আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি ছোট্ট উপদ্বীপ কাতার। প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে অর্জিত অঢেল অর্থ কাজে লাগিয়ে খুব অল্প সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর মধ্যে জনশক্তি রপ্তানির সুবর্ণভূমিতে পরিণত হয়েছে কাতার। যদিও স্বাধীনতার পরপরই চাকরি নিয়ে বাঙালিরা মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমাতে শুরু করেন, তবে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকেই কাতারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আগমন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে থাকে।
বিশে^র অন্যতম ধনী রাষ্ট্রের বাসিন্দা হয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দিনকাল কেমন যাচ্ছে-এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হরহামেশা হতে হয় আমাদের। দেশে যাঁরা আছেন, তাঁদের অনেকের কাছে প্রবাস মানে স্বপ্নের ঘর। তাঁদের ধারণা, প্রবাসেই মিলবে অভাব আর ক্ষুধাকে জয় করার জিয়নকাঠি।
বাস্তব চিত্র কিন্তু তা নয়। প্রবাস মানে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা, প্রবাস মানে শূন্যতা আর একাকিত্বের সঙ্গে ঘর করা। প্রবাসী শ্রমিকদের হাড়ভাঙা খাটুনির ওপর ভর দিয়ে গড়ে উঠছে কাতারের রাজধানী দোহা শহরের বিস্ময়কর ইমারত আর প্রাচুর্যের পাহাড়। অথচ এই ঘামে ভেজা শ্রমিকদের প্রাচুর্যের কানাকড়িও মেলে না।
কাতারপ্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যাগুরু অদক্ষ জনশক্তি এবং শ্রমিক হলেও ব্যবসা, শিক্ষা, ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যাংকিংসহ অন্যান্য বহু সেক্টরে বাংলাদেশিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে আলোকিত করছেন দেশের ভাবমূর্তি। আজকের কাতার স্টিল কোম্পানি প্রবাসী বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানদেরই মেধা ও শ্রমের ফসল। সত্তর দশকের প্রথম দিকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা স্টিল মিল থেকে নিয়ে আসা দক্ষ জনশক্তি দিয়েই চালু করা হয় কাতার স্টিল প্ল্যান্ট। সেই থেকে স্টিল প্ল্যান্টে দীর্ঘদিন ধরে ছিলো বাংলাদেশিদের একচেটিয়া আধিপত্য।
কাতার ফার্টিলাইজার কোম্পানি, পানি ও বিদ্যুৎ সংস্থাÑরাস আবু ফন্টাসে কাজ করছেন বহু বাঙালি। কাতার ফার্টিলাইজার কোম্পানিতে ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান সব মিলিয়ে ১০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মরত। সুপার মার্কেট, রেস্টুরেন্ট, গ্যারেজ, বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল, ফার্নিচার, আবায়া, টেইলারিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা বেশ দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করে যাচ্ছেন।
প্রায় ৪০টিরও বেশি সামাজিক, রাজনৈতিক, বিভিন্ন আঞ্চলিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বুকে ধারণ করে গড়ে ওঠা কাতারের বাংলাদেশ কমিউনিটি, মরুর বুকে যেন ছোট্ট আরেকটি বাংলাদেশ। ছুটির দিনে দোহা শহরের কিছু এলাকা, যেমন নাজমা, মুগলিনা, সালাতা, আল আতিয়া মার্কেট এলাকায় জমে ওঠে প্রবাসী বাঙালিদের আড্ডা। তবে পরিবার নিয়ে খাবার খেতে যাওয়ার মতো মানসম্মত বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর অভাব আমরা সবাই খুব অনুভব করি। বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা এ নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন।
সারা বছর বাংলাদেশ কমিউনিটির বিবিধ কর্মকাণ্ডে সরগরম থাকে দোহা শহর। জাতীয় দিবস এবং বৈশাখী মেলার মতো অনুষ্ঠানগুলো সাধারণত দূতাবাস এবং বাংলাদেশ কমিউনিটির যৌথ উদ্যোগে পালিত হলেও পরে কমিউনিটি সংগঠনগুলো নিজস্ব আঙ্গিকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। কাতারে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের বেশ কয়েকটি ব্যান্ড ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। তবে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠান, কবিতাপাঠের আসর, নজরুল-রবীন্দ্র-সুকান্ত জয়ন্তীর মতো ভিন্ন স্বাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অভাব দেখতে পাই দোহা শহরে।
কাতারের বাংলাদেশ কমিউনিটির সবচেয়ে বড় অর্জন হলো বাংলাদেশ স্কুল। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ উন্নতমানের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এই স্কুল। স্কুলের বর্তমান ছাত্রসংখ্যা ১ হাজার ২০০। সম্প্রতি শুরু হয়েছে বাংলাদেশ স্কুলের বর্তমান ভবন পরিবর্ধনের কাজ। আরও দুটি নতুন ভবন নির্মিত হচ্ছে, যাতে থাকবে ৩০টির মতো ক্লাসরুম, যা স্কুলের ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে দুই হাজারে উন্নীত করবে। বাংলাদেশ কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠন আয়োজিত মেলা কিংবা বড় আকারের অনুষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশ স্কুলের প্রাঙ্গণ ভাড়া দেওয়া যেতে পারে। এটা বাংলাদেশ স্কুলের এককালীন আয়ের একটি ভালো উৎস হতে পারে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সাড়া না পেয়ে এখন বাংলাদেশি কমিউনিটির অনুষ্ঠান হচ্ছে ভারতীয় স্কুলে; আর ভাড়া বাবদ বিশাল অঙ্কের আয় বাংলাদেশ স্কুলের ফান্ডের বদলে জমা হচ্ছে ভিনদেশীয় স্কুলের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।
দোহার ফারিজ আল-আলি এলাকায় ভাড়া করা একটি বিশাল দোতলা দালানজুড়ে রয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাসের কার্যালয়। দূতাবাস হলো বিদেশের মাটিতে নিজ দেশেরই একটি অংশ। অচেনা পরবাসে বাংলাদেশ দূতাবাস আমাদের সুখ-দুঃখের সাথি হবে, মনের গভীরে এই প্রত্যাশাই লালন করেন অধিকাংশ প্রবাসী। অনেক সময় এই প্রত্যাশার মাত্রা এত বেশি থাকে যে, সামান্যতম অপ্রাপ্তিতে প্রশ্নবিদ্ধ হয় দূতাবাস। বাংলাদেশ দূতাবাসে সেবা পাওয়ার সমান অধিকার রয়েছে সব বাংলাদেশি নাগরিকের। তাই এখানে ব্যক্তি কিংবা সংগঠনের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণের কোনো সুযোগ নেই।
দূতাবাস যাতে প্রবাসীদের সঠিক সেবা দিতে পারে, সে জন্য দূতাবাসের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ কমিউনিটিকেও সচেষ্ট হতে হবে। দেখা গেছে, দূতাবাসে আধিপত্য বিস্তারের জন্য আমাদের অনেকেই কর্মকর্তাদের কাজে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেন। নিজের দাপট দেখানোর জন্য ছোটখাটো বিষয় নিয়ে দূতাবাসে লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দেন। এতে দূতাবাসের সেবাদান ব্যাহত হয় এবং পক্ষান্তরে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমগ্র কমিউনিটি।
দূতাবাসকে আরও কার্যকর করার জন্য যাদের সেবা দেওয়া হচ্ছে, তারা সন্তুষ্ট কি না সেটা জরিপ করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। দূতাবাসে ঢোকার মুখেই থাকতে পারে একটি মন্তব্যের বাক্স। এতে শুধু অভিযোগ নয়, কোনো সমস্যার কথা যা দূতাবাস কর্মকর্তাদের সরাসরি বলতে সংকোচ হতে পারে, কোনো পরামর্শ-মন্তব্য, কিংবা প্রশংসার কথা প্রবাসীরা লিখে জানাতে পারেন। সময় সময় এই বাক্স খুলে মাননীয় রাষ্ট্রদূত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। কেউ যাতে এই সুযোগের অপব্যবহার করতে না পারেন, সেদিকেও একটু নজর রাখতে হবে।
ভুলে গেলে চলবে না, সেবা দেওয়ার জন্য দূতাবাসের সক্ষমতারও একটি সীমা রয়েছে। আড়াই লাখ মানুষের সেবা দেওয়া কি চাট্টিখানি কথা? এ জন্য পর্যাপ্ত জনবলেরও প্রয়োজন রয়েছে। প্রবাসীদের সার্বিক কল্যাণের জন্য সৃষ্টি হয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তবে কেবল দেশে বসে প্রবাসীদের সুখ-দুঃখের সাথি হওয়া এই মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোর কার্যালয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে একটি করে প্রবাসী দপ্তর খুলতে পারে।
কাতারে শ্রমিক, গৃহকর্মী ও দক্ষ পেশাজীবী আনার জন্য কাতারের শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিনিধি দল ভারত, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, এমনকি শ্রীলঙ্কাতেও যাচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ওসব দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। ফিলিপাইন ও ভারত সরকার নিজ দেশের নাগরিকদের ন্যূনতম বেতন, নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা আদায়ের জন্য রীতিমতো দর-কষাকষিও করে থাকে। কিছুদিন ধরে দেখছি নেপালি কর্মীতে সয়লাব হয়ে গেছে কাতার, যদিও ওসব জায়গায় বাঙালিদের কাজ করার কথা।
কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ মূলত একটি অদক্ষ জনশক্তি সরবরাহকারী দেশ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু ভারতের মতো বাংলাদেশেরও দক্ষ ও বুদ্ধিবৃত্তিক জনশক্তি রপ্তানি করার সক্ষমতা রয়েছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের এই ইমেজ আমাদের বদলাতে হবে। কাতারপ্রবাসী বাংলাদেশি পেশাজীবীদের নিয়ে জনশক্তি আমদানির জন্য বাংলাদেশ দূতাবাস ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দলকে কাতারে আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে। এদের কাজ হবে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে কাতারের নীতিনির্ধারকদের বোঝানো যে, শুধু ভারত কিংবা ফিলিপাইন নয়, বাংলাদেশেও যোগ্য মানুষ রয়েছে। তাই পেশাজীবী সংগ্রহের উদ্দেশ্যে অন্যান্য দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও যেন কাতার সরকার তাদের প্রতিনিধিদল পাঠায়।
প্রবাসে কর্মরত শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ। বিভিন্নভাবে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক। সরকারি পরিসংখ্যান মতে, ছয় বছরে মোট ১৪ হাজার প্রবাসী লাশ হয়ে ফিরেছেন দেশে। তার মধ্যে ৩০ শতাংশ এসেছেন সৌদি আরব থেকে আর কাতার থেকে ৩০৩ জন।
কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, মৃত্যুর প্রধান কারণ হৃদ্রোগ এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশ। বিদেশে যাওয়ার জন্য খরচকৃত টাকা তুলতে অমানুষিক পরিশ্রম করা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, প্রিয়জনদের কাছ থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা ইত্যাদি মিলিয়ে মানসিক চাপে হৃদ্রোগের মতো ঘটনা ঘটছে। এসব মানুষের কথাও কমিউনিটিকে ভাবতে হবে। কর্মক্ষেত্রে কীভাবে দুর্ঘটনা এড়ানো যায়, এ নিয়ে বাংলাদেশ কমিউনিটির উদ্যোগে বিভিন্ন লেবার ক্যাম্পে সচেতনতামূলক ওয়ার্কশপ, ট্রেনিং এবং কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
কাতারে দক্ষ ও পরিশ্রমী জাতি হিসেবে বাংলাদেশিদের একটি পরিচ্ছন্ন ইমেজ রয়েছে। কাতারের মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং কাতার সফররত বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে কাতারপ্রবাসী বাংলাদেশিদের সুনাম করে থাকেন। আমার দৃষ্টিতে এটাই হলো বাংলাদেশি কমিউনিটির সবচেয়ে বড় সাফল্য।
কাতার একটি অপার সম্ভাবনার দেশ। আমার বিশ্বাস, বর্তমান সাফল্য এবং সুনামের হাত ধরে আরও অনেক এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ, খুলে যাবে বহু প্রবাসী বাংলাদেশির ভাগ্যের দুয়ার।
নভেম্বর, ২০১৬
