মধ্যপ্রাচ্যে চাকরিক্ষেত্রে পাসপোর্ট এবং মানুষের গায়ের রঙের যে কী মূল্য, তা কাতারে না এলে কখনো জানা হতো না। পশ্চিমা দেশের একজন শ্বেতাঙ্গ নাগরিক যে বেতন পাবে, অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন হলেও পশ্চিমা দেশেরই পাসাপোর্টধারী অশ্বেতাঙ্গ নাগরিক তার চেয়ে কম বেতন পাবে। উন্নত বিশ্বেও দেশের পাসপোর্ট না থাকলে বেতনের স্কেল সম্পূর্ণ আলাদা। চাকরিক্ষেত্রে আমেরিকান পাসপোর্টের মূল্য সবচেয়ে বেশি, এরপর ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া। প্রবাসী আরবিদের কথা বাদ দিলে এরপর পর্যায়ক্রমে ভারত, ফিলিপিনো, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ইত্যাদির অবস্থান।
শ্বেতাঙ্গরা হলেন সর্বজ্ঞানী, এমন একটা ভাব কর্মক্ষেত্রে লক্ষ ণীয়। অভিজ্ঞতা আছে কি নেই, সেটা বড় কথা নয়। এ ধরনের মানসিকতা আমাকে ভীষণ পীড়া দেয়। আমি দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন সেক্টরে সাদা মানুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছি কিন্তু এমন সাদা-কালো মনোবৃত্তি কখনো চোখে পড়েনি। ওখানে যোগ্যতা হলো মানুষকে যাচাই করার প্রধান মানদণ্ড। অথচ এই তো খুব বেশি দিনের কথা নয়, White Australia Policy-র কারণে অস্ট্রেলিয়াতে কালো কিংবা বাদামি রঙের মানুষের অভিবাসন ১৯৭৩ পর্যন্ত বন্ধ ছিলো।
গায়ের রঙের কারণে শপিং মলে বৈষম্যের শিকার হওয়ার একটি ঘটনা বলছি। দোহায় কর্মরত দুজন অস্ট্রেলিয়ান সহকর্মী একটি বড় শপিং মলে গেছেন, দিনটি ছিলো শুক্রবার। তাদের একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান আর অন্যজন শ্বেতাঙ্গ। শপিং সেন্টারের প্রবেশদ্বারে সিকিউরিটি গার্ড বাধা দিয়ে বললো, আজ ব্যাচেলরদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তারা ফিরে যেতে উদ্যত হলে সিকিউরিটি গার্ড শে^তাঙ্গ বন্ধুটিকে ডেকে শপিং মলে ঢুকতে দিয়ে ভারতীয় অস্ট্রেলিয়ানটিকে ফিরে যেতে বললো। কারণ জানতে চাইলে গার্ড বললো, এটা ওপরওয়ালার নির্দেশ।
অস্ট্রেলিয়ায় Racial Discrimination Act-এর মাধ্যমে সরকারিভাবে বর্ণবৈষম্যের পথ রুখে দেওয়া হয়েছে। এটা অত্যন্ত কড়া আইন, যা সাদা-কালো সব রঙের মানুষই ভয় পায়। সিডনিতে আমি নিজেও একজন বর্ণবাদী প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলাম, আর আদালতে গিয়ে সুবিচার পেয়েছিলাম। ওই বর্ণবাদী প্রতিবেশী আদালতের রায়ের এক দিন পরই বাসা ছেড়ে পালিয়ে যায়। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় কর্মক্ষেত্রে সবাই যাতে সমান সুযোগ পায়, সেই জন্য রয়েছে EEO (Equal Employment Opportunity), যার সুুফল আমার জানামতে পেয়েছেন অনেকেই।
মক্কার প্রতিক্রিয়াশীলদের গড়া সমাজব্যবস্থা থেকে শ্রেণিবৈষম্যের মূলোৎপাটন করেই ইসলামের যাত্রা শুরু হয়। এ জন্যই দেখা গেছে, হজরত বেলাল (রাদি.)-এর মতো সমাজের অবহেলিত ও নিপীড়িত জনতা সবার আগে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বিদায় হজের ভাষণে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বর্ণবৈষম্যের কবর রচনা করেছিলেন আজ থেকে প্রায় ১৪০০ বছর আগে, ‘…an Arab has no superiority over a non-Arab nor a non-Arab has any superiority over an Arab; also a white has no superiority over black nor a black.Õ’
মানবজাতির জন্য দেওয়া সেই দিকনির্দেশনার প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পেয়েছি ১৮৬৩ সালে, আমেরিকার মানবাধিকারের জনক আব্রাহাম লিঙ্কনের বিখ্যাত Gettysburg বক্তৃতায়, ‘…that all men are created equal.’ কাতারে রাষ্ট্র পরিচালনার অনেক ক্ষেত্রে ইসলামিক শরিয়া আইন প্রয়োগ করা হয়। আশা করছি, কাতারেও সহসা এ ধরনের আইনের প্রবর্তন হবে।
বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো!
ক্ষমতায় আসার পর গত বছরের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাতার সফরে আসেন। দোহার শেরাটনে আয়োজিত হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। সিডনিতে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া, দুজনের অনুষ্ঠানেই আমি যোগ দিয়েছি। অস্ট্রেলিয়ায় বড় হওয়া আমার কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দেখার জন্য ভীষণ আগ্রহ দেখালো। তাই পুরো পরিবার নিয়েই অনুষ্ঠানে হাজির হলাম। শেরাটনে গিয়ে কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনী দেখে প্রথমে ভড়কে গেলেও আশ্বস্ত হলাম উন্নতমানের নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখে। হলের লবিতে ঢোকার মুখেই বসানো হয়েছে মেটাল ডিটেক্টর। একপর্যায়ে নিরাপত্তাকর্মীরা নারীদের হাতের ব্যাগ, ক্যামেরাও গাড়িতে রেখে আসতে বলল। এমনকি তারা আমার মেয়ের iPOD ভেতরে নিতে দিলো না, যা আমার কাছে একটু বাড়াবাড়িই মনে হলো। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার কথা ভেবে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেয়ের হাত থেকে iPOD নিয়ে গাড়িতে রেখে এলাম।
অনুষ্ঠান শুরু হলো। কিছুক্ষণ পর দেখি, হলের বেশ কয়েকটি জায়গা থেকে ক্যামেরার ফ্লাশলাইট জ্বলে উঠলো। তাকিয়ে দেখি, আমার পাশেই একজন ভদ্রলোক ছবি তুলছেন। তিনি বললেন, ‘এখন গেট ফাঁকা, যান গাড়ি থেকে ক্যামেরা নিয়ে আসুন।’ তাড়াতাড়ি হলের বাইরে এসে দেখি, মেটাল ডিটেক্টর জায়গামতো থাকলেও আশপাশে কোনো কাক-পক্ষীও নেই। তা-ই যদি হবে, অনুষ্ঠানের আগে ঢাকঢোল পিটিয়ে সবাইকে নিরীক্ষা করার কী দরকার ছিলো?
আমি রীতিমতো হতবাক! বিরক্তি ও ক্ষোভে মনটা ভরে গেলো। এমন অবস্থায় হলের মধ্যে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে কারও বিন্দুমাত্র অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ক্যামেরা আনার উৎসাহ হারিয়ে ফেললাম। ভেতরে এসে দেখি, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের কেউ মঞ্চের অদূরে দাঁড়িয়ে, আবার কেউ বসে বক্তৃতা শুনছেন। তাঁদের ধারণা, এখন কেবল মঞ্চ সুরক্ষা করলেই যথেষ্ট, বাইরে কী ঘটছে তা জানার দরকার নেই।
অনুষ্ঠানের শেষে খাবারের বিরতিতে অনেকে চাইছিলেন প্রধানমন্ত্রীর একটু কাছে যেতে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দেখলাম গর্জে উঠতে। অনেকের সঙ্গে তাঁরা রূঢ় ব্যবহারও করলেন। নিরাপত্তারক্ষায় নিয়োজিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অফিসারদের এমন আচরণ দেখে মনে হলো, প্রধানমন্ত্রীকে সত্যিকার নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে তাঁরা শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য তোষামোদিতেই ব্যস্ত। না হলে সন্ত্রাসীদের জন্য গেট খোলা রেখে অনুষ্ঠানে আসা অতিথিদের ওপর চোটপাট নিতেন না।
আমার বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত অফিসারদের যেকোনো ধরনের হামলা মোকাবিলার জন্য রয়েছে সর্বোচ্চ প্রশিক্ষণ। অথচ মূূল প্রবেশদ্বার অরক্ষিত রেখে মঞ্চ সুরক্ষার এই পরিকল্পনা তাঁরা কোথায় পেলেন, ভেবে কূল-কিনারা পাইনি। শুধু প্রশিক্ষণ থাকলেই হয় না, নিরাপত্তা কার্যকর করার জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতার। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ভিআইপিদের নিরাপত্তা কতখানি নির্ভরযোগ্য, প্রধানমন্ত্রীর সেটা এখন ভেবে দেখা উচিত।
সেপ্টেম্বর, ২০১০
