পেশাগত কারণে দীর্ঘ সময় অস্ট্রেলিয়ার বাইরে ছিলাম, তাই বৃহত্তর চট্টগ্রাম সমিতির আয়োজিত বেশ কয়েকটি মেজবানে উপস্থিত থাকতে পারিনি। সেই সময়ের অনেক আনন্দঘন মুহূর্ত চোখের আড়ালেই থেকে গেছে। সিডনিতে ফিরলাম ঠিক কোভিডের শুরুর দিকেই—সবকিছু তখন স্তব্ধ, মানুষ বিচ্ছিন্ন।

 

এরপর সময়ের স্রোতে জীবন আবার ছন্দে ফিরতে শুরু করল। ঠিক সেই সময়েই খবর এলো চট্টগ্রাম উৎসব ২০২৫-এর প্রস্তুতি সভা হচ্ছে, আর সেখানে আমারও ডাক পড়েছে। পুরনো স্মৃতি, চেনা মুখ, আর প্রিয় মেজবানের সুবাস যেন আবার ফিরিয়ে আনল সেই প্রথম দিনের আবেগ।

 

বাংলা টাউন ল্যাকেম্বার ড্রিম কি রিয়েলটির অফিসে বসেছে প্রস্তুতি সভা। দিনে যেখানে চলে বাড়ি-ঘর কেনাবেচার হিসাব, সন্ধ্যা নামতেই সেই অফিস রূপ নেয় এক টুকরো চট্টগ্রামে। হাসি, গল্প, পরিকল্পনার ভিড়ে জমে ওঠে চাটগাঁইয়্যাদের প্রাণের আড্ডা। কেউ চা হাতে স্বপ্ন আঁকে উৎসবের, কেউ স্মৃতির অ্যালবাম খুলে ফেলে—সব মিলিয়ে ড্রিম কি অফিস হয়ে ওঠে সত্যিকারের ‘ড্রিম কর্নার, যেখানে চট্টগ্রাম বেঁচে থাকে হৃদয়ের ঠিক মাঝখানে।

ওখানে বসে মুহূর্তের জন্য সময়টা যেন উল্টোদিকে বয়ে গেল। মন ছুটে গেল নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ের সেই দিনগুলোয় যখন প্রথমবার মেজবানীর ধোঁয়া উঠেছিল সিডনীর আকাশে। খুবই ভাগ্যবান আমি, সিডনীর বুকে গুটিকয়েক উৎসাহী উদ্যোক্তার হাত ধরে যখন মেজবানীর পথ চলা শুরু হয়েছিল, আমিও ছিলাম সেই প্রথম সারির সঙ্গীদের একজন। তখন ছিল না এত আয়োজন, ছিল শুধু টান, চট্টগ্রামের টান, মানুষে মানুষে মমতার টান। আজ এত বছর পরও সেই দিনের আবেগ ঠিক ততটাই তরতাজা, যেন সময় থমকে দাঁড়িয়ে আছে সেই প্রথম মিলনের মুহূর্তে।

অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসী হয়ে সিডনী শহরে আমার পা রাখা ১৯৮৮ সালে। তখন শহরে বাংলাদেশিদের সংখ্যা গোনা যেত হাতে। চট্টগ্রামের কাউকে খুঁজে পাওয়া ছিল যেন মরুভূমিতে মরুদ্যান দেখা। ধীরে ধীরে দেখা মিলল কিছু চেনা মুখ, কয়েকজন চাটগাঁইয়া ভাই-বান্ধব। একবার পরিচয় হলেই যেন আপন হয়ে যেত সবাই। কথায় কথায় ভেসে আসত চাটগাইয়া আঞ্চলিক ভাষার সুর, যেটা নিয়ে অনেকেই আমাদের খুনসুটি করত, কিন্তু আসলে সেটাই তো আমাদের টান, কর্ণফুলীর জলের মতো গভীর মায়ার টান।

 

সিডনীর প্রথম মেজবান হয়েছিল ১৯৯৪ সালে, শান্ত আর মনোরম এক দুপুরে, ডলস্ পয়েন্টের সবুজে ঘেরা প্রান্তে। কোনো বিলাসী আয়োজন ছিল না, ছিল কেবল ঘরের মানুষদের উচ্ছ্বাস, হাসি, আর নিজের সংস্কৃতিকে কাছে রাখার এক আন্তরিক চেষ্টার আনন্দ। ডজনখানেক পরিবার আর কিছু তরুণ মিলে সেদিনের সেই মেজবান হয়ে উঠেছিল এক নিখাদ আনন্দঘন দিন।

 

যাঁরা সেই প্রথম আয়োজনের প্রাণ ছিলেন – হারুন-উর-রশীদ, সৈয়দ শাহ আলম, কামালুদ্দিন, রুহুল আহমদ, জসীম উদ্দিন, আনোয়ার, সবুর, সিকান্দার, টিপু এবং আরও অনেকে। তাঁদের সবার অবদানই ছিল অমূল্য। আজ তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তের পথে, যেমন হারুন ভাই, সবুর ভাই, আর জসীম ভাই। আবার কেউ কেউ স্থায়ীভাবে ফিরে গেছেন দেশে।

 

হারুন ভাইয়ের কথা এখনো খুব মনে পড়ে। সারি হিলসের তাঁর বাসায় যাওয়া মানেই ছিল আতিথেয়তার উৎসব, বহু পদের রান্না, হাসিমুখে পরিবেশন, আর একধরনের নিখাঁদ আন্তরিকতা যা আজও মনে গেঁথে আছে।

 

যাঁরা আমাদের মাঝে নেই, আল্লাহ তাঁদের জান্নাত নসীব করুন। আর যাঁদের নাম অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়ে গেছে, তাঁদের কাছে আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। বহু বছরের স্মৃতি একসাথে সাজাতে গিয়ে কিছু নাম হয়তো মনের চোখ ফসকে গেছে।

 

সেই ১৯৯৪ সালের ছোট্ট আয়োজনটাই ধীরে ধীরে পরিণত হয় সিডনীর অন্যতম জনপ্রিয় প্রবাসী উৎসবে। যার নাম মেজবান, আর যার প্রাণ চট্টগ্রামের মানুষ। কখনো এক বছর, কখনো দুই বছর পরপর মেজবান অনুষ্ঠিত হতে থাকে, আর প্রতিবারই বেড়েছে মানুষের ভালোবাসা, অংশগ্রহণ, আর চট্টগ্রামের গর্ব।

 

২০১৮ সালের মেজবান সেই ধারাবাহিকতার এক রেকর্ড সৃষ্টি করে। প্রায় তিন থেকে চার হাজার মানুষের মিলনমেলা! আর পরের বছর, ২০১৯-এ আয়োজনকে আরও ঐতিহ্যবাহী করতে চট্টগ্রাম থেকে বিশেষভাবে আনা হয় বিখ্যাত বাবুর্চি হাজী আবুল হোসেনকে, যার হাতের রান্না চট্টগ্রামের গন্ধ আর স্বাদ এনে দিয়েছিল সিডনীর বাতাসে।

 

আশার কথা হল, এখন মেজবান ও বৃহত্তর চট্টগ্রাম সমিতির হাল ধরেছে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের উদ্যমী ও মেধাবী তরুণরা। তাদের হাত ধরে ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সময়ের ছোঁয়া। মেজবানের মিটিং থেকে শুরু করে টিকিটিং—সবকিছুই তারা ডিজিটালভাবে সাজিয়ে তুলেছে। ফলে পুরো আয়োজন এখন আরও সংগঠিত, আধুনিক, আর অংশগ্রহণে সহজ।

 

তাদের এই উদ্যোগ শুধু আয়োজনকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়নি, বরং দেখিয়ে দিয়েছে, চট্টগ্রামের ঐতিহ্য এখন আগের মতোই জীবন্ত, শুধু রূপ বদলে আরও প্রাণবন্ত হয়েছে।

 

আগামী ৯ নভেম্বর, সিডনির ফেয়ারফিল্ড শো গ্রাউন্ডে বসছে সিডনী বৃহত্তর চট্টগ্রাম সমিতির প্রাণের আয়োজন, চট্টগ্রাম উৎসব। এইবারের উৎসবের এক বিশেষ আকর্ষণ—চট্টগ্রামের মেজবান রান্নার সেলিব্রিটি বাবুর্চি হাজী আবুল হোসেন। যিনি এখন পর্যন্ত সহস্রাধিক মেজবানী রান্না করেছেন, যা এক অনন্য ইতিহাস! আয়োজকদের আন্তরিক আমন্ত্রণে তিনি আবার পাড়ি দিচ্ছেন প্রশান্ত মহাসাগরের ওপার থেকে, ঠিক চট্টগ্রামের রঙ, ঘ্রাণ, আর স্বাদের বার্তা নিয়ে।

 

খোদ শো গ্রাউন্ডের কিচেনেই হবে আসল মেজ্জানী রান্না। সেই ঐতিহ্যবাহী মেজ্জানী চাল, ঝরঝরে মাংস, আর মসলার মায়া। আবুল বার্চীর হাতের জাদুতে সেই খাবারের স্বাদ হবে অমৃত, আর তার সুবাসে যেন কিছুক্ষণের জন্য সিডনি হয়ে উঠবে চট্টগ্রাম।

 

এবারের আয়োজনের সাংস্কৃতিক পর্বের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ—বাংলা সঙ্গীত জগতের কিংবদন্তি শিল্পী, চট্টগ্রামের গর্ব নকীব খান। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি উপহার দিয়েছেন অগণিত কালজয়ী ও সুপারহিট গান, যা আজও স্রোতোদের হৃদয়ে একই রকম অনুরণন তোলে। এবারের চট্টগ্রাম উৎসব-এর মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি হবে স্মরণীয় এক মুহূর্ত, যেখানে নষ্টালজিয়া আর সুরের জাদু মিলেমিশে যাবে একাকার।

 

সিডনীর চট্টগ্রাম উৎসব শুধুমাত্র একটি উৎসব নয় – এটা এক সেতুবন্ধন। চট্টগ্রামের স্মৃতি, মাটির গন্ধ, আর প্রবাসজীবনের মাঝেও না ভোলা এক আবেগের নাম। মেজবান আসলে শুধু খাবারের আয়োজন নয়; এটি চট্টগ্রামের মানুষের গর্ব, শিকড়, আর আত্মপরিচয়ের প্রতিচ্ছবি।

 

একদিন আমরা হয়তো থাকব না, কিন্তু বিশ্বাস আছে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই ঐতিহ্যকে আগলে রাখবে। তাদের হাত ধরে চট্টগ্রামের মেজবান উৎসব আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে সিডনীর আকাশে, আর সেই সুবাস ছড়িয়ে দেবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, হৃদয় থেকে হৃদয়ে।

৩১/১০/২০২৫