রমজানের চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সিয়াম সাধনার দিন। দেশে দেশে মুসলিম সমাজ রমজানের উপবাসের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক শুদ্ধি এবং মহান আল্লাহ তায়ালা নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেন। তবে প্রবাসে যেসব দেশে মুসলিম সম্প্রদায় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতো রমাজানের চাঁদ দেখা না-দেখার বিষয়টি মুসলিমদের মধ্যে যে বিভাজন এনে দেয়, তা সত্যিই দুঃখজনক।
মধ্যপ্রাচের মুসলিম অধ্যুষিত দেশে এটা কোনো সমস্যা নয়। কারন রমজানের শুরু সরকারই নির্ধারণ করে দেন। ফলে বিতর্কের সুযোগ থাকেনা। কাতারের কথাই ধরা যাক। কাতারে, সৌদি আরবে চাঁদ দেখার খবর পাওয়া গেলেই রমজান শুরু করার ঘোষনা দেয়া হয়। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া সহ ইউরোপে সরকারী পর্যায়ে কোনো নির্দশনা না থাকায় কমিউনিটির ইমাম এবং স্থানীয় মসজিদ কমিটির সিদ্ধান্তের দিকে সবাই তাকিয়ে থাকেন। সারাবছর নিরবিচ্ছিন্ন দিন কাটালেও, ইমাম/মুফতিদের ভিন্নমত এবং আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারনে ওইসব দেশে বসবাসরত বিশাল মুসলিম সম্প্রদায় রমজান ও ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে অযাচিত বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে।
দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সুবাদে খুব কাছ থেকে এই বিভক্তি দেখার সুযোগ হয়েছে, যা কখনো মন থেকে মেনে নিতে পারিনি। সারা বছর ধর্ম নিয়ে কোনো রকম উদ্বেগ না থাকলেও রমজান আসলে ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে আড্ডায়, ইফতার মাহফিলে উঠে তর্কের ফোয়ারা। রমজান ও ঈদ আসে বৃহত্তর মুসলিম সমাজকে একীভ’ত করার জন্য। কিন্তু যখনই দেখি বিভেদ ও মতদ্বৈতের জালে জড়িয়ে পড়ছে সবাই, তখন এই বিভক্তির গ্লানি আমাকেও গ্রাস করে।
অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি চাঁদ দেখা নিয়ে মুসলিমরা তিন ধরনের মতবাদ নিয়ে দ্বিধা-বিভক্ত। যেমন: (১) কেবল চর্মচক্ষু দিয়ে চাঁদ দেখা; (২) জ্যোতির্বিদ্যা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে গণনার মাধ্যমে চাঁদের অবস্থান ও কখন চাঁদ দেখা যেতে পারে ইত্যাদি নির্ধারণ করা; (৩) বিশ্বের সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়কে একটি বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহ মনে করে যেকোনো মুসলিম দেশে প্রথম চাঁদ দেখে গেলে সেটাকে গ্রহন করা, যা গ্লোবাল সাইটং নামে পরিচিত।
এই তিনটি মতামতের উপর ভিত্তিতে করেই মুসলিমরা রমজান শুরু করে। অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি ধারী বহু উচ্চ শিক্ষিত ইমাম রয়েছেন। তাঁরা চাঁদ দেখা ও গননার বিষয় নিয়ে জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ লিখেছেন এবং তাদের যুক্তির স্বপক্ষে কোরআন-হাদিসের দলিল রয়েছে বলে দাবী করেছেন। প্রত্যেকেই নিজের পদ্ধতির ব্যাপারে নিশ্চিত। যদিও তারা অন্য ইমামের উল্লেখিত পদ্ধতি ভুল কি শুদ্ধ সে কথা কৌশলে এড়িয়ে চলেন। কিন্তু বিভক্তি থেকেই যায়। এমন পরিস্থিতিকে সামাল দেয়ার জন্য একবার মেলবোর্ন শহরে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান ইমামদের নিয়ে সন্মেলনের আয়োজন করা হয়। কিন্তু তাতেও কোনো সফলতা আসেনি। কারণ, কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজী নন।
এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের বংশোদ্ভ’ত মুসলিমদের একটি অংশ নিজ নিজ কমিউনিটির মসজিদের ইমামদের নির্দেশনা মেনেই রমযান শুরু করে থাকেন। যেমন পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশি মুসলিমরা দেশে কখন রমযান শুরু হচ্ছে সেটার খোঁজ নেন। অন্যদিকে আরব মুসলিমরা মধ্যপ্রাচ্যের খবর নিতে উদগ্রীব থাকেন। উপরের কোন ধারনাটা সঠিক তা নিয়ে আমি বিতর্কে যেতে চাইনা। তবে একজন সাধারন মুসলিম হিসাবে বিভিন্ন মুসলিমদের সাথে আলাপচারিতায় যা জেনেছি তা এখন তুলে ধরছি।
চর্মচক্ষু দিয়ে চাঁদ দেখার কথা যারা বলেন, তাদের মনে রাখা দরকার আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে চাঁদ দেখার সময়ও চর্মচক্ষু ব্যবহার করা হয়। তাহলে কেবল চর্মচক্ষু দিয়ে চাঁদ দেখার সাথে এর পার্থক্য কোথায়? বিশ্বের কিছু এলাকা আছে, যেখানে আবহাওয়াজনিত কারনে এক নাগাড়ে বেশ কিছুদিন চক্ষু দিয়ে চাঁদ দেখা সম্ভব নাও হতে পারে। আবার অন্য দিকে ধরুন আপনি একটি দ্বীপে আছেন, যেখানে কোনো আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা মুঠোফোনও নেই। তখন কেবল চর্মচক্ষু দিয়েই চাঁদ দেখতে হবে।
আরেকটি উদাহরন অনেকেই দিয়ে থাকেন তা হল, ইসলামের শুরু থেকে ঘড়ি আবিস্কারের আগ পর্যন্ত সূর্যের অবস্থান দেখে প্রাত্যহিক নামাজের সময় নির্দারণ করা হত। কিন্তু এখন আধুুনিক জোতির্বিদ্যা, ঘড়ি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে নামাজের সময়সূচী নির্ধারন করা হচ্ছে এবং ঘড়ির কাঁটা ধরে মসজিদে আযান দেয়া হচ্ছে। নামাযের ক্ষেত্রে লাঠির ছায়ার দৈর্ঘ্য মাপার কিংবা আকাশের লালিমার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয় না। তেমনি চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সাহায্য নিতে অসুবিধা কোথায়?
বর্তমান প্রযুক্তির সাহায্যে নতুন চাঁদের জন্মের সময় নিঁখুতভাবে নির্র্নয় করা যায়। তবে পৃথিবী থেকে চাঁদ দেখা মূলতঃ সূর্য-পৃথিবী-চাঁদের মধ্যবর্তী কোণ (elongation angle) কতটুকু তার উপর নির্ভর করে। যখন এই কোনের মান শূন্য ডিগ্রী তখন চাঁদের জন্ম হয়। চাঁদের এই অবস্থানকে বলা হয় Conjunction of moon or birth of new moon. ধীরে ধীরে কৌণিক দুরত্ব যখন বাড়তে থাকে তখন চাঁদ বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে। সরু কাস্তের মত আকার থেকে এই কোনের মাত্রা যখন ১৮০ ডিগ্রী হয় তখন গোল পূর্নিমার চাঁদ আমরা দেখতে পাই।
চাঁদ দেখা অন্য আরো বেশ কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যেমন একজন পর্যবেক্ষকের দৃষ্টির দিগন্তে চাঁদের অবস্থান (elongation angle), সূর্যাস্তের সময়, চাঁদের প্রস্থ, চন্দ্র পৃষ্ঠের উজ্জ্বলতা, তাপমাত্রা, বায়ুমন্ডলের চাপ, আর্দ্রতা, মেঘ, বায়ুমন্ডলের দূষণ মাত্রা, বাড়ি-ঘর, গাড়ী ও রাস্তা থেকে বিচ্ছ’রিত আলো, মানুষের দৃষ্টিশক্তির তারতম্য ইত্যাদি। নতুন চাঁদেও জন্ম হবার পর একটি নির্দিষ্ট সময় অবিতাহিত না হওয়া পর্যন্ত তা দেখা যায়না। জন্মের পর পরিণত বা পরিপক্ক হওয়ার জন্য কমপক্ষে ১৫ ঘণ্টার সময়ের (lag time) দরকার। তার মানে কেউ যদি চাঁদ জন্ম হবার পর কমপক্ষে ১৫ ঘন্টা অতিবাহিত হবার আগে চাঁদ দেখেছে বলে দাবী করে তাহলে বুঝতে হবে কোথাও কোনো সমস্যা আছে।
ধরুন ঢাকায় ঈদের চাঁদ দেখো গেছে বলে দাবী করা হল। ঢাকা থেকে আরো পশ্চিমে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ঢাকার চেয়ে পাচ ঘন্টা পর সূর্য ডোবে। তার মানে ঢাকার চেয়ে ইস্তান্বুলে চাঁদ দেখা যাবার সম্ভাবনা বেশী কারণ সূর্যাস্তের সময় ইস্তাম্বুলে চাঁদের বয়স ঢাকার চেয়ে বেশী ছিল। তেমনি ঢাকা থেকে যতই পশ্চিমে যাওয়া যাবে ততই চাঁদ দেখার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে। আকাশ পরিস্কার থাকার পরও ঢাকা থেকে আরো পশ্চিমের কোনো দেশে বা জায়গায় চাঁদ দেখার সংবাদ পাওয়া না গেলে সেটা সন্দেহজনক বলে ধরতে হবে। তাই বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে চাঁদ দেখা নিশ্চিত করতে হলেও অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয় বৈকি।
যারা ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিপক্ষে তারা বলছেন, নামাজ আর রমযান/ঈদের চাঁদ দেখাকে এক করে ফেলা ঠিক নয়। নামাযের সময় নির্ধারণ করার ব্যাপারে গণনা করার ঈঙ্গিত আছে। এক্ষেত্রে স্বচোখে দেখতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নামাজের সময় যে কোনোভাবে মাপা যাবে কারণ এখানে entrance of time এর কথা বলা হয়েছে। সুর্যের অবস্থানের উপর শর্তসাপেক্ষে নামায হয় কিন্তু রমযান কিংবা ঈদ শুরু করার ব্যাপারে চর্মচক্ষু দিয়ে দেখাকে মানদন্ড হিসাবে নিতে হবে। কারণ রোজার মাস শুরুর শর্ত হিসাবে বাঁকা চাঁদ (crescent moon) দেখার কথা বলা হয়েছে astronomical new moon নয়। চাঁদ দেখাটা মুসলিমদের উপর খোদার বাধ্যবাধকতা হিসাবে আরোপ করা হয়েছে, রাসুলের সময়কার মানুষ গননা জানতোনা বলে নয়। তাই মানুষ যদি গননা করতেও শেখে তবুও চোখে দেখার বিষয়টি রদ হবেনা। ফলে কেউ যদি গননার আশ্রয় নেয় সেটা হবে বিদা (modern innovation).
অন্যদিকে গণনার পক্ষে যাঁরা তাঁরা বলছেন, সুন্নাহ অক্ষরিক অর্থে পালন করলেই হবে না বরং প্রেক্ষাপট, স্থান-কাল-পাত্র বুঝে বাস্তবার নিরিখে এর প্রয়োগ করতে হবে। খালি চোখে চাঁদ দেখা যে একমাত্র মাধ্যম তা ধর্মে নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। তাদের যুক্তি হল, টেলিস্কোপের মত যন্ত্র আম জনতার কাছে থাকার নয়, তাই খালি চোখে চাঁদ দেখা সাধারণ মানুষের উপর টেলিস্কোপ জোগাড় করার জন্য অন্যাবশ্যক চাপ সৃষ্টি করেনা। এছাড়া ওই সময় মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যোগ্যতা সম্পন্ন জোর্তিবিজ্ঞানী কিংবা প্রযুক্তি ছিলনা যা দিয়ে চন্দ্রমাসের শুরু নির্ধারণ করা যেতো। খালি চোখে দেখাটাই মানুষের একমত্র অবলম্বন ছিল বলেই হাদিসে সে কথা বলা হয়েছে। এছাড়া জোর্তিবিদ্যার সাথে জ্যোতিষশাস্ত্রকে গুলিয়ে ফেলার কারণে অনেক ইসলামিক পন্ডিত গননাকে নিষিদ্ধ করেছেন বলে মনে করা হয়। দুই পক্ষেরই স্বপক্ষের যুক্তি আঁকড়ে থাকার বিষয়টি এখানে লক্ষ্যণীয় ।
বাংলাদেশে চাঁদ দেখা কমিটিই সাধারনত চাঁদ দেখার ঘোষনা দিয়ে থাকে। ইদানিং দেখছি চাঁদপুর সহ দেশের কিছু মানুষ এটা না মেনে সৌদি আরবকে অনুসরন করে রমযান ও ঈদ পালন করছে। এদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বলেই মনে হচ্ছে। সরকারী নির্দেশনা উপেক্ষা করে একই দেশের মুসলিম সমাজের মধ্যে এই বিভক্তি গ্রহনযোগ্য নয়। দেশের সব মুসলিমকে একতাবদ্ধ করার জন্য কর্তৃপক্ষকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। না হলে আগামীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
মুনসাইটিং ডট কমের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের ১১২টি দেশের মধ্যে ৪৪টি দেশের মুসলিমরা রোজা ও ঈদ করার ক্ষেত্রে সৌদি আরবকে অনুসরণ করে, ৩৫টি দেশের মুসলিমরা স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে, ১৮টি দেশের মুসলিমরা নিজস্ব পদ্ধতি অনুসরণ করে, ১৫টি দেশ তুরস্কের গণনাভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৪০ শতাংশ দেশ সৌদি আরবকে অনুসরণ করছে যার মধ্যে রয়েছে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার, মধ্য এশিয়ার বেশ কিছুু দেশ। অন্যদিকে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া সহ পাক ভারত উপমহাদেশের দেশগুলো স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখাকে অনুসরণ করে।
সৌদি আরবের চাঁদ দেখার ঘোষণা মুসলিম বিশ্বকে প্রভাবিত করে। চাঁদ দেখা নিয়ে সৌদি আরবের খামখেয়ালপিনা মুসলিম বিশ্বে অনশ্চিয়তার সৃষ্টি করছে। অনেক সময় সৌদি আরবে যখন চাঁদ দেখার দাবী করা হয় তখন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়।। যেসব দেশে সৌদি আরব থেকে ১৮/১০ ঘন্টা পর সুর্যাস্ত হচ্ছে সেখান থেকে চাঁদ দেখার খবর না আসাতে তখন সন্দেহ আরো ঘণিভূত হয়। সৌদি আরবে রয়েছে মুফতি ও জোর্ত্যিিবদদের সমন্বয়ে গঠিত ছয়টি সরকারী চাঁদ দেখা কমিটি। কিন্তু অনেক সময়সৌদি জাষ্টিস ডিপার্টমেন্ট, এই সব কমিটির মতামতকে অগ্রাহ্য করে কোনো একজন মুসলিমের সাক্ষ্য গ্রহন করে চাঁদ দেখা গিয়েছে বলে ঘোষনা দিয়ে দেয়।
শুধু মুসলিম নয় হিন্দু, ইহুদি, চাইনিজরাও চন্দ্র ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে জোর্তিবিজ্ঞান সংস্থা, নৌচলাচল সংস্থা ও আবহাওয়া বিভাগ চাঁদের গতিবিধি এবং অবস্থান নিরিক্ষণ করে চন্দ্র মাসের শুরু নির্ধারণ করে। সৌদি আরবে সরকারীভাবে চন্দ্রমাসভিত্তিক আরবী ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হয়। তবে সৌদিরা আসলেই কোন পদ্ধতি ব্যবহার করে তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। দেখা যায়, সৌদি চন্দ্র মাস বিশ্বের অন্য যেকোনা দেশের চেয়ে আগে শুরু হয়। বর্তমান যুগে বছরের শুরুতেই প্রতিটি মাসের নির্ধারণ করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় ক্যালেন্ডারের সাথে কর্মচারীদের বেতন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারী ও বেসরকারী কার্যক্রম থেকে শুরু করে অসংখ্য কার্র্যক্রম জড়িত। প্রতিটি মাসে চাঁদ দেখে মাসের শুর করাটা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। সৌদি আরব বিষয়টি কিভাবে সামলাচ্ছে জানি না।
জ্যোতির্বিদদের মতে খালি চোখে চাঁদ দেখে মাসের হিসাব কষলে চাঁদের ঘূর্ণনের গতিবেগ, পৃথিবী ও সূর্য্যরে সাথে চাঁদের আপেক্ষিক দুরত্বের কারনে কোনো মাস ২৮ দিনেও শেষ হতে পারে। অথচ চন্দ্র মাস কখনো ২৮ কিংবা ৩১ দিনে শেষ হতে পারেনা। মক্কাকে মেরিডিয়ান হিসাবে ধরে মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি ক্যালেন্ডার তৈরী করার প্রস্তাব আসলেও সৌদি সরকারের সহযোগীতার অভাবে তা সম্ভবপর হয়নি।
কাতারে এসে রমজানের শুরু এবং ঈদ পালন করে বেশ স্বত্বি পাচ্ছি যা অস্ট্রেলিয়ায় কখনো পাইনি। অনেক সময় অস্ট্রেলিয়ায়, রমজান একসাথে শুরু করলেও ঈদ নিয়ে মতের ভিন্নতা থেকেই যায়। ফলে মাত্র হাতে গোনা কয়েকবার সব মতালম্বীদের একই দিনে ঈদ পালন করতে দেখেছি। অনেক সময় ঈদের দিন বন্ধুর বাসার বেড়াতে গিয়ে দেখি তারা সেদিন রোজা রেখেছে, ঈদ করবে পরের দিন।
একবার দেখি আমার মেয়ের মুখ গোমড়া। কারণ, তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু ঈদ করবে অন্যদিন। এমনকি একই পরিবারের সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন দিনে রোজা শুরু করতে দেখেছি। ফলে পুরো কমিউনিটির মধ্যে ঈদের আনন্দে ভাটা পড়ে যায়। শেষ রোজাকে কেনো জানিনা মাসের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘতম মনে হয়। এমনও হয়েছে, একজন রোজা শুরু করেছিলেন চাঁদ দেখা দলের সাথে। সেই হিসাবে তার ত্রিশ রোজা হবার কথা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অন্য দলের সাথে যোগ দিয়ে ঈদ করে ফেললেন।
ভিন্ন ভিন্ন দিনে রমযান শুরু এবং ঈদ উদযাপনের জন্য মুসলিম সংখ্যালঘু দেশের মুসলিম সমাজ বহু রকমের সমস্যার সন্মুখীন হচ্ছে। ঈদের ছুুটি নিতে গেলেই বাধে গোল। দেখা গেলো আমি যেদিন ছুটির নিতে চাইলাম আমার সাথে কর্মরত অন্য একজন মুসলিম ছুটি চাইছেন পরের দিন। এভাবে মুসলিম এবং ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। ধরা যাক, পশ্চিমা কোনো দেশ সিদ্ধান্ত নিল মুসলিমদের জন্য ঈদ উপলক্ষ্যে একদিন সরকারী ছুুটি দেয়া হবে। মুসলিম ইমামদের সাথে আলোচনা করে কোনদিন ছুটি দেয়া যেতে পারে সেই সিদ্ধান্ত কি কর্তৃপক্ষ কখনো নিতে পারবে?
আমরা যতই লেখালেখি করি না কেনো এই বিষয়ে আলেম-ওলামারা ঐক্যমতে না আসলে কোনো সুরাহা হবেনা। চাঁদ দেখা না-দেখা, গননা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও সৌদিকে অনুসরণ করা ইত্যাদি সেটা যা-ই হোকনা কেন, তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ, ওলমারাই সিদ্ধান্ত নেবেন কোনটা গ্রহন করা উচিত। মুসলিম সম্প্রদায় ইমামদের দিকনির্দেশনা নিয়েই চলে। তাই সমাধান তাঁদের কাছ থেকেই আসতে হবে।
বিশ্বের প্রবাসী মুসলিমদের একটি বিরাট অংশ প্রতিবছর চাঁদ দেখা না-দেখা নিয়ে সমস্যার সন্মুখীন হচ্ছেন। একজন সাধারণ মুসলিম হিসাবে আমার চাওয়া হল, যে দেশেরই বংশোদ্ভ’ত মুসলিম হোক না কেন, কমিউনিটির সবাই মিলে ও একাত্ম হয়ে পবিত্র রমযান ও ঈদ পালন করুক। আমাদের ছেলেমেয়েরা তাদের বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে একই দিন, একই সাথে ঈদের আনন্দ উপভোগ করুক।
১৮ মে, ২০১৭
