দোহার বাংলাদেশি কম্যুনিটিতে বৈশাখী উৎসবের আমেজ মিলিয়ে যাবার আগেই পাঁচজন প্রবাসী বাংলাদেশির করুণ জীবনাবসানের ঘটনায় বিষন্ন সবাই। মাত্র ক’দিন আগে রাজধানীর সামাল রোডে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়। যে গাড়ীতে করে তারা যাচ্ছিলেন সেই গাড়ীর মিসরী চালক হঠাৎ করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে গাড়িটি উল্টে যায় আর অন্য একটি গাড়ী এসে সেটিকে ধাক্কা দেয়। গাড়ির আট জন যাত্রীর মধ্যে তিনজন বেঁচে গেলেও বাকী পাঁচজন নির্মম মৃত্যুর শিকার হন।
একট সুন্দর এবং সমৃদ্ধ জীবন গড়ার প্রত্যয় নিয়ে মাতৃভ’মি ছেড়ে সুদূর প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছেন লক্ষ কোটি বাংলাদেশি। দেশে অপেক্ষার প্রহর গুনে পথপানে চেয়ে আছে কারো প্রিয়তমা স্ত্রী, আদরের সন্তান, কিংবা স্নেহময়ী পিতা-মাতা। বহু পরিশ্রম আর কষ্টের দিন-রাত্রি পার করে একদিন স্বচ্ছলতার ঝাড়বাতি হাতে নিয়ে ফিরে আসবে তাদের প্রিয়মানুষটি। কিন্তু সব স্বপ্ন ভেঙেত্ম দিয়ে সেই প্রবাসী মানুষগুলো হীমশীতল কফিনে লাশ হয়ে বিমান বন্দরে নোঙর করবে, সে কথা কখনো কি ভেবেছিলো কেউ?
যারা মারা গেছেন তাদের সম্পর্কে তেমন বিশেষ কিছু আমি জানিনা। তবে এটুকু বলতে পারি তাদের হাঁড়ভাঙত্মা পরিশ্রম থেকে অর্জিত দেশে পাঠানো অর্থের উপর নির্ভরশীর ছিল কোনো পরিবার। আজ ওরা নেই, তাই অর্থের অভারে হয়তো বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারবেনা আদরের বোনটি, থেমে যাবে বাব-মার চিকিৎসা কিংবা বন্ধ হয়ে যাবে ছেলে-মেয়ের পড়াশুনা। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হল, সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মারা গেলেন, তাদের বয়স ছিল মাত্র ২৫ থেকে ৩৫ এর মধ্যে। এতো কম বয়সে সম্ভাবনাময় পাঁচটি জীবন অকালে হারিয়ে যাবে, সেটা কি মেনে নেয়া যায়?
ঢাকার শাহ্জালাল বিমান বন্দরের পরিসংখ্যান থেকে থেকে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে আট থেকে দশটি প্রবাসীর লাশ দেশে আসছে। উন্নত দেশে যারা নাগরিক হিসাবে বসবাস করছেন তাদের অনেককেই ওই দেশে সমাহিত করা হয় বলে দেশে ফেরত কফিনের সিংহভাগ আসছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যে সব প্রবাসী মারা যাচ্ছেন তাদের নব্বই শতাংশেরও বেশী অস্বাভাবিক কারণে মারা যাচ্ছেন। এর মধ্যে কর্মক্ষেত্রে এবং সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন প্রায় ৩০ শতাংশ বাংলাদেশি প্রবাসী। সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কারণেই হতে পারে, তবে উচ্চ গতিতে বেপরোয়া গাড়ী চালানো হচ্ছে গাড়ী দুর্ঘটনার একটি অন্যতম কারণ। ড্রাইভার ও যাত্রীরা যদি কিছু বিষয়ে সচেতন থাকেন তাহলে অনেক সময় মারাত্মক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।
গাড়ী দুর্ঘটনা ছাড়া কাতারে রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ীর ধাক্কা খেয়ে পথচারীরা নিয়মিত মারা যাচ্ছেণ। যা সত্যি ভয়ঙ্কর। রাস্তায় যদিও গাড়ী চলে, তবে পথচারীদেরও রাস্তা ব্যবহার করার সমান অধিকার রয়েছে। ফুটপাত যদিও পথচারীদের চলাচলের জন্য নির্ধারিত, কিন্তু দোহা শহরের ফুটপাত পার্ক করা গাড়ীর দখলে থাকায় পথ চলতে গিয়ে পথচারীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা মাড়িয়ে চলতে হয়। পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পরাপারের জন্য রয়েছে জিব্রা ক্রসিং। রাস্তার জিব্রা ক্রসিং-এর অংশটুকুতে চলবে কেবল পথচারীদের রাজত্ব। আর্ন্তজাতিক ট্রাফিক নিয়ম অনুযায়ী, একজন পথচারী জিব্রা ক্রসিং-এ পা রাখার সাথে সাথে, রাস্তা পার না হওয়া পর্যন্ত রাস্তার সব গাড়ীকে থেমে যেতে হবে। উন্নত দেশগুলোতা এমন হতে দেখেছি। কিন্তু দোহায় জিব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হওয়া মানে নির্ঘাত মৃত্যু। কারণ গাড়ী চালকরা নিয়মের তোয়াক্কা করেননা। কাতারের গাড়ী চালকদের মধ্যে পথচারীদের রাস্তা ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। তাই রাস্তা পারাপার হতে সবাইকে খুব সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।
আমি অনেক সময় দেখেছি,আমাদের শ্রমিক ভায়েরা জীবনের পরোয়া না করে দৌড় দিয়ে ব্যস্ত সড়ক পার হচ্ছেন। তারা হয়তো ভাবছেন, এইতো পেরিয়ে গেলাম বলে। কিন্তু পারাপর করার সময় সামান্যতম দ্বিধা কিংবা সঙ্কোচ কেড়ে নিতে পারে জীবন। দোহা শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে পথচারীদের জন্য নির্মিত হচ্ছে ওভার ব্রীজ। সাফারী মলের কাছে সম্প্রতি চালু হয়েছে তেমন একটি ব্রীজ। রাস্তার পার হবার জন্য সবার এই ব্রীজটি ব্যবহার করা উচিত।
অনেকে বাইসাইকেল নিয়ে হোম ডেলিভারীর কাজ করেন। এদের অনেকে রাস্তার উল্টো দিক দিয়ে বাইসাইকেল চালান। এদের মাথায় থাকেনা কোনো হেলমেট, বাইসাইকেলে নেই কোনো সতর্কতামূলক হলুদ লাইট। ফলে বিশেষ করে রাতের বেলায় গাড়ীচালকরা তাদের দেখতেই পান না। মধ্যপ্রাচের দেশগুলোতে গাড়ীর ধাক্কায় বাংলাদেশী সহ বহু প্রবাসী বাইসাইকেল চালক নিয়মিত প্রান হারাচ্ছেন।
অনেক সময় গাড়ীর যাত্রী দুরে থাক খোদ ড্রাইভারই সিটবেল্ট পড়তে গড়িমসি করেন। দোহার রাস্তায় প্রতিনিয়ত দেখছি চলন্ত গাড়ীর মধ্যে শিশুরা চলা ফেরা করছে, কেউবা গাড়ীর জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিচ্ছে, হাত নাড়াচ্ছে। এমনকি শিশুদের কোলে নিয়ে অনেকে ড্রাইভও করছেন। নিজ সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে বাবা-মার এ ধরনের উদাসীনতা দেখলে ব্যথিত হই। জন্ম-মৃত্যুর নির্ধারক হলেন আল্লাহ, কিন্তু নিরাপত্তার জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। নিরাপত্তার জন্য সিটবেল্ট পরিধানের কোনো বিকল্প নেই। কাতারে কড়া ট্রাফিক আইন রয়েছে, কিন্তু আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশের শৈথিলের কারণেই যাত্রীরা আইন মেনে চলছেনা।
কাতার কর্নেল মেডিকেল কলেজের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আগের তুলনায় কাতারে গাড়ী দুর্ঘটনার সংখ্যা ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে। কিন্তু স্বস্তির কথা হলো, রাস্তায় দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা এখন বেশ কমে এসেছে। ২০০৭ সালে এই মৃত্যুর হার ছিল প্রতি লক্ষে ২৩ জন, আর এখন তা হচ্ছে ১৪ জন। রাস্তায় অধিক সংখ্যক স্পীড ক্যামেরা বসানো এর অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কাতার-ভিত্তিক অন্য একটি সমীক্ষা অনুযায়ী কাতারের রাস্তায় সংঘটিত ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনায় ফোর-হুইল ড্রাইভ গাড়ীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। দেখা গেছে, সাধারণতঃ বড় বড় ফোর-হুইলের চালকরাই ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করে সবচেয়ে বেশী বেপরোয়া গাড়ী চালান। কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি ১০,০০০ গাড়ীর জন্য ৮ জনের মৃত্যু হচ্ছে অন্যদিকে ইউরোপে এই সংখ্যা মাত্র ১.৫ এবং আমেরিকায় ১.৯। প্রবাসে সবাই নিরাপদে থাকুন, গাড়ী চালানোর সময় সতর্ক থাকুন এই কামনা করছি।
এপ্রিল, ২০১৮
