আরব উপসাগর দিয়ে ঘেরা ছোট্ট দেশ কাতার বিশ্বমঞ্চে এখন একটি প্রভাবশালী নাম। গত এক দশক ধরে কাতারের ঐকান্তিক কুটনৈতিক তৎপরতার ফলেই রাজধানী দোহাতে আমেরিকার সাথে আফগানিস্তানের তালিবানের সম্প্রতি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে প্রায় দুই দশক ধরে চলা একটি রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান হবে বলে মনে হচ্ছে। তবে গ্যাস আবিস্কারে আগে কাতার নিয়ে কারো তেমন বিশেষ আগ্রহ ছিল না। দোহা শহর একটি ঘুমন্ত জেলে পাড়ার মতো নিরব ছিল। কিন্তু ১৯৪৯ সালে দুখান গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস রপ্তানী শুরু হলে বদলে যায় কাতারের অর্থনীতি। শুরু হয় উন্নয়নের অগ্রযাত্রা। আজ একুশ শতকের দোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে তাই খুব জানতে ইচ্ছে করে পঞ্চাশ, ষাট দশক কিংবা তারও বহু আগে, সেই প্রাচীনকালে কেমন ছিল কাতার?
কাতার আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি উপদ্বীপ, যার দক্ষিণে রয়েছে সৌদি আরবের সাথে ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থল সীমানা। এই সীমানা বরাবর রয়েছে লবনাক্ত সমতলভ’মি, যা দুই দেশের মধ্যে প্রাকৃতিক বিভাজক হিসাবে কাজ করছে। বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ১৩ গুণ ছোট কাতারের আয়তন হচ্ছে ১১,৫৭১ বর্গ কিলোমিটার। মাত্র তিন লাখ স্থানীয় কাতারী নাগরিক এবং প্রবাসী মিলিয়ে কাতারের জনসংখ্যা এখন ২৭ লাখ।
রাজধানী দোহা ছাড়া কাতারের অন্যন্য উল্লেখযোগ্য শহরগুলো হচ্ছে – উত্তরে আল শামাল, আলখোর, পশ্চিমাঞ্চলে খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সমৃদ্ধ শহর দুখান, উম্ম বাব, দক্ষিণে আল ওয়াকরা ও শিল্প নগরী মিসাইদ।
আরব অঞ্চলে কোনো স্থানের নাম ওই এলাকার শুকনো নদী, পাহাড়, ডিবি, বাগান, কিংবা চারণভূমির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট নিয়ে নির্ধারণ করা হয়। যেমন যেসব নীচু এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকে সেগুলোকে বলা হয় ওআয়াব। অন্তরীপ এলাকাকে রাস, উপকূলীয় এলাকাকে দোহা, এবং সাগরের সরু প্রবেশ পথকে বলা হয় খোর। দেখা গেছে এভাবেই কাতারের রাজধানী দোহা, আলখোর শহরের নামের উৎপত্তি। এছাড়া কখনো কোনো প্রানী কিংবা উল্লেখযোগ্য ঘটনার মা (উম) কিংবা বাবা (আবু) হিসাবেও এলাকার নামকরণ করা হয়। যেমন উম বাব, আবু সামরা উম্ম সায়িদ, উম্ম সালার, উম্ম আলী, আবু নাখলা, আবু হামর, আবু ধাবী ইত্যাদি। কোনো কোনে জায়গার নাম রাওদা বা বাগান দিয়ে শুরু হয় যার মানে পশু চারণ-ভ’মি যেখানে রয়েছে পানির কূপ এবং সবুজ ঘাস।
কাতার একটি উত্তপ্ত এবং শুষ্ক মরু এলাকা। পুরো দেশটা বলতে গেলে সমতল। এই দেশের বুক চিরে বয়ে চলেনা কোনো নদী-নালা কিংবা ঝরনা প্রবাহ। তবে প্রত্নতত্ববিদদের মতে, প্রাচীনকালে কাতারের মূলভ’খন্ডে পানির অস্তিত্ব ছিল। এখানকার আবহাওয়া ছিল বেশ আর্দ্র। এখানে ছিল জলপ্রপাত, ও স্বচ্ছ পানির নালা। কিন্তু ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে গেলে নালার পানি শুকিয়ে যায়। কাতারের বিভিন্ন এলাকায় পানি প্রবাহের সেই চিহৃ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়। শুকিয়ে যাওয়া এসব নালাকে বলা হয় “ওয়াদি”।
প্রাচীনকালে এই ওয়াদি দিয়েই বয়ে যেতো পানি প্রবাহ। বৃষ্টিপাতের পর শুষ্ক, শীর্ণ ওয়াদিগুলো পানির স্পর্শে হঠাৎ করে জীবন্ত হয়ে ওঠত। বাদামী রঙের মাটি মেশানো পানির তীব্র স্রোত চলার পথের সবকিছু খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যেত। সম্প্রতি জর্দান, কুয়েত ও সৌদি আরবে ভয়াবহ বন্যার সময় খরস্রোতা ওয়াদির ভয়ংকর রূপ আমরা দেখেছি।
তবে ওয়াদি ছাড়াও কাতারের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে গুহা। ভ’পৃষ্ঠের নিচে পানি প্রবাহের কারণে সৃষ্ট এই গুহার তলদেশে এখনো মিষ্টি পানির সন্ধান পাওয়া যায়। আল রাইয়ান এলাকায় রয়েছে এমন একটি গুহা যার নাম হল আল মুসফার। সালওয়া রোড দিয়ে একোয়া পার্ক ফেলে একটু এগিয়ে রাস্তা থেকে ডান দিকে নেমে গেলেই পাওয়া যাবে এই গুহা। প্রায় ১০০ মিটার গভীর এই গুহার ভেতরে প্রবেশ করা যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা এই গুহায় এক সময় পানি প্রবাহিত হত। এটি কাতারের একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান বলে আমি মনে করি যার কথা অনেকেই জানেনা।
কাতারের সবচেয়ে উঁচু জায়গা হল কুরাইন আবু-আল বাওল, যার উচ্চতা সমুদ্রতল থেকে মাত্র ১০৩ মিটার! এছাড়া কাতারের পশ্চিম উপকূল এলাকার প্রধান শহর দুখান এবং দক্ষিণ উপকূলে মিসাইদ এলাকার সি-ললাইন বিচ এলাকা জুড়ে রয়েছে চুনাপাথর আর বালির পাহাড়। তবে দুখানের কিম্ভূতকিমাকার টিলাগুলো পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়।
প্রাগৈতিহাসিক কাতারে স্থায়ী জনবসতির কেনো সন্ধান নাওয়া না গেলেও, প্রত্নতত্ববিদ ডে কাড্রির মতে, আজ থেকে পঞ্চাশ হাজার বছর আগে কাতার উপদ্বীপ অঞ্চলে মনুষ্য বসতি ছিল। নাজাদ এবং আল-সাদা এলাকা থেকে আগত বেদুইন গোত্রর চারণভূমি হিসাবে ব্যবহৃত হত কাতার উপদ্বীপ। মাছ, মুক্তা আরোহনের জন্যই কাতারের উপকূলীয় এলাকায় জনবসতি গড়ে ওঠে।
সুদূর অতীতে, এখানকার আবহাওয়া ছিলো বৃষ্টিবহুল। জলপ্রপাত, বিভিন্ন আকারের জলাশয়, উঁচু ঘাস ও স্বচ্ছ পানির নালা ছিলো বলেও প্রমান পাওয়া যায়। আধুনিক ইতিহাসের জনক হেরাডোটাসের মতে খ্রীষ্ট-পূর্ব ৪৯৯-৪৪৯ অব্দে পারস্য ও প্রাচীন গ্রীক সাম্রাজ্যের যুদ্ধের নথি-পত্র ঘেটে পাওয়া যায়, কাতারে ‘কান্নানিয়ান’ নামক এক জেলে সম্প্রদায়ের বসবাস ছিলো। এরা মাছ ধরার মৌসুমে অস্থায়ী অভিযান করে মাছ শিকার করত।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে পরিগণিত হয়। প্রাচীনকালে ব্যবহৃত মাটির বাসন, চকমকি পাথর, পাথর কাটার যন্ত্র নিরীক্ষণ করে পাওয়া যায়, কাতারের পূর্ব উপকূল রাস আব্রুখের সাথে মেসোপটেমিয়ান আল উবায়েদ গোত্রের ব্যবসা ছিলো। পরবর্তিতে ১৫ শতাব্দিতে তৈরী বিশিষ্ট গ্রীক বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ টলেমির আরব্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রাচীন মানচিত্রে কাতারকে ‘Catara’ নামে দেখানো হয়েছে। তবে এই ম্যাপে কাতারের ভৌগলিক অবস্থান সঠিকভাবে দেখানো হয়নি।
আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর আগে ব্রোঞ্জ যুগে আরব্য উপসাগরের অঞ্চলে বাহরাইন এবং কাতার এলাকাজুড়ে “দিলমুন” নামের একটি সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল। ওই সময় বর্তমান ইরাক ও সিরিয়ার উত্তারঞ্চলে গড়ে ওঠা বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় সভ্যতা এবং পাক-ভারত উপমহাদেশের সিন্ধু অববাহিকার সভ্যতার মধ্যে বানিজ্যক লেনদেন হতো। সমুদ্রপথে যাতায়তের পথে কৌশলগত অবস্থানের কারণে, বাহরাইনের পাশাপাশি কাতারকেও সিন্ধু অববাহিকা ও মেসোপটেমিয়ার সভ্যতাগুলির মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসাবে গন্য করা গত। মধ্যপ্রাচ্যে আগত পর্যটকদের বিবরণীতে এর প্রমাণ রয়েছে।
ওই সময় কাতার উর্বর ও চাষাবাদযোগ্য আবাদী অঞ্চল ছিল, আজকের মতো চ’নাপাথরে ভরা শুষ্ক মরু ছিলনা। কাতারের সবখানেই ছিল খেজুর গাছের বাগানের ছড়াছড়ি। তাই ব্যবসায়ীরা কাতারে যাত্রা বিরতির সময় বিপুল পরিমান উৎকৃষ্ট মানের খেজুর এবং রমনীয় মুক্তো কেনাকাটা করত। এজন্য কাতারের আল-জুবারার মত উপক’লবর্তী এলাকায় শহর জনবসতি গড়ে উঠে। আর জুবারা এলাকায় খনন করে প্রত্নতত্ত্ববিদরা আসাবাব পত্র, সহ আদি জনবসতির বহু নিদর্শণ পুনরুদ্ধার করেছেন। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২০০০ সালের দিকে ভারত থেকে বাণিজ্য আসা বন্ধ হয়ে গেলে দিলমুন সভ্যতার পতন ঘটতে শুরু করে।
খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্রিক সম্রাট আলেক্সান্ডার পারস্য উপসাগারীয় অঞ্চলে হানা দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। এর আগে পর্যবেক্ষণের জন্য আলেক্সান্ডার তাঁর শীর্ষ নৌ সেনাপতি এন্ড্রসথেনেসকে ওই অঞ্চলে পাঠান। একজন বিজ্ঞানী এবং মানচিত্রাকার এই নৌ সেনাপতির সামুদ্রিক বিরল উদ্ভিদ এবং প্রাণিকুল অন্বেষণ করার প্রবল আগ্রহ ছিল। ফলে সম্রাটের নৌ অভিযানের তথ্য সংগ্রহের আগে আরব্য উপসাগরের জলরাশির রহস্য উন্মোচনের জন্য তিনি মনোনিবেশ করেন। এর কিছুদিনের মধ্যে হঠাৎ করে সম্রাটের মৃত্যু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে গ্রিক অভিযানের পরিকল্পনা আধুরাই থেকে যায়।
এরপর রোম সম্রাজ্যের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সম্রাট অগাষ্টাস, তাঁর পালক পুত্র গাইয়াস সিজারকে আরব অঞ্চলে অভিযানের নির্দেশ দেন। কিন্তু আমের্নিয়ার যুদ্ধে মাত্র ১৯ বছর বয়স্ক এই যুবরাজের মৃত্যু হলে সম্রাট অগাষ্টাসের ইচ্ছা পূরণ হয়নি। ফলে কাতারকে ওই সময়ের দুইটি সবচেয়ে শক্তিধর সাম্রাজ্য রোম ও গ্রীকের অধীনস্থ হতে হয়নি ।
জনশ্রুতি আছে, আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে কাতার সৌদি আরবের মূল ভ’খন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, আলাদা একটি দ্বীপ ছিল। কিছু প্রাচীন মানচিত্রে কাতারকে দ্বীপ হিসাবে দেখানোর জন্যই হয়ত এ রকম কাহিনীর প্রচলন হয়েছে। তবে এই তত্বের সমর্থনযোগ্য কোনো ভ’তাত্বিক কিংবা ঐতিহাসিক প্রমান এখনো মেলেনি।
আরব অঞ্চলের ভুগোল বিশেষজ্ঞ, ইবনে খুরাদাদবেহ ৯ম শতকে বসরা থেকে ওমান যাবার পথে কাতারে স্বল্প সময়ের জন্য যাত্রা বিরতি নেন বলে তাঁর লেখা থেকে জানা যায়। আল হামদানীও দশম শতকে আরব্য উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি এলাকা হিসাবে তাঁর লেখায় কাতারের উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ত্রয়োদশ শতকের দিকে ইয়াকুত এবং ইবনে মানজুর কাতারকে একটি ছোট্ট শহর বা গ্রাম বলে উল্লেখ করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে আগত পর্যটকদের বিবরণীতে থেকে জানা যায়, অতীতে কাতারকে কখনোই মধ্যপ্রাচের একটি উল্লখযোগ্য পর্যটন কিংবা গন্তব্যস্থান হিসাবে গন্য করা হয়নি বরং যাত্রা পথের একটি অস্থায়ী বিরতির স্থান বলেই বিবেচনা করা হয়েছে। ১৬ শতকের দুঃসাহসীক পর্তুগীজ অভিযাত্রী হলেন পারডো টিয়েক্সেইরা। তিনি একটি ছোট্ট ডিঙি নৌকায় চড়ে আমাজন পাড়ি দিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম পশ্চিমা বিশ্বে কাতার শব্দটি ব্যবহার করেন।
সপ্তম শতকে কাতার এলাকার অধিবাসীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে। ইসলামের প্রসারের আগে কাতার ও বাহরাইন, এই দুই অঞ্চলের শাসক ছিলেন বনু তামিম গোত্রের প্রধান মুনযির বিন সাওয়া আল-তামিমি। বর্তমান শাসক আলথানি পরিবার, আলতামিমিরই একটি শাখা। ইসলাম প্রচারের জন্য হযরত মুহাম্মদ (সা.) সাহাবি আলা আলহাদরামি (রা.)-কে ৬২৮ সালে দক্ষিণ আরব অঞ্চলে পাঠান। বনু তামিমের গোত্র প্রধান মুনযির আল-তামিমি ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন এবং পরবর্তীতে অন্যান্য গোত্রের মানুষও ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে।
উমাইয়া (৬৬১-৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) ও আব্বাসীয় (৭৫০-১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) শাসনামলে এই দুই সাম্রাজ্যের রাজধানী যথাক্রমে দামেস্ক ও বাগদাদে ভারত থেকে উচ্চমানের কাপড়, মসলা, চীন থেকে চীনামাটির আসবাব বাসন-পত্র ও ঔষধ আমদানী করা হত। ফলে সমুদ্রপথে ভারত ও চীনের সঙ্গে সমুদ্র পথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সংযোগকারী স্থান হিসাবে কাতার ব্যবসায়িক সংযোজক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
চীনাদের সাথে আজকের কিরজিস্তানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত শহর তাসালের যুদ্ধে বহু চীনা কাগজ তৈরী কারিগর মুসলিমদের হাতে বন্দি হয়। বাগদাদের শাসক খলিফা হারুন আর রশিদ এই সব কারিগরদের দিয়ে বাগদাদের বিভিন্ন এলাকায় কাগজের কারখানা তৈরী করেন। সত্যি বলতে কি, এই কাগজের কারখানায় তৈরী কাগজের জন্যই আব্বাসীয় শাসনামলে জ্ঞান, বিজ্ঞান, বৃদ্ধিভিত্তিক চর্চার প্রসার পায়। ডাক ব্যবস্থার বিকাশ হয় এবং মুক্তা ব্যবসারও উন্নতি হয়। সে সময় প্রাচ্যের দেশ সহ চীনেও কাতারি মুক্তার চাহিদা পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া মুক্তার পাশাপাশি উট ও ঘোড়া পালন ও বিক্রয়ও জনপ্রিয়তা লাভ করে। কাতারে উটের পশম থেকে এক ধরনের মূল্যবান কাপড় তৈরি হতো। যা কাতারের অন্যতম ব্যবসায়িক আকর্ষণ ছিলো।
সাত শতকের দিকে পন্ডিত, জ্ঞানী আলোকিত মানুষের পদচারণায় মুখরিত ছিল আরব্য উপসাগরীয় এলাকায়। খলিফা হারুন আল-রশিদের (৭৮৬-৮০৯) পরবর্তী সময়ে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির উৎকর্ষতা অর্জনের ফলে সমুদ্রতল থেকে মুক্তা আরোহনের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়। ওই যুগের বিদ্বান ব্যক্তিরা সমুদ্রের মুক্তা সমৃদ্ধ এলাকার বিস্তারিত ম্যাপ তৈরা করেন; ম্ক্তুার প্রকারভেদ, আকার, ওজন এবং দাম সম্পর্কে নতুন তথ্য লিপিবদ্ধ করেন।
কারামিতা শিয়া সম্প্রদায়ের উত্থানঃ সপ্তম শতকের শেষের দিকে উমাইয়া শাসনামলে কাতার এবং বাহরাইনে, ইবন আল ফুজার নেতৃত্বে প্রায় দুই দশক ধরে বিদ্রোহী তৎপরতা চলে। ৮৬৮ সালের দিকে কাতার এবং বাইরাইন এলাকায় আব্বাসীয় শাসনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদ ইবনে আলীর নেতৃত্বে প্রথম বিদ্রোহ সূচিত হয়। ওই সময় আব্বাসীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্য প্রসিদ্ধ আরেকটি দল হচ্ছে কারামিতা শিয়া সম্প্রদায়। কারামিতয়দের প্রতিষ্ঠাতা হামদান কারামত থেকে তাদের গোত্রের নামকরণ ’কারামিতা’ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
শিয়া মতালম্বীদের দুটো প্রধান শাখা রয়েছে। একটি সাত ইমাম এবং অন্যটি বার ইমামে বিশ্বাসী। কারামিতা সাত ইমামে বিশ্বাসী ইসমাইলিয়া শিয়া হিসাবে পরিচিত। তারা ৬ষ্ঠ ইমাম জাফর আল সাদিকের বড় ছেলে ইসমাইলকে সপ্তম এবং শেষ ইমাম মনে করে। তারা এও বিশ্বাস করে, ইমাম ইসমাইল এখন লুকায়িত আছেন এবং একদিন সমাজ সংস্কারের জন্য ইমাম মাহদী রূপে হাজির হবেন।
উল্লেখ্য, যুগে যুগে ইমাম মাহদির আগমনকে কেন্দ্র করে মুসলিম বিশ্বে বিশৃংখলা এবং বিদ্রোহের সূচনা হয়েছে। ১৯৭৯ সালের ২ নভেম্বর, হিজরী ১৪০০ সালের প্রথম দিন, ইমাম মাহদী আবির্ভূত হয়েছেন ঘোষণা দিয়ে সালাফিপন্থী একটি কট্টর সুন্নী সশস্ত্র দল কাবা এবং মসজিদুল হারাম তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।
এই দলের নেতা ছিলেন জোহাইমান আল-ওতাইবি নামের এক বেদুইন। জোহাইমানের ভগ্নিপতি, মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল-কাহতানিকে ইমাম মাহদী বলে ঘোষণা করা হয়। তাদের বিবেচনায়, সৌদি শাসকগোষ্ঠী হচ্ছে দুর্নীতিগ্রস্থ, নৈতিকভাবে দেউলিয়া এবং পাশ্চাত্য দ্বারা কলুষিত। তাই তারা ইমাম মাহদীর নেতৃত্বে সৌদি আরবকে কলূষমুক্ত করতে চায়। বিদ্রোহীদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনী প্রায় দুই সপ্তাহ যুদ্ধ শেষে কাবা ঘর জঙ্গিমুক্ত হয়। তবে এই লড়াইয়ে জঙ্গি, নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারন হাজী সহ শত শত মানুষ নিহত হয়।
৮৯৯ সালে আবু সায়িদ আল-জান্নাবীর নেতৃত্বে কারামিতয়রা বাহরাইনের রাজধানী আল হিজর এবং বর্তমান সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমের আল-আহসা প্রদেশ দখল করে শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। ৮৯৯ থেকে ১০৭৮ পর্যন্ত প্রায় দুই শত বছর কা’রামিতা নামের এই শিয়া দল ইসলামিক বিশ্বে আধ্যিপত্য বিস্তার করে ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে। তাদের কিছু সন্ত্রাশী তৎপরতা ইসলামিক বিশ্বে ঘৃণিত হয়ে আসছে। তারা হজ্জ্ব পালন করাকে কুসংস্কার বলে মনে করত এবং চাইতোনা হজ্ব করার জন্য মানুষ মক্কায় যাক। ওই সময় মানুষ পায়ে হেঁঠে কিংবা উটে চড়ে হজ্জ্বে যেতো। কারামিতয়রা মক্কা অভিমুখী রাস্তায় ওঁত পেতে থাকতো এবং হাজীদের উপর আক্রমন চালাতো। ফলে নিরাপত্তার অভাবে প্রায় আট বছর হজ্জ বন্ধ ছিল।
৯০৬ সালে হজ্জ শেষে মক্কা থেকে ফিরতি পথে হাজীদের উপর আক্রমন চালিয়ে কারামিতয়রা প্রায় ২০,০০০ হাজার নিরীহ হাজীদের নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং হাজীদের লুন্ঠিত মালামাল নিয়ে পালিয়ে যায়। তুর্কী ঐতিহাসিক কুতব আল-দীনের ভাষ্যমতে কারামিতা নেতা আবু তাহের সুলাইমান আল-জান্নাবী, ৯৩০ সালে মক্কা ও মদিনায় হত্যাকান্ড ও লুটতরাজ চালায়। যমযম ক’পে মৃত হাজীদের লাশ ফেলে দিয়ে পানি অপবিত্র করার চেষ্টা করে।
এতেও সন্তুষ্ট না হয়ে, তারা কাবা ঘরের দরজা ও গিলাফ ছিনিয়ে নিয়ে যায়। অতঃপর কাবা ঘরের দেয়ালে সংরক্ষিত কালো পাথর বা “হজরে আসওয়াদ” তুলে নিয়ে তাদের রাজধানী আল-আহাসার আল-দিরার মসজিদে স্থাপন করে। এই সময় তারা হাজীদের বিদ্রূপ করে বলত, কই? কাবা ঘর রক্ষা করার জন্য আবাবলি পাখী আসছেনা কেনো? আবু তাহির আশা করেছিল, কালো পাথরের আকর্ষণে হাজীরা মক্কার বদলে তাদের তৈরী আল-দিরার মসজিদমুখী হবে। কিন্তু আবু তাহিরের সেই আশা পূরণ হয়নি। হাজীরা কাবা ঘরের যে জায়গাতে হজরে আসওয়াদ থাকতো, তাওয়াফ করার সময় সেই খালি জায়গায় শ্রদ্ধা জানাতো। আবু তাহিরের হয়তো জানা ছিলনা ইয়ামানের বাদশা আবরাহা, সা’না নগরীতে কাবার মত বড় এবং আরো জাকজমকপূর্ণ একটি উপসনালয় তৈরী করেও মানুষকে কাবা বিমুখ করতে পারেনি। সেখানে আবু তাহেরতো কোন ছার?
বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ ও ঐতিহাসিক ইমাম আল জুয়াইনির তথ্যানুসারে হজরে আসওয়াদ তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রায় দুই দশক পর তা আবার কাবা ঘরে দেয়ালে প্রতিস্থাপিত হয়। আনুমানিক ৯৫২ সালে বড় অংকের মুক্তিপনের বিনিময়ে আব্বাসীয় খলিফা কালো পাথর মক্কায় ফিরিয়ে আনেন। জানা যায়, কারামিতায়দের কালো পাথর ফিরিয়া দেয়ার ঘটনাটি খুবই বেদনাদায়ক। কালো পাথরটি তারা একটি বস্তায় ভরে কুফা শহরের মসজিদ প্রাঙ্গনে এমনভাবে ছুড়ে মারে যে তা ভেঙ্গে সাত টুকরো হয়ে যায়। তবে ৯৪৪ সালে আবু তাহরের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে কারামিতাদের প্রভাব কমতে শুরু করে। অবশেষে ৯৭৬ সালে আব্বাসীয় বাহিনীর কাছে পরাজয়ের পর কারামিতাদের পতন হয়।
এক পর্যায়ে কারামিতায়রা এতোই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে, এমন কি বাগদাদের আব্বাসীয় শাসকও তাদের ঘাটাতে সাহস করত না। তবে বাহরাইনকে কেন্দ্র করে কারামিতা শাসিত অঞ্চলে তারা সমতার ভিত্তিতে শ্রেনীহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার চালু করেছিল। যেখানে সাধারণ নাগরিকরা বেশ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। যেমন আহসা এলাকার স্থায়ী অধিবাসীদের কোনো শুল্ক দিতে হতনা। ইথিওপিয়া থেকে আনা ক্রীতদাসদের দিয়ে বাহরাইনে চাষাবাদের জন্য উপযোগী জমি তৈরী করে প্রচুর ফসল উৎপাদনে সক্ষম হয় কারামিতা প্রশাসন।
কল-কারখানা সরকারের মালিকানাধীনে আনা হয়।অভাবীদের সুদহীন ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। যারা নতুন করে যারা ব্যবসা শুরু করতে হায়, তাদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। কারামিতাদের সমমাত্রিক আদর্শের সাথে কমিউনিষ্ট সমাজ ব্যবস্থার সাথে বেশ মিল দেখা যায়; যা ওই সময় ইসলামিক বিশ্বের কাছে নতুন ছিল। বেশ কিছু ঐতিহাসিকদের মতে, কারামিতাদের সম্পর্কে যে সব ঘটনা প্রচলিত রয়েছে, তা সুন্নী ঐতিহাসিকদের কিছুটা অতিরঞ্জনও হতে পারে।
১২৫৩ থেকে ১৫১৫ সাল পর্যন্ত কাতার সহ আরবের পূর্বাঞ্চল আল উসফুর এবং হরমুজ নামের দুটো আরব রাজ বংশের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৫ শতকের প্রথম দিকে বাহরাইন এবং কাতারের অধিকাংশ উপক’লীয় অঞ্চল পর্তুগীজদের দখলে চলে যায়। একই সময়ে পারস্যের শাসক শাহ আব্বাস আরব উপসাগীয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করার প্রচেষ্টা শুরু করে। বানিজ্য নিয়ে বৃটিশ, ফরাসী এবং ওলান্দাজ শক্তির মধ্যে প্রতিযোগীতা শুরু হয়। কিন্তু ১৬০২ সালে পারস্য বাহিনী ওলান্দাজ ও পর্তুগীজদের এই এলাকা থেকে সরিয়ে দেয় এবং ১৬২২ সালে বৃটিশ যুদ্ধ জাহাজের সহযোগীতায় পর্তুগীজদের কাছ থেকে হরমুজ এলাকা দখল করে নিয়ে পারস্য উপক’লে বন্দর আব্বাস নামে সমুদ্র বন্দর প্রতিষ্ঠা করে। অন্যদিকে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল আল আহসা, কাতিফ ও বনি খালেদ গোত্রের যৌথ নিয়ন্ত্রণে আসে। ১৭৮৩ আল-খালিফা গোত্র বাহরাইন ও কাতার আধিপত্য বিস্তার করে। জুবারা থেকে রাজধানী মানামাতে সরিয়ে নেয়।
১৭ শতকের প্রথম দিকে বাহরাইনের এখনকার শাসক পরিবার আল-খালিফা কাতারের উত্তর-পশ্চিম উপক’লবর্তী এলাকা আল-জুবারায় বসতি স্থাপন করে। ১৭৭৬ সালে পারস্য বাহিনী বাসরা আক্রমন করলে ওই এলাকার বহু ব্যবসায়ী জুবারা শহরে আশ্রয় নেয়। আরব সাগর-অভিযাত্রী এবং নাবিকদের বর্নণা থেকে জানা যায়, আল-জুবারা আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যবসা-বানিজ্যের কেন্দ্র ছিল।
দোহা থেকে প্রায় ১০৫ কিলোমিটার দুরে আবস্থিত আল জুবারা এলাকায় রয়েছে একটি দুর্গ । ১৯৩৮ সালে উপক’লীয় সীমানা রক্ষা এবং শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য শেখ আব্দুলাহ বিন জাসিম আলথানি এই দুর্গটি নির্মান করেন। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসাবে স্বীকৃত জুবারায় অবস্থিত এই প্রচীন দুর্গ কাতারের একটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান।
১৮২৭ সালে ফিলিপ ভ্যান্ডারমাইলেনের তৈরী বিশ্ব এটলাসে সর্বপ্রথম কাতারের বিশদ ম্যাপ প্রকাশিত হয়। সি.জি. কন্সট্যাবল এবং লেঃ এ. ডব্লিউ স্টিফে ১৮৬০ সালে বিদ্দা এবং দোহা শহরের বিস্তারিত ম্যাপ তৈরী করেন। আজকের দোহা নগরীর একটি অংশ আগে বিদ্দা নামে পরিচিত হিল। ১৯ শতকে এই বিদ্দাই ছিল কাতারের সবচেয়ে বড় শহর। উনিশ শতকের মাঝামাঝি বিদ্দাকে দোহা পৌরসভার একটি এলাকা হিসাবে অর্ন্তভ’ক্ত করা হয়।
কাতারে দক্ষিণে রয়েছে রয়েছে এই অঞ্চলে সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র সৌদি আরব। সড়ক পথে কাতার থেকে বাহরাইন কিংবা আরব আমিরাত যেতে হলে গেলেই সৌদি হয়ে যেতে হয়। কাতারের প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভ্রমন এবং স্থল পথে বানিজ্যক পন্য আমদানী-রপ্তানী করার সময় ভিসা এবং শুল্ক বাবদ সৌদি আরব বড় অংকের অর্থ আয় করে।
তবে এই প্রভাবশালী প্রতিবেশীর সাথে কাতারের সম্পর্ক কখনোই খুব একটা মধুর ছিলনা। ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রভাব বিস্তারের জন্য সৌদি আরব বিভিন্ন সময় কাতারে আগ্রসী অভিযান চালায়। সৌদি আরবের আল-হার্জ প্রদেশের যুবরাজ সুলাইমান বিন উফাইসান কাতারকে সৌদি আরবের অর্ন্তভ’ক্ত করার লক্ষ্যে ১৭৮৭ সালে আল-জুবারা দুর্গে বড় ধরনের আক্রমন চালায়। যুদ্ধে বহু প্রানহানির পর জুবারা দুর্গের পতন হলে সৌদি বাহিনী কাতারের আল-জুবারার আশে পাশের এলাকা যেমন হুয়েলা, আল-ফিরাহিয়া, ইউসুফিয়া, এবং রুওয়াইদা দখল করে নেয়। এভাবে কাতারে সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়। এর কিছুদিন পর আল-আহসা প্রদেশও তারা দখল করে নেয়।
উল্লেখ্য, কাতারের অমীর হামাদ বিন খালিফার বিরুদ্ধে ১৯৯৬ সালে যে অভ্যুত্থান হয়, তাতে সৌদি আরবের সমর্থন ছিল বলে জানা যায়। ২০১৭ সালে সৌাদি আরবের নেতৃত্বে আরব আমিরাত, মিসর ও বাইরাইন জোট বেধে কাতারের বিরুদ্ধে পূর্ন আবরোধ করে। ফলে কাতারের একমাত্র স্থল সীমান্তও বন্ধ হয়ে যায়।
বানিজ্যের জন্য ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর জাহাজ যাতে নিরাপদে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলাচল করতে পারে, সেজন্য এবার বৃটেনও এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেস্টা করে। অবশেষে ১৮২০ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ও পারস্য উক’লবর্তী এলাকার শেখদের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর এই অঞ্চলে বৃটিশ কর্তৃত্ব নিশ্চিত হয়।
১৮৩৩ সালে বাহরাইনের শাসক আব্দুল্লাহ বিন আহমদ আল-খলিফাকে কাতারের গভর্ণর নিযুক্ত করা হয়। ১৮৪৭ সালে কাতারী শেখ ইসা বিন তারিফ বাহরাইনের শাসকের মোহাম্মদ বিন খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। কাতারের উত্তরে ফুওয়াইরিত এলাকায় দুই পক্ষের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে কাতারী শেখ বিন তারিফ পরাজিত এবং নিহত হন। শাস্তি সরূপ, কাতারের ওই সময়কার সবচেয়ে বড় শহর আল-বিদ্দাকে ধ্বংস করে শহরের সব বাসিন্দাদের বাইরাইনে নির্বাসিত করা হয়।
১৭ শতকের মাঝামাঝি মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাবের নেতৃত্বে ওয়াহাবী আন্দোলন সৌদি আরবের নজদ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে। আব্দুল ওয়াহাব অতঃপর ওই এলাকার স্থানীয় নেতা মোহাম্মদ বিন সউদের সাথে এক সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে সমগ্র আরব অঞ্চলে ওয়াহাবী ভাবধারা ছড়িয়ে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের পরিকল্পনা করেন। ১৮৫৩ সালে সৌদি-ওয়াহাবী বাহিনী আল আহসা প্রদেশ থেকে কাতারের আল-খোর এলাকার দিকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু বৃটিশ মধ্যস্থতায় সেই যাত্রায় কাতার সৌদি আক্রমন থেকে রক্ষা পায় করে। এদিকে বার্ষিক খাজনা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ১৮৬০ সালে নজদেও ওয়াহাবী আমির আব্দুল্লাহ বিন ফয়সল বিন তুর্কী বাহরাইন এবং কাতার দখল করার হুমকি দেন। এবারও বৃটিশ সরকারের সাতে বাইরাইনের সাথে নিরপাত্তা চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আগ্রাসন ঠেকানো হয়।
১৮৬৩ সাল থেকে মোহম্মদ বিন থানি কাতারের স্বীকৃত গভর্নরের দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু শান্তি আলোচনার জন্য বিন থানির পুত্র জাসিম বিন মোহাম্মদ আল-থানি বাহরাইন গেলে তাঁকে আটক করা হয়। বাহরাইনের শাসক আল খালিফা, আবুধাবীর সাথে জোট বেধে যুদ্ধ জাহাজ ও নৈা-বাহিনী নিয়ে দোহা এবং আল-ওয়াকরাহ শহর আক্রমন করে। দুটো শহরেই বহ ঘর বাড়ী ধ্বংষ করে স্থানীয় অধিবাসীদের বিতাড়িত করা হয়। এই ঘটনায় ব্রিটিশ ক্ষুব্ধ হয়ে বাহরাইনের শাসক মোহাম্মদ বিন খালিফাকে ক্ষমতাচ্যুত করে আবুধাবি এবং বাহরাইনকে বড় অংকের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করে, যা মোহাম্মদ বিন থানির অবস্থানকে আরও শক্তিশালী।
কাতারের ইতিহাসে দুটো প্রসিদ্ধ যুদ্ধের কথা জানা যায়। একটি হল কাতার-বাহরাইন আর অন্যটি হল কাতারের সাথে অটোমানদের যুদ্ধ। কাতারের আল-ওয়াকরার একজন কাতারী বেদুইনকে জোর করে বাহরাইনে নির্বাসিত করার জের ধরে ১৮৬৮ সালে বাহরাইনের সাথে কাতারের যুদ্ধের সূচনা হয়। অবশেষে বৃটিশ মধ্যস্থতায় বাহরাইন ও কাতারের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তির মাধ্যমে লড়াইয়ের অবসান হয়। কাতার-বাহরাইনের এই লড়াইকে কাতারের স্বাধীনতার যুদ্ধ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। বাহরাইনের সাথে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে আল-থানি পরিবার কাতারের শাসক হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে।
১৮৬৮ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে বৃটিশ প্রতিনিধি কর্নেল লুইস পেলি আল-ওয়াকরায় কাতারের শাসক মুহাম্মাদ আল থানি ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে মিলিত হন। বিস্তারিত আলাপ-আলোচনার পর ১২ সেপ্টেম্বর মুহাম্মদ বিন থানি বৃটেনের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে সম্মত হন। চুক্তির বিষয় গুলো ছিলোঃ ১. দোহায় শান্তিপূর্ণ অবস্থান করা ২. সমুদ্রে অশান্তি সৃষ্টি হতে বিরত থাকা ৩. যে নিজেদের ও প্রতিবেশীর মাঝে সৃষ্ট যে কোন ধরনের সমস্যায় বৃটিশদের ফয়সালা গ্রহন করা ৪. বাহরাইনের তৎকালীন আমীর আলি বিন খলিফার সাথে সুসম্পর্ক রাখা ৫. বাহরাইনের পূর্ববর্তী আমির মোহাম্মদ বিন খলিফাকে কাতারে পাওয়া গেলে তাকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়া। কাতার ও বৃটিশ শক্তির মধ্যে সম্পাদিত এই চুক্তির মাধ্যমেই জন্ম লাভ করে আধুনিক কাতার।
১৮৭১ সালে অটোমান শক্তি বর্তমান সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ আল-আহসা এলাকা দখল করে নিয়ে আরব অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে। ১৮৭২ কাতারও অটোমান সাম্রাজ্যের কর্তৃত্বের মধ্যে চলে আসে। এদিকে জাসিম বিন মোহাম্মদ থানি অটোমান শাসককে কর দিতে অস্বীকৃতি জানালে কাতারের সাথে অটোমান শক্তির লড়াইয়ের সূূত্রপাত হয়। আল ওয়াজবাহ এলাকায় ৩ থেকে ৪ হাজার কাতারী অশ্বারোহী এবং পদাতিক বাহিনী মোহাম্মদ পাশার নের্তৃত্বে ২০০ অটোমান সৈন্যের মুখোমুখি হয়। কাতারী বাহিনীর কাছে আটোমানরা পরাজিত হয়। ফলে পুরোপরি স্বাধীন না হলেও কাতার অটোমান সাম্রাজ্যের অর্ন্তভ’ক্ত একটি স্বায়ত্বশাসিত দেশের স্বীকৃতি পায়। এটা কাতারের একটা বড় অর্জন বলে ধরা হয়। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার পর ১৯১৫ সালের দিকে অটোমানরা আরব অঞ্চল থেকে বিদায় নেয় এবং কাতারে অটোমান কর্তৃত্বের অবসান হয়।
১৯১৬ কাতারের শাসক আব্দুল্লাহ বিন জাসিম আল-থানি বহিঃশত্রু আক্রমন থেকে কাতারকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বৃটেনের সাথে নিরাপত্তা চুক্তি করেন এবং কাতার বৃটিশ আশ্রিত রাস্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি পায়। কাতারে বৃটিশ প্রভাব ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্টের হুমকি থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাতার বিভিন্ন সময় বৃটিশ শক্তির ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে।
পরবর্তীতে সত্তর দশকের শেষের দিকে আরব উপসাগরী অঞ্চল থেকে বৃটেন তার সেনাবাহিনী উঠিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেয়। ফলে নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ১৯৬৮ সালে কাতার এই অঞ্চলে আরো আটটি শেখ শাসিত রাজ্য নিয়ে একটি ফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটি প্রথমে ইতিবাচক সাড়া পেলেও, বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্যের কারনে প্রস্তাবিত ফেডারেশন আলোর মুখ দেখেনি। এর তিন বছর পর, ১৯৭১ সালের ৩ সেপ্টম্বর, কাতার একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তাই ৩ সেপ্টেম্বর কাতারের জাতীয় দিবস হিসাবে পালন করা হয়।
১৯৭১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ৩ সেপ্টেম্বর, কাতারের জাতীয় দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু ২০০৭ সালে জাতীয় দিবস ৩ সেপ্টেম্বরের বদলে ১৮ ডিসেম্বর পালিত হবে বলে সরকারী ঘোষণা দেয়া হয়। ১৮৭৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর শেখ জাসিম বিন মুহাম্মদ বিন থানি কাতারের শাসক হিসাবে তাঁর বাবা মোহাম্মদ বিন থানির স্থলাভিষিক্ত হন। শেখ জাসিমের ব্যক্তিত্বে প্রভাবিত হয়ে কাতারের অন্যান্য সব প্রভাবশালী গোত্র তাঁর আনুগত্য নেমে নেয় এবং এভাবে কাতার রাজনৈতিকভাবে একটি পূর্ন ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মকাশ করে। এজন্যই ১৮ ডিসেম্বরকে কাতারের নতুন জাতীয় দিবস হিসাবে গ্রহন করা হয়েছে।
