কথায় বলে, ‘চেনা বামুনের পৈতা লাগে না’। স্বনামে খ্যাত মানুষের পরিচিতি লাগে না। নিজ মেধা বা কাজের গুণেই মানুষ সমাজে পরিচিত হয়ে ওঠে এবং নিজ পেশায়ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে। কেবল ডিগ্রি, বেশভূষা বা প্রসার-প্রতিপত্তির জন্য মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি হয় না। ইদানিং ভূয়া পৈতা লাগিয়ে বামুন সাজার যেরকম প্রতিযোগিতা চলছে, তা দেখে আমি শঙ্কিত।
ডাক্তার বা চিকিৎসক ও ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দু’টি পদবী। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবেই এই ডিগ্রি দুটো অর্জন করতে হয়। এখন আমাদের সমাজে যত্রতত্র এ দুটি ডিগ্রির ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ডাক্তার পদবীর অপব্যবহার যদিও খুব সীমিত, তবে কম্পিউটার মেকানিক, মোটর মেকানিক, রাজমিস্ত্রি, কন্ট্রাক্টর থেকে শুরু করে গলির মোড়ের মোটর মেকানিকও এখন ইঞ্জিনিয়ার পদবী ব্যবহার করছেন। যে কেউ চাইলেই যেন নিজের নামের আগে এ ধরনের পদবী লাগাতে পারেন।
বাংলাদেশে ইঞ্জিনিয়িার্স ইন্সটিটিউট স্বীকৃত দেশি/বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমমানের ডিগ্রি থাকলেই কেবল তারা নিজের নামের আগে ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী পদবী ব্যবহার করতে পারবেন। এর বাইরে কোনও ‘ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার’ ডিগ্রিধারীরাও নিজেকে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পরিচয় দিতে পারবেন না। তাঁরা নিজেদের নামের আগে ‘ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার’ পদবী ব্যবহার করতে পারবেন। ঠিক তেমনি, ন্যূনতম এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রিধারী ছাড়া অন্য কেউ তাদের নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবী লিখতে পারবেন না। ভুয়া পদবী ব্যবহার করা অন্যায় এবং দন্ডনীয় অপরাধ।
বলতে দ্বিধা নেই, আমি বেশ কিছু ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার এবং ও কন্ট্রাক্টর বা ঠিকাদারদের জানি, যারা ব্যবহারিক কাজ অনেক বিএসসি প্রকৌশলীর চেয়েও ভালো বোঝেন। তার মানে এই নয়, তাঁরা ইঞ্জিনিয়ার পদবী ব্যবহার শুরু করবেন। নির্মাণ খাতে কর্মরত অনেক কন্ট্রাক্টরকে আমি দেখেছি, যারা কেবল নিজেকে ইঞ্জিনিয়ার বলে পরিচয় দিয়েই ক্ষান্ত হননি, ভিজিটিং কার্ডে নিজের নামের আগে ইঞ্জিনিয়ার লিখে তা সবাইকে বিলি করে বেড়াচ্ছে। এছাড়া কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং কিংবা সফ্টওয়্যার ডিজাইনের উপর সার্টিফিকেশন কোর্স করেও অনেকে নিজেকে সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বলে দাবি করছেন। এসব দেখলে অনেক সময় নিজেকে প্রকৌশলী পরিচয় দিতে দ্বিধা হয়।
অনেকে অসদুপায়ে জাল মুক্তিযুদ্ধ সনদ সংগ্রহ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা ভোগ করছেন। নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও নিচ্ছেন। সম্প্রতি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে চাকরি নিয়ে সরকারি সুবিধা গ্রহণের নামে অর্থ আত্মসাতের দায়ে ছয় শিক্ষকসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অন্যদিকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে প্রশাসনের শীর্য পর্যায়ে কর্মরত পাঁচজন সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও গেজেট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গেও প্রতারণা করতে বাঁধছে না কারও।
দেশজুড়ে আরেকটি পদবীর যথেচ্ছা ব্যবহার চলছে, তা হল ‘অধ্যাপক’। স্কুল, কলেজ থেকে শুরু করে দাখিল মাদরাসার শিক্ষকরাও নিজেদের অধ্যাপক বা প্রফেসর বলে পরিচয় দিচ্ছেন। ভাবি, আহা! অধ্যাপক যে কত মর্যাদাপূর্ণ পদবী সেটা যদি তারা জানতেন? যাঁরা সত্যিকারের অধ্যাপক হয়েছেন, তারাই জানেন এই পদবী কত কষ্টের ফসল।
অনেক সময় শিক্ষককে এলাকার মানুষ সম্মান করে প্রফেসর বলে ডাকে। প্রফেসর বা অধ্যাপক ডাকতে ডাকতে অনেক সময় ওই শিক্ষকের নাম পর্যন্ত ভুলে যান এলাকাবাসী। মানুষের ভক্তির সুযোগ নিয়ে কিছু শিক্ষক নিজেদের অধ্যাপক ভাবতে শুরু করেন এবং সুবিধা আদায়ের জন্য এই পদবী ব্যবহার করেন। এজন্যই হয়তো কোচিং সেন্টারের পোস্টারে দেখা যায় অধ্যাপকের ছড়াছড়ি। এটা অপরাধ।
কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পদমর্যাদা শুরু হয় প্রথমে প্রভাষক হিসাবে, তারপর সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং সর্বশেষে অধ্যাপক। অধ্যাপক হওয়ার জন্য একজন শিক্ষককে ক্লাস ও পরীক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি উৎকৃষ্ট মানের জার্নালে তাঁর নিজস্ব গবেষণালব্ধ বহুসংখ্যক প্রকাশনা থাকতে হয়। এ ধরনের প্রকাশনার কাজ খুবই কষ্টসাধ্য এবং এ জন্য প্রচুর আত্মত্যাগও করতে হয়। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা জানি, যেখানে কমপক্ষে শতাধিক গবেষণামূলক প্রকাশনা না থাকলে পুরোপুরি অধ্যাপক হওয়ার কথা ভাবাই যায় না। কিন্তু যখন দেখি, একজন শিক্ষক যার ক্লাসে পড়াশোনার বাইরে কোনো গবেষণা নেই, প্রকাশনা নেই, অথচ তিনি নিজেকে অধ্যাপক হিসেবে জাহির করছেন, তখন বিস্মিত হই, লজ্জিত হই। শুধু কি তাই? ইদানিং দেখছি, কেউ সহকারী অধ্যাপক (অ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসর) পদে পদোন্নতি পেলেই ‘সহকারী’ শব্দটি বাদ দিয়ে নিজেকে অধ্যাপক হিসেবে জাহির করতে থাকেন। নিয়ম অনুযায়ী একজন সহযোগী অধ্যাপকও সেই পদবী ব্যবহার করতে পারবেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের অধ্যাপক ছিলেন জগদ্বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী সত্যেন বসু। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে বোসন কণার অবিস্কার করে তিনি সাড়া জাগিয়েছিলেন বিশ্বে। তাঁর আবিস্কৃত বিষয়বন্তুর উপর গবেষণা করে এ পর্যন্ত দশজন বিজ্ঞানী পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। একবার পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপকের পদ খালি হলে সত্যেন বসু ওই পদের জন্য দরখাস্ত করলেন। কিন্তু ডক্টরেট ডিগ্রি না থাকায় সত্যেন বোসের মতো জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানীকেও নিয়ম ভেঙ্গে প্রফেসর পদে পদোন্নতি দেয়া হল না। তখন সত্যেন বসুর গুরু স্বয়ং আইনস্টাইন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করে বললেন, ‘তোমরা কি পদার্থবিজ্ঞানে সত্যেনের চেয়ে যোগ্যতর কাউকে পাবে?’ এভাবে সত্যেন বসু প্রফেসরের পদ লাভ করেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন ডিগ্রি নিয়ে চলছে বাণিজ্য। সামান্য অর্থ ব্যয় করলে অনলাইনে মিলে যায় এমবিএ, মাস্টার্স এমনকি পিএইচডি’র মতো ডিগ্রি। নিজের গবেষণাও অর্থের বিনিময়ে লিখিয়ে নেওয়া যায়। এই ধরনের ভুয়া সনদ পকেটে পুরে অনেকে হয়ে যাচ্ছেন অধ্যাপক, গবেষক কিংবা জ্ঞানী বুদ্ধিজীবী। যারা এসব করছেন তাঁরা আসলে ঠকাচ্ছেন নিজেকে, প্রতারণা করছেন নিজের সঙ্গে। এ ধরনের জ্ঞানপাপী মানুষ আমাদের সমাজকে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
এ ধরনের অন্যায় কাজ ও প্রতারণা বন্ধ করার জন্য আমাদেরও কিছু দায় দায়িত্ব রয়েছে। যাঁরা নিয়ম বর্হিভূত এবং ভুয়া পদবী ব্যবহার করছেন, তাঁরা যে সমাজে গ্রহণযোগ্য নন, সে কথা তাদের জানিয়ে দিতে হবে। সামাজিক অনুষ্ঠানে যাতে এই পদবী তাঁরা ব্যবহার করতে না পারেন সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। গণমাধ্যম কর্মীদেরও পত্রপত্রিকায় এই ধরনের মানুষদের নামের আগে ভুয়া পদবী লেখা বন্ধ করতে হবে।
