কাতারের ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশ স্কুল দোহা কলেজের প্রধান ফটকের অদূরে দাঁড়িয়ে আছি। দেখলাম, প্রাইমারি ক্লাসের একজন ছাত্র হাতের খালি প্লাস্টিক জুসের বোতল এবং চিপ্সের প্যাকেট রাস্তার পাশে ফুটপাতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে দৌড়ে এসে আমার পাশেই দাঁড়ানো গাড়ীতে উঠে এসে বসলো। মনে হল, গাড়ীতে ছেলেটির বাবা ও মা দু’জনেই ছিলেন। এরপর একটা অবাক করা কান্ড দেখলাম।
গাড়ীটি চলতে শুরু করার ঠিক আগে একজন ব্রিটিশ ভদ্রমহিলা, ছেলেটির ছুড়ে ফেলা আবর্জনা হাতে তুলে নিয়ে গাড়ীর কছে এসে জানালায় টোকা দিলেন। গাড়ীর চালক জানালার কাচ নামাতেই, ভদ্রমহিলা হাতের ক্যান ও প্যাকেট গাড়ীর ভেতরে ছুড়ে দিয়ে বললেন, তোমার আবর্জনা তুমি বাড়ী নিয়ে যাও, রাস্তায় ফেলবে না। গাড়ীর ভেতরে কে বসে রয়েছে তার তোয়াক্কা না করে ভদ্রমহিলা যা করলেন, তা দেখে আতি রীতিমত হতবাক! একেই বলে নাগরিক সচেতনতা। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবর্তমানে কখনো সাধারণ নাগরিকদেরও পুলিশের দায়িত্ব পালন করতে হয়। আর এ জন্যই উন্নত বিশ্বের শহরগুলোর রাস্তাঘাট ও পরিবেশ এতো পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে।
পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহরের একটি হচ্ছে সিঙ্গাপুর। সেখানে রাস্তাঘাটে কেউ থুথু ফেলেনা, শোনা যায়না গাড়ীর হর্ণ, দেখা যায়না কালো ধোঁয়া। শহরের কোথাও ছেঁড়া কাগজ, পলিথিন, খালি বোতল বা আবর্জনা পাওয়া যায়না। রাস্তাঘাট সবকিছুু ঝক্ঝকে পরিস্কার। এর কারন হচ্ছে, সিঙ্গাপুরে আইনের যেমন যথাযথ প্রয়োগ রয়েছে তেমনি জনগনও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। জনগনের সহযোগীতা না থাকলে আইন কিংবা জরিমানা যতই কড়া হোকনা কেনো, সফলতা আসবেনা।
কোনো নতুন শহরে পা রাখার পর সেই শহরের মানুষের আচরন, শহরের রাস্তাঘাটের হাল দেখে সেই শহর কিংবা দেশের সভ্যতা ও উন্নয়নের একটা পরিমাপ করা যায়। ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা উপভোগ করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কাতারে আসবে হাজার হাজার ফুটবল পাগল মানুষ। তাই বিশ্বের চোখে দোহাকে একটি পরিচ্ছন্ন শহর হিসাবে গড়ে তোলার জন্য অবকাঠামো উন্নয়নের সাথে সাথে কাতার সরকার এবার শুরু করেছেন পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান।
গত বছরের অক্টোবরে কাতারের মহামান্য আমীর শেখ তামিম বিন হামাদ আলথানির পরিচ্ছন্নতা এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ক নতুন আইন, ১৮(২০১৭) পয়লা ফেব্রুয়ারী থেকে কার্যকর হয়েছে। কাতারের পৌরসভা ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষকরা মাঠ পর্যায়ে এই আইন প্রয়োগ করবেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা কিংবা দন্ড দেবার জন্য তাঁদের বিচারকি ক্ষমতাও থাকবে। এর আগেও কাতারে একই ধরনের একটি আইন ছিল তা হচ্ছে আইন নং ৮(১৯৭৪)। ২০১৭ সালের নতুন আইনটি মূলতঃ আগের ৮(১৯৭৪) আইনেরই পরিবর্ধিত সংস্করণ এবং এতে আরো জুড়ে দেয়া হয়েছে বেশ কড়া বিধিনিষেধ ও জরিমানা। আগের সর্বোচ্চ জরিমানা পাঁচ রিয়াল থেকে বাড়িয়ে এখন পচিঁশ হাজার এবং সাথে এক বছরের জেলেরও বিধান রাখা হয়েছে।
রাস্তাঘাট, বাড়ির আঙ্গিনা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, সমুদ্র সৈকত, পার্ক, বাগান, পশু পালন থেকে শুরু করে পরিবেশ রক্ষা ও নাগরিক পরিচ্ছন্নতার প্রায় সবকিছুই এই নতুন আইনের আওতায় আনা হয়েছে। আমরা প্রায় সবাই বিনোদনের জন্য সমুদ্র সৈকতে যাই এবং খাওয়া দাওয়া ও আনন্দে মেতে উঠি। পার্ক কিংবা সমুদ্র সৈকতে আধখাওয়া খাবার কিংবা বর্জ্য রেখে আসলে এখন ৫০০ রিয়াল জরিমানা করা হবে।
উন্নত দেশে দালানের সীমানার মধ্যে কাপড় শুকোতে দেয়ার জন্য নির্ধারিত জায়গা থাকে। কিন্তু কাতারে সেই ব্যবস্থা নেই। কাতারে যাঁরা ফ্ল্যাটে থাকেন তাদের জন্য কাপড় শুকোতে দেয়া একটি বড় সমস্যা। এখন থেকে সড়ক কিংবা জনবহুল এলাকার দিকে মুখ করা জানালা কিংবা বারান্দায় কাপড় শুকোতে দেয়ার আগে সচতেন হতে হবে। কারণ এজন্য এখন ৫০০ রিয়াল জরিমানা গুনতে হবে।
দোহা শহরের রাস্তাঘাটে বিভিন্ন স্থানে চায়ের কাপ, প্লাস্টিক ব্যাগ, চট্-জলদি দোকান থেকে কেনা খাবারের উচ্ছিষ্ট ও কৌটা পড়ে থাকতে দেখা যায়। চলন্ত গাড়ী থেকেও আমরা অনেকে আবর্জনা নিক্ষেপ করি। অনেক সময় জনসমাগম স্থলে কিংবা রাস্তায় একটি পানির প্লাস্টিক বোতল বা ব্যাগ নিক্ষপ করে আমরা ভাবি, তেমন কিইবা অপরাধ করলাম? আবর্জনাতো আর আমার বাড়ী যাচ্ছেনা, সেটা ভেবেও অনেকটা স্বস্তি পাই। কিন্তু এক লক্ষ মানুষ যদি একই কাজ করে বসে পরিবেশের কি হাল হবে – ভেবে দেখুন। প্লাস্টিকদূষণ পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিজ্ঞানীদের মতে, পরিবেশে প্লাস্টিক পঁচতে ৫০০ থেকে ১ হাজার বছর পর্যন্ত লাগতে পারে। প্লাস্টিক পণ্যের পুনঃচক্রায়ন হয়না বলে ফলে প্লাস্টিক পরিবেশে স্থায়ীভাবে থেকে যায়।
এছাড়া ফুটপাত দখল করে পাড়ি পার্কিং করা দোহা শহরে অনেকটা গ্রহনযোগ্য রীতিতে পরিণত হয়েছে। রাস্তা কেবল গাড়ী চলার জন্য নয়, পথচারীদেরও রাস্তা ব্যবহার করার সুযোগ থাকতে হবে। গাড়ী থেকে দখল মুক্ত করে রাস্তার ফুটপাত পথচারীদের ফিরিয়ে দিতে পৌরসভাকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।
সঠিক প্রয়োগ ছাড়া আইন প্রনয়ন করলে তেমন সুফল আসেনা। ১৯৭৪ সাল থেকে কাতারে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক আইন বলবৎ রয়েছে। এ ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বেশ শিথিল বলে মনে হয়েছে। উন্নত দেশে পুলিশের পাশাপাশি পৌরসভার পরিদর্শকরাই এই ধরনের আইন প্রয়োগ করতে অগ্রনী ভ’মিকা পালন করে থাকেন। প্রতিটি রাস্তা ও অলিগলিতে তাঁরা নিয়মিত টহল দেন এবং আইন ভঙ্গকারীদের শনাক্ত করেন। তাই নতুন আইন থেকে সুফল পেতে হলে কাতার পৌরসভা ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ের দলে পর্যাপ্ত সংখ্যক পরিদর্শকের নিয়োগ দিতে হবে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন মহল্লার কৌশলগত জায়গায় সিসি টিভি ক্যামেরাও বসানো যেতে পারে।
যে শহরে আমরা বাস করি তার পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে সাথে আমাদের উপরও বর্তায়। মুখে কেবল “আই লাভ কাতার” বললেই হবেনা। আসুন, দোহা শহরকে আরো পরিচ্ছন্ন এবং বসবাসযোগ্য করে তোলার জন্য সঠিক কাজটি করি এবং যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা বন্ধ করি।
৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮
