দোহা শহরের একটি অন্যতম পুরনো এলাকা হল “মুশাইরিব”, যা বাঙালি ও দোহার আম-জনতার কাছে “ন্যাশনাল” বলেই পরিচিত। বেশ কিছু বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ থাকার ফলে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে, ন্যাশনাল এলাকা জুড়ে বসে বাঙালি প্রবাসীদের বিশাল আড্ডা, যাতে ভিনদেশী প্রবাসীরাও যোগ দেন। মূলত: শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের প্রবাসীরাই এখানে সমবেত হন, দেয়া নেয়া করেন নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা। সপ্তাহের ছয়দিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর, ছুটির দিনটি উপভোগ করার জন্য অনেকে ঝকঝকে কাপড় চোপড় পড়ে এখানে আসেন। ন্যাশনালের প্রধান সড়কের পাশেই রয়েছে একটি পাকা চত্বর, তাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু বসার বেঞ্চ। শুক্রবার বিকেল থেকে এই চত্বরকে ঘিরেই জমে উঠে জনসমাবেশ। রাস্তা, ফুটপাত, অলিগলি ও সবুজ আইল্যান্ডেও উপচে পড়ে জনতার ঢল। যেদিকেই দৃষ্টি রাখা হোকনা কেন, চোখে পড়ে কেবল মানুষ আর মানুষের মিছিল। বাতাসে ভেসে বেড়ায় মানুষের চাপা গুঞ্জরন, যা ঢাকার ব্যস্ত গুলিস্তানের মোড়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
দেশের রেস্তোরাঁয় জ্বাল দেয়া ঘন লিকারের চা আমার খুবই প্রিয়। অস্ট্রেলিয়ায় এই চা ভীষণ মিস করতাম। কিন্তু ন্যাশনালের বাঙালি হোটেল “মধুবন” ও “সোনাগাজী”র চা খেয়ে মনে হল, যেন চাটগাঁর কোনো রেস্তোরাঁয় বসে চা খাচ্ছি। ন্যাশনালের কাছাকাছি আমার বাসা। তাই ছুটির দিনে সেই চা, সিঙ্গারা এবং গরম গরম জিলাপির আকর্ষণে আমি হেঁটেই চলে যাই ন্যাশনালে আর ধূমায়িত চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বাঙালিদের আড্ডায় যোগ দেই। বাঙালি হোটেলের চা ও সিঙ্গারা খাবার পর আমার কয়েকজন অস্ট্রেলিয়ান সহকর্মী, বাঙালি রেস্তরাঁর নিয়মিত খদ্দেরে পরিণত হয়েছেন। একদিন দেখি, সোনাগাজীতে চা খেতে লাইন দিয়েছে এক জাপানী কন্সালট্যান্ট!
কখনো আড্ডার আসর ছেড়ে চায়ের গ্লাসটা হাতে নিয়ে, মানুষের ভিড়ে একা হেঁটে বেড়াতেও আমার খুব ভালো লাগে। আম-জনতার এই ভিড় থেকে এক ধরণের উত্তাপ বিচ্ছুরিত হয়, যা আমার অনুভূতিতে সঞ্চারিত হয়ে আমাকে মাতৃভূমির খুবই কাছাকাছি নিয়ে যায়। আর তখন ছেলেবেলার বন্ধুদের সাথে আড্ডা, দুরন্ত দুপুর, ক্লান্তিহীন খেলাধুলার স্মৃতি বুকের অন্ধকারে ছুটে বেড়ায়। মজার কথা হল, মানুষের ভিড়ের একমাথা থেকে হাঁটতে শুরু করলে চাটগাঁ, নোয়াখালী, সিলেট, কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষা থেকে শুরু করে নেপালি, হিন্দি, পস্তুন, মালায়ালাম সহ কমপক্ষে এক ডজন ভাষার কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাবে।
তবে ন্যাশনালে আকর্ষণ শুধু রেস্তোরাঁ নয়, এখানে রয়েছে সস্তায় কেনাকাটার জন্য রকমারি দোকান, আছে ফটো শপ, বিশাল আইটি মার্কেট “সফিটেল” আর দেশে কথা বলার জন্য আছে ভিওআইপি টেলিফোনের দোকান। নিজ নিজ এলাকার মানুষ খুঁজে পেতে যাতে অসুবিধা না হয় সেজন্য ন্যাশনালে এলাকাভিত্তিক আড্ডার জন্যও রয়েছে বেশ কিছু নির্দিষ্ট স্পট। সোনাগাজী হোটেলের কাছেই রয়েছে বাংলা বাজার। দোহার খামারে উৎপন্ন তাজা শাক-সবজীর হাট বসে এখানে। ন্যাশনালে গেলে তাই খালি হাতে কখনো ফেরা হয়না।
বিশ্বকাপ ২০২২ ফুটবলের আসরকে বরণ করে নেবার জন্য এখন ঢেলে সাজানো হচ্ছে দোহা শহরকে। দোহা শহরে এখন চলছে ভাঙ্গা গড়ার খেলা। ক’দিন আগে রাস্তার মোড়ে যে দালানটি দেখলাম আজ দেখি সেটা নেই, বুল-ডোজার দিয়ে উপড়ে ফেলা হয়েছে, তোলা হচ্ছে আকাশ ছোঁয়া স্কাই-স্ক্রেপার। প্রায় প্রতিটি রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে চলছে খোঁড়াখুঁড়ির কারবার, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন হাইওয়ে, ফ্লাই-ওভার। রংবদলের রং মাখা দোহার নিত্য নতুন সাজ দেখে মনে হয়, একি দু’বছর আগে দেখা দোহা নাকি অন্য কোনো শহর। উন্নয়নের জোয়ারে এখন হারিয়ে গেছে দোহার বাংলা-টাউন খ্যাত “ন্যাশনাল”। একই জায়গায় সবকিছু ভেঙ্গেচুরে এখন তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক মুশাইরিব সিটি। কখনো মুশাইরিবের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাবার সময় নিজের অজান্তে চোখ দু’টো খুঁজে ফেরে ন্যাশনালের ফেলে আসা স্মৃতি, মানুষের গুঞ্জন। ব্যথাতুর হয়ে যায় মনটা। উন্নয়ন হবে, নতুনের জন্য পুরাতনকে জায়গা করে দিতে হবে। কিন্তু দোহা শহরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এলাকাগুলো কাতারের মানচিত্র থেকে এভাবে হারিয়ে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছিলামনা।
