লাল সবুজের প্রতীক আঁকা “বিমান বাংলাদেশ” হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র সরকারী আকাশ পরিবহন। বিমানের উড়োজাহাজ বহর, দেশের পতাকা বহন করে যাচ্ছে দেশ থেকে দেশান্তরে। একি কম কথা? বিমানের গায়ে চিত্রিত সফেদ বলাকা দেখে মনে পড়ে যায় কবিগুরু রবি ঠাকুরের বিখ্যাত বলাকা কবিতার ক’টি পংক্তিমালা “.. চলিয়াছে উন্মুক্ত ডানায় দ্বীপ হতে দ্বীপান্তরে, আজানা হইতে অজানায়”।

মাত্র তিনটি ডিসি-৩ বিমান নিয়ে ১৯৭২ সালে জাতীয় বাহন হিসাবে এর যাত্রা শুরু করে বিমান বাংলাদেশ। যাত্রীদের বলাকার মসৃণ পাখার মতো উৎকৃষ্ট সেবা দিতে না পারলেও ভালো মন্দ মিশিয়ে বাংলাদেশ বিমান পাড়ি দিয়েছে দীর্ঘ ৪৫ বছর। বিশেষ করে সিডিউল বিপর্যয় এবং যথা সময়ে ফ্লাইট না ছাড়ার কারণে বাংলাদেশ বিমানে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক দেশপ্রেমিক বাংলাদেশি নাগরিক।

ক’দিন আগে কাতারের বেশ কিছু বাংলদেশি বন্ধুদের মুখে শুনলাম বিমানের দোহা-চট্টগ্রাম রুটের ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে। শুনে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। বিমানের ফ্লাইটে কাতার থেকে বাংলাদেশগামী যাত্রীদের ষাট শতাংশ হলেন চট্টগ্রাম, ত্রিশ ভাগ সিলেট এবং বাকী দশ শতাংশ হলেন অন্যান জেলার অধিবাসী। তাই ভাবছিলাম, চট্টগ্রামের ফ্লাইট বন্ধ হয় কি করে? তবে কাতারে বাংলাদেশ বিমানের কান্ট্র্রি ম্যানেজারের সাথে কথা বলার পর পুরো বিষয়টি পরিস্কার হলো। বিমানের বেশ কয়েকটি জাহাজের মেরামতের কাজ চলছিল বলে প্রায় পুরো ফেব্রুয়ারী মাস চট্টগ্রামগামী ফ্লাইট বন্ধ ছিল। ফলে এ নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়। তবে চট্টগ্রামের ফ্লাইট এখন আগের মতই চলছে।

বর্তমানে দোহা থেকে ঢাকাগামী ফ্লাইটের সংখ্যা হচ্ছে সপ্তাহে তিনটি। একটি দোহা থেকে সরাসরি যাচ্ছে ঢাকা, আর অন্য দু’টি যথাক্রমে চট্টগ্রাম এবং সিলেট হয়ে ঢাকা যাচ্ছে। কাতারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা এখন ৩ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। এত বড় একটি কমিউনিটির জন্য সপ্তাহে মাত্র তিনটি ফ্লাইট খুবই অপ্রতুল। অন্যদিকে কাতার এয়ারওয়েজ দোহা-ঢাকা রুটে সপ্তাহে চৌদ্দটি ফ্লাইট চালু রেখেছে। সকাল কিংবা বিকাল, সপ্তাহের যে কোনো দিন কাতার এয়ারওয়েজে চড়ে এখন ঢাকা যাওয়া যায়। কিন্তু ঢাকার বাইরের গন্তব্যস্থল বিশেষতঃ চট্টগ্রাম ও সিলেটের যাত্রীদের সেই সুযাগে নেই। কাতার থেকে এই দু’টো শহরে বাংলাদেশ বিমানের রয়েছে মাত্র একটি করে ফ্লাইট। অপর্যাপ্ত ফ্লাইটের জন্য চট্টগ্রামগামী যাত্রীদের অনেকেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওমান এয়ারওয়েজে ভ্রমন করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ বিমান হারাচ্ছে মূল্যবান রেভেন্যু। চট্টগাম এবং সিলেট রুটে ফ্লাইটের স্যংখ বাড়ানো শুধু আবশ্যকই নয় বরং এটা এখন সময়ের দাবী।

ঢাকার বাইরে অন্যান্য গন্তব্যস্থানের যাত্রীদের অনেক সময় সংযোজককারী ফ্লাইটের জন্য ঢাকায় রাত কাটাতে হয়। এজন্য যাত্রীদের যেসব দুর্ভোগ পোহাতে হয় তা বাংলাদেশ বিমানের মান ক্ষুন্ন করছে। যেমন ট্রানজিট যাত্রীদের এয়ারপোর্টের কাছাকাছি মানসন্মত কোনো হোটেলে অবস্থান করার কথা। কিন্তু দেখা গেছে, অধিকাংশ সময় যাত্রীদের উত্তরার কোনো অখ্যাত গলির ফ্ল্যাটে তুলে দেয়া হচ্ছে। কখনো এক রুমে পাঁচ থেকে সাতজনকে গাদাগাদি করে রাত কাটাতে হয়। এ বিষয়টির দিকে বিমানের নজর দিতে হবে এবং ট্রাভেল এজেন্টরা যাতে যাত্রীদের মানসন্মত সেবা দেয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

কাতার এয়ারওয়েজে একজন ঢাকাগামী যাত্রী, রিটার্ন টিকেটের সাথে যাওয়া-আসা মিলিয়ে চল্লিশ কিলো করে মোট আশি কিলোর মাল-পত্র সাথে নিতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশ বিমান যাওয়া-আসা মিলিয়ে মোট আশি কিলো দিলেও আসার পথে দিচ্ছে কেবল ৩০ কিলো।

দেশে ছুটি কাটিয়ে ফেরার সময় একজন প্রবাসী কেনাকাটা করে বিভিন্ন পন্য সামগ্রী ও খাবার দাবার সাথে করে নিয়ে আসেন বলে ফেরার পথে মালপ্রত্রের সংখ্যা ও ওজন অনেক বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিমানের ৩০ কিলোগ্রাম অপর্যাপ্ত বলেই মনে হয়। এছাড়াভাড়ার ক্ষেত্রেও কাতার এয়ারওয়েজের সাথে প্রতিযোগীতায় পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশ বিমান হাতে বহন করা ব্যাগের ওজন নিয়ে বেশ ছাড় দেয় যা যাত্রীদের জন্য বাড়তি বোনাস বৈকি।

দোহা-ঢাকা রুটে এখন বাংলাদেশেরই দুটো বেসরকারী বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এবং রিজেন্টস নতুন ফ্লাইট চালু করেছে। এদের ভাড়া বিমানের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম। ফলে এদের কাছে বহু যাত্রী হারাচ্ছে বাংলাদেশ বিমান ।

একজন যাত্রী টিকিট কাটবার আগে সর্বপ্রথম বিবেচনা করে ভাড়া। তারপর যাচাই করে দেখে সাথে করে কি পরিমান মাল-পত্র নিতে পারবে। আকাশ পথে ভ্রমনের সময় একজন যাত্রীর কাছে বিবেচ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু’টো বিষয়ে পিছিয়ে থাকায় বাংলাদেশ বিমান ছেড়ে অন্য এয়ারলাইন্সের দিকে ঝুঁকে পড়ছে বাংলাদেশি যাত্রী।

বিমানের টিকিট কাটার পর একজন প্রবাসী যাত্রীর মন পড়ে থাকে স্বদেশে। প্রতিক্ষার প্রহর গুনতে থাকেন কখন দেখবেন তিনি প্রিয়জনদের মুখ। যাত্রায় এক ঘন্টার বিলম্ব, ঘরমুখী উন্মুখ যাত্রীদের কাছে মনে হতে পারে এক যুগেরও বেশী। এয়ারলাইন্সগুলোকে এই বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে। এছাড়া ঢাকা বিমান বন্দরে যাতে যাত্রীদের মালপত্র তাড়াতাগি বেল্টে চলে আসে সে জন্য বাড়তি উদ্যোগ নিতে হবে।

বাজেট এয়ারলাইন্সের আগমনের ফলে আকাশ পরিবহনে প্রতিযোগীতা এখন তুঙ্গে। তবে কাতার- বাংলাদেশ রুটে সফল হতে হলে বিমান বাংলাদেশ, ইউএস-বাংলা, ও রিজেন্টস এয়ারলাইন্সকে সবার আগে পাল্লা দিতে হবে কাতার এয়ারওয়েজের মত অত্যন্ত সফল এবং নন্দিত পরিবহন সংস্থার সাথে। তাই খুব সহসা সময়োপযুগী কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে প্রবাসী বাংলাদেশি যাত্রী, স্বদেশের পরিবহনকে উপেক্ষা করে অন্য সংস্থার বিমানে চড়েই আকাশ পথ পাড়ি দেবে।

 

২৩ মার্চ, ২০১৯