জীবনের পড়ন্ত বেলায় সিডনীর দুই দশকের সাজানো সংসার, স্থিতিশীল সরকারী চাকুরী পেছনে ফেলে হঠাৎ করে কাতারে পাড়ি জমালাম কেনো? অনেকের কাছে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাকে বার বার। সিডনীর অফিসে আমার পেশা জীবনের বাকী দিনগুলো সহজেই কাটিয়ে দিতে পারতাম। পঞ্চাশোর্ধ বয়সে সরকারী চাকুরী এবং সুপারঅ্যানুয়েশনের নিরাপত্তা বলয় ছেড়ে এতবড় ঝুঁকি নিয়ে আমার মধ্যপ্রাচ্যে চলে যাওয়াটা অনেকের কাছে রহস্যজনকও মনে হয়েছে। অর্থ উপার্জনের জন্যই যদি মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া, তাহরে আরও আগে গেলামনা কেনো? অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানিতে রি-স্ট্রাকচারিং হচ্ছে ডাল-ভাতের মতো ব্যাপার। কেউ আজ চাকুরী হারাচ্ছেন আবার পরদিনই দেখা যাচ্ছে অন্য জায়গায় কাজ শুরু করছেন। তাই স্বভাবতই অনেকের ধারনা, চাকুরী চলে যাবার কারণেই হয়তো আমার এমন করে চলে যাওয়া। একজন পেশাদার প্রকৌশলী হিসাবে আমি নিউ সাউথ ওয়েল্সের কান্ট্রি এলাকার বিভিন্ন শহরে কাজ করেছি। তবে অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে যাবো, এ কথা ভাবিনি কখনো। সিডনী শহরের ল্যাকেম্বা সহ বেশ কিছু এলাকায় আরব-অস্ট্রেলিয়ানদের আচরণ দেখার পর মনে হয়েছে আর যেখানেই যাই না কেনো, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো আরব দেশে কখনো নয়। কিন্তু কথায় বলে না, “Man proposes, god disposes..”
নব্বই দশকের প্রথম সালের কথা। সিডনীতে দু’দিনের একটি ট্রেনিং করছি। ক্লাসের পেছন সারিতে বসা একজন লেবানীজ তরুণ মোবাইল ফোন নিয়ে উচ্চস্বরে অবিরাম কথা বলে যাচ্ছিল যা আমাদের সবাইকে বিরক্ত করছিল। সামনের সারিতে বসা একজন ভদ্রমহিলা খুবই বিনয়ের সাথে তাকে স্বরটা নিচু করতে বললেন। ওমনি সাথে সাথেই ওই ছেলেটা ক্ষিপ্ত হয়ে খিস্তি খাউর আওড়িয়ে তেড়ে এল ওই মহিলার দিকে এবং গায়ে হাত দিতে উদ্যত হল। ঘটনার আকস্মিকতায় ট্রেইনার সহ আমরা সবাই এমনভাবে হকচকিয়ে গেলাম যে, সিকিউরিটিকে ডাকার কথাও সবাই ভুলে গেলো। সামান্য একটি ব্যাপার নিয়ে এমন কেউ করতে পারে তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল সবার। এছাড়া আমার এক বন্ধু ল্যাকেম্বার রাস্তায় একজন লেবানীজের গাড়ী ওভারটেক করায় তাকে সারা শহর তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল ওই লোবনীজ। এ ধরনের হরেক রকমের ঘটনা অনেকেরই জানা আছে। তবে এখন শুনছি, বদলে গেছে ল্যাকেম্বার ডেমোগ্রাফি। আরবদের সরিয়ে ল্যাকেম্বায় এখন চলছে বাংলাদেশিদের আধিপত্য। শুনে খুব ভালো লেগেছে। ভাল মন্দ মিশিয়েই মানুষ। তাই বলে পুরো লেবানীজ সম্প্রদায়কে আমি মন্দ বলছিনা। লেবানীজদের সাথে অনেকের ভালো অভিজ্ঞতাও রয়েছে। তবে বেশ কিছু বাজে ঘটনা দেখে, মধ্যপ্রাচের আরবদের প্রতি নিজের অজান্তেই একটা বিরূপ ধারনা জন্মে গিয়েছিল।
আশি দশকের শেষের দিকে আমি সিডনী শহরের পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের Wastewater Services গ্রুপে কাজ শুরু করি। তখন আমার অফিস ছিল সার্কুলার কি’র ষ্টেট অফিস ব্লকে। আমার বস ছিলেন ইটালি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান, গাই বনকার্ডো। খুব সজ্জন মানুষ। সিডনীর রিভারস্টোনে বাড়ী। আমার বড় মেয়ের সমবয়সী মেয়ে ছিল তার। ফলে পরবর্তীতে বসের সাথে আমার একটা পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমি সিডনী ছাড়ার আগ পর্যন্ত গাই বনকার্ডোর সাথেই ছিলাম একই গ্রুপে। ওই একই সময় আমার অনেক সমসাময়িক ও জুনিয়ার প্রকৌশলী বন্ধু সিডনী ওয়াটার সহ অন্যান্য কোম্পানিতে কাজ শুরু করে। কিন্তু আমার অফিসে কোনো বাংলাদেশিকে সহকর্মী হিসাবে কখনো পাইনি।
সিডনীতে সঙ্গীত পরিবেশনা, রেডিও পরিচালনা, এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে এমন করে জড়িয়ে পড়েছিলাম যে নিজের চাকরী এবং পেশাগত উৎকর্ষতা অর্জনের দিকে নজর দেয়া আমার হয়ে ওঠেনি। এক সময় মনে হল, বিধাতার দেয়া মেধার প্রতি আমি সুবিচার করছিনা। তাছাড়া আমার চাকরীতে দু’একজন অবসরে না যাওয়া পর্যন্ত দেখলাম আমার উপরে উঠার সিঁড়ি বলতে গেলে বন্ধ। তখনই দীর্ঘদিন পর, চাকরীর খোঁজে সিডনী ছাড়া অন্যান্য প্রধান শহর যেমন ব্রিসবেন ও মেলবোর্নের পাবলিক এবং প্রাইভেট সেক্টরেও সিভি পাঠানো শুরু করলাম। এর মধ্যে Maunsell Consulting (এখনকার AECOM) কোম্পানি থেকে দুবাই শহরের একটি মেগা-প্রজেক্টে চাকরীর অফার পেলাম।
এর মাত্র কিছুদিন আগে ইঞ্জিনিয়ার্স অস্ট্রেলিয়ার সাময়িকীতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান মেগা-প্রজেক্ট নিয়ে করা প্রচ্ছদ কাহিনী আমার চোখে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যে তখন নির্মাণ শিল্পে রীতিমত বিপ্লব চলছে। আরব উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিশাল নির্মাণ প্রজেক্টে কাজ করার জন্য বিশ্বের সেরা ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কন্সট্রাকশন কোস্পানীগুলো যেনো হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আমার পরিচিত বেশ কিছু অস্ট্রেলিয়ান সহকর্মী ইতিমধ্যে ছুটে গেছেন মধ্যপ্রাচ্যে। প্রচ্ছদ কাহিনীতে উল্লেখ করা হয়, নির্মাণকার্যের জন্য ব্যবহৃত বিশ্বের ভারী ক্রেইনের প্রায় ৭০ শতাংশই তখন মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয়। অস্ট্রেলিয়ান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের প্রতিবেদনটি আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। একজন পুর-প্রকৌশলী হয়ে এই ধরনের পরিকাঠামো বিষয়ক মেগা-প্রজেক্টে সম্পৃক্ত হবার দুর্নিবার আকর্ষণ, আমাকে মধ্যপ্রাচ্যের ধূসর প্রান্তরে নিয়ে যাবার উদ্দীপনা যোগাতে থাকে।
অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে ফের প্রবাস যাত্রা আমার জন্য খুব একটা সহজ ছিলনা। হাসি-কান্না ভরা জীবনের প্রায় কুড়িটি বছর কাটিয়ে দিয়েছি সিডনী শহরে। তাই ওই শহরের মাটি, আলো-বাতাস আর মানুষের জন্য এক ধরনের ভালোবাসা জন্মে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, এই অস্ট্রেলিয়াই হল আমার স্থায়ী আবাস; এই দেশ ছেড়ে যাবো কোথায়? অথচ মাতৃভূমি যে কখনো প্রবাসের সমতুল্য হতে পারেনা সে কথা আবেগের আবহে ক্ষণিকের জন্য হলেও বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলাম। মাতৃভূমির শেকড় ছিঁড়ে একবার যখন প্রবাস পাড়ি দিতে পেরেছি তখন অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে অন্য প্রবাসভূমিতে যেতে সঙ্কোচ কিংবা দ্বিধা হবে কেনো?
এ ধরনের আবোল-তাবোল ভাবনায় যখন আবিষ্ট হয়ে দিন কাটছিল তখনই দেখি চিঠির বাক্সে Maunsell Consulting থেকে চাকরীর অফার লেটার এবং রিটার্ন টিকেট এসে হাজির। দু’সপ্তাহের মধ্যে কোম্পানির দুবাই হেড অফিসে যোগ দিতে হবে। রীতিমত ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। ভাবলাম, মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে পরিস্থিতি সরজমিনে যাচাই করে না দেখে চাকরী ছেড়ে দেয়াটা ঠিক হবেনা। হিসাব কষে দেখলাম, আমার প্রায় আট মাসের লংসার্ভিস ছুটি জমা হয়ে আছে। বসের সাথে কথা বললাম। দীর্ঘদিনের জন্য ছুটি নেবো শুনে তিনি একটু অবাক হলেন। আমি বললাম,”বহুদিন একটানা কাজ করেছি, এবার একান্ত নিজের জন্য কিছু করার জন্য আমার একটা বিরতির প্রয়োজন।” উনি একটু ভেবে বললেন, “ঠিক আছে, এই যদি হয় তোমার সিদ্ধান্ত, তাহলে যাও।”
এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন অফিস থেকে আবার ইমেইল আসলো, এই মুহূর্তে দুবাই নয়, ওদের কাতার অফিসে আমাকে খুব দরকার। কাতারে কিছুদিন কাজ করার পর আমাকে হেড অফিসে আবার ফিরে যেতে হবে। সত্যি বলতে কি, মধ্যপ্রাচ্য বলতে আমি মূলতঃ দুবাইকেই বুঝতাম। কাতারের মতো দেশেও যে বড় বড় প্রজেক্ট হচ্ছে সে কথা আমার কখনোই জানা ছিলনা। এভাবে অনেকটা অনির্ধারিত ভাবেই আমার কাতারে আগমন। নতুন চাকরীর শুরুতে বহু অনিশ্চয়তা এবং চ্যালেঞ্জ সামলে নিয়ে ঠিক আট মাসের মাথায় পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দিলাম সিডনী অফিসে। এভাবে আট মাসের ছুটিতে এসে গত বছরের জুনে কাতারের মরুর বুকে কিভাবে আটটি বছর কেটে গেলো তা বলতে পারবোনা।
