আমি চেয়েছিলাম ফিরে পেতে আমার বাবার ভিটেমাটি
এক টুকরো জমি, মাথা গুজে থাকবার একরত্তি বসতবাটি
কিংবা জলপাইয়ের জীর্ণ বাগান।
পাঁচ যুগ কেটে গেলো, ঘরে ফেরা হল না আমার।
উদ্বাস্তু শিবিরের ধূসর কামরায় পড়ে আছি,
বেওয়ারিশ লাশ যেমন পড়ে থাকে উপেক্ষায় অন্ধকার গলিতে।
রোগে জর্জরিত মা যখন মৃতপ্রায়, অপারেশন থিয়েটারে
গুণছে প্রহর – এক বোতল সেলাইনের অপেক্ষায়;
বাবাকে দেখেছি হাসপাতালের দেয়াল টপকে
ছুটে যেতে কার্ফ্যুর কালো অন্ধকারে
শহীদ সহযোদ্ধার লাশ কুঁড়োতে, এক মহল্লা থেকে – অন্য মহল্লায়।
মক্তবের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারিনি বেশী দূর
শৈশবে কলম ছুড়ে ফেলে দিয়ে
তুলে নিয়েছি টুকরো পাথর।
তারপর শুধু যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা
হানাদার বাহিনী, ট্যাংক, আর কামানের সাথে
টুকরো পাথরের খেলা, মরণ – খেলা।
বুলেট মুখে নিয়েই যেন জন্ম আমার।
বুলডোজারের বিকট শব্দ ছিল আমার ঘুমপাড়ানী গান।
হয়তো তাই কখনো কাউকে
ভালোবেসে বলতে পারিনি ‘ভালোবাসি’।
আমাকে খুঁজছ ?
আমাকে খুঁজে পেতে খুব একটা কষ্ট হবে না তোমার।
আমাকে খুঁজে পাবে রামাল্লার অলিÑগলিতে, টুকরো পাথর হাতে
ছুটে-যাওয়া কোনো নাবালক কিশোরের মাঝে;
আমাকে খুঁজে পাবে আগ্রাসী কোন ট্যাংকের সমুখে
নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিদ্রোহী জনতার ভীড়ে কিংবা
বাংকার-বাস্টার বোমার আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া কোন
গেরিলা ক্যাম্পের ধ্বংসপের স্তূপের পাশে অথবা
গণ-কবরে শুয়ে থাকা লাখো শহীদের ভীড়ে।
ইদানীং আমার বসতবাড়ী
ফিরিয়ে দেবার কথা অনেকেই বলছেন;
জর্জ ডব্লিউ বুশ, টনি ব্লেয়ার থেকে শুরু করে আরো অনেকেই।
আমাকে নিয়ে অনেকেই লিখেছেন কবিতা
লিখেছেন তুখোড় কবি খলিল জীব্রান। কিন্তু সেই কবিতা
ফিরিয়ে দিতে পারেনি আমার
পূর্বসূরীর ভিটেমাটি আর খর্জুরের বাগান।
আরো লিখেছেন নির্মলেন্দু গুণ। তাঁর কবিতা
আমার ঘরে ফেরার দিন সহযাত্রী হতে চেয়েছিলো।
কিন্তুু আমার যে ঘরে ফেরা হয়নি।
শুনেছি ১৯৭১-এ বাংলা মুলুকে মার্চের সবুজ উদ্যানে
একখানা কবিতা শুনিয়েছিলো সংগ্রামী মুজিবর।
ত্রিশ লক্ষ রক্তের অক্ষর দিয়ে লিখা হয়েছিলো সেই কবিতা।
আর সেই কবিতার শরীর বেয়ে অবশেষে ঘরে ফিরেছিল
ভিটেহারা বাঙালী জাতি।
সেই থেকে আমি প্রতিক্ষায় আছি
কখন আসবে এমন একজন কবি।
শোনাবে একটি কবিতা ।
পরাস্ত হবে হায়নার দল;
আর মুক্ত হবে প্যালেষ্টাইন।
Leave a comment
