মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে এখন চলছে গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহ। গত ৮ জুন কুয়েতে বিশ্বের ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে সংবাদ মাধ্যমে। ওই দিন কুয়েতের তাপমাত্রা ৬৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস ছুঁয়ে যায়। একই দিন সৌদি আরবের আলমাজমাহ এলাকায় ৫৫ ডিগ্রী তাপামাত্রা রেকর্ড করা হয়। অন্যদিকে কাতারের তাপমাত্রাও ৪৮ ডিগ্রী ছাড়িয়ে যায়।
মানুষের দেহের স্বাভাবিক তাপপাত্রা হচ্ছে ৩৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস। শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রী ছাড়িয়ে গেলে যে মারাত্মক স্বাস্থ্যগত জটিলতার সৃষ্টি হয়, তাকে বলা হয় হিট স্ট্রোক। স্বাভাবিক অবস্থায় রক্ত শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভ’মিকা রাখে। প্রয়োজনে ঘামের মাধ্যমে দেহের তাপমাত্রা কমে যায়। কিন্তু প্রচন্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে দেহের তাপমাত্রা বিপদসীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে মানুষের হিট স্ট্রোক হয়। হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত চিকিৎসা দেয়া না হলে মৃত্যুও হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হিট স্ট্রোকে মারা যাচ্ছে মানুষ।
হিট স্ট্রোকের ফলে দেহে যে ধরণের প্রতিক্রিয়া হয়, সেই লক্ষণগুলো সম্পর্কে সবার স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার। প্রাথমিকভাবে শরীরের মাংসপেশিতে ব্যথা হয়, মাথাব্যথা, ঝিমঝিম করা, বমি বমি ভাব, অসংলগ্ন আচরণ ইত্যাদি দেখা দেয়। হিট স্ট্রোকের মারাত্মক পর্যায়ের লক্ষণগুলো হচ্ছে -ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া, ত্বক শুষ্ক ও লালচে হয়ে যাওয়া, নিশ্বাস দ্রুত হওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া, খিঁচুনি ইত্যাদি। এমনকি রোগি অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে।
বাইরে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা হিট স্ট্রোকের বিপদ থেকে বাঁচতে মাথায় ছাতা কিংবা বা কাপড়জাতীয় কিছু দিয়ে মাথা ঢেকে রাখতে পারেন। প্রচুর পানি, ফলের রস, ও অন্যান্য তরল পান করতে হবে। গরমে ঘামের সঙ্গে পানি ও লবন দুটো বেরিয়ে যায় বলে খাবার স্যালাইনও পান করতে হবে। তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধিকারী পানীয় যেমন-চা ও কফি যথাসম্ভব কম পান করা উচিত।
ছোট-বড় নানা বয়সের মানুষ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারে। তবে যাঁরা রোদের মধ্যে কায়িক পরিশ্রম করেন, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নির্মান খাতে কর্মরত শ্রমিকদের হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কাতারে শ্রম আইনের আওতায় ১৫ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দিনের বেলায় সূর্যের তাপ যখন সবচেয়ে তীব্র থাকে তখন অর্থাৎ সকাল ১১টা ৩০মিনিট থেকে দুপুর ৩ টা পর্যন্ত উন্মুক্ত এলাকায় শ্রমিকদের কাজ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এর পরও সচেতনতার অভাবে বহু শ্রমিকের হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার খবর আসছে।
প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে হিট স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে রোগীকে দ্রুত শীতল কোনো স্থানে নিয়ে ফ্যান বা এসি ছেড়ে দিতে হবে। ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে নেওয়া, সম্ভব হলে গোসল করা উচিত। তবে হিট স্ট্রোক হলে জীবন বিপন্ন না করে তড়িৎ হাসপাতালে চলে যাওয়া উচিত। যাদের যানবাহনের ব্যবস্থা নাই, তাদের দেরি না করে ৯৯৯-এ ডায়াল করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা উচিত।
সেদিন কাতারে কর্মরত একজন নেপালি চিকিৎসকের কাছে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের কথা জানতে পারলাম। ক্লিনিকে আসতে ১০/১৫ মিনিট দেরী হলে ওই শ্রমিককে আর বাঁচানো যেতো না বলে জানালেন সেই চিকিৎসক।
নির্মাণ খাতে কর্মরত ওই বাংলাদেশি শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়লে অ্যাম্বুলেন্স না ডেকে তাঁর একজন বন্ধুকে টেলিফোন করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে অনুরোধ করেন। শ্রমিকটির বন্ধু গাড়ী নিয়ে কর্মস্থলে এসে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে লেগে যায় ঘন্টারও বেশী সময়। অথচ সরাসরি অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হলে পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে চিকিৎসা শুরু হয়ে যেতে পারতো। হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু হতে পারে। তাই এ ধরনের পরিস্থিতিতে কারো সাহায্যের জন্য অপেক্ষা না করে রোগীকে সরাসরি ৯৯৯ নম্বরে টেলিফোন করা উচিত।
বাংলাদেশি কর্মী ও শ্রমিকদের মধ্যে দ্রুত চিকিৎসার ব্যাপারে সচেতনার অভাব রয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স ডাকলে যদি কোম্পানীর কাছে জবাবদিহি করতে হয় কিংবা চিকিৎসার সব খরচ নিজেকে বহন করতে হয় – এই ভেবে তারা ৯৯৯ নাম্বারে ফোন করতে দ্বিধান্বিত। এটা সম্পূর্ণ ভ’ল ধারণা। জরুরী চিকিৎসার জন্য যে কোনো কাতারি রেসিডেন্ট এম্বুলেন্স ডাকতে পারেন এবং এজন্য তাঁকে এম্বুলেন্সের খরচ বহন করতে হবে না। এ ব্যাপারে হামাদ হাসপাতালের ষ্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
বাংলাদেশিদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ দূূতাবাস এবং কমিউনিটি সংগঠনগুলোর যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া দরকার। হিট স্ট্রোকে জীবন বিপদাপন্ন হতে পারে। তাই এই গরমে সবাইকে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করে চলা উচিত এবং হিট স্ট্রোকের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরী না করে ৯৯৯ নম্বরে টেলিফোন করে হাসাপাতালে চিকিৎসা নেওয়া উত্তম।
