পুরো নাম উসামা বিন মুহাম্মদ বিন আওয়াদ বিন-লাদেন। ২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের এ্যাবোটাবাদ শহরের একটি উঁচু প্রাচীর ঘেরা বাড়িতে উসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে মার্কিন সিল কমান্ডো বাহিনী। বিশ্বের একমাত্র সুপার পাওয়ার আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন তিনি। তাই আমেরিকা ও তার দোসরদের চোখে উসামা যেমন ছিলেন একজন ভয়ংকর সন্ত্রাসী, অন্যদিকে আমেরিকার আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্য অনেকের চোখে তিনি ছিলেন বিদ্রোহের প্রতীক।
তার পরিচিতির এই বৈসাদৃশ্যের জন্য তিনি পরিণত হয়েছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্বে। আমেরিকার প্রতাপ, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দাকে ফাঁকি দিয়ে উসামা দীর্ঘ দশটি বছর লুকিয়ে ছিলেন। উসামাকে খুঁজে বের করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল আমেরিকা ও তার মিত্র জোট। এ জন্য বিশ্বজুড়ে চলছিল অঘোষিত যুদ্ধ।
উসামাকে হত্যা করতে আমেরিকার সময় লেগেছে ১০ বছর, দখল করতে হয়েছে দু’টি দেশ, খরচ হয়েছে প্রায় ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা আমেরিকার জনসংখ্যার মাথাপিছু ১২,০০০ ডলারের সমতুল্য। ইরাক ও আফগানিস্তানে নিহত হয়েছে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষ। লন্ডনভিত্তিক মেডিকেল জার্নাল ‘দি লান্সেট’ এর রক্ষণশীল হিসাব মতে, টুইন টাওয়ারে নিহত প্রতিটি আমেরিকানের জন্য কমপক্ষে ৮০ জন বেসামরিক মুসলিমকে হত্যা করেছে আমেরিকা।
এ্যাবোটাবাদের শয়নকক্ষে উসামার প্রতিরোধহীন মৃত্যু খোদ আমেরিকানদের বিস্মিতি করেছে। তিনি যখন আক্রান্ত হলেন, তখন তার পাশে ছিল না কোনো দেহরক্ষী কিংবা এক্সপ্লোসিভ ভেস্ট পরা মুজাহিদ। উসামার নিরস্ত্র স্ত্রী আমাল আল-সাওদা স্বামীকে রক্ষার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সিল কমান্ডোদের উপর। জানা যায়, উসামার বিছানার কাছে সব সময় থাকত ১৯৮৭ সালে এক রাশিয়ান জেনারেল থেকে ছিনিয়ে নেয়া মাকারভ পিস্তল ও একে-৪৭ রাইফেল। ফ্রন্ট লাইনে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন উসামা। তোরা-বোরা গুহার ভয়ংকর রণক্ষেত্র থেকেও তিনি পিছু হটে আসতে চাননি। কিন্তু তার সঙ্গী সাথীরা রীতিমত জোর করে তাকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেন। এ জন্য তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। অথচ সেই উসামা মার্কিন কমান্ডোরা আসার আগে উসামা তার পিস্তলটাও হাতে তুলে নেবার সময় পেলেন না।
নিরস্ত্র লাদেনকে জীবিত ধরে কি বিচার করা যেতো না? তার মানে বিন লাদেন খুব বেশি জানতেন বলেই কি তাকে হত্যা করা হল? কিন্তু সাদ্দাম কি কম জানতেন? হাজারো কুর্দিকে গ্যাস প্রয়োগে হত্যার অভিযোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৫৩ জন ইরাকীকে হত্যার অভিযোগে তার ফাঁসি হয়। আদালতে সাদ্দামকে তেমন কিছু বলতে দেয়া হয়নি আর সাদ্দাম কিছু বললেও সেটা বহির্বিশ্ব জানতে পারেনি। তাই উসামার বিচার করা হলেও উসামার ভাষ্য বিশ্ব¦ কি কখনো জানতে পারতো?
আফগানিস্তানের পাহাড়-পর্বতে না ঘুরে থাকার জন্য উসামা এ্যাবোটাবাদেও আবাসিক এলাকার এক বিশাল কম্পাউন্ড বেছে নিয়েছিলেন। বহির্জগতের সাহায্য ছাড়া যাতে চলা যায় সে জন্য এ্যাবোটাবাদের কম্পাউন্ডে নাকি স্বয়ম্বর পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছিল। বাড়ির পেছনে খালি জমিতে ছিল শাক-সব্জির বাগান, ছোটখাট মুরগীর খামার, গরু, খরগোশ ইত্যাদি। ছেলেমেয়েরা স্কুলে না গেলেও বাড়িতেই তাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা ছিল। এ্যাবোটাবাদের বাড়িতে উসামার তিনজন স্ত্রীর মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ আমাল ছাড়া বাকি দু’জন ছিলেন উচ্চ শিক্ষিতা। ওদের একজন আবার ইসলামিক শারিয়ার পিএইচডি ডিগ্রিধারী ছিলেন।
উসামার খোঁজ কিভাবে পাওয়া গেল সে নিয়ে জল্পনা কল্পনার শেষ নেই। তবে উসামার খুব কাছের কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলে মনে হয় না। তাই যদি হতো, উসামার খোঁজ পেতে আমেরিকাকে দশটি বছর অপেক্ষা করতে হতো না। ৫০ মিলিয়ন ডলারের লোভে বহু আগেই ধরা পড়তেন উসামা, যেমন মাত্র ৯ মাসের মাথায় ধরা পড়েছিলেন ইরাকের সাদ্দাম হোসেন।
বিশ্বস্ত সহচর আবু আহমদ আল-কুয়েতীর মাধ্যমেই উসামা বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। পাকিস্তানের খ্যাতনামা জার্নালিস্ট নজম শেঠি থেকে জানা যায়, পাকিস্তানের গোয়েন্দা বাহিনী নিয়মিত ফোনে আঁড়ি পেতে আল-কায়েদার জঙ্গীদের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করত। আরবি ভাষায় কোনো কথাবার্তা ধরা পড়লে পাকিস্তানী গোয়েন্দারা সেটা রেকর্ড করে আমেরিকানদের হাতে তুলে দিত।
উসামার প্রতি তার সহযোদ্ধাদের আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা ছিল কিংবদন্তির মতো। উসামার বিশ্ব¦স্ত বার্তাবাহক আবু আহমদ আল-কুয়েতী উসামার সাথে একই কম্পাউন্ডে থাকতেন। তিনি চাইলে বহু আগে উসামাকে ধরিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু কুয়েতী তা করেননি বরং উসামার প্রতি আনুগত্যের কারণে তাকে পরে অবশ্য জীবনও দিতে হয়েছে।
কারো সাথে যোগযোগ করার প্রয়োজন হলে বাড়ি থেকে অন্তত ৯০ মিনিটের পথ গাড়ি করে গিয়ে মোবাইল সেটে ব্যাটারি ও সিম ঢুকিয়ে তবেই কুয়েতী ফোন করতো। যার ফলে উসামার অবস্থান নির্ণয় করা ছিল দুরুহ। এ্যাবোটাবাদের ঘটনার ৬-৯ মাস আগে একটি সিম থেকে প্রায় ৬ বার আরবিতে কথাবার্তা ধরা পড়ে। পাকিস্তানী গোয়েন্দারা বরাবরের মতো ফোনকলের টেপ মার্কিনীদের হাতে তুলে দেয়। তবে ওই ফোন কলের একটি ছিল এ্যাবোটাবাদের কম্পাউন্ড থেকে যা অবশেষে আমেরিকাকে উসামার ঠিকানায় নিয়ে যায়। কুয়েতী ভুলক্রমে এ্যাবোটাবাদের বাড়ি থেকে একটি ফোন করে বসেন, যা উসামার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
তবে অপারেশনের আগে উসামার অবস্থান সস্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হবার জন্য সিআইএ পাকিস্তানী ডাক্তার শাকিল আফ্রিদির সাহায্য নেয়। আমেরিকার নির্দেশে টিকাদান কর্মসূচীর নামে ডা. অফ্রিদি উসামার বাড়ির সদস্যদের রক্ত নমুনা সংগ্রহ করে সিআইএর হাতে তুলে দেয়। অতঃপর ২০১০ সালে বোস্টনে মারা যাওয়া উসামার বোনের ডিএনএ’র সাথে এ্যাবটোবাদের কম্পাউন্ডে বসবাসরত সদস্যদের রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখা হয়। এভাবে আমেরিকা উসামা ও তার পরিবারের অবস্থান নিশ্চিত করে।
বিন লাদেন বহুবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন। বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক রবার্ট ফিস্কের ‘দি গ্রেট ওয়ার ফর সিভিলাইজেশান’ থেকে তার কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। আফগান যুদ্ধের সময় অন্তত চারবার গোলাবর্ষণের মধ্য থেকে বেঁচে গেছেন উসামা। একবার বিন লাদেনের কয়েক মিটারের মধ্যে কামানের গোলা পড়েও সেটা ফাটেনি। এছাড়া ১৯৯৮ সালে আফগানিস্তানের ট্রেনিং ক্যাম্পে আমেরিকার ক্রুজ মিসাইল আক্রমণ, ২০০০ সালে বিন লাদেনের গাড়ি বহরের উপর রকেট হামলা এবং ২০০১ সালে আফগানিস্তানের তোরাবোরা পর্বতের গুহায় বিধ্বংসী বিমান হামলা থেকেও তিনি অল্পের জন্য রক্ষা পান। মৃত্যুর হাত থেকে অলৌকিকভাবে বারবার বেঁচে যাওয়ার কারণে উসামা তার অনুসারীদের কাছে জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হন।
উসামার চরিত্রের কারিশমা যে মানুষকে আকৃষ্ট করতো সেটা তার ঘোর শত্রু আমেরিকা একটু বাঁকা করে হলেও এভাবে স¦ীকার করেছে। উসামার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে আমেরিকার তৎকালিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রবার্ট গেট্স ‘পিকুলিয়ার কারিশমা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
১৯৭৯ সাল ছিল উসামার জীবনের একটি টার্নিং পয়েন্ট। ওই বছর তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি শেষ করেন। উনসত্তরের নভেম্বরে হজ্জ্ব চলাকালীন কিছু সশস্ত্র বিদ্রোহী কাবাঘর দখল করে আব্দুল্লাহ আল-কাহতানীকে ইমাম মেহেদী বলে দাবি করে। সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বিদ্রোহীদের সংঘর্ষে মসজিদুল হারামে প্রায় ৪০০ লোকের মৃত্যু হয়। আর ওই বছরের ফেব্রুয়ারীতে ঘটে ইরানের ইসলামি বিপ্লব।
এর মাসখানেক পরেই সোভিয়েত রাশিয়া আফগানিস্তান চালায় আগ্রাসন। চাঞ্চল্যকর এই সব ঘটনা প্রবাহ উসামার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি তার তাত্ত্বি¡ক গুরু আব্দুল্লাহ আজ্জামের সাথে সোভিয়েত দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নিতে পাকিস্তান যাবার সিদ্ধান্ত নেন। উল্লেখ্য, পাকিস্তানে যাবার সাথে সাথেই তিনি রাইফেল কাঁধে নিয়ে আফগানিস্তানের ফ্রন্টলাইনে ছুটে যাননি। কার্যত ১৯৮৬ সালের পর থেকেই তিনি সরাসরি রাশিয়ার বিরুদ্ধে সমুখ সমরে অংশ নিতে শুরু করেন।
আশির দশকের প্রথম পাঁচ বছর উসামা আফগানী মুজাহিদদের অর্থনৈতিক সাহায্য, অস্ত্র সরবরাহ, আরব বিশ্ব থেকে যোদ্ধা সংগ্রহ, বিভিন্ন যোদ্ধা উপদলের মধ্যে মধ্যস্থতা করা ইত্যাদি লজিস্টিক সার্পোটের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। এছাড়া মুজাহিদদের জন্য রাস্তাঘাট ও বাঙ্কার নির্মাণ, যুদ্ধে আহতদের সেবার জন্য অস্থায়ী হাসপাতাল এবং রিফিউজিদের জন্য ক্যাম্প নির্মাণের কাজে তিনি নিরলস পরিশ্রম করে যান। এ ধরনের জনসেবামূলক কাজের মধ্য দিয়ে সাধারণ আফগানী জনতার হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নেন উসামা। তাই তো ২০০১ সালে আমেরিকার কর্তৃক আক্রান্ত হবার পরও শুভাকাংখী উসামাকে আমেরিকার হাতে তুলে দেয়নি আফগানিস্তানের তালেবান সরকার।
১৯৮৮ সালে আল-কায়েদা গঠনের পর থেকে উসামা আমেরিকার রাডারে চলে আসেন। মূলত সোভিয়েত-আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ চলাকালে আফগানিস্তানের মুজাহিদিন ক্যাম্পে সংগঠনটি গড়ে ওঠে। তবে ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিখিত ফতোয়া দিয়ে আমেরিকা ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করার পর আমেরিকার এক নম্বর শত্রুতে পরিণত হন উসামা। ফতোয়ায় কুরআনের আয়াত এবং হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে আমেরিকা ও তার সহযোগী দেশের সামরিক ও বেসামরিক নাগরিকদের যে কোনো দেশে হত্যা করা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য বলে দাবি করা হয়।
অথচ কুরআনের আনুষঙ্গিক বাণীটির অবতীর্ণ হবার কারণ, ওই সময়কার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান সময়ে তার উপযোগিতা ইত্যাদি হাদিসের আলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে উসামার ব্যাখার সাথে মেলে না। এভাবে জিহাদের নামে বেসামরিক মানুষ হত্যার ফতোয়া দিয়ে উসামা সন্ত্রাসশর পথেই পা বাড়িয়েছিলেন। নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কুরআনের বাণীর এ ধরনের অপব্যবহার কোনোভাবেই কাম্য নয়। যা ইসলামকে কলুষিত করার জন্য মুসলিম বিদ্বেষীদেরই বেশি সুযোগ করে দেয়।
আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুরোর বিরুদ্ধে আল-কায়েদা জিহাদ ঘোষণা করলেও তেমন সফল হতে পারেনি। ১৯৯৫ সালে রিয়াদের খোবার টাওয়ার ও ইয়ামেনে ২০০০ সালের আমেরিকান ডেস্ট্রয়ার ‘কোল’ আক্রমণ ছাড়া অন্য কোন বড় সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আল-কায়দা হামলা চালাতে পারেনি। ১৯৯৮ সালের তানজানিয়া ও কেনিয়ার মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলায় নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। যদিও আমেরিকান দূতাবাসকে এক ধরনের কমান্ড সেন্টারই বলা যায়, কিন্তু তানজনিয়া ও কেনিয়ায় মার্কিন দূতাবাসের বোমা হামলায় নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক।
আফগান মুজাহিদদের হাতে সোভিয়েত রাশিয়ার পরাজয় উসামাকে আমেরিকার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে মনোবল যুগিয়েছিলে বলে জানা যায়। কিন্তু একটি সুপার পাওয়ারকে মোকাবিলা করার জন্য অদম্য সাহসই যে যথেষ্ট নয় তা উসামার শেষ পরিণতি দেখেই বোঝা যায়। উল্লেখ্য, রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকা ও পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ দিয়ে আফগানদের সাহায্য করেছিল আর পাকিস্তানের মাটিতে ছিল আফগান মুজাহিদদের নিরাপদ আশ্রয়।
যুদ্ধবিশারদদের মতে, আমেরিকার দেয়া স্টিঙ্গার মিসাইলই যুদ্ধের ভারসাম্য মুহজাহিদের পক্ষে নিয়ে যায়। স্টিঙ্গার মিসাইলের আঘাতে প্রায় ৩০০ রাশিয়ান যুদ্ধবিমান ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে, আফগানিস্তানের আকাশে রাশিয়ার আধিপত্য খর্ব হয়ে যায়। কিন্তু এখনকার বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল-কায়দার যোদ্ধাদের না আছে উন্নত মানের অস্ত্র, না আছে নিরাপদ আশ্রয়। ড্রোনের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য এক আস্তানা থেকে অন্য আস্তানায় পালিয়ে বেড়াতেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে আল-কায়দা যোদ্ধাদের যাবতীয় শক্তি। শীর্ষ নেতা উসামাকেই যদি পলাতক হয়ে দিনের পর দিন বন্দী জীবন কাটাতে হয়, তাহলে তিনি দিক নির্দেশনা দেবেন কিভাবে?
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, আমেরিকা নিজের মাটিতে বিদেশি আক্রমণ কখনোই মেনে নেয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান পার্ল হারবার আক্রমণ করলে আমেরিকা কেবল সর্বাত্মক যুদ্ধেই ঝাঁপিয়ে পড়েনি, এটম বোমা ফেলে জাপানকে নতজানু করতে বাধ্য করে। যদিও ওই সময় জাপানকে পরাজিত করার জন্য পারমাণবিক বোমার কোনো প্রয়োজন ছিল না। ৯/১১ পর তাই আমেরিকা বিশাল ঝুঁকি নিয়ে ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমণ করতেও দ্বিধা করেনি। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের দীর্ঘ ১০ বছর পরও আল-কায়দার বিরুদ্ধে আমেরিকার লড়াই চালিয়ে গেছে।
উসামা হত্যার প্রতিশোধ স্বরূপ আল-কায়দা আমেরিকার বিরুদ্ধে বড় আকারের আক্রমণের অঙ্গীকার করলেও পাকিস্তানে তালেবানদের কিছু বিক্ষিপ্ত বোমাবাজি ছাড়া তেমন কোনো কিছু করতে সমর্থ হয়নি। উসামার মৃত্যুর পর ইয়ামেনে আল-কায়দাকে কিছুটা সক্রিয় দেখা গেলেও তাত্ত্বিক গুরু ও তুখোড় বক্তা আনোয়ার আল-আওলাকিসহ বহু আল-কায়দার শীর্ষনেতাকে হত্যা করেছে আমেরিকা। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনযন্ত্রে হাজারেরও বেশি সিএইএ এজেন্ট কাজ করছে।
উসামার শূন্যস্থানে পা রেখেছেন আল-জাওয়াহিরি। কিন্তু আল-কায়দার নেতারা এখন মূলত আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে উসামার পুত্র হামজা বিন লাদেনেকেও হত্যা করেছে আমেরিকা। তাই পাকিস্তানের এ্যাবোটাবাদে উসামার হত্যার মধ্য দিয়ে আল-কায়দারও যে মৃত্যু হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
উসামা বিশ্বের মুসলিম দেশগুলির মধ্যে সাত শতকের ইসলামি খেলাফতের আদলে একতা আনতে চেয়েছিলেন। তাই যে সব সরকার ইসলামি শাসন কায়েম করতে চায় তাদের বিভিন্ন উপায়ে তিনি সাহায্যও করেছেন। যেমন ১৯৯১ সালে সুদানের ইসলামি সরকারকে সাহায্য করার জন্য উসামা বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন। যদিও সুদান সরকার সেই অর্থের কিছুই তাকে ফেরত দেয়নি। কিন্তু তালেবান শাসিত আফগানিস্তানকে বিশ্বের একমাত্র আদর্শ ইসলামিক দেশ হিসাবে উল্লেখ করার পর উসামাকে নিয়ে মুসলিম সমাজেও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
উসামা সাত শতকের আদলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন, অথচ তালেবানরা যে পথে ইসলামি শাসন কায়েম করতে চাচ্ছিল সেটা ছিল পশ্চাদমুখী ও বাস্তবতা বিমুখ, যা সাত শতকের ইসলামের সাথে মেলে না। সাত শতকের ইসলাম সহনশীলতা, উদারনীতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রগতির মাধ্যমেই বিশ্বের সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়েছিল। সেই যুগের মুসলিমরা গ্রিক, পার্সিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশ ও প্রাচ্যের সভ্যতা থেকে জ্ঞান আহরণ করে উৎকর্ষতার শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল। অথচ তালেবানরা মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ করে দিয়ে ছুটছিল সময়ের উল্টো দিকে।
ইসলামি খিলাফত বলতে উসামা আসলেই কী চান তার কোনো সুনির্দিষ্ট রুপরেখা কিংবা তত্ত্ব তিনি দিয়ে যেতে পারেননি। আমেরিকা বিরোধিতাই ছিল উসামা দর্শনের মূল ভিত্তি। উসামা আরব দেশগুলিতে আমেরিকা সমর্থিত শাসকদের উৎখাত করতে চেয়েছিলেন। যদিও জনগণের বিদ্রোহের মুখে বেশ ক’টি আরব দেশে ইতিমধ্যে স্বৈারাচারী সরকারের পতন হয়েছে, তবে ওই সব দেশে উসামার ডাকে সাড়া দিয়ে ইসলামি খিলাফাত প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম হয়নি। আরব জনগণ রাস্তায় নেমেছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য। এটা ছিল উসামা ও আল-কায়দার জন্য বিশাল রাজনৈতিক পরাজয়।
লাদেনের হত্যা ও শেষকৃত্যের সাথে ল্যাটিন আমেরিকার মার্ক্সিষ্ট বিপ্লবী চে গুয়েভেরার বেশ কিছু মিল দেখা যায়। চে গুয়েভেরাকে ১৯৬৭ সালে বলিভিয়ার জঙ্গলে ধরে হত্যা করা হয়। চের সমাধি যাতে পরে তীর্থস্থানে পরিণত হতে না পারে সে জন্য সিআইএ’র পরামর্শে একটি গোপন স্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। উসামাকে হত্যার পর তার মরদেহ কিভাবে সমাহিত করা হবে সে নিয়ে আমেরিকার নীতিনির্ধারকরা চে গুয়েভেরার কথাই হয়ত স্মরণ করেছিলেন। কিন্তু আমেরিকার কাছে বিন লাদেন আরো ভয়ংকর ছিল বলেই হয়তো তাকে ভূপৃষ্ঠে সমাহিত করারও ঝুঁকি নেয়নি। মৃত্যুর প্রমাণ হিসাবে চে গুয়েভেরার মরদেহের ছবি পত্রিকায় ছাপানো হলেও বিন লাদেন ফোবিয়ায় আক্রান্ত আমেরিকা তাও করেনি।
চে গুয়েভেরা বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন বলে তিনি ছিলেন আমেরিকার পথের কাঁটা। তার বিরুদ্ধে কিউবাতে গণহত্যার অভিযোগ যেমন রয়েছে তেমনি ল্যাটিন আমেরিকার বঞ্চিত মানুষের কাছে তিনি ছিলেন মুক্তির প্রতীক। অন্যদিকে চে’র মতো বড় আকারের বুদ্ধিজীবী না হলেও বিন-লাদেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংসহ ইসলাম নিয়েও প্রচুর পড়াশোনা করেছেন বলেও জানা যায়। উসামার ব্যক্তিত্ব ও বিরল সাহসিকতা তার অনুসারীদের অনুপ্রেরণা জোগাতো। উসামা নিরপরাধ মানুষ হত্যার দায়ে যেমন অভিযুক্ত তেমনি আবার সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াকু মানুষের নিরব ভালোবাসায় সিক্ত।
মৃত্যুতে মিল থাকলেও একজন সফল বিপ্লবী হিসাবে চে গুয়েভেরার সাথে উসামার তুলনা করা হয়তো সাজে না। তবে লাদেন ডাইনেস্টির একজন উত্তরসূরী হিসাবে উসামা সহজেই বিলাসবহুল জীবন বেছে নিতে পারতেন। আমেরিকার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করার জন্য নিজের পরিবার উসামাকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে, স্বদেশ সৌদি আরব থেকে তিনি হন বিতাড়িত। জানা যায়, মৃত্যুর আগে তিনি রীতিমতো অর্থকষ্টে ছিলেন। কিন্তু সম্পদের মোহ ছুড়ে ফেলে কাঁধে রাইফেল তুলে নিয়ে স্বেচ্ছায় যেভাবে দুর্গম গুহার জীবন তিনি বেছে নিয়েছিলেন, জীবন বাজী রেখে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়েছেন; সেকথা বিবেচেনা করলে উসামাকে কেবল একজন সন্ত্রাসী হিসাবে আখ্যা দেয়া যায় কিনা সে নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে।
২০০১ সালে টুইন টাওয়ারের ঘটনার পর পলাতক জীবনের বোঝা বইতে গিয়ে উসামা নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিলেন। শীর্ষ নেতা হিসাবে আল-কায়দার উপর ছিল না উসামার কোনো সরাসরি নিয়ন্ত্রণ। পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন নির্বাসিত জীবনে মাঝে মধ্যে দু’একটি ভিডিও টেপ তৈরি করা ছাড়া তার তেমন কিছু করার ছিল না। বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আল-কায়দার সেলগুলো স্থানীয় কমান্ডারের নেতৃত্বে তাই অনেকটা স্বাধীনভাবে কাজ করে যাচ্ছিল। বিন-লাদেন কেবল একজন প্রতীকী নেতা হয়ে হয়ে দূর থেকে সহযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা দিচ্ছিলেন।
পাকিস্তানের খ্যাতিমান সাংবাদিক হামিদ মীরের কাছে দেয়া বিরল সাক্ষাৎকারে উসামা অঙ্গীকার করেছিলেন, মার্কিন বাহিনী তাকে জীবিত ধরতে পারবে না, তার লাশই শুধু পাবে। এ্যাবোটাবাদে অবশ্য তার সেই অঙ্গীকার পূরণ হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করে যিনি মরতে চেয়েছিলেন, আমেরিকার হাতে সেই উসামার মৃত্যু ছিল যেন সবচেয়ে যথাযথ।
গভীর সমুদ্র বুকে হারিয়ে আজ গেছে উসামার নশ্বর দেহ। উসামার সমাধিতে এখন এপিটাফ লেখার কোনো সুযোগ আর নেই। তবুও আমাকে যদি উসামার জন্য এপিটাফ লিখতে বলা হতো, তাহলে সমাধিস্তম্ভে উৎকীর্ণ লিপিতে মহাকবি সেক্সপিয়ারের বিয়োগান্তক নাটক ম্যাকব্যাথের এই পংক্তিটিই তুলে ধরতাম– ‘Nothing in his life became him like the leaving it.’
