মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে ছোট্ট দেশ কাতারকে এখন বিশ্বের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে গন্য করা হচ্ছে। আয়তনে বাংলাদেশের মাত্র তেরো ভাগের একভাগ হলেও তেল এবং গ্যাস সমৃদ্ধ দেশেটি তাদের উদ্বৃত্ত অর্থের বিশাল অংশ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে বিনিয়োগ করছে। কাতার সরকারের বিনিয়োগ সংস্থা কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (কিউআইএ), কাতার হোল্ডিংস এই বিনিয়োগ পরিচালনা করছে। সিমেন্স, বার্কলে ব্যাংক, লন্ডনের হিথরো এয়াপোর্ট, ভক্সওয়াগেন, ব্যাংক অফ আমেরিকা, চীনের কৃষি ব্যাংক, ব্রাজিলের সান্টেন্ডার মতো বিশ্বের খ্যাতনামা নানাবিধ প্রতিষ্ঠানে বিশাল অংকের অর্থ বিনিয়োগ করছে কাতার। বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে অর্থ বিনিয়োগ করার জন্য কাতারের মত বিনিয়োগ বান্ধব দেশকে উৎসাহিত করতে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া উচিত।

গ্যাস এবং তেল রপ্তানীর আয়ের উপর ভর করে কাতারের জিডিপি এখন প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার ছুুঁতে চলেছে। আর মাথাপিছু জিডিপি হিসাবে টানা তৃতীয়বারের মত বিশ্বের ধনবান দেশের তালিকার শীর্ষে রয়েছে কাতার। তবে বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে বানিজ্যিক লেনদেনের পরিমান খুব একটা উল্লেখ করার মত নয়। গত বছরের হিসাব অনুযায়ী এর পরিমান হচ্ছে মাত্র ১২ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ কাতার থেকে বছরে প্রায় ৪০ লক্ষ টন ইউরিয়া সার আমদানী করে থাকে। এছাড়া সম্প্রতি প্রাকৃতিক গ্যাস (এল এন জি) আমদানির জন্য কাতারের সাথে একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। পারস্পরিক বানিজ্যিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে যে সব খাতে মূলধন খাটানোর সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে তার একটি তালিকা দিচ্ছিঃ

জ্বালানী এবং বিদ্যুতঃ উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সমস্যা প্রকট। নতুন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের পাশাপাশি একটি পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্যও রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের চুক্তি হয়েছে। ইদানিং বাংলাদেশের বাসা বাড়ীতে লোড শেডির্ং মোকাবেলা করার জন্য সোলার সিষ্টেম বসানো হচ্ছে। পরিবশেকে দূষন মুক্ত করার জন্য সবুজ জ্বালানীকে অগ্রাধিকার দেয়া খুবই জরুরী। আশার কথা হল, আগামী ১০ বছরে জ্বালানী খাতে ১২০০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিযোগের পরিকল্পনা করেছে কাতার। জ্বালানী এবং বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে কাতারের বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে অগ্রনী ভ’মিকা রাখতে পারে।

চিকিৎসা খাতঃ সম্প্রতি বাংলাদেশে থেকে ডাক্তার, প্রকৌশলী সহ অন্যান্য দক্ষ জনশক্তি নিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ কাতার সরকার। বাংলাদেশ সফরের সময় কাতারের প্রতিমন্ত্রী সুলতান বিন সাদ আল-মুরাইখী একথা বলেছেন। কাতারে গত বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশি প্রবাসীদের হাতে দুই জন নেপালি নাগরিক হবার পর অঘোষিতভাবে বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য ভিসা বন্ধ ছিল। এতে বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে জনশক্তি রফতানি বন্ধ হয়ে যায়। তবে এখন সেই সিদ্ধান্ত থেকে কাতার কর্তৃপক্ষ সরে এসেছে বলে মনে হচ্ছে । ফলে বহুদনি পর কাতাওে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তির ঢোকার একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতীয়রাই কাতারের দক্ষ জনশক্তির বিভিন্ন খাতে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স থেকে শুরু করে প্রকৌশলী, আইটি বিশেষজ্ঞ, ব্যাংক, মানব-সম্পদ ইত্যাদি প্রায় সবখানেই ভারতীদের দেখা যায়।

এদিকে প্রায় শ’তিনেক প্রকৌশলী, ডজনখানেক ডাক্তার ছাড়া হাসপাতালে বাংলাদেশি কোনো নার্স নেই বললেই চলে। কাতারের জনশক্তি বাজারে প্রতিযোগীতা এখন তুঙ্গে। ভারতীয় নাগরিকটা ভিসা ছাড়াই কাতারে প্রবেশ করতে পারেন। বিমান বন্দওে অবতরণের পর তাদের ভিসা দেয়া হয়। এই সুযাগ কাজে লাগিয়ে প্রচুর দক্ষ ভারতীয় নাগরিক কাতারের জনশক্তি বাজারে প্রবেশ করছে। যা বাংলাদেশি নাগরিকদের কাতারের দক্ষ জনশক্তির বাজারের ঢোকা দুরূহ করে দিচ্ছে।

একটা সময় ছিল যখন মধ্যপ্রাচ্য এবং আরব দেশগুলো থেকে সরকারী দল তাদের স্বাস্থ্যখাতে কাজ করার জন্য বাংলাদেশে গিয়ে শত শত ডাক্তার নিয়ে আসতেন। কিন্তু ইদানিং বাংলাদেশের নিম্নগামী শিক্ষার মান এবং সনদপত্রের সত্যতা নিয়ে নিয়ে সংশয় থাকার কারনে আগের মত বাংলাদেশ থেকে কেই সরাসরি ডাক্তার নিয়োগ দিতে চায়না।

এছাড়া কাতারে কাজ করতে হলে ডাক্তার ও নার্সদের একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হয়। প্রকৌশীদের যেমন পরীক্ষা দিয়ে কাতার পৌরসভা এবং পরেিবশ মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন নিতে হয় তেমনি ডাক্তারদেরও কাতার কাউন্সিল ফর হেল্থকেয়ার প্র্যাক্টিশনারস (কিউসিএইচপি) থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। এজন্য প্রথমে দিতে হয় পরীক্ষা। পরীক্ষায় পাশ করলে আন্তজার্তিক সংস্থা ডাটা ফ্লোর মাধ্যমে সব সার্টিফিকেট এবং প্রয়োজনীয় কাজপত্র যাচাই করে জমা দিতে হয়। এর পর কিউসিএইচপি সব মূল্যায়ন করে তবেই নিবন্ধন দেয়। কেবল আমেরিকা, বৃটেন ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো থেকে পাশ করা ডাক্তার ও নার্সদের পরীক্ষা দিতে হয়না।

কাতারের একজন ভুক্তভোগী বাংলাদেশী ডাক্তার জানালেন, ডাটা ফ্লো থেকে বাংলাদেশে তথ্য যাচাই বাছাইয়ের জন্য অনুরোধ গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সময় মতো সত্য সরবরাহ করেনা। অনেক সময় তাদের অবহেলার কারণে ছয় মাসেও ডাটা ফ্লো তথ্য পায়না। এজন্য অনেক বাংলাদেশী নার্স ও ডাক্তার প্রবাসে কাজ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ ভারত থেকে একজন আবেদনকারী তথ্য এক সপ্তাহের মধ্যে ডাটা ফ্লো সংস্থার কাছে চলে আসে।

বাংলাদেশের শ্রম, প্রবাসী কল্যান মন্ত্রণালয় ও কাতারস্থ বাংলাদেশে দূতাবাসের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই বিরূপ পরিস্থিতির উন্নতি করা না গেলে, কাতারে দক্ষ জনশক্তি রফতানি কেবল আলোচনার টেবিলেই রয়ে যাবে। আশার কথা হল বাংলাদেশে থেকে প্রথম বারের মত প্রায় শ’খানেক নার্স আনার প্রক্রিয়া প্রায় শেষের পথে বলে জানিয়েছে কাতারের বাংলাদেশ দূতাবাস কর্তৃপক্ষ।

অবকাঠামো উন্নয়নঃ সড়ক যোগাযোগ, বিমান বন্দর, নদী খনন ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য কাতার ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিনিয়োগের পরিমান আরো বাড়ানোর জন্য সার্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

কৃষিঃ কৃষিখাতে বাংলাদেশের উন্নয়ন বিশ্বের দরবারে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশের কৃষিবিদরা বিশ্বের উন্নত দেশে নিজের মেধা ও দক্ষতার প্রমান দিয়ে দেশের সুনাম কুড়াচ্ছেন। কৃষিক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হবার জন্য মরুর দেশ কাতার বিশাল বাজেট নির্ধারণ করেছে। কাতারের আমীরের সরাসরি তত্বাবধানে এ নিয়ে কাজ করছে “কাতার ন্যাশনাল ফুড সিকিউরিটি পোগ্রাম” নামের একটি মন্ত্রণালয়। আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে খাদ্যে স্বয়ংস্মপূূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কাতার। কাতারের কৃষিখাতে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানীর বড় ধরনের সুযোগ রয়েছে।

সড়ক যোগাযোগ, বিমান বন্দর, নদী খনন ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য কাতার ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রিয়েল ষ্টেটঃ আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে আমেরিকা ও ইউরোপের প্রধান শহরগুলোর রিয়েল ষ্টেট খাতে কাতার এ পর্যন্ত প্রায় ৫,০০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। লন্ডন শহরের কেন্দ্রে কাতারের অর্থে নির্মিত হয়েছে ৩১০ মিটার উঁচু “শারদ্ টাওয়ার”। ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার দিয়ে কাতার কিনে নিয়েছে বৃটেনের মর্যাদাপূর্র্ণ সপিং মল “হেরড্স”। কাতার ইনভেষ্টমেন্ট অথরিটি সম্প্রতি ভারতে আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মানের জন্য ২০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলোতে বাসস্থানের চাহিদা মেটাতে কাতারের বিনিয়োগ বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।

শিক্ষা ও প্রযুক্তিঃ কাতারের নির্মিত হয়েছে “এডুকেশন সিটি” যাতে রয়েছে জর্জটাউন, টেক্সাস এ এন্ড এম, কার্নেগী মেলন এবং কর্নেল মেডিক্যাল কলেজের মত খ্যাতনামা বেশক’টি আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা। কাতারের সহযোগীতায় বাংলাদেশে বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে। ফলে বিদেশে না গিয়েও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচুঁমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পাবে।

ক্রীড়াঃ কাতারীরা ফুটবল পাগল। কাতারী ধনকুবেরেরা চড়া মূল্যে কিনে নিচ্ছে পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব। এছাড়া কাতারে সম্প্রতি নির্মিত হয়েছে বিশ্বমানের ক্রিকেট ষ্টেডিয়াম। অদুর ভবিষ্যতে দুবাইয়ের মতো দোহা শহরেও বসবে আর্ন্তজাতিক একদিনের ক্রিকেট খেলার আসর। বাংলাদেশের ক্রিকেট লীগ, বিপিএল এবং ফুটবল ক্লাবগুলোতে কাতারী বিনিয়োগ আকর্ষন করার জন্য চেষ্টা করা যেতে পারে।

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২ঃ ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজকের দায়িত্ব পাওয়ার পর উন্নয়নের সুনামীতে এখন ভেসে চলেছে কাতার। কাতারে বর্তমানে প্রায় দেড় লক্ষ প্রবাসী বাংরাদেশী কর্মরত রয়েছেন। বিশ্বকাপ ফুটবলকে সামনে রেখে কাতারে প্রচুর জনশক্তি রপ্তানীর সুযোগ রয়েছে। ফিফার শর্তানুযায়ী ফুটবল ফ্যানদের থাকার জন্য জন্য কাতার সরকারকে নূন্যকল্প ৬০,০০০ রুমের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু কাতার ২০২২ সালের মধ্যে প্রায় ৯৬,০০০ হোটেল রুমের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে। এজন্য নির্মিত হচ্ছে অসংখ্য হোটল ও সার্ভিস্ড এপার্টমেন্ট। কাতারের হসপিট্যালিটি সেক্টরে তাই এখন বিশাল চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে।

২০১২ সালে কাতার, বাংলাদেশ ব্যাংকে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সাথে কাতার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠকে এ নিয়ে ঊভয় দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করারও কথা হয়। তবে কাতার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র থেকে জানা গেছে, আজ দু’বছর পরও সেই টাকা এখনো বাংলাদেশে ব্যাংকে জমা হয়নি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের তড়িৎ ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

কাতার ও বাংলাদেশের মধ্যে বানিজ্যিক লেনদেন বৃদ্ধি ও পারস্পরিক বিনিয়োগে গতিশীলতা আনার জন্য বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দূতাবাস এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের যৌথ প্রচেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতো সামর্থ্যবান প্রবাসীরা চাইলে পুজিঁ বিনিয়োর করে দেশের উন্নয়নে এভাবে সরাসরি অংশ নিতে পারেন। যেমন সম্প্রতি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকায় প্রবাসীদের টাকায় একটি ৫০ মেগাওয়াট বিদুৎ কেন্দ্র নির্মানের কাজ শুরু হয়েছে। এনআরবিদের বিনিয়োদের পথ যাতে নিষ্কন্টক হয় সে জন্য বাংলাদেশের বানিজ্য মন্ত্রনালয়কে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

অক্টোবর, ২০১৮