি। আরবের বেদুইনরা মরুভূমিতে রাত্রি যাপনের জন্য যে ধরনের তাবু ব্যবহার করে ঠিক সেরকম নকশা করে তৈরি করা হয়েছে এই স্টেডিয়াম। এখানে একটি সেমি-ফাইনাল খেলা হবার কথা।

বিশ্বকাপ শেষ হবার পর ধারণ ক্ষমতা অর্ধেকের চেয়ে বেশি কমিয়ে আনা হবে। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর সত্যিকার তাঁবুর মতোই এর অংশবিশেষ স্থানান্তর করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হবে। এর উপরের সারির আসনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হবে, যেগুলোকে স্থানান্তর করে উন্নয়নশীল আরব দেশগুলোতে নিয়ে সেখানকার স্টেডিয়ামে স্থাপন করা হবে। তখন এটি ৬০,০০০ আসনের পরিবর্তে ৩২,০০০ আসন বিশিষ্ট স্টেডিয়ামে রূপান্তরিত হবে।

আল রাইয়ান স্টেডিয়াম: কাতারের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী আল-রাইয়ানে অবস্থিত আহমেদ বিন আলি স্টেডিয়ামটি মূলত স্থানীয় অত্যন্ত জনপ্রিয় ফুটবল ক্লাব আল-রায়ান স্পোর্টস ক্লাবের স্টেডিয়াম। এই স্টেডিয়ামের জায়গায় নতুন করে নির্মিত হচ্ছে এই বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামটি, যার ধারণ ক্ষমতা হবে ৪০ হাজার। এই স্টেডিয়ামটিও বর্তমানে নির্মাণাধীন আছে এবং ২০২১ সালে এটি উদ্বোধন করার পরিকল্পনা আছে।

স্টেডিয়ামটির বাইরের আবরণটি একটি সুবিশাল ত্রিমাত্রিক গোলাকার পর্দা হিসেবে কাজ করবে, যা বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন দৃশ্য প্রক্ষেপণ করবে। এর নকশা এবং প্রক্ষেপিত দৃশ্যাবলির মধ্য দিয়ে ফুটে উঠবে পরিবারের গুরুত্ব, মরুভূমির সৌন্দর্য, স্থানীয় উদ্ভিদ এবং প্রাণীকুলের বৈচিত্র, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ইত্যাদি। স্টেডিয়ামের বহির্ভাগের নকশার রং হবে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্যায়ের জন্য নির্বাচিত দেশগুলোর পতাকার রংসমূহের সমষ্টি। এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন ফুটবল প্রিয় দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব করা হবে, তেমনি দেশগুলোর মধ্যকার বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক সম্মানও স্বীকৃতি পাবে। বিশ্বকাপের পর প্রায় ২০ হাজার আসন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দান করে ধারণক্ষমতা কমিয়ে আনা হবে।

আল থুমামা স্টেডিয়াম: আরব টুপির আদলে তৈরি আল-থুমামা স্টেডিয়ামের নকশা কাতারের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় পরিচয়ের একটি নিদর্শন। এটি দেখতে বিশাল একটি টুপির মতো, যাকে স্থানীয় ভাষায় গাফিয়া বলা হয়। হাতে বোনা এ ধরনের টুপি কাতারসহ প্রায় সবগুলো উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রের পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গাফিয়া নামক এ টুপিগুলো মাথায় পরিধান করা তিনটি বস্ত্রাংশের মূল ভিত্তি। এই টুপির উপরে পরা হয় এক টুকরো কাপড়, যাকে বলা হয় গুত্রা। তার উপরে থাকে কালো রংয়ের দড়ি সদৃশ আগাল, যা গাফিয়ার উপরে গুত্রাকে বেঁধে রাখে।

রাজধানী দোহা থেকে ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত সাগরের তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে স্টেডিয়ামটি। এর ধারণক্ষমতা হবে প্রায় ৪০,০০০ এবং এতে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত একাধিক ম্যাচের আয়োজন করা হবে।

কাতার ফাউন্ডেশন স্টেডিয়াম: রাজধানী দোহার অদূরে ১৪ বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে নামী-দামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা কেন্দ্রের জন্য যে আলাদা শহর গড়ে তোলা হয়েছে সেটির নাম এডুকেশন সিটি। এই শহরে স্কুল, কলেজ থেকে শুরু রয়েছে এখানে পাঁচটি বিখ্যাত আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এই শহরটির মাঝখানে নির্মিত হয়েছে ৪০,০০০ হাজার ধারণ ক্ষমতা বিশিষ্ট এই স্টেডিয়াম। স্টেডিয়ামটির জটিল জ্যামিতিক নকশা একই সাথে ঐতিহাসিক ইসলামিক স্থাপত্য এবং আধুনিত প্রযুক্তির অপূর্ব সমন্বয়। এর বহির্ভাগে থাকবে ত্রিভুজ এবং হীরকাকৃতির জটিল জ্যামিতিক নকশা, যার রং সূর্যের স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হবে।

‘মরুভূমির হীরক” নামের এই স্টেডিয়ামে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ সহ কোয়ার্টার ফাইন্যাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। এই স্টেডিয়ামে গ্রুপ পর্ব থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত খেলা অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্বকাপ শেষে এর ২০ হাজার আসন অনুদান হিসেবে পাঠানো হবে অনুন্নত দেশে স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্য।

বিশ্বকাপের পর ৪০ হাজার ধারণ ক্ষমতার এই স্টেডিয়ামটি অন্য বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যাবে—এমনভাবেই এটি তৈরি করা হচ্ছে। টুর্নামেন্টের পর তা হতে পারে শপিংমল, কমিউনিটি হল, অডিটোরিয়াম বা মাল্টিপ্লেক্স। আবার প্রয়োজনে ছোট ছোট ভেন্যুতেও ভেঙে একসঙ্গে অনেক খেলার আসরও বসতে পারবে! আবার কোনো ফুটবল ম্যাচ থাকলে স্বরূপে ফিরবে এই স্টেডিয়াম।

লুুসাইল স্টেডিয়াম: লুসাইল স্টেডিয়াম হবে কাতার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম। এর অবস্থান হবে রাজধানী দোহা থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে নবনির্মিত লুসাইল সিটিতে, ধারণ ক্ষমতা হবে প্রায় ৮০ হাজার। এই স্টেডিয়ামেই ২০২২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী এবং সমাপনী খেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা আছে।

বৃত্তাকার স্টেডিয়ামটির চারপাশে কৃত্রিম জলাধার থাকবে। জলাধারের বাইরে অবস্থিত ছয়টি পার্কিং এরিয়ার সাথে স্টেডিয়ামটি সেতু দ্বারা সংযুক্ত থাকবে। এর গোলাকার ছাদের অংশবিশেষ সম্পূর্ণ ঢেকে এটিকে ইনডোর স্টেডিয়ামে পরিণত করা অথবা সম্পূর্ণ খুলে উন্মুক্ত আকাশের দৃশ্য উপভোগ করা সম্ভব হবে।

রাস আবুদ স্টেডিয়াম: অবর‌্য উপসাগরের তীরে নির্মিত বিশ্বের প্রথম স্থানান্তরযোগ্য স্টেডিয়াম। বিশ্বে এমন প্রযুক্তি আর কোনো স্টেডিয়ামে নেই। শিপিং কন্টেইনারের অংশ দিয়ে তৈরি প্রত্যেকটি ব্লক ও প্রত্যেক আসন স্থানান্তরযোগ্য।