খসখসে কালো রাজপথে খেটে-খাওয়া মানুষ আমি;
আমার খুব একটা বেশী কিছু চাইবার ছিল না।
সেই কাক-ডাকা ভোরে ছুটে যেতাম ঘামে-ভেজা শহরে
আর সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরে বলতাম:
‘বড্ড ক্ষিদে পেয়েছে মা, ভাত দে’।
আমার খুব একটা বেশী কিছু চাইবার ছিল না।
গাড়ী, বাড়ী, হেরেমখানা কিংবা সুইমিং পুল
না কোনটাই নয়;
শুধু একটি স্বপ্নের কথা আমি
শোনাতে চেয়েছিলাম আমার বাবাকে।
আমার স্বপ্নের কথা, বাংলাদেশের কথা।
এই স্বপ্নের কথা ভেবেছি আমি ফুসফুস থেকে
বেরিয়ে আসা আমার শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে,
আমার ব্যস্ততায়, আমার অবসরে
আর প্রেমিকার সাথে প্রতিটি প্রেমবাক্য উচ্চারণের ফাঁকে ফাঁকে।
সহ্য হয়নি ওদের আমার এই স্বপ্ন দেখা,
আমার মত আরো সাত কোটি মানুষের স্বপ্ন দেখা।
তাইতো ২৫শে মার্চের ঘন-কালো অন্ধকারে
তাণ্ডব তুললো যত হিংস্র শ্বাপদের দল সারা বাংলায়।
হানাদারের বিষাক্ত ছোবল থেকে রক্ষা পেল না কিছুই
কোলাহলে ভরা মধুর কেন্টিন,
বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর, রমনার বটমূল;
দানব ট্যাংকের ঘায়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হল শহীদ মিনার।
তাজা রক্তের স্রোতে পিচ্ছিল হল খস্খসে রাজপথ।
ওরা নিয়ে গেল আমার বাবাকে। বুকের ঠিক মধ্যখানে
নির্মম বেয়োনেটের ক্ষত চেপে ধরে,
যাবার আগে বাবা বলে গেলেন:
‘ফিরে আসি, তবেই তোর স্বপ্নের কথা শুনবো’।
বাবা আ- র – ফেরেননি।
প্র্রচণ্ড ঘৃণায় তখনই মুষ্টিবদ্ধ হল হাত,
দিতে হবে আঘাতের বদলে প্রতিঘাত।
আমার যে হাতে থাকতো প্রেমিকার হাত
সেই হাতে উঠলো স্টেনগান,
আর ভয়ংকর তাজা বোমা।
যে চোখে দেখতাম শুধু প্রিয়তমার চোখ
সেই চোখে জ্বললো প্রতিশোধের আগুন।
যে কণ্ঠ দিয়ে মা বলে ডাকতাম
সেই কণ্ঠে উঠলো বজ্র শ্লোগান।
বাংকারে আর শত্র“ ছাউনির ভয়াল অন্ধকারে কাটলো
আমার দিনরাত্রি, দীর্ঘ ন’টি মাস।
অবশেষে হার মানলো ঘাতকের দল, মুক্ত হল স্বদেশ।
ফিরে আসলো অনেকেই;
কিন্তু বাবা তাঁর কথা রাখলেন না।
আমার স্বপ্নের কথাও আর বলা হলনা।
সেই থেকে বাবাকে বলতে না পারার যে কষ্ট
হায়নার মত কুরে-কুরে খাচ্ছিল আমাকে।
ত্রিশটা বছর পরে হঠাৎ মনে হল
ওই কষ্টটা হালকা হল বুঝি কিছুটা।
কারণ, মাত্র ক’দিন হল
একজন বাবা হয়ে নিজের সন্তানকে
আমি বলেছি, আমার সেই স্বপ্নের কথা,
বাংলাদেশের কথা, স্বাধীনতার কথা,
মুক্তিযুদ্ধের কথা আর আমার বাবার কথা।