গত অর্থ বছরে (জুলাই ২০১৭-জুন ২০১৮), প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে প্রায় ১৫০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, এটা হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রবাসীদের পাঠানো দ্বিতীয় বৃহত্তম রেমিট্যান্স। এটা সত্যিই সুখবর। তবে গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে গেলেও জনশক্তি রপ্তানী কমেছে ৪৬ শতাংশ। ফলে এই রেমিট্যান্স বৃদ্ধির খবরটি বেশ বিভ্রান্তিকর।
জনশক্তি রপ্তানী থেকেই সবচেয়ে বেশী বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে বাংলাদেশ। আর প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তাই এই খাতে মন্দাভাব, প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভাবিয়ে তুলেছে। হুন্ডি প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়াকড়ি, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও ডলারের বিপরীতে বেশি টাকা পাওয়ায় বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। কিন্তু একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জনশক্তির রপ্তানীও কমেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে অধিক সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি কাজ করছেন সৌদি আরবে। সম্প্রতি সেদেশে ১৩ ধরনের কাজে বিদেশিদের কাজ করা নিষিদ্ধ করার ফলে বহু বাংলাদেশি চাকরী হারিয়েছেন। এছাড়া ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। তাই সৌদি আরবে জনশক্তি রপ্তানিতে কিছুটা ভাটা পড়েছে। কিন্তু এরপরও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে সৌদি আরবে। বেশী হারে নারী শ্রমিক রপ্তানীই হচ্ছে এর মূল কারণ।
কাতার এবং ওমানে আগে যেখানে প্রতি মাসে ৯-১০ হাজার মানুষ আসতো, তা কমে এখন ৬-৭ হাজারে নেমে এসছে। সবচেয়ে আশংকার বিষয় হচ্ছে, বহু চেষ্টা করেও সংযুক্ত আরব আমিরাতে শ্রম বাজার এখনও খোলা সম্ভব হয়নি। গত পাঁচ বছর ধরে আরব আমিরাতে জনশক্তি রপ্তানী বন্ধ রয়েছে। এক সময় ছিল যখন কেবল দুবাইতে এক থেকে দেড় লাখ মানুষও গেছে। এছাড়া কুয়েত, লিবিয়া ও ইরাকে কর্মসংস্থানের বাজার বলতে গেলে একবারেই বন্ধ।
কাতারে ভিসামুক্ত সফরের সুবিধা পাওয়ায় ভারতীয়রা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। বিভিন্ন পেশায় দক্ষ ভারতীয়রা কিছুদিনের জন্য কাতারের এসে চাকুরীদাতাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করছেন এবং চাকরী যোগাড় করে নিচ্ছেন। দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি দক্ষ জনশক্তি এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এমনকি পাকিস্তানীরাও ভিসামুক্ত দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
অবরোধের কারণে কাতারে নির্মান খাতের কাজ কিছুটা মন্থর হয়ে গেলেও, অন্যান্য জিসিসি দেশগুলোতে বড় বড় প্রজেক্ট কিন্তু থেমে নেই। সৌদি আরবে ১০০০ কোটি ডলার ব্যায়ে নির্মিত হচ্ছে বাদশাহ আব্দুল্লাহ অর্থনৈতিক সিটি, জেদ্দা, আবুধাবী এবং রিয়াদে হচ্ছে মেট্রো রেল। এ সব প্রজেক্টে দক্ষ এবং পেশাদার জনশক্তি রপ্তানীর সুযোগ রয়েছে। কেবল অদক্ষ এবং আধা দক্ষ শ্রমিক না পাঠিয়ে বেশী বেতনের দক্ষ জনশক্তি পাঠিয়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো সম্ভব।
সত্যি বলতে কি, বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানীর পরিস্থিতি এখন খুব একটা ভালো নেই। এর জন্য আমাদেরও দায় আছে৷ প্রবাসীদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ ও হানাহানি অনেক সময় মানুষ খুন পর্যন্ত গড়ায়, যা প্রবাসে একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে অহেতুক লড়াইও নষ্ট করে ফেলছে শ্রমবাজার।
ভিসা বানিজ্য বন্ধ করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও তা এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এছাড়া আইনগত কাঠামোর মুখোশ পড়ে অনেকে এখন পাতছেন প্রতারণার নুতন ফাঁদ। কোম্পানী খুলে বৈধ উপায়ে কিছু মানুষ নিয়ে আসার এক বছরের মধ্যেই বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে, পরিকল্পনা মাফিক বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে কোম্পানী। এটা যদিও আইনের চোখে বৈধ, কিন্তু ওই কোম্পানীতে আসা মানুষগুলো মাত্র এক বছরের মাথায় চাকরী হারিয়ে চরম সঙ্কটে পড়ে যাচ্ছেন।
আইনগতভাবে নতুন কোম্পানীতে যোগদানের সুযোগ থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি নতুন চাকরী খুঁজে নেওয়া সহজ কাজ নয়। ফলে সবকিছ’ হারিয়ে অনেকে দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে আগত নারী শ্রমিকরা হয়রানি, স্বল্প মুজুরীসহ বহু ধরণের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। প্রতারণা ও নির্যাতন বন্ধের জন্য সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
বন্ধ শ্রমবাজার খুলে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টির জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে হবে। কাতারে বাংলাদেশিদের ভিসামুক্ত সফরের সুযোগ তৈরী করার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা আরো কার্যকর এবং জোরদার করতে হবে। জনশক্তি রপ্তানীর অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন যাবতীয় সম্যসা সমাধান করার লক্ষ্যে সরকারের সব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একযোগে কাজ করা উচিত।
রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়াতে হলে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যাপারে প্রবাসীদের উৎসাহী করতে হবে। এজন্য বিভিন্ন ব্যাংক আকর্ষণীয় প্যাকেজ চালু করতে পারে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের পথও সুগম করে দিতে হবে। প্রবাসীদের জন্য নিরাপদ এবং ভালো বিনিয়োগের উপায় হল সরকারী ওয়েজ আর্নার বন্ড কিনে রাখা।
বাংলাদেশ সঞ্চয় অধিদপ্তরের চালু করা পাঁচ বছর মেয়াদি ‘ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড’, তিন বৎসর মেয়াদী ‘ইউএস ডলার ইনভেষ্টমেন্ট বন্ড’ এবং ’ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড’ নামের ভিন্ন বন্ডে বিনিয়োগের চমৎকার সুযোগ রয়েছে। অন্য কোনো সঞ্চয়পত্র বা বন্ডে এত মুনাফা এখন পাওয়া যায় না। সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক হল মেয়াদ শেষ হলে এই টাকা দেশ হতে ফিরিয়ে আনা যায়। এগুলো সম্পর্কে বেশিরভাগ প্রবাসী তেমন ভালোভাবে অবহিত নন। প্রবাসীকল্যান মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে জনসচেতনতামূলক পদক্ষেপ নিতে পারে।
৪ নভেম্বর, ২০১৮
