৩১ জুলাই ১৯৮০। বুকে প্রচন্ড ব্যথা নিয়েও অডিও অ্যালবাম রেকর্ডিংয়ের কাজ শেষ করলেন মোহম্মদ রফি। রেকর্ডিংয়ের জন্য সুদূর কোলকাতা থেকে আসা প্রয়োজককে ফিরিয়ে দিলেন না তিনি। স্টুডিও থেকে বাড়ি ফেরার পর ব্যথা তীব্রতর হলে হাসপাতালে যাবার জন্য তৈরি হলেন। তখন চলছিল পবিত্র রমজান মাস। রোজা রাখার ফলে তিনি পানিও স্পর্শ করলেন না। হাসপাতালে যাবার আগে পরিবারকে বিদায় জানিয়ে বললেন শেষ কথা, ‘মেরে লিয়ে দোয়া কারনা’। হাসপাতাল থেকে তাঁর আর বাড়ি ফেরা হয়নি। এভাবে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে চিরবিদায় নিলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী মোহাম্মদ রফি।
পরদিন শুক্রবার, পবিত্র রমজানের শেষ জুমআর নামাজের পর মুম্বাইয়ের জুহু কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। রফির শেষ যাত্রায় অংশ নিতে সেদিন কষ্টের চাদরে ঢাকা মুম্বাই শহরের রাজপথে নেমেছিল শোকার্ত মানুষের ঢল। কেঁদে বুক ভাসাচ্ছিলেন সবাই। আকাশ ভেঙ্গে তখন নেমেছিল তুমুল বৃষ্টি। সবার সাথে একাত্ম হয়ে প্রকৃতিও যেন কাঁদছিল অঝোর ধারায়। কারো শবযাত্রায় মুম্বাই শহরে এত মানুষের সমাগম এর আগে কখনো হয়নি। রফির চলে যাবার শোক বইতে না পেরে প্রবাসে তাঁর কয়েকজন ভক্ত আত্মহননের পথও বেছে নেন। মানুষের এতটাই প্রিয় ছিলেন মোহম্মদ রফি।
রফির সমসাময়িক শিল্পীদের মধ্যে কে সেরা, এ নিয়ে একবার বিতর্ক উঠেছিল। কিশোর কুমার নিজেই বিতর্কের ইতি টেনে বলেছিলেন, ‘মোহাম্মদ রফি হলেন আমাদের সময়কার সবচেয়ে সেরা পুরুষ কন্ঠ।’ মান্না দে বলেছিলেন, ‘রফি সকলের সেরা। কেউই তাঁকে স্পর্শ করতে পারবে না।’ এক সাক্ষাৎকারে লতা মুঙ্গেশকর বলেছিলেন, ‘একশ বছরেও মোহাম্মদ রফির মতো কণ্ঠ আর আসবে না।’ রাগিনী চলচ্চিত্রের ‘মন মরা বাউরা’ কিংবা ‘আজীব দাস্তান হ্যায় মেরী’র মতো গানগুলো গাইতে গিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন কন্ঠশিল্পী কিশোর কুমার। এক পর্যায়ে তিনি নিজেই রফিকে দিয়ে গানগুলি সম্পন্ন করার জন্য সঙ্গীত পরিচালকে অনুরোধ করেছিলেন।
মোহাম্মাদ রফির জন্ম ১৯২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ভারতের অমৃতসরের একটি ছোটো গ্রাম কোটলা সুলতান সিংয়ে। তাঁর ডাকনাম ছিল ফিকু। শৈশবে গ্রামের শ্যামল ছায়ায় ফকির বাবাদের আধ্যাত্মিক গানের মায়া তাঁকে সুরের ভুবনে টেনে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে রফির বড় ভাইয়ের বন্ধু আবদুল হামিদের অনুপ্রেরণাতে ওস্তাদ আবদুল ওয়াহিদ খান, পন্ডিত জীবন লাল মাট্টু এবং ফিরোজ নিজামির মতো সঙ্গীতজ্ঞের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের সাধনা শুরু করেন তিনি।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে লাহোরে তখনকার সেরা গায়ক কুন্দনলাল সায়গলের সহযোগী হয়ে জীবনের প্রথম খালি গলায় মঞ্চে গান পরিবশেন করেন তিনি। তরুণ রফির দরদী কন্ঠের গান হাজারো দর্শক শ্রোতার মন জয় করে নেয়। দর্শক-শ্রোতাদের কাছ থেকে আসতে থাকে একের পর এক আরো গান করার অনুরোধ। এর পর তিনি অল-ইন্ডিয়া লাহোরে গান গাওয়ার সুযোগ পান। ১৯৪৪ সালে পাঞ্জাবি ”লচ্চিত্র ‘গুল বালুচ’ দিয়ে তাঁর প্লেব্যাকের অভিষেক হলেও বলিউডের হিন্দি ছবিতে প্লেব্যাক করার প্রথম সুযোগ আসে ১৯৪৫ সালে। ‘গাঁও কি গৌরী’ ছায়াছবির ‘আজি দিল হো কাবু মে’ ছিল হিন্দি ছবিতে রফির গাওয়া প্রথম গান।
বলিউডের সঙ্গীত ভুবনে পথচলার শুরুতে নওশাদের সুরে গান গেয়ে রফি সুপারস্টার হয়ে উঠেন। নওশাদের সাথে জুটি বেঁধে তিনি উপহার দিয়েছেন ১৪৯টি অসাধারণ গান। ১৯৫২ লালে মুক্তি পাওয়া ‘বেজু বাওরা’ ছবিতে নওশাদের সুরে রফি পরিবেশন করেন তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গান ‘ও দুনিয়াকে রাখওয়ালে’। এই গানটির জন্য শ্রোতাদের কাছে তিনি পেয়ে যান কাল্ট স্ট্যাটাস। এমনই ছিল রফির গলার যাদু যে সঙ্গীতপ্রেমীরা তাঁর গানে নিজের জীবনের ছায়া দেখতে পেতেন। মুম্বাইতে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত জনৈক আসামীকে তার সর্বশেষ ইচ্ছের কথা জানতে চাওয়া হলে অসামীটি বললেন, তিনি ‘ও দুনিয়াকে রাখওয়ালে’ গানটি শুনে ফাঁসির মঞ্চে উঠতে চান।
শংকর-জয়কিষণ জুটির পরিচালনায় ‘বাহারো ফুল বারসাও’, ‘চাহে কোয়ি মুঝে জাংলি কাহে’ ইত্যাদির মতো মানুষের মুখে মুখে ফেরা অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন রফি। সঙ্গীত পরিচালক রবি শঙ্কর শর্মার সুরে ১৯৬০ সালে ‘চৌধবি কা চান্দ হো’ গানটি গেয়ে প্রথমবারের মতো সেরা গায়ক হিসাবে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পান রফি। এই রবির সুরেই ‘নীল কমল’ ছবিতে ‘বাবুল কি দোয়া লেতি যা’ গানটি গেয়ে ১৯৬৮ সালে জাতীয় পুরস্কার পান। তবে লক্ষিকান্ত-পয়ারেলাল জুটির সংগীত পরিচালনায় সবচেয়ে বেশি গান করেছেন রফি। গানের সংখ্যা হল ৩৬৯টি। এই জুটির সুরে ‘চাহুঙ্গা ম্যায় তুঝে সাঁঝ সভেরে’ গানটি গেয়ে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান তিনি। এছাড়া কিংবদন্তি সঙ্গীতজ্ঞ এস ডি বর্মণের সুরে ‘পিয়াসা’, ‘কাগজ কি ফুল’, ‘কালা বাজার’, ‘কালা পানি’, ‘গাইড’- এর মতো সুপারহিট সব ছবিতে গান গেয়েছেন রফি। বাংলায় মোহাম্মদ রফির গাওয়া ‘ওই দূর দিগন্ত পারে’, ‘নাই বা পরিলে আজ মালা চন্দন’, ‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন’ ইত্যাদি গান আজও মানুষকে আলোড়িত করে।
হিন্দি ফিল্মি গানের সূচনায় কিংবদন্তি নায়ক-গায়ক কে এল সায়গলের ঘরানাকেই আদর্শ হিসাবে মানা হত। মুকেশ, কিশোর কুমার, শ্যামকুমার, জগম্ময় মিত্রসহ অধিকাংশ প্লেব্যাক শিল্পীরা সায়গল ঘরানাকে অনুসরণ করতে চেষ্টা করতেন। সায়গলের ঘারানার বাইরে নিজস্ব একটি ঘারানার সৃষ্টি ও বিকাশ ঘটানোই হল ভারতের সঙ্গীত জগতে মোহাম্মদ রফির সবচেয়ে বড় অবদান। হালকা সেমি-ক্ল্যাসিকাল ঢংয়ে গাওয়া রফির মখমলি কন্ঠের গান খুব সহজেই সাধারণ মানুষকে কাছে টানতো। রফি ঘরানার অনুসারী শিল্পীরা হচ্ছেন মহেন্দ্র কাপুর, উদিত নারায়ণ, এস পি বালা সুব্রামানিয়াম, সনু নিগাম, মোহিত চৌহান, সুরেশ ওয়াদেকার, মোহাম্মদ আজিজ, সাব্বির কুমার প্রমুখ। পশ্চিম বাংলার শ্যামল মিত্র এবং বাংলাদেশের বশীর আহমেদ ও খুরশিদ আলমও রফি ঘরানার শিল্পী।
চলচ্চিত্র অভিনেতাদের কন্ঠের সাথে নিজের গলা বসিয়ে গাইবার মতো অসাধারণ দক্ষতা ছিল রফির। রফি গান গাইবার আগে অভিনেতার কন্ঠ, কথা বলার ধরণ এবং গানের সিকোয়েন্স নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। ফলে গান শুনেই বুঝা যেতো কোন নায়কের জন্য তিনি গান গাইছেন। রফির কন্ঠের গান মানেই সুপার হিট। তাই তো সেরা নায়করাও তাদের ছবিতে রফিকে দিয়ে গান করানোর জন্য পরিচালকদের শর্ত বেঁধে দিতেন।
মোহাম্মদ রফির মতো গলার বহুমুখিতা ও রেঞ্জ তাঁর সমসাময়িক কোনো কন্ঠশিল্পীর ছিল না। ওই সময়কার জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পীদের প্রায় সবাই একটি নির্দিষ্ট ছাঁচ বা গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু রফি ফিল্মী গান, ভজন, কাওয়ালী, গজল, সেমি ক্লাসিকাল, ফোক, পপ, নজরুলগীতিসহ সব গানেই সমানভাবে দেখিয়েছেন দক্ষতা ও পারদর্শিতা। উপমহাদেশের কোনো পুরুষ শিল্পীদের মধ্যে আর কেউ এটা করতে পারেননি।
রোমান্টিক ও প্যাথোজ গানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট হলেন মোহাম্মদ রফি। তাঁর গাওয়া ইয়ে মেরা প্রেমপত্র, রাহা গার্দিশোমে হারদম, খিলোনা জানকার, ইয়াদ না যায়ে বিতে দিনোকি, বাহারো ফুল বরসায়ো, না ঝটকো জুলফসে পানি, খিলোনা জানকার তুম, টুটে হুয়ে খাবোনে, তেরি পেয়ারি পেয়ারি সুরতকো, আনেসে উসকে আয়ে বাহার, পুকারতা চলা হু ম্যায়, ইয়ে রেশমি জুলফে ইত্যাদি শতবার শুনলেও আবেদন ফুরিয়ে যায় না, মনে হয় এই যেন প্রথমবার শুনছি। সময়ের চাহিদামতো রফি বার বার নিজেকে ভেঙ্গেছেন, গড়েছেন। তাই তো রফির গান সবসময় নতুন এবং প্রাসঙ্গিক, কখনো পুরোনো মনে হয় না।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল, বিনয়ী ও পারিবারিক মানুষ। মুুম্বাইয়ের ফিল্ম জগতের জৌলুস তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি কখনো। বন্ধুত্বের খাতিরে অনেক সিনেমায় তিনি বিনা পারিশ্রমিকে গান করেছেন। কোনো গানের সুর ভালো লেগে গেলে তিনি পারিশ্রমিক নিতেন না। তিনি বহু দুঃস্থ সঙ্গীতশিল্পী ও পরিচালকের বিপদের সময় সাহায্যর হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, চ্যারিটি শোতে অংশ নিয়েছেন।
দীর্ঘ চার দশকের সঙ্গীত জীবনে মোহাম্মদ রফি হিন্দি ছাড়া ১৮টি ভাষায় গেয়েছেন প্রায় ২৮ হাজার গান। ছয়বার পেয়েছেন ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। একবার পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার এবং ভারত সরকারের ‘পদ্মশ্রী’ খেতাব। তবে রফির সবচেয়ে বড় পুরস্কার হচ্ছে তাঁর গানের জন্য শ্রোতাদের শর্তহীন ভালোবাসা। মোহাম্মদ রফির ভুবনভোলোানো কন্ঠ হচ্ছে স্রষ্টার উপহার। তাঁর মতো মহান শিল্পীরা পৃথিবীতে আসে না বারবার। কারো কাছে মোহাম্মদ রফি হলেন উপমহাদেশের আধুনিক তানসেন কিংবা গ্রিক পুরানের সর্বকালের সেরা মানব গায়ক অর্ফিয়াস। রফি কন্ঠের আবেদন কালজয়ী, ফুরিয়ে যাবে না কখনো।
