সেদিন ফেসবুক বন্ধু হাবিব হাসানের টাইমলাইনে পাবনার সিপিএ ক্লাব ও ইফার ছবি দেখে চমকে উঠেছিলাম। মনে হল, যেনো ফিরে গিয়েছি আমার শৈশবের বেলাভূমি প্রিয় পাবনা শহরে। ভাবছিলাম, কোথায় গেলো আমার ছোট্টবেলার সাথীরা? কেমন আছে সবাই?

জনাব হাবিবের কাছ থেকে জানতে পারলাম তিনিই হচ্ছেন পাবনার গান ও নাচ শিক্ষার বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ইন্সটিটিউট অফ ফাইন আর্টস ইফা’র (IFA) বর্তমান প্রিন্সিপাল। ইফার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রকাশিতব্য স্মরণিকার জন্য আমার একটি লেখা চাইলেন।  আর সেই সুবাদেই আজকের এই লেখা।

শৈশবের স্মৃতি সব মানুষের জন্যই বোধহয় মাধুর্যময়। তাই পাবনার ফেলে আসা দিনগুলো এখনো বড্ড স্মৃতিময়। মনে পড়ে পদ্মা নদীর তীরে হার্ডিঞ্জ ব্রীজ পাড়ি দেয়া, পাবনা সদরের অদূরে পাকসী এবং নাটোরে দিঘাপতিয়ার রাজবাড়ী এলাকায় দলে বেধে পিকনিকে মেতে ওঠা, এবং আরো কতো কি!

আমাদের ছিল নয় ভাই ও দুই বোনের বিশাল সংসার। আমি হলাম পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। বাবা জেলা প্রশাসনে চাকরী করতেন বলে ৩/৪ বছর পরপর তাঁকে বদলী করা হত এক জেলা হতে অন্য জেলায়। ১৯৬১ সালের প্রথম দিকে বাবা পাবনায় বদলী হলে কালাচাঁন্দ পাড়ায় একটি একতলা বাসায় আমরা গিয়ে উঠি। কিছুদিন পর ওই বাসা ছেড়ে আমরা দিলালপুরে ভবানী শাহের চারতলার পশ্চিম পাশের ‘হরিনাথ ভবন’নামের একটি দোতলা বাসায় চলে আসি।

আমার পরিবারে ধর্মীয় অনুশাসন এবং সৃজনশীল কাজের মধ্যে একটা সুন্দর ভারসাম্য ছিল। বাবা-মা খুব ধার্মিক ছিলেন। কিন্তু কোনো সৃজনশীল কাজে বাধা দিতেন না। ফলে ক্বারী করে কুরআন তেলোয়াত থেকে শুরু ছবি আঁকা, গান, কবিতা, অভিনয়, সাংবাদিকতা ও খেলাধূলা, বলতে গেলে সবকিছুরই চর্চা হতো আমাদের বাড়ীতে।

আমাদের পাড়ায় (দিলাল পুর) ছিল সরকার অনুমোদিত ক্লাব, যার নাম হল ‘চিলড্রেন ফিজিক্যাল এন্ড কালচারাল এসোসিয়েশন (সিপিসিএ), যাতে প্রায় একশ’ জন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে সদস্য ছিল। এই ক্লাবের প্রতিষ্ঠা এবং কর্মকান্ডের সাথে আমার পুরো পরিবারই সম্পৃক্ত ছিল। জনাব আব্দুল আওয়াল ছিলেন এই ক্লাবের সভাপতি। আর আমার সেজদা বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব বদিউল আলম ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক।

আমার শৈশবের খেলাঘর ছিল এই সিপিসিএ ক্লাব। আমার আরো তিন অগ্রজ সহোদর মো. আলম, আহমদ উল্লাহ ও শহীদ উল্লাহ ক্লাবের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে নিয়মিত অংশ নিতেন। আমার ভাই আহমদ উল্লাহ খুব ভালো ছবি আঁকতেন এবং মাটির ভাস্কর্যও তৈরী করতে পারতেন। তৎকালীন দৈনিক অবসার্ভার পত্রিকায় বিভিন্ন বরেণ্য ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি এঁকে তিনি সুনাম কুড়িয়েছিলেন।  এছাড়া তিনি উঁচুমানের অভিনয়ের সাথে কৌতুক পরিবেশন করতে পারতেন। পাবনার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কৌতুক অভিনয় করে তিনি একাধিকবার প্রসংশিত হন।

আওয়াল ভাই পাবনা ডিসি অফিসের একজন অফিস সহকারী ছিলেন। বাবাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন। তিনি ছিলেন একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ। তিনি আমাদের খুব স্নেহ করতেন। আওয়াল ভাই ও আমার সেজদা এই ক্লাবকে দাঁড় করাতে বহু শ্রম দিয়েছেন। পাবনা শহরের অফিসারদের বাসায় গিয়ে তাঁদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদর সিপিএ ক্লাবের তাঁরা সদস্য বানাতেন। আমার সংগ্রহে থাকা ক্লাবের সদস্যদের নিয়ে তোলা একটি দুর্লভ ছবি এখানে শেয়ার করলাম। আশাকরি, এই ছবিতে অনেকেই তাঁদের শৈশব খুঁজে পাবেন।

আমার সেজদা বদিউল আলম ছিলেন পাবনার সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াঙ্গনের একটি অত্যন্ত প্রিয় মুখ। আবৃত্তিকার ও গায়ক হিসাবেও তাঁর সুনাম ছিল।  এছাড়া তিনি ছিলেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। নেপথ্য সঙ্গীতের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে মঞ্চে কাঠের ব্ল্যাকবোর্ডে সাদা চক দিয়ে গানের বিষয়বস্তু ও ছবি এঁকে ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। নীল নবঘনে আষাঢ় গগণে, খরবায়ু বয় বেগে, কোনো এক গাঁয়ের বধূ ইত্যাদি গানের সাথে তাঁদের মিউজ্যিকাল ড্রইং দর্শকদের মুগ্ধ করতো। আমাদের ক্লাবের ছেলে-মেয়েদের ভাল শিক্ষক দিয়ে গান, নাচ, আবৃত্তি ও কুরআন তেলোয়াত শেখানো হত। ফলে প্রতি বছর সিপিএ ক্লাব পাবনার সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতায় ১ম স্থান অধিকার করতো।

সিপিসিএ ক্লাবের পাশেই ছিল ইফা। এখানে সঙ্গীত, বাদন, চিত্রকলা, নৃত্য ও নাটকের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের সুকুমারবৃত্তি চর্চা করানো হত। ইফাতে আমার আপা রিজিয়া আক্তার ও সেজদা নজরুল সঙ্গীতের প্রথম সারির শিক্ষার্থী ছিলেন। অনিমা ভট্টাচার্য ও গোলাম সরওয়ারও ইফার ছাত্র ছিলেন। গোলাম সারওয়ার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। সেজদা ইফাতে মিউজিক্যাল ড্রইংও শেখাতেন ।

রাজশাহী বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত শিল্পী মহিউদ্দীন চৌধুরী শেখাতেন নজরুল সঙ্গীত। দেবু ভট্টাচার্য শেখাতেন তবলা ও ক্লাসিক্যাল নৃত্য। ওই সময় ইফার প্রিন্সিপাল ছিলেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের অর্থণীতির অধ্যাপক জনাব এস কিউ হোসেন।

আহামদ ফরিদ উদ্দীন সিএসপি তখন পাবনায় আতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসাবে কর্মরত ছিলন।  তিনি হলেন দেশবরেণ্য নৃত্যকলা ব্যক্তিত্ব বুলবুল চৌধুরীর নাতি। তিনি ছিলেন ভীষন সাংস্কৃতিমনা একজন মানুষ। পাবনার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমরা তাঁকে পেতাম। পরবর্তীতে তিনি আবুধাবীর রাষ্ট্র্রদূত নিযুক্ত হন।

বনমালী ইন্সটিটিউিট ছিল তখনকার নাটক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রধান কেন্দ্র। আমার বয়স তখন ৪ বছর। আমি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নজরুল ইসলামের ‘লিচু চোর’ ও রবি ঠাকুরের ‘বীর পুরুষ’ কবিতা আবৃত্তি করে ভীষণ সুনাম অর্জন করেছিলাম। আমি স্টেজে উঠলেই নাকি দর্শকের মুহুর্মুহু করতালিতে চারিদিক মুখরিত হয়ে উঠতো।

আমাদের সময় প্রতি পাড়াতেই ছিল চিত্তবিনোদনের জন্য ক্লাব। এখানে শিশু ও কিশোরদের জন্য শুদ্ধধারার সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া চর্চার সুযোগ ছিল। কিন্তু এখন এলাকায় সিপিসিএ ক্লাবের মত প্রতিষ্ঠান আর গড়ে উঠতে দেখিনা। এখন সেই ক্লাবের জায়গা নিয়ে নিয়েছে মোবাইল ফোন, আই প্যাড, ও অনলাইন গেম্স।

দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর দখল মুক্ত হয়ে আবার নতুন আঙ্গিকে ফিরে এসেছে আমাদের প্রানের সিপিসিএ ক্লাব। আর খুব সহসা পালিত হতে যাচ্ছে ইফার ৫৯তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। ভাবতেই ভালো লাগছে, এই ঐতিহ্যবাহী দুটো প্রতিষ্ঠানের সাথে আমার নিবিড় সখ্য ছিল। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ইফার সব নতুন ও পুরাতন সদস্যদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।  দেশ বিদেশে ছড়িয়ে থাকা এই দু’টি এতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের পুরোনো সদস্যদের খুঁজে বের করে তাদের মধ্যে সেতু বন্ধন তৈরী করার এই মহতী প্রচেষ্টার জন্য হাবিব হাসানকে জানাই আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।  আমি নিশ্চিত, জনাব  হাবিবের মত একজন নিবেদিতপ্রান সংগঠকের নেতৃত্বে ইফা ফিরে পাবে তার হারানো গৌরব।

আজ জীবন সায়াহেৃ এসে আওয়াল ভাই, ছেলেবেলার খেলার সাথী ও পাবনার সেই সোনালী দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে। শুনেছি আওয়াল ভাই আর আমাদের মাঝে নেই। আমার সহপাঠিদের অনেকেই পাড়ি জমিয়েছেন ওপারে। একদিন হয়তো আমারও ডাক আসবে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, ইফা ও সিপিসিএ ক্লাব পাবনার শিশু কিশোরদের অন্তরে আলো ছড়াবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মন্তরে।