অর্থ আত্মসাৎ করে প্রবাসীদের কাতার ছেড়ে পালিয়ে যাবার ঘটনা নতুন কিছু নয়। কিছুদিন আগে কোয়ালিটি শপিং সেন্টারের প্রবাসী ভারতীয় ব্যবস্থাপকের লাখ লাখ রিয়াল নিয়ে উধাও হয়ে যাবার ঘটনা বেশ আলোড়ন তুলেছিল। সেই থেকে দোহা শহরের জনপ্রিয় ডিপার্টমেন্ট ষ্টোর কোয়ালিটির বহু শাখা বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসা লাটে উঠে। বাংলাদেশ কমিউনিটিতেও এমন ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের অপরাধের জন্য ওই স্পন্সরের অধীনে একই কমিউনিটির অন্য যারা কাজ করছেন, তারা বৈষম্য এবং হয়রানির শিকার হন। অনেককে স্পন্সর দেশে পাঠিয়ে দেন। একজনের অপরাধের জন্য এভাবে অনেক নিরপরাধ মানুষ সাজা পান। যারা এসব কাজ করছেন তারা ভাবেন, আমিতো পার পেয়ে গেলাম। কিন্তু তিনি যে পুরো দেশটাকে কাঠগড়ায় তুলে দিয়ে গেলেন, সেই কথা কখনো ভাবেন না।
তবে কথায় বলে, যত দোষ নন্দ ঘোষ। বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে অনেকটা হয়েছে তাই। অন্যান্য কমিউনিটির তুলনায় অপরাধ নগন্য হলেও বাংলাদেশিদের কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, যা কাতারে বাংলাদেশের ক্ষয়িষ্ণু ভাবমূর্তিকে আরো ভঙ্গুর করে তুলছে। কাতারের বিভিন্ন প্রশাসনিক, সামাজিক স্তর এবং গনমাধ্যমে,বাংলাদেশিদের উল্লেখ করার মত প্রভাব প্রতিপত্তি নেই বলে বাংলাদেশ কমিউনিটি সম্পর্কে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নেতিবাচক এবং গৎবাঁধা ধারণাকে পরিবর্তন করা যাচ্ছেনা। তবে এই প্রতিক’ল পরিবেশ বদলে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ কমিউনিটিতে সাংগঠনিক এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে বেশ কিছু ফলপ্রসূ উদ্যোগ চোখে পড়ছে। এগুলোর মধ্যে সাম্প্রতি কাতারের সমুদ্র সৈকত পরিচ্ছন্ন অভিযান, কাতারের জাতীয় দিবসের প্যারেডে কমিউনিটির পক্ষ থেকে একটি বড়সড় দলের অংশ গ্রহন উল্লেখযোগ্য।
অধিকাংশ বাংলাদেশী কর্মী কোনো দেশে যাওয়ার আগে সেই দেশের আইন-কানুন এবং নিজের কাজের চুক্তিপত্র সম্পর্কে খুব বেশী একটা কিছু জানেন না। ফলে খুব সহজেই তারা প্রতারণার শিকার হন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সম্প্রতি কিছুু পদক্ষেপও নেওয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাস এবং কাতার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বিভিন্ন শ্রমিক ক্যাম্পে গিয়ে সচেতনামূলক ওয়ার্কসপ এবং শ্রমিকদের ট্রেনিংও দিচ্ছে একটি সংগঠন। কাতারের গনমাধ্যমে এসব খবর এসেছে। আশাকরি এ ধরণের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
মাদকদ্রব্য সেবন এবং পাচার, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। কাতারের বিন্নি কারাগারে যেসব বাংলাদেশি রয়েছেন তাদের প্রায় ৫০ শতাংশই মাদক সংক্রান্ত অপরাধে সাজা ভোগ করছেন। সবচেয়ে দুঃখজনক হল, অনেক নিরপরাধ মানুষ পাচারকারীদের ফাঁদে পড়ে সাজা ভোগ করছেন। ঢাকা, চট্টগ্রামের আর্ন্তজাতিক বিমানন্দরে পাচারকারীরা শিকার ধরার জন্য ওত পেতে থাকে। বিশেষ করে সরলমনা শ্রমিকদেরই তারা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
দেখা যায়, বিমান বন্দরে হঠাৎ একজন হাতে একটি প্যাকেট নিয়ে কোনো যাত্রীকে বলবে, আমার এই ছোট্ট প্যাকেটটা দয়া করে নিয়ে যাবেন? কাতারে নামলেই আমার আত্মীয় আপনার সাথে যোগাযোগ করবে। কিন্তু যে আত্মীয়ের কথা বলা হচ্ছে, তার কোনো ঠিকানা কিংবা টেলিফোন তারা দেয়না। প্যাকেটে কি আছে জিজ্ঞাসা করলে বলা হয় শুকনো ফল, জরুরী ঔষধ, ঘরে তৈরী করা পিঠা, আচার ইত্যাদি। বিদেশে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নেই এমন অনেকেই সরল মনে এইসব কথা বিশ্বাস করে প্যাকেট সাথে করে নিয়ে আসে এবং পাতানো ফাঁদে পা দেয়। অথচ কাতারের বিমান বন্দরে ধরা পড়লে কি যে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, সে বিষয়ে তার পুরোপুরি অজ্ঞ বলা যায়।
অনেক সময় মাদক পাচারকারীরা যাত্রীদের আর্থিক প্রলোভনও দেখায়। যেমন, অতিরিক্ত মালামাল নেয়ার বাড়তি খরচ, কিংবা টিকেটের কিয়দংশ বহন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাত্রীদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে। অপরিচিত কারও কোনো প্যাকেট কিংবা মালামাল কখনো নেয়া উচিত নয়। এমনকি পরিচিত হলেও তা খুলে দেখে পরখ দেখে নিতে হবে। বিমানবন্দরে নিজের মালামাল রেখে কোথাও যাওয়া ঠিক নয়। স্যুটকেস কিংবা ব্যাগের বাড়তি প্যাকেটগুলো বন্ধ করে দেয়া উচিত যাতে কেউ নিষিদ্ধ বস্তু ঢুকিয়ে দিতে না পারে। বিমানবন্দরের কর্তৃপক্ষ আপনার ব্যাগে কি আছে সে জন্য আপনাকেই দায়ী করবে। এতে কোনো ওজর আপত্তি খাটবেনা। তাই এই ব্যাপারে আমাদের শ্রমিক ভায়েরাসহ সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। মালামাল আনার নিয়মকানুন সম্পর্কে জানতে হবে।
সব রকমের ওষুধের জন্য ডাক্তারের প্রেস্ক্রিপশান সাথে রাখা আবশ্যক। এ ছাড়া যারা নিয়মত কোনো ওষুধ সেবন করেন, তাদের ব্র্যান্ড নয় ওষুধের মূল উপাদানের নাম মনে রাখা উচিত। কারন দেশে দেশে ওষুধের ব্র্যান্ডের নাম ভিন্ন হতে পারে। আমি একজন যাত্রীর কথা জানি, প্রেস্ক্রিপশান সাথে না থাকাতে যার জেলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে দেশে থেকে মুঠো ফোনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে পাঠানো প্রেস্ক্রিপশানের ছবি দেখানোর পর তিনি সেই যাত্রায় রক্ষা পান।
ইদানিং হারবাল বা ভেষজ ওষুধের আড়ালে কৌশলে নেশাজাত দ্রব্য গাঁজা, ভাং ইত্যাদি পাচার করা হচ্ছে। এক ধরনের গাছের পাতা থেকে এসব মাদক তৈরী করা হয়। তাই অনেক যাত্রীকে ভেষজ ওষুদের নামে নেশাজাত দ্রব্যও গছিয়ে দেয়া হয়। কাতারে মাদক ও নেশাজাত দ্রব্য ব্যবহার ও পাচারের জন্য সাজা খুবই কড়া। কাতার আইনে এজন্য জেল, পাঁচ লাখ রিয়াল জরিমানাসহ সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ডেরও বিধান রয়েছে। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিদেশগামী যাত্রীদের সচেতন করতে বিমানবন্দরে সতর্কতামূলক প্রচারপত্র বিতরণ সহ অন্যান্য পদক্ষেপ নিতে পারে।
প্রতি বছর জুন মাসের ২৬ তারিখ বিশ্বব্যাপী আর্ন্তজাতিক মাদক বিরোধী দিবস পালিত হয়। কাতারের বাংলাদেশ কমিউিনিটি এই দিনটিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে সচতেনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিতে পারে।
৭ মার্চ, ২০১৯
