একুশ আসলে আমার দুঃখ বাড়ে
মহাজনের চক্র-বৃদ্ধি সুদের মত
আমার দুঃখের মাত্রা বাড়তেই থাকে।
’৫২ সালে ছিল বর্ণমালার জন্য স্বজন হারানোর দুঃখ।
একুশের ভোরে মুহুরী নদীর ভরা জোয়ারে
পাল তুলে ছুটেছিলেন মুন্সি চাচা,
রইসুদ্দী ফেরিওয়ালা এবং আরো অনেকেই
বর্ণমালা আনতে শ্লোগানের হাত ধরে।
ওরা সেই যে গেলেন আর ফিরে আসলেন না।
ওরা সবাই এখন লিংক রোডের মোড়ে
কংক্রিটের তৈরী শহীদ মিনার।
মুহুরীতে পানি নেই। এনারক্সিয়া রোগীর মত
শুকনো কাঠ হয়ে গেছে মুহুরীর জোয়ান শরীর।
এখন ডুব সাঁতার দিয়ে পানকৌড়ির মত
আর বর্ণমালা খুঁজে আনতে পারি না।
তাই একুশ আস্লে আমার দুঃখ বাড়ে
বাড়তেই থাকে।
মায়ের শেখানো বর্ণমালা আর মনে পড়ে না।
মুখে খৈ ফোটে শেখানো বুলি।
আমার মগজের কার্পেটে গর্জন করে
অত্যাধুনিক ভ্যাকুয়াম-ক্লিনার;
শুষে নেয় যাবতীয় বর্ণমালা।
আমার সন্তানেরা ভোর হলে দোর না খুলে
চালু করে এটিভির দুরন্ত চ্যানেল;
হিংস্র আঙ্গুলে চেপে ধরে রিমোট কন্ট্রোল ।
সিঁথিতে তাদের শ্রীদেবী, জিন্সের বাহারে জন আব্রাহাম।
মুখস্থ পদ্যের মত আওড়িয়ে চলে
‘হাম আপকে হ্যায় কওন’।
আমার বর্ণমালার উপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে
বলিউডের অসংখ্য রঙীন ঘোড়া;
শিবসেনার ধারাল কিরিচ হয়ে
চিরে দিচ্ছে সংস্কৃতির উদোম শরীর;
রেখে যাচ্ছে গভীর ক্ষত।
হ্যামিলনের বংশীবাদকের সুরে
মোহাচ্ছন্ন ইঁদুরের মত
ছুটছে সবাই।
ছেড়ে যাচ্ছে বর্ণমালার শহর
মাইকেল মধুসূদনের সাগর দাঁড়ি,
নজরুলের চুরুলিয়া গ্রাম।
মধুসূদন যদি আজ বেঁচে থাকতেন
নির্ঘাত কবিতা লেখা বন্ধ করতেন।
কিংবা শোকার্ত শবযাত্রীর মত
কালো পোষাক পরে
আবার কাটতেন বিলেতের টিকেট।
একুশ আস্লে তাই আমার
দুঃখ বাড়ে
ঘৃণা বাড়ে
ক্ষোভ বাড়ে।
আমার দু’চোখ সার্চ লাইটের মত জ্বলে ওঠে।
আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি,
আমার মা আমাকে অভিশাপ দিচ্ছে
আমার বর্ণমালা আমাকে অভিশাপ দিচ্ছে
ক্লান্ত বিবেক আমাকে অভিশাপ দিচ্ছে, অভিশাপ দিচ্ছে–
