আল-মনসুরার স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে আমার দিন একরকম চলে যাচ্ছিলো। অফিসের পর অধিকাংশ সময় বাসায় থাকি। রাতে খাবার খেতে একবার বের হই। এ ছাড়া গরমের জন্য বাইরে পা রাখা দায়। তবে বাসায় বাড়িওয়ালার সৌজন্যে পেলাম স্যাটেলাইট চ্যানেল। এতে আল-জাজিরা, বিবিসি, সিএনএন থেকে শুরু করে মিউজিক চ্যানেলসহ রয়েছে বেশ কিছু আরবি ও হিন্দি মুভির চ্যানেল, এনডিটিভি ও জি-অ্যারাবিয়া যাতে ২৪ ঘণ্টা ধরে চলে নতুন-পুরোনো হিন্দি ছায়াছবি।
টিভির পাশাপাশি অন্তর্জালে চোখ রেখে আমার সময় কাটে। রুমে সারাক্ষণই চলে এসি। গরমের যা তেজ, এসি ছাড়া টেকা মুশকিল। আমার সহকর্মী সাঁজির বাসায় ছিলো ডরহফড়ি অঈ। সিডনি থেকে এসে প্রথম প্রথম সেই এসির আওয়াজটা বড্ড কানে লাগতো। তাই অনেক বাসা পছন্দ না হওয়ার কারণ ছিলো শুধু ডরহফড়ি অঈ। তবে এই ফ্ল্যাটে রয়েছে ‘ওয়াল এসি ইউনিট’, তাই রক্ষে।
দোহায় দুই মাস কেটে গেলো। সেপ্টেম্বর প্রায় শেষ, রমজান মাস সমাগত প্রায়। ভাবছি কখন হবে এই গ্রীষ্মের তীব্র দাহনের অবসান আর কীভাবে কাটবে রোজার মাস। দোহার সবচেয়ে গরমের সময় হলো জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর। এখন তাপমাত্রা সব সময় থাকছে ৪০ ডিগ্রির ওপরে। কখনো আবার ৫০ ছুঁয়ে যাচ্ছে। বাথরুমে ট্যাপের পানি এত গরম থাকে যে ভোরে অফিসে যাওয়ার আগে এই পানি দিয়ে গোসল করা অসম্ভব। তাই সবাই রাতে ঘুমুবার আগে বালতিতে পানি ভরে রাখে, যাতে ভোরে পানি ঠান্ডা হয়ে আসে। সবার মতো আমিও কিনলাম একটি বড় বালতি আর মগ। দীর্ঘদিন পর মগ দিয়ে এভাবে গায়ে পানি ঢালার সময় কৈশোরের দিনগুলো যেন আবার ফিরে পেলাম।
এখন দোহার আবহাওয়া কখনো থাকে শুকনো আবার কখনো খুবই আর্দ্র। একদিন অফিস থেকে বের হয়ে দেখি মুহূর্তের মধ্যে চোখের সানগ্লাসটা ঘোলাটে হয়ে গেলো। বুঝতে পারলাম, আজকের আর্দ্রতা অত্যধিক। গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি একই কাণ্ড। গাড়ির উইন্ডশিল্ড ঘোলাটে হয়ে গেছে, যা রীতিমতো পানি আর ওয়াইপার দিয়ে পরিষ্কার করতে হলো। রাস্তায় বের হলে তো কথাই নেই, ঘামে গা ভিজে সয়লাব হয়ে যায়।
আমার এমনিতেই ঘামের বাতিক আছে। সামান্য গরমেই ভীষণ ঘামতে থাকি, যা দেখে আমার চেয়ে আশপাশের মানুষ আরও বেশি অস্থিরতায় ভোগে। আমি সব সময় পকেটে রাখি রুমাল। ঘাম মুছতে মুছতে পথ চলি আর অনেক সময় একটি রুমালে কাজ হয় না, তাই সাধারণত রুমালের বদলে টাওয়েল রুমাল ব্যবহার করি। এখানে পথ চলতে কী পরিমাণ ধুলো গায়ে উঠে আসে, তার নমুনা দেখলাম কাপড় ধুতে গিয়ে। কাপড় ধোয়া পানির রং কুচকুচে কালো। ভাবলাম হয়তো জামা থেকে রং বেরোচ্ছে। আসলে কিন্তু তা নয়, এ হলো রাস্তাঘাটের ধুলোবালির রং।
দোহার আবহাওয়ার আরেকটি দিক নজরে পড়লো, তা হলো ধূলিঝড়। হঠাৎ একদিন দেখা যাবে ধুলোয় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে চারদিক। রাস্তার ওপারের দালান, বাড়িঘর সবকিছুই মনে হয় পরেছে ধুলোর ধূসর বোরকা। মেঘ করে বৃষ্টি আসার আগে যেমন দিগন্তজুড়ে আঁধার নেমে আসে, ঠিক তেমনি গা-ছমছম করা ভুতুড়ে ভাব গ্রাস করে চারপাশ। তবে দু-এক দিনের মধ্যে আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে।
কিন্তু বৃষ্টি? সে যেন মঙ্গলগ্রহের কোনো এক অচেনা প্রাণী। তাই তার দেখা কখন পাবো জানি না। মাঝেমধ্যে মনটা চাতকের মতো তৃষ্ণায় কাতর হয়, কখন নামবে বৃষ্টি। শুনবো বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ। সিডনিতে টেলিফোন করলেই জানতে পারি, বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে সবকিছু। অথচ দোহায়? কী হচ্ছে এসব?
আমাদের কাব্য-কবিতা, গল্প ও উপন্যাসের বিশাল অংশজুড়ে আছে বৃষ্টি। বাংলা কিংবা হিন্দি চলচ্চিত্রে বৃষ্টিধারায় স্নাত নায়ক-নায়িকার গানের দৃশ্য, সে যে থাকতেই হবে! আর গানে? তা লিখেই শেষ করা যাবে নাÑআজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে, আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে, ও বৃষ্টির পানি তুই দুষ্টু জানি, এই বৃষ্টিভেজা রাতে তুমি চলে যেও না…ইত্যাদি। আরবদের কাব্যপ্রতিভার কথা কারও অজানা নয়। কথায় কথায় পদ্য রচনা করা, কবিদের মধ্যে কাব্যলড়াই ইত্যাদি আরবসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাই এদের কাব্যভান্ডারে বৃষ্টিবিষয়ক কোনো কিছু আছে কি না তা খুব জানতে ইচ্ছে করছিলো।
দোহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের খুবই কাছে আমার অফিস। গাড়িতে চড়ে গেলে মাত্র পাঁচ মিনিট আর হেঁটে গেলে লাগবে ১০ মিনিট। তবে প্লেনের বহর ওঠানামা করার সময় তেমন কোনো শব্দ শুনতে পাই না। বর্তমান ‘দোহা এয়ারপোর্ট’ খুবই ছোট। এর কাছেধারেই তৈরি হচ্ছে বিশাল আকৃতির নতুন এয়ারপোর্ট, যা ২০১০ সালে চালু হওয়ার কথা। ২৫ বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে তৈরি হচ্ছে এই বিমানবন্দর, যার প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল সহজেই ৮৫টি ফুটবল ফিল্ড গিলে খেতে পারবে।
দোহা এয়ারপোর্টে যে রাস্তা দিয়ে ঢুকতে হয়, তার ঠিক উল্টো দিকে রয়েছে একটি সবুজ খেলার মাঠ। দোহা শহরে এ ধরনের সবুজ খোলা মাঠের খুবই অভাব দেখতে পেলাম। আমি অফিস শেষ করে সন্ধ্যায় মাঝেমধ্যে ওই মাঠে গিয়ে বসতাম। সিডনিতে অফিস থেকে বাসায় ফিরেই কাছের একটি মাঠে নিয়মিত চক্কর দিতাম। অফিসের পাশেই সবুজ মাঠ দেখে সেই অভ্যাসটা আবার চালু করতে চাইলাম। অফিসে জগার, শর্টস, আর টি-শার্ট নিয়ে এলাম। অফিস ছুটির পর কাপড় বদলে মাঠে গেলাম জগিং করতে। কিন্তু এক চক্কর দেওয়ার পর অত্যধিক গরমে আমার মাথাই চক্কর দিতে শুরু করলো। তখন সঙ্গে সঙ্গে জগিং বন্ধ করে শরীরচর্চার পর্ব শীতকালের জন্য রেখে দেওয়াই শ্রেয় মনে করলাম।
এয়ারপোর্ট আমার বরাবরেরই একটি প্রিয় জায়গা। হাজারো ভিনদেশি মানুষের আসা-যাওয়ার দৃশ্য আমাকে বরাবরই টানে। কেউ আসছে, কেউ চলে যাচ্ছে। কারও মুখে আনন্দের ঝিলিক, কারও চোখে বিষাদের ছায়া, আবার কারও গাল বেয়ে নেমে আসছে অশ্রুধারা। স্বাগত আর শুভেচ্ছার কোলাহলের পাশাপাশি কোথাও যেন নিরন্তর বেজে চলেছে বিদায়ের বিষণ্ণ সুর।
তাই এয়ারপোর্টে গেলেই আমি একটু বাড়তি সময় হাতে রাখি। কখনো কোনো কফিশপে বসে গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে রানওয়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। বিমান ওঠানামা করে, মানুষ আসে-যায়, আর আমি ধীরে ধীরে ডুবে যাই উদাসী ভাবনায়। কখনো মনের অজান্তেই গুনগুন করে উঠি সেই পুরোনো গান—
‘আমি পথে পথে ঘুরি, আমার নেই যে কোনো ঠিকানা,
আমার মনের মাঝে বসত কাহার, নিজেই জানি না।’
তখন মনে হয়, আহা! এমন করে পথে পথে ঘুরে ঘুরেই যদি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারতাম!
তবে প্রস্থানের চেয়ে যাত্রী আগমনের জায়গাটিই আমার বেশি প্রিয়। বিদায়ের মুহূর্তের বিষণ্ণতা কি আর কারও ভালো লাগে? তার চেয়ে আগমন এলাকায় মানুষের প্রতীক্ষা, উৎকণ্ঠা, আনন্দ আর নানা রকম প্রতিক্রিয়া দেখতে আমার বেশ লাগে।
কেউ দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়জনের অপেক্ষায়, হাতে একগোছা ফুল। কেউ এসেছে বাবা-মাকে বরণ করে নিতে, কেউ পরিবারের সদস্যকে, আবার কেউ নতুন কোনো অভিবাসী বন্ধুকে স্বাগত জানাতে। কারও হাতে বেলুন, কারও হাতে প্ল্যাকার্ড—Welcome Home। প্রত্যেকের চোখ যেন আটকে আছে সেই একই দরজার দিকে।
তারপর যখন ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে র্যাম্প দিয়ে একে একে যাত্রীরা বেরিয়ে আসতে শুরু করেন, অপেক্ষমাণ মানুষগুলোর মধ্যে যেন হঠাৎ চাপা উত্তেজনার ঢেউ ওঠে। একেকজন আপনজনকে দেখতে পেয়ে ছুটে যায়, কেউ জড়িয়ে ধরে, কেউ ফুল এগিয়ে দেয়, কেউ শুধু দাঁড়িয়ে থাকে—চোখের ভাষায় কত কথা যে বলে ফেলে!
কাতারে যাওয়ার আগে একবার ভাইপো-ভাইঝিকে আনতে সিডনি এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম। অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ একজন যুবকের দিকে চোখ আটকে গেল। হাতে একগোছা তাজা ফুল। চেহারায় আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে অদ্ভুত এক অস্থিরতা। মনে হচ্ছিল, সে যেন একই সঙ্গে অপেক্ষা করছে, আবার অপেক্ষার শেষটাকেও ভয় পাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর বুঝলাম, সম্ভবত তার নতুন বিয়ে করা স্ত্রী আসছেন। যাত্রীদের ভিড় থেকে স্ত্রীকে দেখতে পেয়েই ছেলেটি ছুটে গেল। হাতে তুলে দিল ফুলের তোড়া। মুখে আনন্দের ঝিলিক। কিন্তু কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েও যেন খুব বেশি কাছে যেতে পারছিল না। কারণ, নবপরিণীতা স্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন দুজন মুরব্বি। হয়তো তাঁদের একজন শ্বশুর, অন্যজন শাশুড়ি।
দৃশ্যটা দেখে আমার বেশ মায়া হলো। ছেলেটি আনন্দে উদ্বেলিত, অথচ সেই আনন্দের মধ্যেও যেন একটু সংযম, একটু সংকোচ, আর সামান্য অপূর্ণতার ছায়া। মনে হলো, বহুকাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে কাছে পেয়েও সে যেন পুরোপুরি কাছে যেতে পারছে না।
দৃশ্যটা দেখতে দেখতে হঠাৎ আমার মন ছুটে গেল বহু বছর আগের এক নভেম্বরের দিনে—১৯৯১ সালের নভেম্বর। সময়ের স্রোত পেরিয়ে যেন মুহূর্তেই ফিরে গেলাম সেই দুর্লভ দিনে। সিডনি বিমানবন্দরের সেই দিনটির কথা মনে পড়লে আজও মনে হয়, এই তো সেদিনের ঘটনা।
সেদিন সিডনি বিমানবন্দরে আমার অবস্থাও ছিল ঠিক ওই নাম-না-জানা যুবকের মতো। আমিও দাঁড়িয়ে ছিলাম অপেক্ষায়, বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উত্তেজনা আর আনন্দ নিয়ে। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়—আমি হয়তো তার চেয়ে একটু ভাগ্যবান ছিলাম।
কারণ, আমার নতুন বিয়ে করা স্ত্রী যখন সিডনি বিমানবন্দরের আগমন পথ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন, তাঁর সঙ্গে কোনো গুরুজন ছিলেন না। তিনি এসেছিলেন একাই।
আর সেই মুহূর্তে অপেক্ষমাণ মানুষটি ছিলাম শুধু আমি—একজন সদ্য বিবাহিত স্বামী, প্রবাসের মাটিতে নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে, বহু প্রতীক্ষিত প্রিয় মানুষটির অপেক্ষায়।
আজ এত বছর পর দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, জীবনের কিছু মুহূর্ত আসলে সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না। ১৯৯১-এর সেই নভেম্বরের দিনটিও আমার জীবনে তেমনই এক স্মৃতি। সিডনি তখনও আমার কাছে অনেকটাই নতুন, আর সামনে পড়ে ছিল এক অজানা জীবনের হাতছানি। প্রিয় মানুষটির জন্য অপেক্ষা করতে করতে সেদিন আমার বুকের ভেতরেও কত স্বপ্ন, কত উৎকণ্ঠা, কত না-বলা কথা জমে ছিল!
আজ মনে হয়, বিমানবন্দরের সেই আগমন পথ দিয়েই শুধু একজন মানুষ আমার জীবনে আসেননি; সেদিন যেন আমার জীবনের একটি নতুন অধ্যায়েরও আগমন ঘটেছিল।
সেপ্টেম্বর, ২০০৮
