কাতারের শাসক পরিবারের নাম আল-থানি। থানি মূলতঃ একটি বেদুইন গোত্র। আল থানি সৌদি আরবের নজদ এলাকার প্রভাবশালী মুদার বিন নিজারের বনু তামিম গোত্রেরই একটি শাখা। বনু তামিম নজদের দক্ষিণে জাবরিন মরু অঞ্চলে বসবাস করত। যাযাবর জীবন যাত্রায় অভ্যস্থ আল থানি গোত্র কোনো একটি এলাকায় স্থির থাকেনি। কিছু সময় পর পর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গিয়ে তারা বসতি স্থাপন করত।
আনুমানিক ১৭৪০ সালে আল-থানি গোত্র কাতারে অগমন করে। এর আগে তারা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের উত্তর-পূর্বে উশাইকির এলাকায় থাকতো। প্রথমে কাতারের দক্ষিণে সিকাক শহরে বসতি স্থাপন করলেও পরবর্তীতে উত্তর-পশ্চিমে জুবারা এবং আল রুআইস এলাকায় চলে আসে। উনিশ শতকের প্রথম দিকে শেখ মুহাম্মদ বিন থানির নেতৃত্বে থানি পরিবার দোহা শহরে বসবাস করতে শুরু করে।
থানি পরিবারের নামকরণ করা হয় কাতারের প্রথম শাসক মোহাম্মদ বিন থানির পিতা থানি বিন মুহাম্মদ বিন তামের বিন আলির নামে। আল থানির কাতার আগমনের প্রাক্কালে মূল কাতার উপদ্বীপ এলাকা ছিল অন্য একটি প্রভাবশালী গোত্র বনু খালিদের নিয়ন্ত্রনে। ওই সময় কাতারে ছোট-বড় বেশ কিছু গোত্র বসবাস করলেও সম্পদের প্রাচুর্য, মর্যাদায় আল-থানির প্রভাব অন্যান্য সবার উপরে ছিল।
যতদূর জানা যায়, আল-থানি পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা থানি বিন মুহাম্মদের জন্ম হয় কাতারের উত্তর-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত জুবারা দুর্গে। থানি একজন মুক্তা ব্যসায়ী ছিলেন এবং পরিবার নিয়ে ফুওয়াইরিত এলাকায় বসবাস শুরু করতেন। ওই এলাকায় তার পুত্র শেখ মুহাম্মদ এবং পৌত্র শেখ জাসিম বড় হয়ে ওঠেন। আল থানি গোত্রের চারটি প্রধান স্বীকৃত শাখা রয়েছে – বুন কাসেম, বনু আহমেদ, বনু জাবের, এবং বনু থামের। প্রথম শাসক মোহম্মদ বিন থানিকে হাকিম বলা হত। এর পর থেকে কাতারের শাসকরা আমীর উপাধি ধারণ করেন।
কাতারের বর্তমান শাসক পরিবারের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম যিনি কাতার শাসন করেন তিনি হলেন শেখ মুহাম্মদ বিন থানি। ১৮৭৮ সালে শেখ মুহাম্মদ বিন থানির মৃত্যুর পর শেখ জাসেম বিন মুহাম্মদ নতুন শাসক হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহন করেন। তিনি মুক্তা ব্যবসায়ী ছিলেন। শেখ জাসেম রাস্ট্র পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দেন। শেখ জাসেম বিন মুহাম্মদকে আধুনিক কাতারের স্থপতি বলা হয়। দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে শাসক হিসাবে তিনি কাতারের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে কাতারি গোত্রগুলির মধ্যে সম্প্রীতির সৃষ্টি করে তিনি একটি একক ও স্বাধীন সার্বভৌম কাতার প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
শেখ জাসেমের মৃত্যুর পর শেখ আব্দুল্লাহ বিন জাসেম ক্ষমতায় আসেন। তিনি বৃটেনের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। শেখ আব্দুল্লাহ তাঁর ছেলে শেখ হামাদকে যুরবাজ হিসাবে মনোনীত করেন এবং কিছুদিন পর শেখ হামাদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহনের পর পরই শেখ হামাদের মৃত্যু হাওয়ায় শেখ আব্দুল্লাহ বিন কাসেম আবারও কাতার রাষ্ট্র্র পরিচালনায় ফিরে আসেন। এরপর তিনি অন্য সন্তান শেখ আলীকে যুরবাজ ও ক্ষমতার উত্তারধিকারী মনোনীত করেন। কিছুদিন পর অসুস্থতার কারণে শেখ আলির হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে অবসরে যান শেখ আব্দুল্লাহ। ১৯৫৬ সালে মৃত্যু হয় কাতারের এই কীর্তিমান শাসকের। শেখ আব্দুল্লাহ বিন কাসেমের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে কাতারের রাষ্ট্র সীমানা নির্ধারিত হয় এবং এছাড়া তাঁর শাসনামলে বৃটেনের সঙ্গে প্রতিরক্ষামূলক চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়।
কাতারের পঞ্চম শাসক ছিলেন শেখ আলি বিন আব্দুল্লাহ আল থানি। ১৯৬০ সালে স্বাস্থ্যগত কারনে ছেলে শেখ আহমদ বিন আলির হাতে ক্ষমতার দিয়ে তিনি সরে দাঁড়ান। শেখ আলি একজন শিক্ষানুরাগী ছিলেন। তিনি নিজের অর্থে দোহা শহরে “দারুল কুতুব আল-কাতারিয়া” নামে কাতারের প্রথম জাতীয় গ্রন্থাগার গড়ে তোলেন। ১১ বছর ধরে তিনি আমীরের দায়িত্ব পালন। দারুল কুতুব গ্রন্থাগারের ৫০ বছর পূর্তির বছর একটি নতুন জাতীয় গ্রন্থাগার নির্মাণের প্রজেক্ট হাতে নেয়া হয়। র্দীঘ পাঁচ বছর পর ২০১৭ সালে নতুন জাতীয় গ্রন্থাগার ভবনের উদ্বোধন করা হয় ।
শেখ আলি পর ১৯৬০ সালের ২৪ অক্টোবর ক্ষমতায় আসেন শেখ আহমদ বিন আলি। তাঁর সময় মজলিশে শুরা বা উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয় এবং ১৯৭০ সালের এপ্রিল কাতারের প্রথম অস্থায়ী সংবিধান রচিত হয়। এ সময় কাতারের যুবরাজ হিসাবে মনোনীত হন শেখ খালিফা বিন হামাদ। ১৯৭২ সালে কাতারের আমিরের দায়িত্বভার গ্রহন করেন শেখ খালিফা বিন হামাদ। ১৯৭৭ সালের ২৫ নভেম্বর লন্ডনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শেখ আহমদ বিন আলি। একই বছর শেখ খালিফার পুত্র স্যান্ডহার্স্ট শিক্ষিত হামাদ যুবরাজ এবং আমীরের উত্তরাধিকারী মনোনীত হন। ১৯৯৫ সালে তিনি কাতারের আমির হন।
শেখ হামাদের শাসনামলে কাতারের আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। গ্যাস উৎপাদন কাতারের ইতিহাসের শীর্ষে পৌছে। কাতার জনপ্রতি আয়ের হিসাবে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশে পরিনত হয়। জনপ্রিয় আল জাজিরা নিউজ মিডিয়া প্রতিষ্ঠা হল শেখ হামাদের একটি অন্যতম সাফল্য কীর্তি। এছাড়া তাঁর নেতৃত্বেই ২০১০ সালে কাতার ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের স্বাগতিক দেশ হিসাবে মনোনীত হয়। ২০১৩ সালে তিনি তাঁর চতুর্থ পুত্র বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে অবসরে যান। কাতারের শাসকদের একটি তালিকা নীচে দেয়া হলঃ
শেখ মোহাম্মদ বিন থানি (হাকিম) ১৮৫১-১৮৭৮
শেখ জাসিম বিন মোহাম্মদ আল থানি (১ম আমির) ১৮৭৮-১৯১৩
শেখ আব্দুল্লাহ বিন জাসিম আল থানি (১৯১৪-১৯৪৯)
শেখ আলি বিন আব্দুল্লাহ আল থানি (১৯৪৯-১৯৬০)
শেখ আহমদ বিন আলি আল থানি (১৯৬০-১৯৭২)
শেখ খালিফা বিন হামাদ আল থানি (১৯৭২-১৯৯৫)
শেখ হামাদ বিন খালিফা আল থানি (১৯৯৫-২০১৩)
শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি (২০১৩ – বর্তমান)
