কাতারপ্রবাসী বাংলাদেশি জনসংখ্যা এখন প্রায় তিন লাখের কোঠায়। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারা মিলিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের সংখ্যা পঞ্চাশোর্ধ্ব। এসব সংগঠনের উদ্যোগে জাতীয় দিবসগুলো পালন করা ছাড়াও পিকনিক, ইফতার ও ঈদ পুনর্মিলনী, জন্মদিনের উৎসব, পিঠা উৎসব, প্রশিক্ষণ কর্মশালা, মিলাদসহ হরেক রকমের অনুষ্ঠান কাতারে লেগেই থাকে সারা বছর। এ ধরনের ছোট-বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য উপযোগী মিলনায়তনের অভাব বহুদিন ধরে অনুভব করছে কাতারপ্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি। এমনকি সংগঠনগুলোর নিয়মিত সভা করার জন্য ২০-৩০ জনের জন্য উপযোগী কোনো হলঘরও এখন মিলছে না। অনুষ্ঠান আয়োজকদের সুবিধাজনক একটি মিলনায়তন খুঁজে পেতে রীতিমতো গলদঘর্ম হতে হয়। তাই দোহা শহরের বিভিন্ন এলাকার বাংলাদেশি রেস্তোরাঁই হলো সবার একমাত্র ভরসা। ব্যয়সাধ্য হওয়ায় তারকাখচিত হোটেলে এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে গুটিকয়েক সংগঠন ছাড়া কেউ তেমন একটা আগ্রহী হন না।

কিছু কিছু বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর দোতলায় হলঘর রয়েছে। তবে অধিকাংশ রেস্তোরাঁর হলঘরে ১০০ থেকে ১৫০ জনের বেশি মানুষের সংকুলান হয় না। সাপ্তাহিক বন্ধের দিন শুক্রবার। তাই ওদিনই জনসমাগমের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। তবে ছুটির দিনে রেস্তোরাঁয় নিয়মিত গ্রাহকদের প্রচুর ভিড় হয় বলে অনেক সময় স্বস্তিতে পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা সভা করা যায় না। সাংগঠনিক সভা কিংবা প্রশিক্ষণ কর্মশালার মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান রেস্তোরাঁর কোলাহলময় পরিবেশে করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া অধিকাংশ বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ দোহা শহরের পুরোনো এবং ব্যস্ততম এলাকায় হওয়ায় আশপাশে গাড়ি পার্কিং পাওয়াটা অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অতিথিরা সময়মতো আসতে ব্যর্থ হন বলে অনুষ্ঠান ঝুলে যায় কিংবা দেরিতে শুরু করতে হয়।

এই তো মাত্র কদিন আগে, সবাইকে কাঁদিয়ে অকস্মাৎ পরপারে পাড়ি জমালেন কাতারের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশ কমিউনিটির প্রাণপুরুষ, সবার প্রিয় প্রকৌশলী আবদুল মান্নান। হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি স্থানীয় হামাদ হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। কাতারের বাংলাদেশ স্কুলের প্রতিষ্ঠা, কখনো বন্যার সময় তহবিল সংগ্রহ, ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ কাতার শাখার প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে কাজ করেছেন। মরহুম মান্নান নিজের কর্মকাণ্ড ও ভালোবাসা দিয়ে মানুষের হৃদয়কে এমন করে ছুঁয়ে যান যে তাঁর মৃত্যু কাতারের বাংলাদেশ কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষকে নিদারুণ শোকাহত করেছে।

তাঁর মৃত্যুর পর বিভিন্ন সংগঠন এবং কমিউনিটির পক্ষ থেকে তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনায় আয়োজন করা হয় দোয়া মাহফিল। বাংলাদেশ কমিউনিটির পক্ষ থেকে দোয়া মাহফিল আয়োজন করতে গিয়ে এমন একটি ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানের জন্য উপযোগী হলঘরের অভাব আয়োজকদের সবাই অনুভব করেছেন। শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি একটি রেস্তোরাঁয় করা হয়। তবে কমিউনিটি থেকে প্রচুর সাড়া আসার পরও জায়গার সংকুলান হবে না বলে প্রতিটি সংগঠন থেকে দোয়া মাহফিলে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যা আয়োজকদের জন্য ছিলো সত্যিই পীড়াদায়ক।

ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলোতে প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় পৌরসভার তত্ত্বাবধানে রয়েছে কমিউনিটি হল বা সেন্টার, যা খুব সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া নেওয়া যায়। কিন্তু কাতারে সেই সুবিধা নেই। এখানে বড় ধরনের অনুষ্ঠান, যেমন ঈদের কনসার্ট, মেলা, মেজবান ইত্যাদি স্টেডিয়াম কিংবা কোনো স্কুলের অডিটরিয়াম ভাড়া নিয়ে করা হয়। এতে যা খরচ এবং অনুমতি নিতে যে ধরনের ধকল পোহাতে হয়, তা সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে বললেই চলে। কাতার মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় বিভিন্ন এলাকায় পৌরসভার নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি হল নির্মাণের কথা ভাবছে কাতার সরকার। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে এখনো অনেক দিন বাকি।

এ নিয়ে অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমাদের কমিউনিটির জন্য একটি হলঘর দরকার, এ বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু উপযুক্ত মিলনায়তন মিলবে কোথায়? এ নিয়ে ভাবতে গিয়ে প্রথমেই যে প্রতিষ্ঠানের কথা মাথায় আসে, সেটা হচ্ছে কাতারস্থ বাংলাদেশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ। অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, বাংলাদেশ স্কুলের একটি মিলনায়তন কি এ জন্য ব্যবহার করা যায় না? স্কুলের একটি বড় আকারের কক্ষ কমিউনিটির অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত করে রাখা যেতে পারে।

তবে মিলনায়তন ব্যবহার করার আগে প্রয়োজনীয় বিধি-নিয়ম তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো রকমের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা না ঘটে। বিধি-নিয়ম মেনে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের ভাড়া দিয়েই কেবল মিলনায়তন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে। এতে সমগ্র কমিউনিটি যেমন উপকৃত হবে, তেমনি হল ভাড়া থেকে বাংলাদেশ স্কুল নিয়মিত উপার্জন করতে পারবে। দূতাবাস এবং বাংলাদেশ কমিউনিটির যৌথ প্রচেষ্টার ফসল এই বাংলাদেশ স্কুল। স্কুল পরিচালনা থেকে শুরু করে, নতুন ভবন নির্মাণ ব্যবস্থাপনায় কিছু নিবেদিতপ্রাণ প্রবাসী বাংলাদেশি এখনো সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাই বাংলাদেশ স্কুল কমিউনিটির দীর্ঘদিনের লালিত এই আকাক্সক্ষা পূরণে হাত বাড়িয়ে দেবে, এই প্রত্যাশায় উন্মুখ সবাই।

কাতারে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রবাসী কমিউনিটির রয়েছে ‘ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টার’ বা সংক্ষেপে আইসিসি। ডি রিং রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠান ভারতীয় কমিউনিটিকে বহুমুখী সেবা দিয়ে থাকে। এতে রয়েছে বিভিন্ন আকারের আটটি মিলনায়তন। রয়েছে নৃত্য, ভাষাশিক্ষা, যোগব্যায়াম, কারাতে, সংগীত ও চিত্রাঙ্কন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। স্বভাবতই এই সেন্টারের ভাড়া, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশাল বাজেটের প্রয়োজন। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্স থেকে কিছুটা আয় হলেও বাকি খরচের টাকা আসছে কোত্থেকে? এই অর্থ জোগান দিতে ভারতীয় দূতাবাসের রয়েছে বিশাল ভূমিকা। জানা যায়, ভারতীয় দূতাবাসের কনসুলার সার্ভিসের সব ধরনের সেবা দূতাবাসের পাশাপাশি দিচ্ছে আইসিসি। যেকোনো কারণেই হোক, যাঁরা দূতাবাসে যেতে চান না, তাঁরা আইসিসির মাধ্যমে একই সেবা পাচ্ছেন। এই সেবা থেকে অর্জিত অর্থ আইসিসির ব্যয়ভার বহনে সহায়তা করছে।

এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান গড়তে হলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের যে একযোগে কাজ করতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কাতারে একই দলের মতানুসারী হয়েও নিজেদের মধ্যে বিভাজনের কারণে অনেক বাংলাদেশি সংগঠন দ্বিধাবিভক্ত। তবে এটা শুধু কাতার নয়, বিশ্বের দেশে দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির চিত্র প্রায় একই ধরনের। তাই অনেকে হতাশ হয়ে বলেন, এ ধরনের কাজ হয়তো আমাদের দিয়ে হবে না।

কিন্তু আমি হতাশ নই। সবাইকে একতাবদ্ধ করার অলীক স্বপ্ন না দেখে বিভক্তি যাতে কাজে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে পন্থাই আমাদের বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টারের পরীক্ষিত পদ্ধতি কাজে লাগানো যায় কি না, সেটা সবার ভেবে দেখা উচিত। যেমন একটি নির্ধারিত ফি এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা মেনেই কমিউনিটি সংগঠনগুলোকে আইসিসির সঙ্গে নিবন্ধিত হতে হয়। দূতাবাস স্বীকৃত সংগঠন, যাদের কোনো রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অ্যাজেন্ডা নেই, তারাই কেবল আইসিসির নিবন্ধন পায়। একমাত্র নিবন্ধিত সংগঠনই তখন তাদের সভা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের জন্য মিলনায়তন ব্যবহার করতে পারে।

বাংলাদেশ সেন্টারের মতো একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের মূল উদ্যোগ অবশ্য প্রথমে কমিউনিটিকেই নিতে হবে। এরপর বাংলাদেশ দূতাবাস সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। অপ্রিয় হলেও এটা মানতে হয়, আমাদের দেশে যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন সরকারি সংস্থা ও তাদের আমলাদের স্বেচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছাই হোক, সরকারি দলের সহযোগীদের প্রতি অনেক সময় পক্ষপাতমূলক আচরণ করতে হয়। এ জন্য দেখা যায়, ভালো কিছু করতে গিয়ে অনেক সময় দূতাবাসকে অযথা পক্ষপাতদুষ্টের অনুযোগ শুনতে হয়। তবে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ সেন্টারের সঙ্গে নিবন্ধনের সময় রাজনৈতিক সমীকরণ যদি বাদ দেওয়া যায়, তাহলে দূতাবাসকেও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না। তাই বলতে ইচ্ছে হয়, ‘ওরা যদি পারে তাহলে আমরা পারবো না কেন?’

অক্টোবর, ২০১৬