কনকনে শীতের বিকেল। সিডনি শহরের পশ্চিমের উপশহর ‘কোয়েকার্স হিল’-এর আকাশে সূর্য ডুবি ডুবি করছে। গোধূলির রক্তিম আলো ছড়িয়ে পড়েছে ঘাসের ডগায়, গাছের পাতায়, বাড়ির জানালার কাঁচে। আমার বাড়িতে কাছের মানুষদের আনাগোনা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। চলছে অন্য এক আয়োজন।
দোতলায় যাওয়ার সিঁড়ির মুখে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে আমার লটবহর। দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমিরাত উড়োজাহাজের ৪১৩ নম্বর ফ্লাইটে চড়ে পাড়ি দিতে হবে মরুর দেশ সুদূর কাতারে।
রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে হাঁড়ি-পাতিলের মৃদু শব্দ। গিন্নি আমার পছন্দের বেশ কিছু পদের রান্নায় মমতার শেষ পরশ বুলিয়ে দিচ্ছেন। ভালোবাসা কখনো কখনো শব্দে প্রকাশ পায় না; প্রকাশ পায় এক থালা গরম ভাতে, এক বাটি ডালে, কিংবা বিদায়ের আগে যত্ন করে সাজিয়ে দেওয়া প্রিয় খাবারে। আমার বড় মেয়ের মুখে তখন গোধূলির বিমর্ষ ছায়া। সে কিছু বলছিল না। কিন্তু তার চোখের কোণে জমে থাকা অপ্রকাশিত কথাগুলো আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম।
দিনটি ছিল ২৯ জুলাই ২০০৮, মঙ্গলবার।
ফ্যামিলি রুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিলাম বাড়ির পেছনের উঠোনে। স্লাইডিং দরজা পেরোলেই পারগোলা। স্লাইডিং দরজা পেরোলেই পারগোলা। তার এক কোণে বিশাল বাগানবিলাসের ঝাড় ছড়িয়ে দিয়েছে রঙিন ছায়া। অদূরে গার্ডেন শেডের পাশ ঘেঁষে উঠেছে দেশীয় শিম গাছের ঘন ঝাড়; বাড়ির সীমানা ডিঙিয়ে তা অনধিকার প্রবেশ করেছে প্রতিবেশীর আঙিনায়। এর পাশেই মাত্র কদিন আগে লাগানো পুঁই শাক ও শসা গাছের চারা দেখলাম লকলকিয়ে বেশ বেড়ে উঠছে।
হঠাৎ মনে হলো, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সিডনিতে দীর্ঘ দুই দশক সময়ের সুতো দিয়ে গাঁথা জীবন পেছনে ফেলে পাড়ি দেবো অজানা গন্তব্যে। আত্মীয়, পরিবার, বন্ধুবান্ধবের পাশাপাশি এসব লতা-পাতার সঙ্গে এতটা মায়া গড়ে উঠবে, তা কখনো ভাবিনি। হঠাৎ মনে হলো, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি পেছনে ফেলে যাব সিডনিতে গড়ে তোলা প্রায় দুই দশকের জীবন। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত মুখ—সবকিছুর পাশাপাশি এই গাছপালা, লতাগুল্ম, মাটির গন্ধও যেন আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। কখন যে তাদের সঙ্গে এতটা মায়া গড়ে উঠেছে, তা নিজেও বুঝিনি।
আমি হয়তো থাকবো না, কিন্তু আমার স্পর্শ রয়ে যাবে এই তরু-লতা-গুল্মের ভাঁজে ভাঁজে । আমি থাকবো না তাতে কী? আমার হয়ে কেউ ছুঁয়ে দিলেই ওরা বড় হবে। বড় হতে হতে একদিন আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে। আর তখন হয়তো বাতাসের ভেতর কোথাও আমার স্মৃতিরও একটু গন্ধ থাকবে।” মনে মনে আওড়াচ্ছিলাম এসব কথা।
বিদায়ের মুহূর্তে মানুষ বড় অদ্ভুত হয়ে যায়। তখন ইট-পাথরের ঘরও আপনজন মনে হয়, আর গাছের পাতার মর্মর ধ্বনিও যেন কথা বলে ওঠে।
রাত নয়টায় ফ্লাইট। ভাইপো বললো, এখনই রওনা দিতে হবে, না হলে সময়মতো বিমানবন্দরে পৌঁছাতে পারবো না।
আমিরাতের বিমানে চড়ে কাতারের রাজধানী দোহা শহরের বিমানবন্দরে পা রাখলাম পরদিন বুধবার সকাল নয়টায়। Maunsell Consultancy-তে চাকরি নিয়ে যাচ্ছি। যদিও পরবর্তী সময়ে এটি অন্যান্য বহু কোম্পানির সঙ্গে একীভূত হয়ে বিশ্বের এক নম্বর কনসার্টিং কোম্পানী AECOM-এ পরিণত হয়।স
এয়ারপোর্টে স্বাগত জানানোর জন্য অফিস থেকে লোক পাঠানো হয়েছে। ওদের হাতে ধরা বোর্ডে আমার নাম দেখেই বুঝলাম সঠিক জায়গায় পদার্পণ করেছি।
যা-ই হোক, ওইদিন বিকেলেই অফিসে রিপোর্টিং করার কথা। কিন্তু আমি এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি অফিসে গিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পেপার ওয়ার্কস সেরে ফেলি। পুরো রাতের দীর্ঘ ফ্লাইট। এত ক্লান্ত ছিলাম যে হোটেলে গিয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম।
কতক্ষণ যে ঘুমিয়েছিলাম, জানি না। হোটেলের পাশেই বড় মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনিতে জেগে উঠলাম। সিডনি শহরে মাইকে আজান? এ তো অসম্ভব। হঠাৎ করে মনে হলো এ তো অস্ট্রেলিয়া নয়, ভিন্ন কোনো দেশ, ভিন্ন জনপদ। চাকরির অফার, প্রস্তুতি, ভিসা সবকিছু এত তাড়াতাড়ি হয়েছে যে আমার তখনো ঘোরই কাটেনি। বুঝতেই পারিনি যে দু-দুটো মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমি এখন মরুজগতের এক ভিনদেশে এসে বসতি গেড়েছি।
বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে চোখ রাখতেই চমকে উঠলাম। চোখ কচলালাম। আবার তাকালাম। নিজেকে চিমটি কাটলাম।
না, ভুল দেখছি না।
এ তো আমার পরিচিত শহর নয়। এ দৃশ্য তো কোয়েকার্স হিলের নয়। এ আকাশে নেই ইউক্যালিপটাসের গন্ধ, নেই বৃষ্টিভেজা ঘাসের রং, নেই সিডনির শীতল নীল আলো।
এক অজানা শীতলতা ধীরে ধীরে শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এলো।
বাইরে তখন মধ্যপ্রাচ্যের দুরন্ত গ্রীষ্ম। আগুনরঙা বিকেল। চারদিকে যেন পোড়া উনুনের গরম চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। যতদূর চোখ যায়, কেবল ধূসর রঙের বিস্তৃতি। চোখে পড়ছিলো ধুলোমাখা ভবনের সারি, দূরে কোথাও মসজিদের মিনার, আর তারও ওপারে ঝাপসা দিগন্ত।
আমি তখন দোহার এক হোটেল কক্ষে।
রুমের মাঝখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে অখোলা স্যুটকেস আর ব্যাগপত্র। দেয়ালগুলো নীরব। এমনকি সময়ও যেন নীরব হয়ে গেছে।
নিজেকেই প্রশ্ন করলাম –
আমি এখানে কেন?
কী খুঁজতে এসেছি?
এই শহরের সঙ্গে আমার সম্পর্কই বা কী?
নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে উঠল।
বাইরে যদিও তখন কড়া রোদ। অথচ আমার বুকের মধ্যে তখন শুরু হয়ে গেছে এক তুমুল ঝড়। বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। এক অজানা আবেগের সুনামি আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে। মুন হচ্ছিল, ব্ল্যাকটাউনের প্রসপেক্ট জলাধারে জমে থাকা সমস্ত জল যেন আমার দু’চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত জোয়ার। বিচ্ছেদের জোয়ার।
ইচ্ছে হচ্ছিল- কোনোভাবে ফিরে যাই সিডনিতে, আমার প্রিয় মানুষগুলোর কাছে।
কিন্তু পরক্ষণেই বুঝলাম, তা আর সম্ভব নয়। বাস্তবতা বড্ড নির্মম।
আমি তখন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে। পরিচিত পৃথিবী পেরিয়ে এক অচেনা ভূখণ্ডে। নিজেকে টাইম জোনে আটকে পড়া এক নিঃসঙ্গ এলিয়েন, যার চারপাশে সবকিছু আছে, অথচ কিছুই তার নয়।
অথচ পরিবার-পরিজন ছেড়ে প্রবাসে যাওয়া এ প্রথম নয়।
১৯৮৩ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ ছেড়েছি। এরপর পাড়ি দিয়েছি অস্ট্রেলিয়ায়। চাকরির প্রয়োজনে অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যন্ত কান্ট্রি এলাকায় একা থেকেছি দীর্ঘদিন। কিন্তু একাকীত্বের বেদনায় নিজেকে এত অসহায়, এত পরাজিত কখনো মনে হয়নি। কিন্তু একাকিত্বের বেদনায় ক্লেশবিদ্ধ হয়ে নিজেকে এমন পরাস্ত মনে হয়নি কখনো।
হঠাৎ চোখ পড়ল বিছানার পাশের টেলিফোনে।
আমি যেন ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো সিডনির বাসার নম্বর ডায়াল করলাম।
টেলিফোন ধরল আমার বড় মেয়ে মুনিরা। “হ্যালো, বাবা?” শুধু এই দুটি শব্দ।
এরপরের স্মৃতিগুলো আজও ঝাপসা। শুধু মনে আছে, ওর কণ্ঠস্বর শুনেই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। শিশুর মতো কাঁদতে শুরু করেছিলাম। কোনো কথা বলা সম্ভব হয়নি।
কেন এমন হয়েছিল, আজও জানি না।
ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, পুরুষ মানুষ কাঁদে না। চোখের জল নাকি তাদের জন্য নয়। সংসারের কর্তার কোনো কারণেই ভেঙে পড়া চলবেনা। দুর্বলতা প্রকাশ করা যেন তাদের জন্য নিষিদ্ধ।
মনে পড়ে একাত্তরের কথা। আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর মাকে দেখতাম বিলাপ করে কাঁদতে। আর বাবা? তিনি কখনো কাঁদতেন না। শুধু বারান্দায় ঘন ঘন পায়চারি করতেন কিংবা বিবর্ণ মুখ নিয়ে চেয়ারে বসে আকাশের দিখে নির্বাক তাকিয়ে থাকতেন। বাবার চোখ দেখলে মনে হতো যেন মরা ইলিশের নিথর দুটো চোখ দেখছি।
বাবাকে কাঁদতে দেখিনি কখনো।
তবে দোহা শহরের অচেনা হোটেলের নির্জন কক্ষে সেদিন মনে হলো, হোক সে পুরুষ বা নারী, বেদনার রং সবার কাছেই এক এবং অভিন্ন।
টেলিফোনের অপর প্রান্তে আমাকে ভয়ানক ভেঙে পড়তে দেখে আমার অতোটুকুন মেয়ে অনেকটা মায়ের মতো উল্টো সান্ত্বনা দিতে শুরু করল।
সে বলল, “বাবা, তুমি যদি কাঁদো, তাহলে আমারও কান্না পাবে। তুমি তো একটা স্বপ্ন নিয়ে গেছো। তুমি আমার আইডল। আমি জানি, তুমি সফল হবে।”
মেয়ের কণ্ঠে সেদিন যেন আমি এক নতুন শক্তি খুঁজে পেয়েছিলাম।
এরপর ফোন ধরল আমার স্ত্রী সেলি। তখনও আমার চোখের বন্যা থামেনি। সেলি রীতিমতো বিচলিত হয়ে বললো, ‘তোমার আর কাতারে থাকার দরকার নেই। রিটার্ন টিকিট তো কাটাই আছে, আর এখানে তোমার চাকরিও আছে। এখনই সিডনি ফিরে এসো।’
সেদিন হাজার মাইল দূরে বসেও আমি সেই আশ্রয়ের উষ্ণতা অনুভব করেছিলাম।
এরপরের ঘটনাগুলো ইতিহাস।
দিন গড়িয়েছে, মাস পেরিয়েছে, বছরও কেটে গেছে।
সেদিন যে মানুষটি দোহার একটি হোটেল কক্ষে বসে অশ্রুসজল চোখে সিডনিতে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন, তিনি আজও কাতারের দোহা শহরেই আছেন।
জুলাই, ২০০৮
