সিডনী ছেড়ে মরুর দেশ কাতার পাড়ি দিয়েছি এক যুগ পেরিয়ে গেছে। বছর হিসেব করলে অনেক, অথচ কেনো জানি মনে হয়, কাতারে এসেছি এইতো সেদিনের কথা। পেছনে ফিরে তাকালে ফেলে আসা দিনগুলো গোধূলি বেলার এক চিলতে আলো হয়ে বুকের গভীরে বার বার পরশ বুলিয়ে যায়।
আমরা প্রায় সবাই অতীত নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। দাদু, নানুরা বলতেন বৃটিশ আমলেই ভালো ছিলাম, বয়স্করা বলেন ছেলেবেলাতেই ভালো ছিলাম। আবার অনেকে বলেন বিয়ের আগেই ভালো ছিলাম। আহারে! আগের দিনগুলি কতইনা মধুর ছিল ইত্যাদি। বর্তমান হচ্ছে এলামেলো, ভবিষ্যত অনিশ্চত। তাই বুকের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা অতীতের দিনগুলো সতত মধুর হয়।
দোহা শহর আর আগের মত নেই। অনেক কিছুই বদলে গেছে। ইদানিং দোহা শহরের রাস্তায় বের হলে পরিবর্তনের হাওয়া আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। দোহার বদলে যাওয়া অলি-গলির ভাঁজে ভাঁজে তাই খুঁজে ফিরি ফেলে আসা কিছু ভালোলাগার উপলব্ধি, কিছু প্রিয় মুখ, কিছু প্রিয় মুহূর্ত।
জীবনের পড়ন্ত বেলায় অস্ট্রেলিয়ার সিডনী শহরের দুই দশকের সাজানো সংসার, স্থিতিশীল সরকারী চাকুরী পেছনে ফেলে হঠাৎ করে কাতার চলে আসি। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত অনেকেই সাধারণতঃ এই বয়সে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় কিংবা অন্যান্য দেশে পাড়ি জমান। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ঘটেছিল ঠিক তার উল্টো। তাই অনেকের কাছে আমার মধ্যপ্রাচ্যে আসাটা ছিল অনেকটা অস্বাভাবিক প্রস্থান।
অস্ট্রেলিয়ায় একজন পেশাদার প্রকৌশলী হিসাবে সরকারী চাকুরী করতাম। এই চাকুরীতেই পেশা জীবনের বাকী দিনগুলো সহজেই কাটিয়ে দিতে পারতাম। পঞ্চোশোর্ধ বয়সে সরকারী চাকুরীর নিরাপত্তা বলয় ছেড়ে এতবড়ো ঝুঁকি নিয়ে আমার মধ্যপ্রাচ্যে চলে যাওয়াটা অনেকের কাছে রহস্যজনকও মনে হয়েছে। অর্থ উপার্জনের জন্যই যদি মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া, তাহরে আরও আগে গেলামনা কেনো? তাই স্বভাবতঃই অনেকের ধারণা, চাকুরী চলে যাবার কারণেই হয়তো আমার এমন করে চলে যাওয়া।
নব্বই দশকের প্রথম দিকের কথা। সিডনীতে দু’দিনের একটি ট্রেনিং করছি। ক্লাসের পেছন সারিতে বসা একজন লেবানীজ তরুন মোবাইল ফোন নিয়ে উচ্চস্বরে অবিরাম কথা বলে যাচ্ছিল যা আমাদের সবাইকে বিরক্ত করছিল। সামনের সারিতে বসা একজন ভদ্রমহিলা খবুই বিনয়ের সাথে তাকে নীচু স্বরে কথা বলতে অনুরোধ করলেন। ওমনি সাথে সাথে ছেলেটি ক্ষিপ্ত হয়ে খিস্তি খাউর আওড়িয়ে তেড়ে এল ওই মহিলার দিকে এবং গায়ে হাত দিতে উদ্যত হল। ঘটনার আকস্মিকতায় ট্রেইনার সহ আমরা সবাই এমনভাবে হকচকিয়ে গেলাম যে, সিকিউরিটিকে ডাকার কথাও সবাই ভুলে গেলো। সামান্য একটি ব্যাপার নিয়ে এমন কেউ করতে পারে তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল সবার।
সিডনীতে আরব জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে লেবানীজ। এদের অধিকাংশ আবার মুসলিম হওয়াতে, লোবানীজদের সব অপকর্মের দায় মুসলিম হিসাবে আমাদেরও নিতে হত। একবার আমার এক বন্ধু একজন লেবানীজের গাড়ী ওভারটেক করায় তাকে সারা শহর তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল ওই লেবানীজ। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আরবদের প্রতি নিজের অজান্তেই একটা বিরূপ ধারণা জন্মে গিয়েছিল। ভাল মন্দ মিশিয়েই মানুষ। তাই বলে পুরো লেবানীজ সম্প্রদায়কে আমি মন্দ বলছিনা। তবে সিডনী শহরে বসবাসরত আরব-অস্ট্রেলিয়ানদের আচরণ দেখার পর ভেবেছি আর যেখানেই যাই না কেনো, মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশে কখনো নয়। কিন্তু কথায় বলে না? “Man proposes, god disposes…”
মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। চায় একটা, পায় অন্যটা। যে দেশে কখনো আসতে চাইনি, শেষ পর্যন্ত সেই আরব দেশেই আমাকে পাঠালেন বিধাতা। আর এখানেই কাটলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু সময়। বড়ই বিচিত্র! বিধাতার লীলাখেলা বোঝা দায়।
সিডনী থাকাকালীন সঙ্গীত চর্চা ও পরিবেশনা, রেডিও পরিচালনা, এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে এমন করে জড়িয়ে পড়েছিলাম যে নিজের চাকরী এবং পেশাগত উৎকর্ষতা অর্জনের দিকে নজর দেয়া আমার ঠিক হয়ে ওঠেনি। এক সময় মনে হল, বিধাতার দেয়া মেধার প্রতি আমি সুবিচার করছিনা। তাছাড়া আমার অফিসে দু’একজন অবসরে না যাওয়া পর্যন্ত দেখলাম আমার উপরে উঠার সিঁড়ি বন্ধ। তাই চাকরী বদলানোর চিন্তা-ভাবনা করছিলাম।
এর কিছুদিন আগে ইঞ্জিনিয়ার্স অস্ট্রেলিয়ার সাময়িকীতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান মেগা-প্রজেক্ট নিয়ে করা একটি প্রচ্ছদ কাহিনী আমার চোখে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যে তখন নির্মাণ শিল্পে রীতিমত বিপ্লব চলছে। আরব উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিশাল নির্মাণ প্রজেক্টে কাজ করার জন্য বিশ্বের সেরা ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কন্সট্রাকশন কোস্পানীগুলো যেনো হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আমার পরিচিত বেশ কিছু অস্ট্রেলিয়ান সহকর্মী ইতিমধ্যে ছুটে গেছেন মধ্যপ্রাচ্যে।
প্রচ্ছদ কাহিনীতে উল্লেখ করা হয়, নির্মানকার্যের জন্য ব্যবহৃত বিশ্বের ভারী ক্রেইনের প্রায় ৭০ শতাংশই তখন মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয়। অষ্ট্রেলিয়ান ইনিঞ্জয়ার্স ইন্সটিটিউটের প্রতিবেদনটি আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। একজন পুর-প্রকৌশলী হয়ে এই ধরনের পরিকাঠামো বিষয়ক মেগা-প্রজেক্টে সম্পৃক্ত হবার দুর্নিবার আকর্ষণ, আমাকে মধ্যপ্রাচ্যের ধূসর প্রান্তরে নিয়ে যাবার উদ্বীপনা যোগাতে থাকে। অন-লাইনে চাকরীর খোঁজ নিতে থাকি। খুব সহসা Maunsell Consulting (এখনকার AECOM) কোম্পানী থেকে দুবাই শহরের একটি মেগা-প্রজেক্টে চাকরীর অফার পেয়ে গেলাম।
অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে ফের প্রবাস যাত্রা আমার জন্য খুব একটা সহজ ছিলনা। হাসি-কান্না ভরা জীবনের প্রায় কুড়িটি বছর কাটিয়ে দিয়েছি সিডনী শহরে। ওই শহরের মাটি, আলো-বাতাস আর মানুষের জন্য এক ধরনের ভালোবাসা জন্মে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, স্বদেশের বাইরে এই অস্ট্রেলিয়া হল আমার স্থায়ী আবাস; এই দেশ ছেড়ে আবার যাবো কোথায়? অথচ মাতৃভ’মি যে কখনো প্রবাসের সমত’ল্য হতে পারেনা সে কথা আবেগের আবহে ক্ষণিকের জন্য হলেও বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলাম। মাতৃভ’মির শেকড় ছিড়ে একবার যখন প্রবাস পাড়ি দিতে পেরেছি তখন অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে অন্য প্রবাসভ’মিতে যেতে সঙ্কোচ কিংবা দ্বিধা হবে কেনো?
এ ধরনের আবোল-তাবোল ভাবনায় আবিষ্ট হয়ে যখন দিন কাটছিল তখনই দেখি চিঠির বাক্সে Maunsell Consulting থেকে চাকরীর অফার লেটার এবং রিটার্ন টিকেট এসে হাজির। দু’সপ্তাহের মধ্যে কোম্পানীর দুবাই হেড অফিসে যোগ দিতে হবে। রীতিমত ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম।
ভাবলাম, মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে পরিস্থিতি সরজমিনে যাচাই করে না দেখে অস্ট্রেলিয়ার চাকরীটা ছেড়ে দেয়া ঠিক হবেনা। হিসাব কষে দেখলাম, আমার প্রায় আট মাসের লংসার্ভিস ছুটি জমা হয়ে আছে। বসের সাথে কথা বললাম। দীর্ঘদিনের জন্য ছুটি নেবো শুনে তিনি একটু অবাক হলেন। আমি বললাম,“বহুদিন একটানা কাজ করেছি, এবার একান্ত নিজের জন্য কিছু করার উদ্দেশ্যে আমার একটা বিরতির প্রয়োজন।” উনি একটু ভেবে বললেন, “ঠিক আছে, এই যদি হয় তোমার সিদ্ধান্ত, তাহলে যাও।”
এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন অফিস থেকে আবার ইমেইল আসলো, এই মুহুর্তে দুবাই নয়, ওদের কাতার অফিসে আমাকে খুব দরকার। কাতারে কিছুদিন কাজ করার পর আমাকে হেড অফিসে আবার ফিরে যেতে হবে। সত্যি বলতে কি, মধ্যপ্রাচ্য বলতে আমি মূলতঃ দুবাইকেই বুঝতাম। কাতারের মতো দেশেও যে বড় বড় প্রজেক্ট হচ্ছে সে কথা আমার কখনোই জানা ছিলনা। এরকম অনেকটা অনির্ধারিতভাবেই ২০০৮ সালের ৩০ জুন আমার কাতারে আগমন।
কাতারের প্রথম দিনগুলোতে মনটা বড় উদাস থাকতো। নিজেকে সবসময় শামুকের মত গুটিয়ে রাখতাম। খুঁজে ফিরতাম অস্ট্রেলিয়ার ফেলে আসা দিনগুলো। কিন্তু সময়ের আবর্তনে ধীরে ধীরে কাতারের স্মৃতি হৃদয়ের পুরো জমিটাই দখল করে নিয়েছে। এখন আর সিডনীর ফেলে আসা জীবনের কথা ভেবে নিজের ভেতরে কখনো শোক কিংবা বৈরাগ্য অনুভব করিনা।
এইতো কিছুদিন আগে সিডনী শহরে ছুটি কাটাতে গিয়ে নিজেকে আগন্তুকের মত মনে হচ্ছিল। রাস্তায় চলতে গিয়ে কোথাও শুনতে পেলামনা মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা অতি পরিচিত আযানের ধ্বনি। রেস্তারাঁর সামনে গাড়ীতে বসে কাড়াক চা আর সিঙ্গারা খাওয়ার জন্য নিজের অগোচরে আনচান করছিল মন। এখানে দেখি শুধু কাপুচিনো আর কাপুচিনো।
পেট্রোল পাম্পে তেল ভরতে গিয়ে নিজের অজান্তেই গাড়ীতে অপেক্ষা করছিলাম কখন আসবে পেট্রাল বয়, তেল ঢেলে দেবে গাড়ীর ট্যাংকে। স্ত্রীর ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম। ও হ্যাঁ! এখানেতো নিজেকেই পেট্রোল ভরতে হবে। পরিবার নিয়ে বেশ কয়েকটা আড্ডায় গিয়ে নিজেকে কেমন বেখাপ্পা লাগছিল। আড্ডার মধ্যমনি হয়েও মনে হচ্ছিল আমি যেন আড্ডায় নেই। বহু দিনের পুরোনো বন্ধুদের আবার যেনো নতুন করে আবিস্কার করলাম।
২০২০ সালের বছরের ৩০ জুন, কাতারে আমার এক যুগ পূর্ণ হল। যদিও দীর্ঘ বারোটি বছর পেরিয়ে গেছে, তবুও নস্টালজিয়ার অলি-গলিতে হাঁটতে গিয়ে মনে হয় কাতারে এলাম এইতো সেদিন। কাতারে গত একযুগের পথ চলায় সমাজের বিত্তবান মানুষের সাথে যেমন মিশেছি, তেমনি অভাবী, শ্রমজীবী আমজনতার সাথে বসেও আড্ডা দিয়েছি। দোহার রাস্তায়, চোরা গলিতে, বাংলাদেশী চায়ের টেবিলে বসে কান পেতে শুনেছি জীবন থেকে নেয়া এমন কত সুখ দুঃখের গল্প। সত্যি বলতে কি, সুখ, দুঃখ মিলিয়ে কাতারে কাটানো এক যুগ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়ের অংশ হয়ে থাকবে।
কাতারের বহতা দিনগুলোতে পেয়েছি মানুষের নিরন্তর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। মিলেছে বহু আলোকিত ও ভালো মানুষের সন্ধান। পেয়েছি অনেক অকৃত্রিম বন্ধুর সান্নিধ্য। স্বজনহীন প্রবাসে আনন্দ বেদনার সাথী হয়ে ছায়ার মতো এরাই ছিলেন আমার ও আমার পরিবারের পাশে।
বহু সামাজিক, পেশাদার সংগঠনের সাথে কাজ করার ও নেতৃত্ব দেয়ার যেমন সুযোগ হয়েছে তেমনি চারপাশের মানুষ থেকে শিখেছিও অনেক কিছু। তাইতো একযুগ আগের তুলনায় আজকের আমি, একজন অনেক বেশী সমৃদ্ধ এবং পরিপূর্ণ মানুষ। মরুর দেশ কাতারে এসে ভালোলাগার বহতা নদীতে অবগাহন করা সুযোগ করে দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই মহান বিধাতাকে।
কাতারের পাট চুকিয়ে আবার অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যাবার ডাক শুনতে পাচ্ছি। এ বছরই ফিরে যেতে হবে অস্ট্রেলিয়া। আসা যাওয়া, এতো প্রকৃতিরই নিয়ম। আমরা সবাই যেনো যাযাবর। মরুর বেদুঈনের মত ছুটে যাচ্ছি এক গন্তব্য থেকে অন্য গন্তব্যস্থলে। সব খেলা সাঙ্গ হলে একদিন পাড়ি জমাবো পরপারে।
অস্ট্রেলিয়ায় থাকাকালীন মনে হত, চারপাশ ঘিরে থাকা জগতটাই হচ্ছে আমার একমাত্র পৃথিবী। এভাবে গ্রিন হাউসের কৃত্রিম পরিবেশে গড়ে ওঠা লতাপাতর মতো কখন যে নিজের অস্তিত্বকেই হারাতে বসেছিলাম, জানি না। কিন্তু কাতারে আসার পর মনে হল, গ্রিন হাউসের কাঁচের দেয়ালের বাইরে রয়েছে অন্য এক পৃথিবী। মধ্যপ্রাচ্যের মরু প্রান্তরে এসে অবশেষে খুঁজে পেয়েছি নিজের অস্তিত্বের ক্লোন দিয়ে গড়া সেই যমজ পৃথিবী, মিলেছে শেকড়ের সন্ধান।
