আহমদ আল-মা’দহীদ। আধুনিক ঘরানার একজন কাতারী চিত্রশিল্পী। আহমদের আঁকা কাতারের আমীর শেখ তামিমের একটি প্রতিকৃতি সম্প্রতি আলোড়ন তুলেছে কাতারে। রাতারাতি তিনি পরিণত হয়েছেন সেলিব্রেটিতে। কাতারের ইতিহাসে কোনো শিল্পীর আঁকা প্রতিকৃতি এতোটা জননন্দিত হয়েছে বলে আমার জানা নইে। সাদা ক্যানভাসের উপর কালো রঙে আঁকা এই ছবির পোস্টারে ছেয়ে গেছে রাজধানী শহর দোহা। শহরের স্উুচ্চ অট্টালিকা, ছোটো-বড় গাড়ীর জানালা, উইন্ডশিল্ড, এমনিক বাড়ীর দেয়ালেও শোভা পাচ্ছে এই প্রতিকৃতি। এই ছবিটিকে এখন কাতারের প্রতি আনুগত্য এবং স্বদেশপ্রেমের প্রতীক বলে গন্য করা হচ্ছে। দেশের এই দুঃসময়ে, রাজপথে নেমে তীব্র শ্লোগান দিয়ে নয় বরং এই প্রতিকৃতিকে মননে ধারন করেন নিরব অথচ দৃঢ় ভাষায় কাতারের অপামর জনতা দেশপ্রেমের বার্তা পাঠাচ্ছেন বিশ্বের কাছে।
শুধু কি তাই? আহমদের তুলির যাদুকরি ছোঁয়ায় কাতারের প্রতিটি মানুষরে হৃদয় এখন রূপান্তরিত হচ্ছে কাতারের প্রতি নিরন্তর ভালোবাসার নকশী ক্যানভাসে। দোহা শহরতলীর একটি অভিজাত হোটেলে চলছে অধুনা বিখ্যাত সেই চিত্রকরের একক চিত্র প্রদর্শনী। যাতে প্রদর্শিত হচ্ছে শিল্পীর স্বকীয় শৈলী সমৃদ্ধ অসাধারণ কিছু ছবি। প্রতিটি ছবিরই উপজীব্য হচ্ছে স্বদেশ ও দেশপ্রেম। তবে সবকিছু ছাপিয়ে যে ছবিটি সবচেয়ে বেশী দ্যুতি ছড়াচ্ছে সেটি হল তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের প্রতিকৃতি। এই হলেন সেই অগ্নিবীর রাষ্ট্রনায়ক এরদোগান, যিনি সর্বপ্রথম কাতারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সৌদি জোট আর সুপার পাওয়ার আমেরিকাকে উপেক্ষা করে বজ্রকন্ঠে কাতারের প্রতি তাঁর দ্ব্যর্থহীন সমর্থনের কথা জানিয়েছিলেন।
এছাড়া শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে আমিরের প্রতিকৃতি সম্বলিত বিশাল আকৃতির বিলবোর্ড। এই সব পয়েন্টে পরিবার নিয়ে ভীড় জমাচ্ছেন হাজারো মানুষ। বিলবোর্ডোর বুকে ছবি এঁকে, বিভিন্ন ভাষায় দু’কলম লিখে সবাই জানাচ্ছেন কাতারের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও সমর্থনের কথা। এ এক অসাধারন অভিজ্ঞতা যা দিব্য চোখে না দেখলে অনুভব করা সত্যিই দুরূহ।
কাতারের বিরুদ্ধে আরোপিত সৌদি জোটের আবরোধের প্রায় দু’মাস হতে চলল। অবরোধের প্রথম দিনগুলোতে প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের কিছুটা ঘাটতি দেখা গেলেও, সুপার মার্কেটের শেলফে এখন ফিরে এসছে স্থিতিশীলতা। দুগ্ধজাত পন্য, শাক-সব্জি ও ফলমূলের সরবরাহ মূলতঃ আসতো সৌদি আরব থেকে স্থল পথে। এখন সেই পন্য আসছে কার্গো বিমানে করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। এখন উন্নত মানের টমাটো আসছে মরক্কো, হল্যান্ড ও স্পেন থেকে। দুধ, দই, ও লাবান অসছে তুরস্ক, ইরান, বৃটেন, ফ্যান্স এমনকি আজারবাইজান থেকে। বিশাল আকৃতির ইরানী ও মরক্কোর তরমুজ দৃষ্টি কাড়ছে সবার। অস্ট্রেলিয়ার আলু ও কমলা; দক্ষিণ আফ্রিকা, কস্টারিকা, পেরু, চিলি, ও অর্জেন্টিনার মতো দেশেরও ফলমূল দেখলাম বাাজরে। ভারতের পামাপাশি চীনা আদা-রসুনও জায়গা করে নিয়েছে শেলফে। বাংলাদেশী শাক-সব্জিরও বেড়েছে চাহিদা।
দুবাই ও সারজাহ সমুদ্র বন্দর কাতারের জন্য বন্ধ করে দেয়ায় এখন যাবতীয় পন্য আসছে ওমানের সমুদ্র বন্দর ঘুরে কিংবা আকাশ পথে। ফলে কিছু কিছু খাদ্যপন্যের দাম বেশ বেড়ে গেছে। তবে সেটা মনে হচ্ছে সাময়িক। ইতিমধ্যে কাতারে উৎপাদিত দুধ বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। ব্যবসায়ী এবং ক্রেতারা একজোট হয়ে প্রত্যাখ্যান করছেন সৌদি পন্য। ফলে কাতারী পন্যের চাহিদা বাড়ছে দ্রুত। এছাড়া খাদ্য সঙ্কট মোকাবেলার জন্য দীর্ঘ মেয়াদী খাদ্য মওজুদ করার নতুন প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে কাতার। এজন্য নির্মিত হচ্ছে প্রায় ৬ লক্ষ বর্গ মিটার আয়তনের বিশাল ওয়্যারহাউজ। সরকার কৃষিখাতে উৎপাদন বাড়িয়ে স্বনির্ভর হতে সচেষ্ট হয়েছেন এবং এজন্য সরকারী সহায়তার দেয়ার কথাও ঘোষণা করেছেন। এটা বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা হলেন মধ্যপ্রাচ্যের মরু দেশসমূহের সবুজীকরন এবং ওই সব দেশে শাক-সবব্জী উৎপাদনের পথিকৃত। ইতিমধ্যে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কাতারের কৃষিখাতে বিনিয়োগের জন্য উৎসাাহিত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তবে এই সঙ্কটে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে কাতারে জাতীয় আকাশ পরিবহন সংস্থা কাতর এয়ারওয়েজ। সৌদি আরব, আমিরাত, বাহরাইন ও মিসরের আকাশপথ রুদ্ধ করে দেয়ায় বেশ কিছু ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে এবং বহু ফ্লাইটকে নতুন রুট খুঁজে নিতে হচ্ছে। কাতার এয়ারওয়েজ এখন ওমান ও কুয়েতের বিমান বন্দরগুলোকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে ব্যবহার করছে। যেমন ওমানের ছোট্ট, শান্ত সোহার বিমান বন্দর এখন আর্ন্তজাতিক ফ্লাইটের যাত্রীদের আগমনে গমগম করছে। এখন কাতারের পশ্চিমে বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার আরব দেশগুলোতে যাবার পথ বেশ বিলম্বিত হচ্ছে। যেমন সুদান যেতে আগে আগে লাগতো ৩ ঘন্টা কিন্তু এখন ওমানের ঘুরে যেতে হচ্ছে বলে গন্ত্যবে পৌচতে লাগছে প্রায় দ্বিগুন সময় অর্থাৎ ৬ ঘন্টা। ফলে জ্বালানীর জন্য বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে কাতার এয়ারেেয়জকে।
তবে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেবার জন্য আগামী এক বছরের মধ্যে ২৪টি নতুন গন্তব্যে ফ্লাইট চালু করার পরিকল্পনা করছে কাতার । খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিবেশীর দেশের ইত্তেহাদ, আমিরাতস্-এর মতো বিমান সংস্থাকে ডিঙ্গিয়ে বিশ্বের এক নম্বর বিমান পরিবহন সংস্থায় পরিনত কাতার এয়ারওয়েজ। এজন্য কিছুদিন আগে “এয়ার লাইন অফ দ্যা ইয়ারের” খেতাবও পেয়েছে। সৌদি জোটের দেশের দেশগুলো মেনে নিতে পারছেনা কাতার এয়ারওয়েজের এই নাক্ষত্রিক উত্থান । মনে হচ্ছে আকাশে পথে কাতারের আধিপত্যকে ক্ষুন্ন করার জনই আরোপিত হয়েছে এই আকাশ অবরোধ।
সৌদি জোট মনে করেছিলো অবরোধের কিছুদিনের মধ্যে ভেঙ্গে পড়বে কাতারের অর্থনীতি। খাদ্যাভাবের জন্য দেশটিতে নেমে আসবে বিশৃঙ্খলা। কিন্তু ওরা যেমনটি চেয়েছিলো সেটি না হয়ে বাস্তবে ঘটেছে ঠিক তা উল্টো। তড়িৎ গড়িতে খাদ্য সরবরাহের জন্য বিকল্প উৎস খুঁজে বের করে সৌদি জোটের দর্প চ’র্ণ করে দিয়েছে কাতার। এছাড়া স্টক মার্কেট ও ব্যাংকিং খাতে অর্থ ঢেলে অর্থনীতিকে সচল রাখতে সমর্থ হয়েছে কাতার।
কাতারের রয়েছে ৩৩৫ বিলয়ন ডলারের সঞ্চয় তহবিল। এছাড়া বিশ্বেব্যাপী বিভিন্ন খাতে রয়েছে বিশাল অংকের বিনিয়োগ যার পরিমান কাতারের জিডিপির প্রায় ২৫০ শতাংশেরও বেশী। তাই সম্প্রতি মুডিস এবং এস এন্ড পির মতো সংস্থাগুলো কাতারের ঋণ নেয়ার সক্ষমতা কিছুটা হ্রাস করলেও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। কাতারের উপর বিনিয়োগকারীদেও আস্থা আগের মতোই আছে।
আমেরিকার বিশাল সামরিক ঘাটি থাকা সত্বেও কাতারের মাটিতে তুরস্কের সেনাবহিনীতে চট্-জলদি নিয়ে আসাটাই ছিল আমার দৃষ্টিতে কূটনীতির খেলায় শেখ তামিমের শ্রেষ্ঠ চাল। যা খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকেও নমনীয় করতে বাধ্য করেছে। দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বয়স এবং রাজনীতিতে আপেক্ষাকৃত নবীন এই আমির যেভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তা তা বিস্ময়করই বটে!
সৌদি জোটের অবরোধ কাতারকে নতজানু করা দুরে থাক, উল্টো যেনো নিজের পায়ে দাঁড়াতেই সাহায্য করছে। যে সন্ত্রাশবাদের অভিযোগ এনে কাতারকে কোনঠাসা করার প্রচেষ্টা চলছে সেই কাতারের সাথেই সৌদি জোটের ত্রাণকর্তা আমেরিকার সাথেই সন্ত্রাশ মোকাবেলার জন্য চুক্তি করেছে কাতার। অন্যায় অবরোধের ক্ষতিপূরণ দাবী করে আর্ন্তজাতিক আদালতে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাতার। শুধু তাই নয়, মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে সৌদি জোটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে কাতার। যদিও খুব সহসা এই পরিস্থিতির সমাধান হবে বলে মনে হচ্ছেনা। তবে এটুকু বলতে পারি, বর্তমান সঙ্কট কাতারকে অনেক বেশী শক্তিশালী রাস্ট্র ও সত্তায় পরিণত করবে।
জুলাই ১৯, ২০১৭
