‘শোনো বন্ধু শোনো, এই শহরের ইতিকথা’Ñএই গানটি আমাদের অনেকেরই জানা। প্রতিটি শহরের নামের পেছনে থাকে একটি ইতিহাস বা গল্প। যেমন শিলহট থেকে শ্রীহট্ট, তারপর সিলেট। চাটি বিছানোর জায়গা থেকে চাটিগাঁÑচাটগাঁ, তারপর চট্টগ্রাম। ঢাকের শব্দ থেকে ঢাকা ইত্যাদি। তেমনি কাতারের রাজধানী শহরের নাম কেন দোহা রাখা হলো, তারও একটি কারণ রয়েছে।
দোহা (الدوحة) শব্দের মানে হলো বিশাল বৃক্ষ। দোহার আদিবাসীরা ছিল মূলত জেলে। জানা যায়, সাগরের পাড়ে একটি বিরাট বৃক্ষ ঘিরে গড়ে ওঠে জেলে কাতারিদের ছোট্ট বসতি আর তার নামকরণ করা হয় দোহা। তবে এর আরও আগে আলবিদা নামে পরিচিত ছিলো এই দোহা। দোহার আদিবাসীদের সিংহভাগ সৌদি আরবের নাজদ ও আল-হাসা এলাকা থেকে আসা আরব ও বেদুইন ছাড়াও রয়েছে পূর্ব আফ্রিকা থেকে আনা বেশ কিছু ক্রীতদাস। তবে এ পর্যন্ত যেসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে তার ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, কাতারে মনুষ্য বসতির শুরু হয় প্রস্তর যুগে।
ভৌগলিক পরিভাষায় কাতার (قطر) হলো একটি Peninsula. এর দক্ষিণে সৌদি আরব আর বাকি সব দিক ঘিরে রয়েছে আরব উপসাগর। কাতারের আয়তন মাত্র ১১,৫০০ বর্গ কিলোমিটার যা বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সমতুল্য। কাতারের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ হচ্ছে যথাক্রমে ১৮০ ও ৮৫ কিলোমিটার। পুরো কাতার দেশটাকে গাড়ি নিয়ে ঘুরে দেখতে দিন দু’য়েকের বেশী লাগেনা।
কাতারের রাজধানী হচ্ছে দোহা। এই দোহা শহরকে ঘিরেই কাতারের যাবতীয় কর্মকাণ্ড, তাই কাতারকে একটি নগর সর্বস্ব রাষ্ট্র (City State) বললেও ভুল হবেনা। তবে ইদানীং দোহা শহরের অদূরে গড়ে উঠছে বেশ কিছু উপ-শহর ও বাণিজ্যিক এলাকা, যেমনঃ আল-খোর, আল-ওয়াক্রা, মেসাইদ, দুখান, আল-শামাল ইত্যাদি।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, কাতার বিভিন্ন সময়ে বাগদাদের আব্বাসীয় সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে পর্তুগিজ, পারস্য ও তুরস্কের উসমানি সাম্রাজ্যের মতো সুপার পাওয়ারদের শাসনাধীন ছিলো।
এখন কাতার শাসন করছেন আল-থানি পরিবার। এই পরিবার সৌদি আরবের নাজদ এলাকা থেকে ১৭৫০ সালের দিকে কাতারে আসে। তাদের মূল ব্যবসা ছিলো সাগরের মাছ ও মুক্তো কেনাবেচা। এখন কাতার শাসন করছে আল-থানি পারিবার। সৌদি আরবের নাজাদ এলাকা থেকে কাতারে আসে থানি পরিবার। এই পরিবার সৌদি আরবের নাজদ এলাকা থেকে ১৭৫০ সালের দিকে কাতারে আসে। তাদের মূল ব্যবসা ছিলো সাগরের মাছ ও মুক্তো কেনাবেচা। উল্লেখ্য, কাতারের থানি পরিবার ও সৌদি আরবের শাসক, সৌদ পরিবারের মধ্যে গোত্রীয় যোগাযোগ রয়েছে। কারণ, এই দুই পরিবারেরই শেকড় হল সৌদি আরবের নাজাদ এলাকা।
আল-থানি পরিবার আসার ছয় বছরের মাথায় কুয়েত থেকে কাতারে পাড়ি জমায় অন্য একটি ক্ষমতাশালী পরিবারÑআল-খলিফা। এর কিছুদিন পর পার্সিয়ানরা কাতার আক্রমণ করে আল-খালিফা পরিবারকে বাহরাইনে বিতাড়িত করে। উল্লেখ্য, এই আল-খলিফা পরিবারই এখন বাহরাইনের শাসক। বাহরাইনে থাকলেও কাতারের মুক্তো ব্যবসা মূলত আল-খলিফা পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এ নিয়ে আল-থানি ও খলিফা পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলতে থাকে।
১৮৫০ সালে আল-থানি পরিবারের প্রধান শেখ মোহাম্মদ থানি নিজেকে কাতারের আমির ঘোষণা করেন। এরপর তুর্কিদের সঙ্গে এক দফা লড়াইও হয়ে যায়। একদিকে তুর্কি, বাহরাইনের আল-খলিফা আর অন্যদিকে সৌদি আরবের ক্ষমতাশালী আস-সউদের আগ্রাসন থেকে বাঁচার জন্য ব্রিটেনের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে কাতার একটি ব্রিটিশ প্রটেক্টরেটে পরিণত হয়। ফলে কাতারে ব্রিটিশ আধিপত্য নিশ্চিত হয়। বৃটিশ শাসিত কাতার সত্তর দশকের আগে বলতে গেলে বিশ্বের চোখের আড়ালেই ছিল। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত কাতারের নিজস্ব কোনো মুদ্রা ছিলনা। ভারতীয় রুপি গালফ রুপী নামে কাতারে ব্যবহৃত হতো।
১৯৭১ সালে বৃটিশ থেকে স্বাধীনতা অর্জন ছিল কাতারের জন্য টার্নিং পয়েন্ট। ১৯৯৫ সালে স্যান্ডহার্ষ্ট শিক্ষিত শেখ হামাদ আল থানি ক্ষমতায় আসেন। তিনিই হলেন আজকের আধুনিক কাতারের রূপকার। শেখ হামাদ শুধু তেল এবং গ্যাসের উপর নির্ভর না করে বিকল্প অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য বিশ্বের প্রায় সব বড় বড় শহরের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং রিয়েলষ্টেট খাতে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশী অর্থ বিনিয়োগ করেন। যার মধ্যে রয়েছে লন্ডনের সবচেয়ে উঁচু টাওয়ার শার্দ, বার্কল্যে ব্যাংক, হিথরো বিমান বন্দর, হ্যারড্স মল, ভক্সওয়াগন, সিমেন্স ইত্যাদি।
শেখ হামাদ তাঁর বড় ছেলে শেখ জাসিম আল-থানির বদলে শেখ তামিমকে নতুন যুবরাজ ও সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর ২০১৩ সালে পুত্র শেখ তামিমের হাতে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেন আমির শেখ হামাদ। সেই থেকে কাতারের আমির হিসেবে দক্ষ নেতৃত্ব দিচ্ছেন তরুণ শেখ তামিম বিন হামাদ আলথানি।
আমেরিকার বিখ্যাত ম্যাগাজিন ফোর্বস-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বের ধনবান দেশের তালিকার শীর্ষে রয়েছে কাতার। কাতারের মাথাপিছু জিডিপি এখন প্রায় ১৪০,০০০ ডলার ছুঁতে চলেছে। কাতারের বর্তমান জনসংখ্যা হল ২৭ লক্ষ, যার মাত্র ১.৮ শতাংশ (প্রায় ৩ লক্ষ) হল স্থানীয় কাতারী নাগরিক। অন্য একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কাতারী জনসংখ্যার এক দশমাংশ অর্থাৎ আনুমানিক ৩০,০০০ হচ্ছেন মিলিওনিয়ার! শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আরব দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশ হল কাতার। ২০১৬ সালের বিশ্ব শান্তি সূচকের (GPI) র্যাংর্কিংয়ে ১৬২টি দেশের মধ্যে কাতারের স্থান হল ৩৪।
ভৌগলিক ও জনশক্তি বিচারে নিতান্তই একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হবার পরও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান পাওয়ার ব্রোকার হিসাবে কাতারের সাম্প্রতিক উত্থান সত্যিই বিস্ময়কর। কাতারের আল-জাজিরা টেলিভিশন বিবিসি, ফক্স ও সিএনএন-এর একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে মধ্যপ্রাচ্যের মিডিয়া জগতে রীতিমত বিপ্লব এনেছে। কাতারের উদার এবং আধুনিক ভাবমূর্তি পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে যেমন সফল হচ্ছে তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর কাছেও কাতার একটি মডেল হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডিসেম্বর, ২০০৮
