দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর আগামী ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ কাতারে আসছে নতুন শ্রম আইন। এ নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। নতুন শ্রম আইনে মালিক বা চাকরী পরিবর্তন থেকে শুরু করে কাতার ত্যাগ (এক্সিট পারমিট) এবং কাতারে পুনঃপ্রবেশ করা সহ বেশ কিছু বিষয়ে বড় আকারের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নিউজ মিডিয়ার বরাত দিয়ে শ্রম আইন নিয়ে বিভিন্ন তথ্য মানুষের মুখে শোনা গেলেও এ সম্পর্কে কারো সঠিক ধারনা না থাকায়, অনেকেই অনিশ্চয়তা এবং আতঙ্কে ভুগছেন।
কাফালা ভিত্তিক প্রথা কাতারে কর্মরত প্রবাসীদের মাথার উপর যেনো সিন্দাবাদের ভুতের মত চেপে বসেছে। কাতারে আসার পর কফিলের কাছে পাসপোর্ট জমা দিয়ে অনেকটা পরাধীনতার হাতকড়া লাগিয়ে শ্রমজীবিদের শুরু করতে হয় মরু প্রবাসের জীবন। মালিকের অনুমতি বা ছাড়পত্র ছাড়া কোনোভাবেই কাতার ত্যাগ করা যায়না। মালিকের সাথে কোনো রকম দ্বন্দে জড়িয়ে পড়া মানেই কপাল পুড়লো। চাকরী ছেড়ে দেশে চলে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। এছাড়া একবার কাতার ছেড়ে গেলে দু’বছরের মধ্যে নতুন চাকুরী নিয়ে পুনঃপ্রবেশ করাও সম্ভব নয়। এসব কারনে ভুগছেন প্রবাসী শ্রমিক এবং জনশক্তি।
বিশ্বকাপ ২০২২ ফুটবলের স্বাগতিক দেশ হিসাবে মনোনয়ন পাবার পর থেকেই বিশ্ব মিডিয়া, অর্ন্তজাতিক শ্রম সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মাইক্রোস্কোপের নীচে চলে এসেছে কাতারের শ্রম আইন। বিশ্বকাপ ফুটবলের বিভিন্ন প্রজেক্টে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে বেশকিছু প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশ, কাতার সরকার ও বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানীর উপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে। এসব কারনে কাতারে কর্মরত প্রবাসীদের সুবিধার জন্য পুরোনো শ্রম আইনকে সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাতার সরকার। কি আছে নতুন শ্রম আইনে?
নতুন আইনে পরিভাষাগত যে পরিবর্তন আসছে তাহল কফিলকে এখন চাকরিদাতা বলা হবে। কোনো প্রবাসীর কাতারে থাকা এবং কর্মসংস্থান, তার কোম্পানী বা চাকরীদাতার সাথে চুক্তিভিত্তিক হবে। নতুন নিয়মে প্রতিটি কর্মরত প্রবাসীকে নতুন চুক্তিপত্র দেয়া হবে। চাকরীদাতা থেকে লিখিত অনুমতি (এনওসি) না পেলে কাতারে চাকরী বদল করা সম্ভব নয়। নতুন আইনে চুক্তির মেয়াদ শেষ হবার পর অন্য চুক্তি করার ক্ষেত্রে পুরোনো মালিকের অনুমোদনের দরকার নেই। তবে কাতার শ্রম মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে নতুন চাকরীদাতার অধীনে কাজ খুঁজে নেয়া যাবে। আর যাদের চুক্তিতে কোনো মেয়াদ নেই তারা পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলে এই সুযোগ পাবেন।
একমাত্র বহুজাতিক বড় কোম্পানী ছাড়া কাতারের সরকারী এবং বেসরকারী খাতে কর্মচারীদের চাকরি লানোর জন্য সাধারণত ছাড়পত্র দেয়া হয়না। আমার জানা মতে, উচ্চ শিক্ষিত এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বহু বাংলাদেশি কাতারে রয়েছেন যারা বছরের পর বছর একই কোম্পানীতে খেটে মরছেন। পেশাদারিত্বের সবকিছু উজাড় দিয়েও দিয়েও না হচ্ছে তাদের পদোন্নতি, না পাচ্ছেন তারা উপযুক্ত বেতন। এনওসির বেড়াজালে আটকে পড়ে তারা প্রতারনার শিকার হচ্ছেন। শ্রমিক এবং অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত প্রবাসীরা নিপীড়িত হয়েও নিরুপায় হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। চুক্তিভিক্তিক নতুন আইন এসব মানুষকে আশার আলো দেখাচ্ছে।
শ্রমিকদের চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ, নিয়োগদাতা কোম্পানীর জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। যেমন, কোম্পানীগুলো প্রজেক্টে কর্মরত বাড়তি জনশক্তি অন্য কোনো কোম্পানীতে স্থানান্তর করতে পারবে। ফলে শ্রমিকদের দেশে ফেরত পাঠানোর খরচ সাশ্রয় হবে। এছাড়া চুক্তির মেয়াদ শেষ হবার পর দেশে ফিরে না গিয়ে অন্য কোথাও কাজ খুঁজে নেয়ার সুযোগ থাকায়, অবৈধ এবং কর্মস্থান থেকে পলাতক শ্রমিকের সংখ্যা হ্রাস পাবে।
কাতারে পুনঃপ্রবেশের ক্ষেত্রে ২ বছরের নিষেধাজ্ঞা থাকায় আগের চেয়ে অনেক ভালো চাকরির সুযোগ পেয়েও অনেকে কাতারে ফেরত আসতে পারেন না। নতুন আইনে এই নিষেধাজ্ঞ থাকছেনা। ফিরে যাওয়া যে সব শ্রমিক নতুন চুক্তিবদ্ধ হবেন তারা যে কোনো সময় কাতারে প্রবেশ করতে পারবেন। যা সবার জন্য সুখবরই বটে।
তবে নতুন চাকরিদাতার সাথে চুক্তি করার আগে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে সবাইকে। কারন, চাকরিদাতা চাইলে শ্রম মন্ত্রণালয়ে নালিশ করে কর্মচারীকে ঠেকিয়ে দিতে পারে। কিছুুদিন আগে কাতার পেট্রোলিয়াম থেকে বহু কর্মচারী ছাটাই করা হয়। যে সব কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন তারা কাতার পেট্রালিয়াম থেকে এনওসি পেলেও দেখা গেছে, কাতার আভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়ের ক্লিয়ারেন্স না পাওয়ায় তাদের দেশে ফিরে যেতে হয়েছে। তার মানে মালিক চাইলে নতুন আইনের সূক্ষ ফোকর দিয়ে কর্মচারীর চাকরী বদল করার সুযোগ বন্ধ করে দিতে পারে। এ বিষয়ে আগের চেয়ে প্রবাসীরা কতটা লাভবান হচ্ছেন সে নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
নতুন আইনে দেশ ত্যাগ করতে চাইলে কফিল বা চাকরীতাদার কাছ থেকে এক্সিট পারমিট বা খুরুজ নিতে হবেনা। দেশ ছাড়ার তিন দিন আগে চাকরীদতাকে জানাতে হবে এবং মেটর্যাশ ২ পদ্ধতিতে আভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হবে। এ সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মালিক বা স্পন্সরের সঙ্গে অনুমোদনের জন্য যোগাযোগ করবে। আর কাতার ছেড়ে যাবার ব্যাপারে কোনো ধরনের আপত্তি থাকে, তাহলে মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দিষ্ট কমিটি তার সাক্ষাৎকার গ্রহন করে সিদ্ধান্ত গ্রহন করবে।
পুরোনো আইনে মালিক পক্ষকেই খুরুজের ব্যবস্থা করে দিতে হয়। মালিক রাজী হলে, যে কোনো সময় এক্সিট পারমিট পাওয়া যায়। কিন্তু এখন সেটা কর্মীদের নিজেদেরকেই সামলাতে হবে। মেটর্যাশে আবেদন করাটা শ্রমিকদের জন্য খুব একটা সহজ কাজ হবেনা। আবেদন করার সময় অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুল-ত্রুটির জন্য অনেকে দেশে যাবার আগে বিপাকে পড়তে পারেন। নতুন আইনের অসুবিধা হচ্ছে মালিক পক্ষ চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষের কাছে অভিযোগ করে কর্মচারীর দেশত্যাগ স্থগিত করে দিতে পারে। এছাড়া জরুরী ভিত্তিতে দেশ ত্যাগ করার প্রয়োজন হলে মেটর্যাশে বিষয়টি কিভাবে কাজ করবে সেটা খুব একটা পরিস্কার নয়।
নতুন আইনে কাতার শ্রম মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া নিয়োগদাতা যদি তার কোনো কর্মী বা শ্রমিককে কাজে লাগায় তাহলে সেই মালিকের ৫০ হাজার রিয়াল জরিমানা এবং ৩ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। ফ্রি ভিসার নামে যারা প্রতারণার ব্যবসা করছেন তাদের জন্য এটা সকর্তবার্তা। এছাড়া কাতারে আসার পর শ্রমিকদের পাসপোর্ট কোম্পানীর কাছে জমা রাখতে হয়। ফলে অনেক সময় তাদের প্রতারনা এবং বঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে। নতুন আইনে কোনো নিয়াগদাতা যদি কর্মীর পাসপোর্ট আটকে রাখে তাহলে ১০-১৫ হাজার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
পরিবর্তনের কথা বলা হলেও নতুন আইনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরনো কাফালাপ্রথার প্রতিফলন এখনো বিদ্যমান। কাতারের নতুন শ্রম আইন ভালো কি মন্দ সেটা নিয়ে শুদ্ধ মতামত দেয়ার সময় এখনো আসেনি। এই আইন প্রবাসীদের জন্য সত্যিকারের মঙ্গল বয়ে আনবে কিনা তা কেবল সর্বক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ হবার পরই জানা যাবে।
৮ ডিসেম্বর, ২০১৮
