কাতারের প্রবাস জীবনের অত্যন্ত কাছের, আপন একজন মানুষ, আমার অনুজপ্রতিম মোস্তফা কামাল…চলে গেল না ফেরার দেশে। দীর্ঘ সাতটি বছর দুরারোগ্য ক্যান্সারের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করেছে। অবশেষে ক্লান্ত শরীর থেমে গেল… কিন্তু স্মৃতিগুলো? সেগুলো আজও বুকের ভেতর ঝড় তোলে। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন।
খবরটা শোনার পর থেকে বুকের ভেতরটা হু হু করে কাঁদছে। জানতাম, একদিন হয়তো এই খবর আসবে। কিন্তু মন কখনোই মানতে চায়নি। প্রাণভরে চেয়েছি, এই দুঃসংবাদ যেন কোনোদিন না আসে। আজ মনে হচ্ছে, নিজের হৃদয়ের একটা টুকরো যেন হারিয়ে ফেললাম। ভালো মানুষগুলো কেন এত তাড়াতাড়ি হারিয়ে যায়?
২০১৩ সালের কোনো এক মিটিংয়ে প্রথম দেখা। তখন চট্টগ্রাম সমিতির দায়িত্ব নেবো কিনা ভাবছি। বলেছিলাম, মনের মতো একজন সাধারণ সম্পাদক না পেলে দায়িত্ব নেবো না। তখন পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো মোস্তফার সঙ্গে। প্রথম দেখাতেই মনে হলো, এই মানুষটার ভেতর কিছু আলাদা আছে। বিনয়, সরলতা, আর কথার ভেতরে বুদ্ধির ঝলক। তারপর থেকে শুরু…
সুখে-দুঃখে, প্রতিটি মুহূর্তে, সে ছিল আমার ছায়া হয়ে।
আমার মেয়াদ শেষ হবার পর নিষ্ঠার সাথে মোস্তফা চট্টগ্রাম সমিতি কাতারের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছে। একজন মানুষ আরেকজনকে কতটা শ্রদ্ধা আর ভালোবাসতে পারে, মোস্তফা আমাকে তা অনুভব করিয়েছে, নিঃশব্দে, নিঃস্বার্থভাবে। যে মানুষটা ছিল নির্ভরতা, আজ সে-ই স্মৃতির ভার। যে মানুষটা ছায়া হয়ে ছিল, সে-ই আজ স্মৃতির ছায়া।
তার বড় মেয়ে মাইসাম আর আমার ছোট মেয়ে সোফিয়া, একই বয়সী। কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠান মানেই, “মোস্তফাকে বললেই হবে।” মুহূর্তের মধ্যে সব আয়োজন করে ফেলতো।
আজ ভাবি, মাইসাম, মারওয়া, আর ছোট্ট মুনতাসির… তাদের মাথার ওপর আর বাবার ছায়া থাকবে না!
মুনতাসির, মোস্তফার একমাত্র ছেলে। যাকে সবসময় বুকের কাছে আগলে রাখতো। কোলে নিয়েই কাজ করতো। সেই দৃশ্যগুলো চোখে ভাসলেই বুকটা ভেঙে যায়।
মোস্তফা ছিল অসাধারণ সৎ একজন মানুষ। স্পষ্টভাষী, নির্ভীক, আর নীতিতে অটল। ব্যবসায় কখনো অসততার পথ নেয়নি। চাইলে অন্যদের মতো খুব সহজেই বড়লোক হতে পারতো, কিন্তু সে বেছে নিয়েছিল সৎ থাকার কঠিন পথ।
কতবার গিয়েছি তার গ্যারেজে… আড্ডা দিতে। আমি ঢুকলেই নিজের চেয়ারটা ছেড়ে দিয়ে জোর করে বসাতো আমাকে। তারপর চা, বিস্কুট… আর গল্প।
কাতার ছেড়ে আসার পরও, মাসে অন্তত একবার কথা হতো। ঘন্টার পর ঘন্টা…আর ওপাশ থেকে সেই পরিচিত কণ্ঠ – “বদ্দা, ক্যান আছন?” আজ বুঝি, এই একটি প্রশ্নই কতটা আপন ছিল, ভাবতেই বুকটা ছিঁড়ে যায়, আর কোনোদিন শোনা হবে না।
মোস্তফা রেখে গেছে তার স্ত্রী আর তিনটি ছোট্ট সন্তান। আমাদের সবার দায়িত্ব, ওদের পাশে দাঁড়ানো। যেন তারা বাবার অভাবটা কম অনুভব করে, আর বাবার মতোই একজন ভালো মানুষ হয়ে বড় হতে পারে।
কেন জানি না, ভালো মানুষগুলো খুব বেশিদিন থাকে না। কিন্তু তারা চলে গেলেও, তাদের ভালোবাসা, তাদের ছায়া, চিরকাল থেকে যায় আমাদের হৃদয়ের ভেতর।
