সৌদি আরবে সম্প্রতি দুজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ তোলপাড় চলছে। অভিযোগ উঠেছে, তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি, এমনকি দণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ দূতাবাসকেও কিছু জানানো হয়নি।
বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের মতো দেশগুলোতে আমাদের দেশের মানুষদের একরকম ‘মিসকিন’ বা নিচু চোখেই দেখা হয়। সেখানে নিজ দেশের নাগরিকদের জন্য এক আইন, আর ঘাম ঝরানো প্রবাসী কর্মীদের জন্য আরেক আইন! তবে হ্যাঁ, পশ্চিমা নাগরিকদের কথা আলাদা। তাঁরা কখনো স্থানীয় নাগরিকদের চেয়েও বেশী খাতির যত্ন পান। তাই তথাকথিত ‘মিসকিন’দের বিচারে যে জবাবদিহিতার প্রয়োজন আছে, তারা তা মনেই করে না।
সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত হাজারো কর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর আমরা প্রতিনিয়ত পাই। বিশেষ করে নারী গৃহকর্মীরা দিনের পর দিন নির্মম শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। শরীরে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন, এমনকি হাত-পা ভাঙা অবস্থায় পুলিশের কাছে গেলেও বিচার পাওয়া যায় না; পুলিশ মামলা নিতেই চায় না উল্টো মারধর করে।পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্তের রিপোর্টগুলো অত্যন্ত অস্পষ্ট ও পরস্পরবিরোধী। কোথাও মৃত্যুর কারণ হিসেবে ট্রমা, পুড়ে যাওয়া বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার কথা বলা হয়, আবার কোথাও লেখা হয় ‘ব্রেইন ডেড’। অথচ শেষমেশ সেই দেশের পুলিশ বলে দেবে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’!
যে শরিয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ নিয়ে এত আলোচনা, শত শত প্রবাসীর মৃত্যু ও নারী কর্মীদের নির্যাতনের ক্ষেত্রে সেই আইনের প্রয়োগ কই? সেখানে ন্যায়বিচার কেন অধরা?
মূলত সৌদি আরব চলে একজন শাসকের খেয়ালখুশিমতো। দেশটিতে রাজা কিংবা বর্তমান শাসক রাজকুমার মোহাম্মদ বিন সালমানের (MBS) ইচ্ছাই শেষ কথা। এমন একটি দেশে কোনো হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা বা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায় না। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেট থেকে বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে গায়েব করে দেওয়ার পর আজও কি কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে?
এখানে বাংলাদেশ সরকারেরই বা কী করার আছে? কূটনৈতিক স্তরে প্রতিবাদ করতে গেলেই হুমকি আসে, লাখো প্রবাসী বাংলাদেশিকে বের করে দেওয়া হবে! বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ চাইলে যে কাউকে আটক করে কোনো কারণ না দেখিয়ে দেশে ফেরত পাঠাতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যে থাকার সুবাদে এমন অনেক অভিজ্ঞতা আমার নিজের দেখা। এমনকি অনেকে ছুটি কাটাতে দেশে গিয়ে আর ফিরতে পারেননি, কারণ হঠাৎ করেই তাদের ভিসা বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল।
সবমিলিয়ে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সৌদি সরকারের কাছে সুবিচার বা ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করা মানে মরুভূমিতে মরীচিকার পেছনে ছোটাই বৈকি!
17 October 2026