“কাতার আগের চেয়ে হাজার গুনে ভালো আছে”। সম্প্রতি কাতারের আমীর সন্মানিত শেখ তামিমের এই একটি কথাই বলে দেয় দীর্ঘ ছয় মাসের অবরোধ, চক্রান্তের মুখেও কেমন করে মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলেছে কাতার। মাত্র ক’দিন আগে ২০২২ সালে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপের সপ্তম ষ্টেডিয়ামের নকশা উন্মোচন করা হয়েছে। রাস আবু আবুদ এলাকায় নির্মিত হবে এই স্টেডিয়াম। দ্রুতবেগে এগিয়ে চলেছে কাতার রেলের কাজ। ইতিমধ্যে আল-ওয়াকরা লাইনে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হয়েছে নতুন মেট্রো ট্রেন।
ইতিমধ্যে স্থানীয় বাজারে শাক-সব্জির চাহিদা মেটানোর জন্য কাতারে নির্মিত হয়েছে পাঁচ শতাধিক গ্র্রীনহাউস। কৃষি খাতের আওতায় বরাদ্দ করা হয়েছে প্রায় ৩লক্ষ নতুন জমি। ফলে সব্জি উৎপাদন বেড়েছে ব্যাপকহারে। চালু হয়েছে চমক দেখানো জাতীয় জাদুঘর। জাতীয় মিউজিয়ামের কাজও থেমে নেই। এগিয়ে চলেছে পানি সংরক্ষণের জন্য বিশ্বের সর্ববৃহৎ জলাধার নির্মানের কাজ। এতে প্রায় ১.৪ মিলিয়ন গ্যালন পানি মজুত করে রাখা যাবে। আগামী গ্রীষ্মের মধ্যেই দুগ্ধজাত সামগ্রীর চাহিদা স্থানীয় দুগ্ধ খামারের উৎপাদন থেকেই মেটাতে সক্ষম হবে কাতার। এখন মনে হচ্ছে অবরোধকারী দেশগুলোরই কপাল পুড়লো। মানুষের মধ্যে সৌদি জোট বিরোধী মনোভাব এতই তীব্র যে আগামীতে অবরোধ উঠে গেলেও কাতারের জনগন সৌদি উৎপাদিত কোনো সামগ্রী ক্রয় করবে বলে মনে হচ্ছেনা।
অন্যান্য ক্ষেত্রেও থেমে নেই কাতার। গত নভেম্বরে কাতারে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৫৭টি দেশের প্রতিযোগীদের নিয়ে রাইড অব চ্যাম্পিয়নস ২০১৭ শীর্ষক প্রতিযোগীতা। দোহা কনভেনশন সেন্টারে সদ্য সমাপ্ত হয়েছে ২৮তম আর্ন্তজাতিক বইমেলা। চালু হয়েছে জাতীয় লাইব্রেরী। এতে রয়েছে প্রায় ১২ লক্ষ বই, ৫ লক্ষ অনলাইন বই, গবেষণা পত্র, সাময়িকী এবং সংবাদ পত্র। কাতার বিরোধীরা ভেবেছিল সড়ক এবং অকাশ পথের অবরোধ, পর্যটকদের কাতারে আসতে নিরুৎসাহিত করবে। যা কাতারের পর্যটন শিল্পকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। গত মাসে চার হাজার পর্যটক নিয়ে কাতারের বন্দরে নোঙ্গর করেছে এই মৌসুমের প্রথম বড় জাহাজ মেইশিফ-৫। অবরোধকারী জোটের প্রানান্তকর প্রচেষ্টার পরও থেমে নেই কাতার। বড় বড় সব প্রজেক্ট আগের মতোই চলছে। কোনো কোনো ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিলেও সেটা মনে হচ্ছে সাময়িক।
কাতার সরকারের কৃতিত্ব হচ্ছে এই প্রতিক’ল পরিবেশেও কাতারী নাগরিকদের জীবন যাত্রার মানের অবনতি ঘটেনি। সাথে সাথে কাতারে কর্মরত প্রবাসী নাগরিকরাও যাতে অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তহীনতায় না ভোগে সেজন্য তাদের বেতন, ভাতা এবং ছুুটি বহাল রাখা হয়েছে। ফলে প্রবাসী জনগোষ্ঠির মধ্যেও আমীরের নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা এবং সমর্থন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুবাই, বাহরাইন এবং সৌদি বন্দর থেকেই কাতারে খাদ্য সরবরবাহ আসতো। এখন সেটা ওমান, তুরস্ক এবং ইরান ঘুরে আসছে। ফলে কিছু কিছু খাদ্র সামগ্রীর মূল্য বেড়ে গেলেও খাদ্র সরবরাহে কোনা ঘাটতি চোখে পড়েনি। সুপার মার্কেটের তাক আগের মত আর খালি দেখা যাচ্ছেনা। ফার্মেসি এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধের কোনো ঘাটতি পড়েনি, সরবরাহ রয়েছে অটুট।
২০২২ সালে অনুষ্ঠেয় ফুটবল বিশ্বকাপই কাতারকে বিশ্বের মঞ্চে সন্মানের আসনে সমাসীন করেছে। অবরোধকারী দেশগুলোর জ্বলনের এটা ছিল একটি অন্যতম কারণ। তাই বিশ্বকাপকে বানচাল করার জন্য তাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিলনা। কাতারে নির্মান সামগ্রীর সিংহভাগ আসতো মূলতঃ আসতো সৌদি আরব ও আমিরাত থেকে। নির্মান সামগ্রীর আকাল পড়লে বিশ্বকাপের উপর প্রভাব পড়বে কিনা সে নিয়ে আমিও বেশ শঙ্কায় ছিলাম। কিন্তু আমার সেই শঙ্কাকে ভুল প্রমানিত করে তুরস্ক, ওমান থেকে আনা নির্মান সামগ্রী দিয়ে তুমুল বেগে এগিয়ে চলেছে অবকাঠামো তৈরীর কাজ। এছাড়া অবরোধের জন্য কাতারে জনশক্তি চাহিদায় তেমন কোনো মন্দার ভাবও দেখতে পাচ্ছিনা।
সরকারী তথ্যানুযায়ী কাতারের জনসংখ্যা ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত ১.৭ শতাংশ বেড়েছে। কাতারী রিয়ালকে নিষিদ্ধ করে কাতারের অর্থনীতিতে আঘাত হানতে চেয়েছিল সৌদি জোট। কিন্তু সব বাধা ডিঙ্গিয়ে কাতারের জিডিপি ১৫৬ বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে এ বছর। আর ২০২২ সালের মাথায় সেটা ২০১০ বিলিয়ন ছুুঁয়ে যাবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে।
ইরানের সাথে কাতারের গোপন সম্পর্ক রয়েছে বলে সৌদি দেশগুলো নিয়মিত অভিযোগ করে আসছে। কিন্তু এই অবরোধ উল্টো কাতারকে সেই ইরানের দিকেই ঝুঁকতে বাধ্য করছে বলে আমেরিকার নীতি নির্ধারকরা বেশ উদ্বিগ্ন। তাই আমেরিকা সহসা এই সমস্যা নিরসনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে বিভিন্ন মহল থেকে ঈঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যে দেশে রয়েছে আমেরিকার এতো বড় সামরিক ঘাটি, সেই কাতার আমেরিকার চিরশত্রু ইরানের বলয়ে চলে যাবে তা কি হয়?
সম্প্রতি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে একটি কৌতুক। গত মে মাসে রিয়াদে ৫৫টি আরব ও মুসলিম দেশের সন্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। রিয়াদের সন্মেলন কক্ষে নামাজের সময় হয়েছে। সন্মেলনে আগত নেতৃবর্গ নামাজের জন্য দাঁড়িয়েছেন। ইমাম সাহেব সবাইকে কাতার সোজা করতে বললেন। অতিথিদের অনেকে অনারব হওয়ায় ইমাম সাহেব ইংরেজীতে বললেন, “Sraighten up Qatar! Straighten up Qatar!” দূরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কানে আসে ইমামের কথা। তিনি ভাবলেন, ইমাম সাহেব সবাইকে যখন কাতারকে সোজা করার কথা বলছেন তখন তাঁকে কিছু একটা করতেই হবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। তিনি সাথে সাথে সৌদি আরবকে কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করার পরামর্শ দিলেন। আর এভাবেই নাকি শুরু হয় কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি জোটের অবরোধ। ট্রাম্পের মতো এমন একজন নির্বোধ ও ধীশক্তিহীন নেতার কাছ থেকে সমাধান আসার কোনো সম্ভাবনা অন্তত আমি দেখছিনা। তাই খুব সহসা গাল্ফ সঙ্কটের সমাধান হবে বলে মনে হচ্ছেনা।
সবাই তাকিয়েছিল কুয়েতের দিকে। আশা করা হচ্ছিল কুয়েতের জিসিসি সন্মেলন থেকে হয়তো ইতিবাচক কিছ’ একটা বেরিয়ে আসবে। কিন্তু সৌদি আরব ও আরব আমিরাত জিসিসি থেকে আলাদা করে নতুন জোট গঠনের ঘোষণা দেয়ায় কুয়েতের গাল্ফ সন্মেলন একদিনের মাথায় অপ্রত্যাশিতভাবে শেষ হয়ে গেছে। ফলে সৌদি জোটের সাথে সমস্যা সমাধানের রাস্তা সুদূর পরাহত বলেই মনে হচ্ছে। এভাবে নতুন জোট করে পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে কেউ লাভবান হবে বলে মনে হয়না। উপরোন্তু এই সন্মেলন শুরু হবার আগের দিন হুতিদের হাতে ইয়েমেনের সাবেক প্রসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহ-এর খুন হবার পর পরিস্থিতি গভীর অনিশ্চয়তার দিকে মোড় নিয়েছে।
ইয়েমেন সৌদি আরবের জন্য গলার কাঁটা দাঁড়িয়েছে, না পারছে গিলতে না ছুড়ে ফেলতে। ইয়েমেন যুদ্ধের খরচ যোগাতে গিয়ে সৌদি আরবের কোষাগারে আকাল পড়ে গেছে। তাই এই সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি সন্মানজনক পথ খুঁজছিলেন প্রিন্স সালমান। হঠাৎ করে আলী আব্দুল্লাহ হুতিদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন তা ছিল এই ছকেরই একটি অংশ। জানা যায়, এর নেপথ্যে ছিল আরব আমিরাত। ইয়েমেন সঙ্কট নিয়ে সৌদি আরব এমন করে ফেঁসে আছে যে কাতার অবরোধ নিয়ে ভাববে সেই ফুরসৎ নেই তাদের। এ পর্যন্ত আমিরাতের দেয়া কোনা পরামর্শ নিয়ে সৌদি আরব সফল হতে পারেনি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তা বুমরাং হয়ে সৌদি আরবকেই তাড়া করছে। এই সত্যটা প্রিন্স সালমান যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করবেন সেটা ততই মঙ্গলজনক হবে।
অবরোধের প্রাথমিক ধাক্কা সামলিয়ে মোটামুটি অক্ষত অবস্থায় কাতারের এই উত্তোরণ, আমীর শেখ তামিমের বিচক্ষনতা ও সময়োচিত পদক্ষেপের জন্যই সম্ভব হয়েছে। এজন্য কঠিন বিপর্যয়ের মধ্যে থেকেও আমীরের প্রতি কাতারীদের আনুগত্যে কোনো চিঁড় ধরেনি। দেশের এই দুঃসময়ে সব শ্রেনীর কাতারী নাগরিক একজোট হয়ে আমীরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তারা বিশ্বকে জানিয়ে দিতে চায়, অবরোধে ভীত নয় কাতার। সবাইকে সাথে নিয়েই কাতার পোঁছে যাবে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে।
৬ ডিসেম্বর, ২০১৭
