কাতারে নেমেছে দুরন্ত শ্রাবণ। বছরের এই সময়ে বৃষ্টি, মেঘের গর্জন, মরুর দেশে শীতের আগমনী বার্তা পৌঁছে দেয় সবার কাছে। হঠাৎ বৃষ্টি দেখে বহু প্রবাসী বাংলাদেশির মন ছুটে যায় স্বদেশের ঠিকানায়। গ্রীষ্মের তপ্ত দিনগুলো থেকে কিছুদিনের জন্য হলেও একটু পরিত্রাণ পাওয়া যাবে ভেবে সবার মনে সুখের ময়ূর পেখম তুলে নেচে উঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের খুদে বার্তায় এর ছোঁয়া দেখতে পাচ্ছি। কাতারের বৃষ্টিমুখর দিনে বৃষ্টিতে কাকভেজা হওয়ার মজা নিতে অনেকে নেমে পড়েন রাস্তায় কিংবা বাড়ীর উঠোনে। এমন বৃষ্টিমাখা পরিবেশে মাংস দিয়ে গরম-গরম ভ’না খিচুড়ি খাওয়ার দৃশ্যও দেখলাম অনেকের ফেসবুকের পাতায়।
তবে ২০ অক্টোবরের কয়েক ঘন্টার টানা মুষলধারে বৃষ্টি ডুবিয়ে দেয় দোহা শহরের বহু এলাকা। জলাবদ্ধতার কারণে ওইসব এলাকার রাস্তা-ঘাট যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। দোহা শহরের বেশ কিছু বড় বড় সড়ক মোড়ের আন্ডারপাসও পানিতে তলিয়ে যায়। তবে পানিতে ডুবে থাকা গাড়ীর পাশাপাশি রবারের তৈরী ভেলায় চড়ে রাস্তায় জমে থাকা পানিতে অনেকের ফ’র্তি করার ছবিও দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।।
দোহা শহরের যেসব এলাকায় ভারী বর্ষণের ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্ট হয়েছে সেগুলোর মধ্যে আবু হামর, আল থুমামা, আল হিলাল, বারওয়া সিটি, নুজিয়া, আলরাইয়ান অন্যতম। বৃষ্টির পানিতে ডুবে থাকা দোহা শহরের কিছু ছবি দেখে অনেকে মন্তব্য করছেন, উন্নত দেশ কাতারে যদি এমন হয় তাহলে বাংলাদেশের জলাবদ্ধতা নিয়ে এতো প্রশ্ন কেন?
এ ধরনের আকস্মিক এবং অত্যধিক বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট বন্যা কিংবা জলাবদ্ধতা রুখে দেয়া খুব সহজ নয়। এমন বৃষ্টিপাতে উন্নত দেশের শহরগুলোও সময় সময় প্লাবিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সাথে উন্নত দেশের পার্থক্য হচ্ছে, আমাদের দেশের শহরগুলোতে বন্যার পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। দিনের পর দিন পানি জমে থাকে শহরের রাস্তায় এবং বাড়ীর উঠোনে। যেমন চট্টগ্রাম শহরে বৃষ্টির পানি ছাড়াও কর্নফুলী নদীর জোয়ারের পানি শহরে ঢুকে প্রতিদিন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে।
সাধারণত বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে কিছুটা বেশী ধরেই একটি শহরের পানি নিস্কাশন ব্যবস্থার (storm water drainage system) ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়। তবে বড় ধরনের বৃষ্টিপাতের কারণে পানি জমে যাতে যানবাহন চলাচল এবং জনজীবন স্থবির হয়ে না যায়, সেজন্য দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা রাখা হয়। ফলে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী না হয়ে সহনীয় পর্যায়ে থাকে। ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে প্রকৃতির খেলা। এ ব্যাপারে সঠিক পূর্বাভাস দেয়া অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। তাই জলাবদ্ধতা হবেনা – এমন গ্যারান্টি দিয়ে কোনো নগর পরিকল্পনা করা অনেকটা অসম্ভব। যেমন হঠাৎ করে ২০ অক্টোবর কাতারের আবুহামর এলাকায় ৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
কাতারে রাস্তা-ঘাট এবং বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হবার কারণ বহুবিধ। বিশ্বকাপ ফুটবলের কারণে সড়ক উন্নয়ন, মেট্রা রেল, ফুটবল স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে সব খাতেই বলতে গেলে একসঙ্গেই চলছে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ। ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নির্মাণের কাজে আলাদা করে মনযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। দোহা শহরের যেসব এলাকা বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হচ্ছে, তার অনেক জায়গায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনো নির্মিতি হয়নি। কোনো কোনো জায়গায় কাজ শুরু হয়েছে অথচ শেষ হতে আরো অনেক সময় বাকী। আর অনেক এলাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে নিষ্কাশিত পানি সমুদ্রে ফেলার অনুমোদন এখনো মেলেনি।
তবে সুখবর হল, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ টানেলের কাজ এগিয়ে চলেছে, যা দোহা শহরের প্রায় অর্ধেক এলাকার পানি নিষ্কাশন করে সমুদ্রে ফেলতে পারবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এই টানেলের কাজ শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এই টানেল চালু হলে, দোহা শহরে জলাবদ্ধতার দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যাবে।
গত শনিবারের ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাতে প্রান হারিয়েছেন একজন বাংলাদেশি শ্রমিক। তাঁর পরিচয় এখনো আমরা জানি না। প্রবল বজ্রপাতের সময় কি করে ওই শ্রমিককে জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কাজে সক্রিয় রাখা হল, তা নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। এমন অযাচিত মৃত্যু মেনে নেয়া যায়না।
বজ্রপাতের সময় নিরাপত্তার জন্য কিছু বিষয় মেনে চলতে হবে। যেমন – উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের লাইন থেকে দূরে থাকা, বাড়ীর জানালা থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি ধাতব বস্তু এড়িয়ে চলা, টিভি-ফ্রিজ না ধরা, গাড়ির ভেতরে অবস্থান না করা, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে রাখা ইত্যাদি। বজ্রপাতের সময় বাড়ী কিংবা অফিসের ভেতরে থাকাটাই শ্রেয়।
২৫ অক্টোবর, ২০১৮
