২০১৯ সালের জানুুয়ারিতে দোহা শহরের বিদ্দা পার্কে একটি পিকনিকে দেখা হল বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত বেশ ক’জন অনুজ পেশাজীবিদের সাথে। এদের কেউ ডাক্তার, কেউ প্রকৌশলী, কেউ ব্যাংকার, ম্যানেজার ইত্যাদি। সবাই নিজ নিজ পেশায় সুপ্রতিষ্ঠিত, আমাকে বড় ভাইয়ের মত শ্রদ্ধা করে। খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের উপর আমার ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন উপলক্ষ্যে আমাকে একটি নাগরিক সংবর্ধনা দেয়ার প্রস্তাব দেয়।
ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি সংগঠন থেকে এই ধরণের প্রস্তাব আসলেও তা আমি ফিরিয়ে দেই। তবে বিদ্দা পার্কে আগত অনুজ বন্ধুদের কাছে একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম থেকে কমিউনিটির সব পেশার মানুষকে সংযুক্ত করে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করার পরিকল্পনা শুনে আমি সম্মতি দেই।
যেই দেশ জ্ঞানী-গুনীদের কদর দিতে জানে না সেই দেশে নাকি জ্ঞানী-গুনী মানুষ জন্ম নেয় না। সমাজের ওইসব গুনী মানুষদের মূল্যায়ন করা না হলে দেশত্ববোধ হারিয়ে যেতে পারে। গুনী মানুষদের তাঁদের প্রাপ্য সন্মান দেয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই বিদ্দা পার্কের সবুজের আবহ মেখে এভাবে যাত্রা শুরু করল কাতারের ভিন্ন ধারার একটি সংগঠন “বাংলাদেশ নাগরিক সমাজ”।
পরবর্তীতে দফায় দফায় মিটিং, পরিকল্পনা ও আলোচনার পর কাতারের পাঁচ-তারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল দ্যা দোহা সিটির জাওহারা হলে সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানটি আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তারিখটি ছিল ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট ব্যাংকার শাদাত হোসেন, আর প্রধান অতিথি ছিলেন কাতারে নিযুক্ত বাংলাদেশের মান্যবর রাস্ট্রদূত আসুদ আহমেদ। অনুষ্ঠানে কাতারের বাংলাদেশ কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষের স্বপরিবারে স্বতঃষ্ফ’র্ত উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়। সব মিলিয়ে ২৫০ জন অতিথির উপস্থিতিতে জাওহারা হল ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। সম্বর্ধনা পর্ব ও রাতের খাবারের পর ছিল কাতারের পরিবেশিত আমার প্রথম এক সঙ্গীত সন্ধ্যা।
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ক্রেস্ট প্রদানের পর আমার অনুভূতি কি তা শোনার অপেক্ষায় সবাই। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে কি বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। কারণ মঞ্চে আমার পাশে উপবিষ্ট তিনজন গুণী মানুষ বহু আগেই কৃতিত্বের সাথে এই ডিগ্রী অর্জন করেছেন। মনে পড়ল ২০১০ সালের একটি ঘটনা।
ফেসবুকে ঢুুকেছি বছরখানেক হয়েছে। একদিন আমার স্কুল জীবনের একজন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফেসবুকে আমাকে ড. মামুন নামে সম্বোধন করে একটি পোস্ট দেয়। পোস্টটি দেখে আমি বিব্রত বোধ করি এবং বন্ধুকে আমার নামের আগের পদবী সংশোধন করতে বলি। কারন তখন আমার ডক্টরেট ডিগ্রী ছিলনা। শুনে আমার বন্ধু বিস্মিত হয়। আমি শিক্ষকতা পেশা থেকেই উচ্চশিক্ষার জন্য প্রবাসে যাই। তাই আমার বন্ধুরা ধরেই নিয়েছিল যে আমি পিএইচডি করে ফেলেছি।
বিষয়টি আমাকে ভীষণরকম আলোড়িত করে। আমি নিজেকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করি। নিজেকে প্রশ্ন করি, বিগত দিনগুলোতে আমার উল্লেখযোগ্য অর্জন কি? বিধাতা আমার মধ্যে যে মেধা ও প্রতিভা দিয়েছেন তার প্রতি পুরোপুরি সুবিচার কি আমি করতে পেরেছি? পৃথিবীতে গড়ে প্রতিদিন প্রায় দেড়লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে। সবার কথা কি মানুষ মনে রাখে? এদের অধিকাংশই সংসার, জীবিকার পেছনে ছুটোছুটি করেই কাটিয়ে দেয় জীবনের পুরোটা সময়। আমিও কি ওদের একজন হতে যাচ্ছি?
প্রতিটি মানুষকে বিধাতা কোনো একটি বিশেষ মিশন নিয়ে পাঠিয়েছেন এই ধরায়। তবে সেই মিশনের সফলতা নির্ভর করে আমাদের সাগ্রহ ইচ্ছের উপর। তাই কেবল জীবন ও জীবিকার পেছনে না ছুটে, আন্তরিকতার সাথে নিজের মেধা ও দক্ষতা কোনো সৃষ্টিমূলক কিংবা ব্যতিক্রমী কাজের জন্য কি আমরা নিয়োজিত করতে পারি না? যা আমাদের চলে যাবার পরও সমাজ ও মানতবতার কল্যানে আসবে?
এধরণের বিরামহীন ভাবনার ধূম্রজালে থেকে একসময় বেরিয়ে এসে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম, আবার ফিরে যাবো ক্যাম্পাস জীবনে। ২০১৪ সালের জানুয়ারীতে অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনী বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হল আমার ছাত্রজীবনের শেষ ইনিংস। বিশ্ববিদ্যালয় জানালো, খন্ডকালীন ছাত্র জিসাবে পিএইডি শেষ করতে সময় লাগবে ৬ বছর। শুনে হতাশ হয়ে গেলাম। তবে আমার সুপারভাইসর বললেন, গবেষণায় তড়িৎ অগ্রগতি দেখাতে পারলে চার বছরের মধ্যে ডিগ্রী শেষ করা সম্ভব।
শুনে অনুপ্রানিত হলাম। আঠঘাট বেঁধে শুরু করলাম গবেষণার কাজ। প্রতি দ’ুসপ্তাহে সুপারভাইসরের সাথে স্কাইপে মিটিং ছাড়াও বছরে দু’বার আস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ইউনিভার্সিটিতে কাজের অপ্রগতির উপর সেমিনার দিতে হত। উচ্চতর গবেষনা ও লেখাপড়ার সময় সুপারভাইজার হলেন ঈশ্বর। আমি খুবই ভাগ্যবান যে ড. আতাউরের মত একজন বিশ্বসেরা গবেষক এবং বিনয়ী মানুষকে সুপারভাইসর হিসাবে পেয়েছিলাম।
অফিস, সংসার সামলে নিয়ে পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করা ও মিউজিকের জন্যও আমাকে প্রচুর সময় দিতে হত। এরমধ্যে আবার বেশ কয়েকটি সামাজিক ও পেশাদার সংগঠনের নেতৃত্বেও জড়িয়ে পড়ি। সত্যি বলতে কি, জীবনের পড়ন্ত বেলায় এতো জটিলতার মধ্যে পড়ার টেবিলে বসে মনোনিবেশ করাটাই ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
মাঝে মধ্যে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেইে প্রশ্ন করতাম, পারবো তো? দ্বিধাগ্রস্থ থাকায় গবেষণা শুরু করার প্রথম দুই বছর অনেক কাছের বন্ধুদেরও বিষয়টি জানাইনি। মাঝে মাঝে হতাশায় ডুবে যেতাম। তখন আমার স্ত্রী আমাকে সাহস যোগাতো। কখনো গুগলে সফল মানুষের জীবন কাহিনী পড়ে নিজেকে উজ্জ্বীবিত করার চেষ্টা করতাম।
এভাবে কি করে পাঁচটি বছর কেটে গেলে টের পাইনি। দেখলাম শুরু করাটাই হচ্ছে আসল কথা। অবশেষে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে মাস্টার্র্স ডিগ্রী করার দীর্ঘ ৩২ বছর পর আবারো সমাবর্তন অনুষ্ঠানের মঞ্চে দাঁড়ালাম। সে এক ভিন্ন ধরণের অনুভ’তি যার সংজ্ঞা দেয়া মুশকিল। তবে পার্থক্য হল, এবার আমার পাশে ছিল আমার পুরো পরিবার।
ডিগ্রী শেষ করার পর মনে হয়েছে ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে এই ডিগ্রী কি আসলেই কি কোনো কাজে আসবে? পেশায় আইনজীবি আমার বড় মেয়ে মুনিরা সমাবর্তন অনুষ্ঠানের পর ফেসবুকে আমার টাইমলাইনে লিখল:
I hope that your work will be a source of inspiration to the young generation as a reminder that you are never too busy or too old to pursue your goals …dreams
আসলেই তাই। প্রাত্যহিক জীবনের ব্যস্ততা, কোনা কিছুই নিজের লক্ষ্য ও স্বপ্ন পূরনের জন্য বাধা হতে পারে না।
১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯
