কথায় বলে, “যত বাঙালী তত সমিতি”। দু’জন বাঙালি এক জায়গায় হলে নাকি দু’টো সংগঠন হয়ে যায়। দেশে, বিদেশে সবখানেই অধিকাংশ বাংলাদেশিরা সংগঠন বা দলাদলি প্রিয়, এমন অনেক কথাই আমাদের কমিউনিটিতে প্রচলিত আছে। আত্মসমালোচনা করতে যেয়ে এই ধরনের কথা আমরা প্রায়ই বলে থাকি। তবে উদ্বেগের কারন হল, আমাদের কমিউনিটি ক্রমশঃ বিভিন্ন দল, গোষ্ঠি, গোত্র, উপদলে বিভিক্ত হয়ে খন্ড-বিখন্ড হয়ে পড়ছে। আগে ছিল বিভাগীয় সংগঠন, আর এখন জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন ভিত্তিক আঞ্চলিক সমিতি গঠিত হচ্ছে।

আমাদের কমিউনিটিতে বিভিন্ন শ্রেনীর এবং মনোবৃত্তির মানুষ রয়েছে। তার মধ্যে এক ধরনের এলিট শ্রেনী আছেন যারা কেবল কিছু বাছাই করা মানুষ ছাড়া অন্য কারো সাথে মিশতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন না। কিন্তু অন্যদিকে যারা নিজেদের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি বলে মনে করেন তারাও আপন গন্ডির বাইরের কাউকে ছাড় দিতে চান না পাছে কমিউনিটিতে তাদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়। মোদ্দা কথা হল, আমরা নিজেরা উপরে উঠতে না পারলেও অন্যকে কিছু করতে দেইনা। এভাবে আমাদের বহু ভালো প্রচষ্টা, আশা আকাংখা কেবল স্বপ্নই থেকে যায়।

বিশ্বের বহু দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে খুব ভালো করছেন। তবে কমিউনিটির মধ্যে ক্রম-বর্ধমান বিভেদ ও অনৈক্য, এই সাফল্য ও ঔজ্জ্বলতাকে ম্লান করে দিচ্ছে। সবাই মিলেমিশে কোনো আয়োজন করা যাচ্ছেনা। দেখা যায় কোনো গ্রুপ যদি একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তাহলে বিপরীত গ্রুপ আপ্রান চেষ্টা করে যাতে অনুষ্ঠান বিফল হয়। অনুষ্ঠান ভন্ড’ল করার জন্য প্রয়োজনে দেশে টেলিফোন করে, দূত পাঠিয়ে আমন্ত্রিত অতিথি এবং শিল্পীদের অপপ্রচার ও ভ’ল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। যা সত্যিই হতাশার এবং বেদনাদায়ক।

দেখা যাচ্ছে, সংখ্যায় অনেক ছোটো কমিউনিটিও আমাদের ডিঙ্গিয়ে প্রবাসী কর্তৃপক্ষের নজর কাড়ছেন আর সরকার থেকে বিশেষ সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন। কোন্দলের কারনে আমরা কমিউনিটি হিসাবে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছতে ব্যর্থ হচ্ছি। মাঝে মধ্যে একতা নিয়ে অনেকে আওয়াজ তুললেও তা মরুভ’মির মরীচিকার মত শূন্যে হারিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বাংলাদেশি কমিঊনিটিতে একই প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়। মনে হয় আমরা ক্ষুদ্র গোষ্টিগত থাকতে পছন্দ করি। আর এই জন্যে হয়তো ক্ষুদ্রতা থেকে বেরিয়ে এসে বৃহত্তর ঐক্যে আসতে পারিনা।

কাতারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা ২০১৬ সালের মার্চে ছিল দুই লাখ আশি হাজার। আদমসুমারীর পরিসংখ্যান মতে কাতারে বাংলাদেশি জনসংখ্যা ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই তিন বছরে গড়ে ১০৪% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ! অবাক হয়েছি। আমি মনে করতাম কাতারে নেপালীদের সংখ্যাই তর তর করে বাড়ছে। কিন্তু আমার এই ধারনা সঠিক ছিলনা। বাংলাদেশের কাছাকাছি রয়েছে ফিলিপিন্স এবং পাকিস্তান, যাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ওই তিন বছরে ছিল ৪০ শতাংশ। কাতারে বাংলাদেশিদের সংখ্যা এখন প্রায় ৪ লাখের কাছাকাছি। এছাড়া বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আরো প্রায় তিন লক্ষ কর্মী আনার যে চুক্তি হয়েছে তাতে এই সংখা খুব সহসা বেড়ে ছয় লক্ষে পৌছতে পারে।

আমার জানা মতে কাতারে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি সব মিলিয়ে বাংলাদেশি সংগঠনের সংখ্যা এখন প্রায় পঞ্চাশ। তার মানে কাতার প্রবাসী প্রতি আট হাজার বাংলাদেশিদের জন্য রয়েছে একটি করে সংগঠন। উল্লেখ্য, কমিউনিটির জনসংখ্যার শতকরা নব্বই শতাংশ হলেন খেটে খাওয়া মানুষ যারা এইসব সংগঠনের নাগাল পান না কখনো। কারন অধিকাংশ সংগঠনগুলোর কার্যক্রম দোহা সহ বিভিন্ন শহরতলীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থার পদগুলো ধরে আছেন প্রায় একই মানুষ। আর এরাই হলেন সমিতি বা সংগঠন ভাঙ্গা-গড়ার কারিগর।

তবে কেবল বাংলাদেশি কমিউনিটিতেই যে সংগঠনের সংখ্যা বেশী এমন ধারনা সত্য নয়। আসুন অন্য কমিউনিটিতে কি হচ্ছে সেটা একটু তথ্য-সূত্র ঘেটেই না হয় দেখা যাক! কাতারে প্রায় ৯০টি দেশের প্রবাসী নাগরিক রয়েছেন। সংখ্যা বলুন কি প্রভাব-প্রতিপত্তি, সবদিক দিয়ে ভারতীয়রা হচ্ছে কাতারের সবচেয়ে বড় কমিউনিটি। এদের সংখ্যা এখন প্রায় সাড়ে ছয় লাখের মত। ভারতীয়দের রয়েছে ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টার (আইসিসি) নামের একটি কেন্দ্রিয় সংগঠন। এই সংগঠনের ছাতার নীচে রয়েছে প্রায় শ’খানেক নিবন্ধিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। আইসিসি’র বাইরেও রয়েছে বেশ কিছু সংগঠন। উপরের হিসাব অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে প্রতি সাড়ে ছয় হাজার ভারতীয়দের জন্য রয়েছে একটি করে সংগঠন।

অন্যদিকে নেপালিদের সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের কিছুটা বেশী। ওদের সংগঠনের সংখ্যা হচ্ছে প্রায় ১৩০; তার মানে প্রতি তিন হাজার নেপালির জন্য একটি করে সংগঠন। তবে নেপালিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের নাম হল নন-রেসিডেন্ট নেপালিজ এসোসিয়েশন। ইন্টারন্যাশনাল কর্ডিনেশন কাউন্সিলের ছাতার নীচে দারুন কার্যকর একটি সংস্থা তৈরী করেছে প্রবাসী নেপালি কমিউনিটি। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে এর ৭০টি শাখা। এর কাজ হলো প্রবাসী নেপালিদের কল্যাণ ও অধিকার আদায়ের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া, সরকারী পর্যায়ে লবিং এবং নেপালে বিনিয়োগের জন্য ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করা। একটি কার্যকরী কমিটি নিয়ে নির্বিঘ্নে নিজস্ব কমিউনিটির জন্য ওরা কাজ করে যাচ্ছে। কাতারে নেপালিদের এই সংগঠন কিন্তু বিভক্ত হয়নি।

তুলনামূলক বিচারে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে সংগঠনের সংখ্যা কাতারে অন্যান্য কমিউনিটির চেয়ে অনেক কম। তবে পার্থক্য হল, অন্য কমিউনিটির প্রায় সবই হচ্ছে সামাজিক ও সাংস্কৃতি ভিত্তিক সংগঠন; যাদের মধ্যে রয়েছে অদ্ভুত সমন্বয় এবং ঐক্য। রাজনৈতিক দল, উপদল নেই বললেই চলে। এদিকে আমাদের কমিউনিটিতে ভিন্ন ধারার রাজনৈতিক সংগঠনতো রয়েছেই, আবার সেই সংগঠনগুলো নিজেরাই অর্ন্তকোন্দলের জন্য বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। এইসব সংগঠনের নেতারাই হলেন অধিকাংশ বাংলাদেশি সামাজিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের চালিকা শক্তি। ফলে অরাজনৈতিক সংগঠনেও রাজনৈতিক ভাবধারার লাইনে হচ্ছে মেরুকরণ এবং বিভক্তি। প্রতিটি মানুষেরই একটি রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতে পারে। এতে দোষের কিছু দেখিনা। কিন্তু সবকিছুতেই এই বিশ্বাসের প্রয়োগ করতে গেলেই শুরু হয় বিভক্তি আর কোন্দল। তাই সংগঠনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কার্যক্রমের গুনগত বিচারে অন্য কমিউনিটির চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছি আমরা।

আমি ভারতীয়দের আসিসির আদলে বাংলাদেশ কমিউনিটিতে একটি কেন্দ্রিয় সংস্থা তৈরী করার প্রস্তাব রেখেছিলাম প্রথম আলোরই একটি কলামে। এই ধরনে সংস্থা গঠন করতে খুব একটা বেগ পেতে হবেনা। সংগঠনের নেতৃত্ব কে বা কারা আসবেন সে নিয়েই হয়তো প্রথম শুরু হবে বিতর্ক এবং চর দখলের প্রতিযোগীতা। প্রশ্ন হচ্ছে, বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাধবে কে? ভালোমন্দ নিয়েই মানুষ। আমরা কেউ ধোয়া তুলসী পাতা নই। কিন্তু আমার দলের কিংবা মতাদশের্র অনুসারী না হলে যতই সাংগঠনিক দক্ষতা কিংবা অন্যান্য গুনাগুন থাকুকনা কেনো, সেই মানুষ গ্রহনযোগ্য হবেনা, এই ধরনের মানসিকতা পরিহার করতে না পারলে সমানে এগুনো যাবেনা।

কারো যদি বিশেষ কোনো দক্ষতা থাকে শত্রু হলেও তার মূল্যায়ন করতে হবে। কিন্তু আমরা যাকে প্রতিদ্বন্দ্বি ভাবি তাকে ঠ্যাং ধরে টেনে কিভাবে নীচে নামানো যায় সেই চেষ্টাই করি। এজন্য প্রয়োজনে মিথ্যাচার, দুর্নাম করতেও দ্বিধা করিনা। এছাড়া অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে একটি সংগঠনের নেতৃত্বে থাকার পর নিজেকেই তার মালিক ভাবতে শুরু করেন। এরকম একজন কমিউনিটির নেতাকে আক্ষেপ করে বলতে শুনেছি, “আমার সংগঠনটা ওই লোকটা দখল করে নিচ্ছে”। এভাবে সংগঠনের নেতৃত্বে উঠে আসার পথ বন্ধ করে দেয়া হয় বলে হতাশা এবং অসন্তোষ থেকে ভাঙ্গনের শুরু হয়।

কমিউনিটিতে বিভক্তি থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। অন্য কমিউনিটিতে যে বিভক্তি নেই তা নয়। কিন্তু এজন্য হানাহানি কিংবা তিক্ততা কেনো? একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে বিভক্তি নিয়েও এক টেবিলে বসে কাজ করা যায়।

 

২৩ নভেম্বর, ২০১৯