ডা. মোদাস্সের আলম, দোহা শহরে কর্মরত একজন নেপালি চিকিৎসক। দোহার শিল্প এলাকার আল-জাইম ক্লিনিকে তিনি চিকিৎসা সেবা দেন। বাংলাদেশের সিলেট মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করা এই চিকিৎসক খুব ভালো বাংলা বলতে এবং পড়তেও পারেন। বাংলাদেশের উপন্যাসিক হুয়াময়ূন আহমদ হলেন তাঁর প্রিয় লেখক।
আল-জাইম ক্লিনিকের মালিক হলেন একজন কাতার প্রবাসী চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী। তিনি হলেন আবার বৃহত্তর ”ট্টগ্রাম সমিতির উপদেষ্টা। সমিতির সভাপতি হিসাবে মেজবানের দাওয়াত দিতে আমি একবার এই ক্লিনিকেরই উপর তলায় তাঁর অফিসে এসেছিলাম। কিছুদিন আগে প্রথম আলো পত্রিকায় একটি লেখা লিখতে গিয়ে কিছু তথ্য জানার জন্য ডাঃ আলমের সাথে টেলিফোনে আলাপ করতে গিয়ে পরিচয়।
ক্লিনিকের পাশেই রয়েছে আল আত্তিয়া মার্কেট। শিল্প এলাকার বাংলা টাউন। এই মার্কেটের প্রায় সব দোকানই বাংলাদেশিদের। এখানে রয়েছে বহু শ্রমিক ক্যাম্প। যেখানে থাকে বিভিন্ন দেশের নিম্ন আয়ের প্রবাসী নাগরিক। এসব শ্রমজীবি মানুষের ভালো ক্লিনিকে যাবার মত সামর্থ্য নেই। এছাড়া ভাষাগত সমস্যার কারণে এরা ডাক্তারের সাথে মন খুলে কথা বলতে পারেনা। শিল্প এলাকার খেটে খাওয়া মানুষের জন্য অনেকটা অবতারের ভ’মিকায় নেমেছে আল জাইম ক্লিনিক। অসাধারণ সেবা দিয়ে যাচ্ছে সবাইকে। যা অনেকেরই জানা নেই।
এখানে রোগীরা আসলে কখনো ফিরে যায়না। ডাক্তারের ফি কিংবা ল্যাব টেস্টের জন্য রোগীদের কাছে পর্যাপ্ত টাকা না থাকলেও বিশেষ ছাড় দিয়ে যে কোনো উপায়ে তাদের সেবা দেয়া হয়। এ ব্যাপারে ক্লিনিকের মালিকের বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। এভাবে আর্তমানবতার সেবা দেয়ার জন্য আল জাইম ক্লিনিকের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই বিশেষ করে স্বত্তাধিকারীর জন্য রইল অকুন্ঠ শ্রদ্ধা ও শুভকামনা।
কথা প্রসঙ্গে আমার রক্ত পরীক্ষা করার কথা উঠতেই ডা. আলম বললেন, এখনই চলে আসুন আমার ক্লিনিকে। টেলিফোনে কথা হলেও ডাক্তারের সাথে সাক্ষাৎ হয়নি কখনো। তাই ভাবলাম, ভালই হল দেখা করার একটা সুযোগ পাওয়া গেল।
ক্লিনিক শুরু হবে বিকেলে। তাই আমাকে বিকেলে আসতে বললেও পারতেন। কিন্তু উনি আমার জন্য বাড়ী থেকে সোজা ক্লিনিকে চলে আসলেন। নিজের তদারকিতে সব কিছু করিয়ে দিয়ে রেস্তারাঁয় নিয়ে গিয়ে চা-নাস্তা খাইয়ে তবেই বিদায় দিলেন। তাঁর কথা বার্তায় বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশিদের প্রতি যে ধরণের বিশেষ মমত্ববোধ ফুঠে উঠছিল তা দেখে খুব অবাক হলাম।
চায়ের টেবিলের আড্ডায় নেপালের ভাষা, ইতিহাস, এবং একজন সংখ্যালঘু মুসলিম হয়ে প্রতিক’লতার বিরুদ্ধে সাঁতার কেটে তাঁর ডাক্তার হয়ে উঠার কথা সহ অনেক কিছুই উঠে আসলো। আমার মাস্টার্স ডিগ্রী করার সময় আমার বেশ কিছু নিপালী সহপাঠি ছিল। নেপালী ভাষার সাথে বাংলা ভাষার যে বেশ মিল রয়েছে সেকথাও জানতাম। কিন্তু ডা.আলমের বাংলাদেশ এবং বাংলাপ্রীতি দেখে নেপাল সম্পর্কে আমার জানার আগ্রহ আরো বেড়ে গেল।
এতো ভালো বাংলা জানার রহস্য জানতে চাইলে তিনি বললেন, নেপালের মৈতালি নামে ভাষা আছে যার সাথে প্রায় ৫০ ভাগ বাংলা ভাষার মিল রয়েছে। যে কারণে নেপালীরা সহজেই বাংলা বুঝতে এবং বলতে পারে। নেপালের সরকারী ভাষা হচ্ছে নেপালি ভাষা। নেপালী মূলত একটি ইন্দো-আর্য ভাষা। এই ভাষা ভারত, ভূটান এবং বার্মাতেও ব্যবহৃত হয়। নেপালী এবং বাংল ভাষার উৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃতি ভাষা থেকে। তাই বাংলা ভাষার সঙ্গে নেপালি ভাষার শতকরা ৪০ ভাগ আভিধানিক সাদৃশ্য রয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯০৭ সালে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম লিপি “চর্যাপদ”, নেপালের রয়াল লাইব্রেরিতে পাওয়া গিয়েছিল। চর্যাপদ হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মীয় দর্শন ধারণ করে লিখা ৪৬ টি কবিতার সঙ্কলন। অধিকাংশ পণ্ডিতের মতে চর্যাপদ ৬৫০ কিংবা ৯৫০ সালের কাছাকাছি লিখিত হয়েছে।
ভাষা হচ্ছে একটা বহতা নদীর মত। বিভিন্ন ভৌগলিক এলাকার সংস্কৃতি ও মৌখিক ভাষায় প্রভাবিত হয়ে ভাষা রূপান্তরিত হয়, নতুন নতুন শব্দমালা ধারণ করে সমৃদ্ধ হয় ভাষার শব্দভান্ডার। নেপালের উত্তরে রয়েছে তিব্বত, দক্ষিণে এবং পূর্বে রয়েছে ভারতের বিহার এবং আসামের সাথে সীমান্ত। এছাড়া নেপালের দৃক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত থেকে মাত্র ২৭ কিলোমিটার দূরেই হল বাংলাদেশের সীমান্ত। তাই নেপালের দক্ষিণে বাংলা ভাষার যেমন রয়েছে প্রভাব, তেমিন উত্তরাঞ্চলের কিছ’ এলাকায় তিব্বতী ভাষার সাথে বহু সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। শুনে অবাক হয়েছি, নেপালের মানুষ ১২৩টি ভাষায় কথা বলে। তিন কোটি মানুষের দেশ নেপালে এতো ভাষার প্রচলন সত্যিই বিস্ময়কর।
নেপাল হচ্ছে হিন্দু প্রধান দেশ যার মুসলিম জনসংখ্যা হল আনুমানিক ৫ শতাংশ। মুসলিম জনসংখ্যার অধিকাংশই বসবাস করেন নেপালের দক্ষিণাঞ্চলে। ডা. আলমের জন্ম দক্ষিনের ২ নং প্রদেশের সিরাহা এলাকার রামাউল গ্রামে। নেপালের মুসলিমদের মধ্যে উর্দু ভাষারও প্রচলন রয়েছে। ডা. আলম নেপালি, মৈথালী, বাংলা সহ উর্দু ভাষাতেও পারদর্শী।
যদিও এখন নেপালে মেডিক্যাল পড়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কয়েকটি উন্নতমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কিন্তু ডা. আলম যখন উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন তখন মেডিক্যাল পড়ার জন্য নেপালি ছাত্রদের ভারত, বাংলাদেশ কিংবা শ্রীলংকা পাঠানো হতো। কেন্দ্রীয়ভাবে মেডিকেল পড়ার জন্য ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হত এবং মেধানুসারে বিভিন্ন দেশের মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রদের পাঠানো হত। এভাবেই বাংলাদেশের সিলেট মেডিক্যাল কলেজে তাঁর আগমন। এর মধ্যে বাংলাদেশ এডুকেশন এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের আওতায় সার্ক স্কলারশিপের পেয়ে গেলে লেখাপড়ার খরচও তাকে বহন করতে হয়নি।
সিলেট মেডিকেলে পড়তে এসে বাংলাদেশের মাটি, মানুষ ও ভাষাকে ভালোবেসে ফেলেছেন ডা. আলম। তিনি বললেন, বাংলাদেশের মানুষ অনেক আন্তরিক এবং বন্ধু বৎসল। কলেজের বিভিন্নœ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত অংশ নিতেন। এভাবে বহু বাংলাদেশী সহপাঠির সাথে তৈরী হয়েছিল বন্ধুত্বের বন্ধন, যা এখনো অটুট রয়েছে। সিলেট মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পসে ফেলে আসা বহু অম্ল-মধূর স্মৃতি এখনো তাকে ব্যাকুল করে।
পড়াশুনা শেষ করে তিনি প্রায় ৩ বছর ভ’টানী রিফুজীদের জন্য জাতিসংঘের একটি প্রজেক্টে কাজ করেন। এরপর ডাক্তারদের লাইসেন্সিং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০১৪ সালে জীবিকার টানে কাতার চলে আসেন।
কাতারের লাখো প্রবাসীর ভীড়ে খুঁজে পাওয়া একজন খাঁটি বাংলা প্রেমী মানুষ ডাঃ মোদাস্সের আলম, যিনি অবাঙ্গালী হয়েও বাংলা ভাষা বাংলাদেশ ও বাংলার মানুষকে ভালোবেসে বুকে টেনে নিয়েছেন।
মার্চ ২০২০
