রমজান মাসে রাতে জেগে থাকে দোহা শহর। অনেকে সেহরী খেয়ে ফজরের নামাজ পড়ে তবেই ঘুমোতে যান। কমিউনিটি সংগঠনগুলো তাদের নিয়মিত সভা কিংবা আলোচনা অনুষ্ঠান তারাবহি নামাজ শেষ করে রাত সাড়ে নটা কিংবা দশটার দিকে আয়োজন করেন যা গভীর রাত পর্যন্ত চলে।
দোহা শহরের দাফনা এলাকায় অধিকাংশ সরকারী মন্ত্রনালায়ের অবস্থান। রমজান মাসে অফিস ছুটি হলে দেখা যায় সবাই প্রায় এক সাথেই ঝাঁপিয়ে পড়েন রাস্তায়। কার আগে কে বাড়ী যাবেন এই নিয়ে যেনো চলে প্রতিযোগিতা। অফিস শেষে কর্নিশ এবং সমান্তরাল রাস্তাগুলো বলতে গেলে থেমে যায়।
শামুকের গতিতে চলতে থাকে সব গাড়ী। ফলে বাড়ী যাবার সময় ঘন্টা দুয়েক গাড়ীতে বসেই কাটিয়ে দিতে হয়। এজন্য রমজানে হ্রাসকৃত কর্মঘন্টার সুফল পাওয়া যায়না। কিন্তু এবার ভিন্ন ছবি চোখে পড়ছে। বিশ্বকাপ ফুটবলকে সামনে রেখে দোহা শহরের বিভিন্ন এলাকার প্রধান সড়কগুলো যেভাবে প্রশস্ত করা হচ্ছে এটা তারই আংশিক সুফল বলেই মনে হচ্ছে।
রাশিয়ায় আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই বসছে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর। কাতার প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ইফতারের টেবিলে, পারিবারিক এবং সামাজিক সমাবেশে ও আড্ডায় ধীরে ধীরে বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে। এ কথা সত্যি, ক্রিকেটে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশিরা যে কতটা ফুটবল পাগল সেটা বিশ্বকাপ না আসলে বুঝা যায় না।
বিশ্বকাপ আসলে বাংলাদেশে ফুটবলের শীর্ষ ও জনপ্রিয় দলগুলোর পতাকা এবং জার্সি বিক্রির চলে রমরমা ব্যবসা। অনেকে নিজের সারা বছরের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে কিংবা জমি বিক্রি করে নিজ প্রিয় দলের পতাকা বানান। সবাই খবরে এবং আলোচনায় আসতে চান। একই পরিবারে স্বামী স্ত্রী প্রতিদ্বন্দী দলের সমর্থক হওয়ায় অনেক সময় নেমে আসে দুর্ভোগ ও কলহ। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও ফুটবল নিয়ে মজাদার নাটক তৈরী করার প্রতিযোগীতায় নামে।
সেদিন পত্রিকায় দেখলাম, নারায়নগঞ্জের একজন ব্রাজিল ভক্ত তার ছয় তলা বাড়ীর পুরোটাই ব্রাজিলের রঙে রাঙিয়েছেন। বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের দালান, দোকান-পাটের ছাদে, জানালায় বিভিন্ন দলের জাতীয় পতাকা উড়তে দেখে মাঝে মাঝে বিস্মিত হতে হয়, কোন দেশে আছি? এ নিয়ে অনেকে অনুযোগ করে বলেন, দেশের মাটিতে অন্য দেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন যে আমাদের জাতীয় সত্ত্বার অসন্মান। তবে আমি বিষয়টি সেভাবে দেখিনা। আমরা হলাম খুবই আবেগী জাতি। সে জন্যই হয়তো এমনটি হয়। কিন্তু আমাদের সবার হৃদয়ে শুধুই বাংলাদেশ।
বাংলাদেশিরা মোহামেডান এবং আবাহনীর আদলে মূলতঃ আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল এই দুই দলের সমর্থক গোষ্ঠিতে বিভক্ত। এই দুই দলের খেলোয়াড় সুপারস্টাদের পোশাক, চুলের কাট, চলন বলন নকল করতে উঠে পড়ে লাগে তরুণ এবং যুব সমাজ। কিন্তু যাদের নিয়ে এতো মাতামাতি তারা কি এই উন্মাদনার খবর রাখেন? বলতে পারবোনা। কাতারে এখন বাংলাদেশি সমর্থক গোষ্ঠির মধ্যে মেরুকরণ শুরু হয়ে গেছে। ফেসবুকের স্ট্যাটাসে এর ছায়া চোখে পড়ছে। যেমন একজন লিখেছেন , “ম্যারাডোনা থেকে মেসি, জিতলেও আছি, হারলেও আছি”, নেইমার একাই যথেষ্ট” ইত্যাদি।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা কাতারে বসে কিভাবে টেলিভিশনে বিশ্বকাপের খেলা দেখা যায় সে নিয়ে চালাচ্ছেন অনুসন্ধান। কাতারের উরিদু টেলিভিশনের স্পোর্টস চ্যানেলে বিশ্বকাপ দেখা যাবে। কিন্তু এই চ্যানেলের গ্রাহক মূল্য হচ্ছে মাসে ১১০ রিয়াল। অন্যদিকে খেলার ধারাভাষ্য ইংরেজীতে হবে কিনা সে নিয়ে সন্দেহ থাকে।
বাংলাদেশি দর্শকদের চাহিদার কথা মাথায রেখে উরিদু টেলিভিশন সম্প্রডু বেশ কিছু বাংলাদেশি চ্যানেলের সমন্বয়ে বাংলা ভ্যারাইটি প্যাক নামে একটি প্যাকেজ চালু করেছে। এজন্য ফি দিতে হতে মাসে মাত্র ৩৫ রিয়াল। বাংলাদেশে বিশ্বকাপের খেলা সম্প্রচার করার জন্য যে তিনটি চ্যানেল অনুমোদন পেয়েছে তার মধ্যে মাছরাঙা চ্যানেল অন্যতম। ফুটবল প্রেমিকদের জন্য সুখবর হচ্ছে উরিদু’র বাংলা ভ্যারাইট প্যাকে মাছরাঙা চ্যানেলও রয়েছে। কাতারে বসে টেলিভিশনে বিশ্বকাপ দেখার জন্য একটিা বেশ নির্ভরযোগ্য উপায় বলেই মনে হচ্ছে।
কাতারের প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটিকে একতাবদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশ কমিউনিটি কাতার নামের একটি কেন্দ্রিয় সংগঠন গড়ার কাজ এগিয়ে চলেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে কাতারের জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে কমিউনিটির পক্ষ থেকে একটি সাংস্কৃতিক দলের অংশ গ্রহনের মধ্য দিয়েই এই প্রচেষ্টার সূত্রপাত হয়। সংগঠনের গঠনতন্ত্র তৈরীর কাজ চলছে। এই উদ্যোগের সাথে জড়িত সবাইকে সাধুবাদ জানাই।
তবে এই সংগঠনটি যাতে কোনো প্রকার রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দিতা কিংবা মেরুকরণের শিকার না হয় সে দিকে সবার নজর রাখতে হবে। আর সংগঠনের খরচ চালানোর জন্য যাতে সবার কাছে হাত পাততে না হয় সেজন্য একটি নিয়মিত আয়ের সংস্থান করার কথা এখন থেকেই ভাবতে হবে। অদূর ভবিষ্যতে, শ্রম এবং সামাজিক বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সাথে নিবন্ধন করার কাজ এখন থেকেই হাতে নিতে হবে। নিবন্ধন ছাড়া ব্যাংকে কোনো একাইন্ট খোলা যাবেনা এবং বৈধভাবে কোনোরকম আর্থিক লেন-দেনও করা যাবেনা।
৩১ মে, ২০১৮
