কিংবদন্তি গায়ক ও সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯২০ সালে বেনারস শহরে। বাবা চাইতেন ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হোক। অন্যদিকে হেমন্ত সাহিত্যচর্চায় তৃপ্তি খুঁজে পেতেন। ‘দেশ’ পত্রিকায় তাঁর একটি গল্পও বেরিয়েছিল। কিন্তু সঙ্গীত ছিল তাঁর নেশা। শেষ পর্যন্ত সবকিছু ফেলে তিনি সে পথেই হাঁটলেন।

হেমন্ত ওস্তাদ ফায়েজ আলী খানের কাছে কিছুদিনের জন্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে দীক্ষা নেন। এরপর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাঁর আর সঙ্গীত শেখা হয়নি। তিনি প্রথম রেডিওতে গান করেন ১৯৩৫ সালে আর ছায়াছবির গানে প্রথম কন্ঠ দেন ‘নিমাই সন্যাসী’ ছবিতে। পরবর্তীতে তাঁর কন্ঠে মুছে যাওয়া দিনগুলি, মেঘ কালো আঁধার কালো, আজ দুজনার দুটি পথ, এত সুর আর এত গান এবং রোমান্টিক হিট গান কেন দূরে থাকো, আমি দূর হতে তোমারে দেখেছি, তুমি এলে অনেকদিনের পরে যেন বৃষ্টি এলো, এই রাত তোমার আমার’র মতো অসংখ্য কালজয়ী গান আজও উপমহাদেশের সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে ঢেউ তুলছে। গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের কথায় তাঁর সুরে ও কন্ঠে ‘মাগো ভাবনা কেন’ গানটি একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাঙালি জাতিকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। সত্তর দশকে শ্রাবন্তী মুখার্জীর সঙ্গে গাওয়া ‘আয় খুকু আয়’ বাবা-মেয়ের চিরন্তন প্রীতির বন্ধনকে অমর রূপ দিয়েছে।

রবীন্দ্র সঙ্গীতে তাঁর সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বেশ কিছু রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনার পর মনে হয় গানগুলো যেন হেমন্তর গাইবার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। হেমন্তর রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইবার ঢং দেবব্রত, কণিকা ও হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতো শিল্পীরা পছন্দ না করলেও, রবীন্দ্র সঙ্গীতকে জনপ্রিয় করার জন্য তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

লতা মঙ্গেশকরের মতো শিল্পীকে বাংলা গানের জগতে নিয়ে আসা এবং তাঁকে দিয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাওয়ানোর কৃতিত্ব হেমন্তের। লতার কন্ঠে অদ্ভুত মিষ্টি গান ‘প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে’ হেমন্তেরই সুর করা। শুধু কি তাই? তিনি অসাধারণ গীতিকাব্যও রচনা করেছেন। ‘কোনও এক গাঁয়ের বধূর কথা’ গানটি তাঁরই লেখা।

১৯৬২ সাল। গ্রাম বাংলার ভবঘুরে এক গায়কের কাহিনী নিয়ে ছবি করবেন তরুণ মজুমদার। ছবিতে সুর করার জন্য তাঁর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে তার চাই। কাহিনীর জন্য প্রয়োজন লোক-সঙ্গীতের। তাই হেমন্ত মুখার্জী খুব একটা উৎসাহ দেখাচ্ছিলেন না। কিন্তু ছাড়বার পাত্র নন তরুণ মজুমদার। অনেক বলে কয়ে সুর করার জন্য রাজি করালেন হেমন্তকে। ঠিক তখনই ঘাড়ের ব্যথা নিয়ে হেমন্ত হাসপাতালে ভর্তি হলেন। কিন্তু কাজ থেমে থাকলো না। গীতিকার গান লিখে লিখে কাগজ দিচ্ছেন হেমন্তকে, আর তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে সুর করে যাচ্ছেন। এভাবেই রচিত হল কালজয়ী লোক ধারার গান, ‘জীবনপুরের পথিকরে ভাই, কাথাও আমার মনের খবর পেলাম না’।

গায়ক হিসাবে তাঁর আকাশচুম্বি খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার কাছে সুরকার পরিচয়টি অনেকের অগোচরেই রয়ে গেছে। পঞ্চপান্ডব খ্যাত হেমন্ত, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, কিশোর কুমার ও মানবেন্দ্র মুখার্জী, এই পাঁচজন কিংবদন্তি শিল্পী ওই সময় বাংলা সঙ্গীত জগত শাসন করছিলেন। এরা সবাই গান গাইবার পাশাপাশি সুরও করতেন। কিন্তু সুরকার হিসাবে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন হেমন্ত।

গত কয়েক দশক ধরে সনু নিগাম, কুমার শানু ও উদিত নারায়নের মতো জনপ্রিয় শিল্পীর গান আমরা শুনছি। নিঃসন্দেরহ এরা প্রতিবাভান। কিন্তু এদের কেউই কন্ঠশিল্পীর সীমানা পেরিয়ে সুরকার হিসাবে স্বাক্ষর রাখতে পারেননি। অন্যদিকে রয়েছেন অস্কার বিজয়ী কম্পোজার এ আর রহমান। তিনি সুরের যাদু তৈরি করেছেন ঠিকই, কিন্তু গায়ক হিসাবে বিশেষ উচ্চতায় পৌছতে পারেননি। কিন্তু হেমন্ত মুখার্জী গায়ক এবং সুরকার, এ দুটো ক্ষেত্রেই রেখেছেন আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা, সাফল্যে ও প্রতিভার স্বাক্ষর।

১৯৫৪ সালে ‘শাপমোচন’ ছবিতে হেমন্তের সুর করা ও গাওয়া গান সুপারহিট হবার পর উত্তম কুমারের কন্ঠে হেমন্ত ছাড়া অন্য কারো গান ভাবাই যেতো না। বাঙালির রোমন্টিকতা, আবেগ, অনুভূতির পুরোটাই যেমন জুড়ে ছিলেন তিনি, তেমনি অসংখ্য সুপারহিট হিন্দি গান দিয়ে মাতিয়েছিলেন বলিউড। ১৯৫৪ সালেই তাঁর মিউজিকে মুক্তি পেয়েছিল ‘নাগিন’। এই ছবিতে হারমোনিয়াম আর ক্লাভিয়োলিন ব্যবহার করে সাপুড়ের বীণের সুরে তৈরি ‘মন ডোলে মেরা মন ডোলে’ গানের সুরে মেতেছিল পুরো উপমহাদেশ। ভারতে এখনও ছোট-বড় পার্টিতে বাজে ‘মন ডোলে মেরা মন ডোলে’। হিন্দিতে নায়ক দেবানন্দের সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যেতো হেমন্তের গলা। দেবানন্দের গলায় ‘হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা’ গানটি ষাট দশকের শুরুতে উপমহাদেশের মানুষের মুখে মুখে ফিরতো।

১৯৮৯ সালে প্রথম ও শেষবার ঢাকায় আসেন হেমন্ত মুখার্জী। বিটিভি তাঁর একক সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করে। এর মাত্র কিছুদিন আগেই তাঁর হার্টে লাগানো হয়েছে পেসমেকার। শারীরিকভাবে তিনি ছিলেন বেশ দুর্বল। এর পরও দশতলা সিঁড়ি বেয়ে উঠে বিটিভিতে অনুষ্ঠান করেন। এছাড়া বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক এবং জনপ্রিয় গীতিকার আবু হেনা মোস্তফা কামাল তাঁর একটি সাক্ষাতকার নেন যা বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। হেমন্ত মুখার্জী ঢাকা ত্যাগ করার এক সপ্তাহ পর ২৩ সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ড. আবু হেনা মুস্তফা কামাল মৃত্যুবরণ করেন। দুঃখজনকভাবে এর মাত্র তিনদিন পরই পরপারে পাড়ি জমান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।

বিটিভির অনুষ্ঠানে তাঁর গাওয়া শেষ গানটি ছিল, ‘আগামী পৃথিবী কান পেতে তুমি শোনো/আমি যদি আর নাই আসি হেথা ফিরে/তবু আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’। তাঁর কন্ঠ থেমে গেছে ঠিকই, তবে হেমন্তের গাওয়া গান কান পেতে শুনবে সবাই, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।