পহেলা বৈশাখ হচ্ছে বাংলা নতুন বর্ষবরণের দিন। পান্তা-ইলিশ, শুকনো পোড়া মরিচ, রকমারী ভর্তা, ঢাক-ঢোলের বাজনা, আল্পনা আঁকা শাড়ি আর পাঞ্জাবীতেই যেনো পূর্ণতা পায় অসাম্প্রদায়িক ও সার্বজনীন এই পহেলা বৈশাখ। তবে আমাদের মত প্রবাসীদের কাছে পহেলা বৈশাখ হচ্ছে শেকড়ের কাছে ফিরে যাবার দিন, বাঙালিয়ানার স্বাতন্ত্র খুঁজে পাবার দিন।
বাঙালীর প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখের উচ্ছ্বাসে ভেসে চলেছে কাতারের বাংলাদেশ কমিউনিটি। এবছর সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে পড়েছিল পহেলা। তাই কাতারের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রায় সব পার্ক ও সবুজ চত্বরে বহতা জলের মতো নেমেছিলো স্বতঃস্ফ’র্ত মানুষের ঢল। বিভিন্ন সংগঠন, পারিবারিক ফোরাম দলবদ্ধ হয়ে উপেভোগ করেছে বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ পান্তা-ইলিশ আর ভর্তা। ফলে কোনটা ছেড়ে কোনটায় যাবো এ নিয়ে আমি নিজেই রীতিমত ধন্দে পড়ে গিয়েছিলাম।
দেশে বৈশাখের আগমনে ইলিশের দামে আগুন লাগলেও কাতারে মাছের দাম ছিল মোটামুটি সহনীয়। দোহা শহরের মাছের বাজারে মোটামুটি বড় সাইজের ইলিশ প্রতি কিলো ৫০ থেকে ৬০ রিয়ালের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছিল। কাতারে বৈশাখ আগমনের মাসখানেক আগ থেকেই অনেকে পাইকারি দামে ইলিশ কিনে ফ্রিজারে রেখে দিয়ে পহেলা বৈশাখের দিন গুনছিলেন।
বাংলাদেশ এমএইচএম স্কুল এবং বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত বৈশাখী মেলা ও উৎসব ছিল কাতারের সবচেয়ে বড় বৈশাখীর আয়োজন। কাতার প্রবাসী বিভিন্ন স্তরের মানুষ, পরিবার পরিজন সহ এই উৎসবে অংশ নেন। মেলার ষ্টলের মধ্যে এই প্রথমবারের মত নবপ্রকাশের বইয়ের ষ্টল সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কাতারের প্রবাস জীবন নিয়ে লেখা আমার সদ্য প্রকাশিত “কাতারে বহতা সময়” বইটির পাওয়া যাচ্ছিল এই স্টলে। বইটি নিয়ে পাাঠকদের বিপুল আগ্রহ আমাকে অনুপ্রানিত করেছে। কাতারে বই প্রেমীদের সংখ্যা যে নিতান্তই কম নয় তা জানতে পেরে খুব ভালো লাগছে।
বাংলাদেশ স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ছিল মনমুগ্ধকর। তবে আরো নান্দনিক পরিবেশনার জন্য প্রয়োজন অধিক অনুশীলনের। অনুশীলনে আরো একটু যত্নবান হলে পরিবেশনাগুলো আরো ছন্দময় ও চিত্তগ্রাহী হতো। মেলার ষ্টল প্রাঙ্গনের কিছু কিছু জায়গা ছিল অসমতল। ফলে অনেক শিশুকে দৌড়াদৌড়ি করতে যেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তে দেখলাম। এছাড়া মঞ্চের কাছে পর্যাপ্ত পরিমান চেয়ার দিলে মহিলা এবং শিশুরা মঞ্চের অনুষ্ঠান স্বাচ্ছন্দে উপভোগ করতে পারতো। কাতারে তরুন বাংলাদেশিদের রয়েছে বেশ কয়েকটি মিউজিক ব্যান্ড। এইসব ব্যান্ডগুলোকে সঙ্গীত পরিবেশনার সুযোগ দিলে পহেলা বৈশাখের মতো সার্বজনীন অনুষ্ঠান নতুন মাত্রা পেতো এবং শিল্পীরাও অনুপ্রানিত হত ।
দোহার আল হিলাল এলাকার আল-আন্দালুস কম্পাউন্ডে যাযাবার সাংস্কৃতিক গোষ্ঠি আয়োজিত বৈশাখী অনুষ্ঠান ছিল চিত্তাকর্ষক। বিভিন্ন ধরনের ষ্টলের পাশাপাশি মঞ্চে চলছিল একটানা বিচিত্রানুষ্ঠান। অনুষ্ঠানমালা এমন করে সাজানো হয়েছিলো তাতে দেশের বৈশাখী মেলার আমেজ খুঁজে পেয়েছেন অনেকে। বাংলাদেশের জনপ্রিয় ছায়াছবির কিছু বাছাই করা গানের নাটকীয় পরিবেশনা ছিল খুবই উপভোগ্য। তবে এই ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য ক্লাব হাউসের বদ্ধ পরিবেশ উপযোগী মনে হয়নি। প্রয়োজন উস্মুক্ত মঞ্চ।
অন্যদিকে দোহা শহরের দক্ষিনে আল-ওয়াকরা গার্ডেনের সবুজ চত্বরে, পান্তা-ইলিশ ও রকমারী ভর্তার আয়োজনে বৈশাখ পালন করলো ফ্রেন্ডশীপ ফোরাম, কাতার। কিছু সমমনা বন্ধু এবং তাদের পরিবার নিয়ে প্রায় তিন বছর আগে গঠিত হয়েছে এই ফোরাম। উদ্দেশ্য, ফোরামের বন্ধুদের সাথে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়া, বিপদ আপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া। এছাড়া সালাতা, ইসলামিক মিউজিয়াম, শামাল পার্কেও পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মিলনমেলা। দোহার দুহাইল এলাকায় একটি ক্লাব হাউজেও প্রায় ত্রিশ পরিবার মিলে পালন করেছে পহেলা বৈশাখ। নৃত্য, গান,নাটিকা ইত্যাদি সব মিলিয়ে তাদের সাংস্কৃতিক আয়োজন ছিল সত্যি উপভোগ্য।
মনে হচ্ছে এবার পুরো বৈশাখ মাস জুড়েই চলবে বৈশাখের হৈ-হুল্লোড় ও আন্দমুখর উৎসব। গত শুক্রবার ইসলামিক মিউজিয়াম পার্কে শিশুদের জন্য বৈশাখী অনুষ্ঠানের আয়োজন করলো বাংলাদেশ চিলড্রেন ফোরাম কাতার। এই ফোরামের মূল উদ্দেশ্য হল প্রবাসী ছেলেমেয়েরা যাতে মাতৃভ’মিকে ভুলে না যায় সেজন্য তাদের বাংলা ভাষা শিক্ষা দেয়া এবং দেশীয় সংস্কৃতি চর্চার তালিম দেয়া। বাবা-মা সহ শিশুরা রং-বেরঙয়ের দেশীয় পোশাকে সেজে অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বিভিন্ন আয়োজনের মধ্যে শিশুদের তৈরী হস্তশিল্প প্রদর্শনী ছিল মনোমুগ্ধকর।
চিলড্রেন ফোরামের অনুষ্ঠান চলাকালীন ঢাকা থেকে ফোনে খবর পেলাম কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী লাকী আখন্দ আর নেই। খবর শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। আমার পাশে রাখা মউিজিক সিস্টেমে তখন বাজছিল তারই সুর করা আমার কন্ঠের গান “মিথ্যে অভিমানে”। হঠাৎ করে মনে হল, বৈশাখের সব রং ও উচ্ছ্বাস যেনো ফিকে হয়ে গেছে। হৃদয়ের ইউটিউবে ষ্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম লাকী ভাইয়ের সাথে শেষ দেখার মুহুর্তগুলো।
৪ মে, ২০১৭
