কাতারে সবচেয়ে পুরোনো এবং ঐহ্যিবাহী পার্ক হচ্ছে বিদ্দা পার্ক। এক সময় বিদ্দা পার্কই ছিল কর্মব্যস্তার ফাঁকে একটু অবসর বিনোদনের জন্য দোহা শহরের একমাত্র স্থান। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সবাই পরিবার নিয়ে ছুটে আসতেন এই পার্কে। মরুর বুকে সবুজ ঘাসের চাদরে ঢাকা পার্কে বসে আলাপচারিতায় মেতে উঠতেন। রাতের খাবার খেয়ে গভীর রাত অবধি চলতো অড্ডা। রমজানের সময় অনেকে বিদ্দা পার্কেই সেহরী সেরে ফেলতেন। জাতীয় থিয়েটারের উল্টোদিকে, পার্কের সীমানা যেখান থেকে শুরু, ঠিক সেখানে উঁচু ডিবির উপর ছিল একটি মসজিদ। সেহরী খেয়ে এই মসজিদে ফজরের নামাজ সেরে তবেই সবাই বাড়ী ফিরতেন।
কাতার জাতীয় থিয়েটার পার্শ্ববর্তী মেহাম্মদা বিন থানি সড়ক থেকে শুরু করে মারমার শ্বেত প্রসাদের পাশ ঘেঁষে যাওয়া রুমাইলা সড়ক পর্যন্ত একফালা সরু জমির উপর গড়ে উঠেছিল এই পার্ক। তবে কাতার ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০-এর আওতায় বিদ্দা পার্ককে সম্প্রসারিত করে ঢেলে সাজানোর কাজ হাতে নেয়া হয় ২০১৪ সালে। দীর্ঘ চার বছর পর অবশেষে এছরের স্পোর্টস ডেতে নবরূপে আবিভর্’ত হয়েছে বিদ্দা পার্ক। ১০.৫ হেক্টর এলাকা জুড়ে নির্মিত এই পার্ক এখন মোহাম্মদ বিন থানি সড়ক থেকে শুরু করে দিওয়ান সড়ক পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২ চলাকালীন ফুটবল ফ্যানদের চিত্তবিনোদন এবং বিশ্রামের জন্য অন্যতম প্রধান এলাকা হিসাবে নির্ধারিত করা হয়েছে এই পার্ককে।
প্রায় ছয় হাজার গাড়ী রাখার জন্য পার্কের নীচে নির্মিত হয়েছে বিশাল ভুগর্ভস্থ পার্কিং এলাকা। গাড়ীর ঢোকার জন্য আল খালিজ, কর্নিশ এবং দিওয়ান সড়ক থেকে রয়েছে প্রবেশদ্বার। তবে সঠিক অবস্থান জানা না থাকলে প্রবেশদ্বার খুঁজে পেতে সমস্যা হতে পারে। পার্কের আল-রাইয়ান সড়কের অংশে দিকে তৈরী হচ্ছে মেট্রা রেল বিদ্দা পার্ক স্টেশন। ফলে ট্রেনে চড়ে সরাসরি পার্কে আসা যাবে।
কি নেই এই পার্কে? ব্যাপক সংস্কারের পর নবরূপে সজ্জিত এই বিদ্দা পার্ককে বিশ্বের যেকোনো আধুনিকতম পার্কের সাথে তুলনা করা চলে। ছোটো-বড়, পুরুষ-মহিলা সবার কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা হয়েছে নতুন বিদ্দ পার্কে। এখানে শিশুদের আনন্দ দেওয়ার জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি বিশাল আকারের হরেক রকমারী খেলাধূলার সরঞ্জাম সম্বলিত ছায়াবৃত খেলার মাঠ, ও পানির ফোয়ারা। এছাড়া আছে রোলার স্কেটিং এবং সাইকেল চালানোর জন্য বিশেষভাবে নির্মিত ট্র্রাক, টেনিস এবং বাস্কেটবল কোর্ট। মাত্র ১৫ রিয়ালের বিনিময়ে ট্রেনে চড়ে পুরো পার্ক ঘুরে দেখারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুরো পার্ক জুড়ে আরো রয়েছে শরীর চর্চার বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং পুরুষ ও মহিলাদেও জন্য আলাদা ব্যায়ামাগার।
এই পার্কের নতুন সংযোজন হচ্ছে উট এবং গোড়া চলাচলের জন্য বিশেষ পথ এবং ৮৫০ জন দর্শক বসার উপযোগী এম্পিথিয়েটার বা মুক্ত মঞ্চ। এছাড়া পার্কের কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে কাতারে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত উঁচু বেদী। পুরো পার্ক জুড়ে একটু পর পর রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমান টয়লেট।
পার্কে খাবারের দোকানের নেই কোনো কমতি। কিছুদূর পরপর কফি সপ, ক্যাফেটেরিয়া, রংবেরংয়ের ছোট কেবিন আকারের দৃষ্টিনন্দন খাবার ও উপহার সামগ্রীর দোকান খুব সহজেই দৃষ্টি কাড়ে।
বিদ্দা পার্কের অন্যতম বৈশিষ্ট হচ্ছে, মারমার প্রাদাস সংলগ্ন এলাকায় সংযোজিত হয়েছে বার্বিকিউ চুলা সম্বলিত বিশেষ এলাকা। যা বিদ্দা পার্কের আকর্ষণ বহুগুনে বাড়িয়ে তুলবে। এছাড়া চোট কিংবা জরুরী ভিত্তিতে চিকিৎসার জন্য রয়েছে ফার্স্ট এইড সেন্টার, যা দর্শনার্থীদের মনে স্বস্তি এনে দেবে।
বিদ্দা পার্কের প্রায় মাঝখান থেকে চলে গেছে রুমাইলাহ সড়ক। পায়ে হেঁটে এই সড়ক পারাপারের জন্য নির্মিত হয়েছে তিনটি সুদৃশ্য সেতু। কিন্তু পার্কের কর্নিশের দিককার মাজলিশ সড়ক পারাপারের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। পায়ে হেঁটে রাস্তা পারাপার পথচারীদের জন্য বিপদজনক। এজন্য ভূগর্ভস্থ টানেল র্নিমাণ করা যেতে পারে।
এস্পায়ার, কাতারা এবং ইসলামিক মিউজিয়াম পার্কের সাথে এবার ঐতিহ্যবাহী বিদ্দা পার্কের সংযোজন কাতার প্রবাসী সবার জন্য সুখবরই বটে! বিশ্বমানের এই পার্ক খুব সহসা দোহা শহরের মানুষের চিত্তবিনোদনের শীর্ষ অকুলস্থলে পরিনত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
১১ মার্চ, ২০১৮
