মধ্যপ্রাচ্যের মরু প্রবাসে প্রথম বাংলা পত্রিকার প্রিন্ট সংস্করণ বের করার সাহস দেখায় বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদ মাধ্যম প্রথম আলো। কাতারের স্থানীয় আল-সার্কের বৈদেশিক প্রকাশনা শাখার তত্ত্বাবধানে প্রথম আলোর মধ্যপ্রাচ্য সংস্করণ যাত্রা শুরু হয় ২০১৪ সালের ১৫ অক্টোবর। আপাততঃ দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক সংখ্যা বের করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এটা কাতারের বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য ছিল একটি মাইল ফলক। প্রথম আলোর ঢাকা অফিসেই পুরো পত্রিকা কম্পোজ করে কাতারের আল-সার্ক পত্রিকার প্রেসে প্রিন্ট করার ব্যবস্থা করা হয়।
খবর সংগ্রহ, লেখা থেকে শুরু করে পুরো পত্রিকা চালানোর দায়িত্ব পড়ে অনুজপ্রতিম সাংবাদিক ও লেখক তামিম রায়হানের উপর। আর পত্রিকার উপদেষ্টা হিসাবে ছিলাম আমি। লেখালেখি করি বলে পত্রিকা ও সাহিত্য নিয়ে রয়েছে আমার অদম্য আগ্রহ। তাই কাতারে প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মধ্যপ্রাচ্য সংস্করণের সাথে কিভাবে যেনো জড়িয়ে পড়ি। এরপর পত্রিকার জন্য বাংলাদেশ কমিউনিটির সুখ-দুঃখ নিয়ে নিয়মিত কলাম লিখা শুরু করি।
প্রতি বৃহস্পতিবার গ্রাহকদের বাড়ীর দরোজায় পত্রিকা সরবরাহ করা হত। সকালে অফিসে যাবার সময় দরোজা খুললেই চোখে পড়ত পত্রিকা। মেঝে থেকে কাগজ হাতে তুলে নিয়ে বিভিন্ন পাতায় চট্-জলদি একটু চোখ বুলিয়ে নিয়েই রওয়ানা দিতাম অফিসে। প্রবাসে বসে স্বদেশের মতো বাংলা খবরের কাগজ বাড়ীর দ্বার গোড়ায় পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। সাপ্তাহিক বন্ধের দিনে ধূমায়িত চায়ের কাপ হাতে নিয়ে আয়াসে পত্রিকা পড়াটা আমার দীর্ঘদিনের অভ্যেস। কাতারে আসার বহুদিন পর আবারো পত্রিকা হাতে পেয়ে মনে হচ্ছে যেনো স্বর্গ ফিরে পেয়েছি।
পত্রিকায় স্থানীয় কমিউনিটির সংবাদ ছাড়া বেশ কিছু বিভাগ পাঠকদের মধ্যে সাড়া জাগায়। যেমন চাকুরির খোঁজ, আরবী ভাষা শিক্ষা, জেনে রাখুন, বাংলাদেশে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের আঁকা ছবি, আইনি পরামর্শের বিভাগ ইত্যাদি। চাকুরির খোঁজ এবং আইন বিভাগের পরামর্শ অনেকের কাজে লেগেছে বলে জানান বেশ কিছু পাঠক। এটা প্রথম আলোর জন্য বড় ধরনের সাফল্য বলতে হবে।
বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও আলোর ৪র্থ বর্ষপূর্তি বেশ ধূমধাম করে পালিত হয় স্থানীয় আবুবকর স্কুলে। বাংলাদেশ থেকে প্রথম আলোর শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তা সহ দুজন কন্ঠশিল্পীও আসেন অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করতে। এই অনুষ্ঠানে আমার প্রথম অডিও অ্যালবাম ‘তোমার জন্য’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয় এবং আমি নিজেও কয়েকটি গান পরিবশেন করি।
আজকের জিডিটাল বিশ্বে প্রায় সব পত্রিকাই এখন অনলাইনে পড়া যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমের জনপ্রিয়তার কারণে মূলধারার খবর সরবরাহকারী মাধ্যম যেমন পত্রিকা, রেডিও ইত্যাদির অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে পড়েছে। মনে হচ্ছে খবরের কাগজ কিছুদিন পর শহরের মিউজিয়ামে আশ্রয় নেবে। নিউইয়র্ক টাইম্স এবং ওয়াশিংটন পোস্টের মতো ঐতিহ্যবাহী পত্রিকাগুলোও আজ প্রিন্ট ভার্সনের পাপাপাশি অনলাইন সংস্করন চালু করতে বাধ্য হয়েছে। প্রথম আলোর মধ্যাপ্রাচ্যে সংস্করণও এর ব্যতিক্রম ছিলনা।
কাতারের বাংলাদেশ কমিউনিটিতে প্রথম আলো পত্রিকার গ্রাহকের সংখ্যা প্রতিষ্ঠার সময় থেকে পরবর্তী কয়েক বছরে বহুগুনে বেড়ে গেলেও পত্রিকাটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য তা যথেষ্ট ছিলনা। পত্রিকা চালু রাখার জন্য প্রথম আলো কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার কোনো অভাব ছিলনা। কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ভর্তূকি দিয়েই পত্রিকা চালাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। পাঁচটি বছর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলার পর অবশেষে ২০১৯ সালে থেমে যায় মরুর বুকে প্রথম আলোর পথচলা। যা আমার মত অনেকের জন্য ছিল বড় ধরনের একটি দুঃসংবাদ।
প্রবাসে বাংলা পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশের জন্য সাংবাদকিদের বেতন, পত্রিকা ছাপনোর খরচ, গ্রাহকদের কাছে পত্রিকা বিলি ইত্যাদি বিভিন্ন আনুষঙ্গিক খাতে প্রতি মাসে প্রচুর খরচ হয়। এখানে যেহেতু সরকারী বিজ্ঞাপন পাবার কোনো সুযোগ নেই, তাই গ্রাহক ফি এবং বানিজ্যক বিজ্ঞাপন থেকেই পুরো খরচ তুলে আনতে হয়, যা কাতারের মতো প্রবাসে সত্যিই দুরূহ ব্যপার। পত্রিকা প্রকাশনার খরচ মেটানো জন্য তাই প্রয়োজন নিয়মিত বড় অংকের বিজ্ঞাপন। কাতারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যবসা-বানিজ্য থেকে আশানুরূপ বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়নি।
কাতারের চার লাখ বাংলাদেশ কমিউনিটির মাত্র মাত্র এক শতাংশ আগ্রহ দেখালেই গ্রাহকের সংখ্যা চার হাজারে গিয়ে দাঁড়ায়। দোহা শহরে বাড়ী বাড়ী গিয়ে পত্রিকা পৌছে দেয়ার কাজ ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই পত্রিকা সরবরাহে কিছু সমস্যা ছিল ঠিকই। কিন্তু বিদেশের মাটিতে একটি বাংলা পত্রিকা চালু রাখার জন্য গ্রাহক হয়ে পরোক্ষভাবে আমরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছি। কাতারে ভারতীয় এবং অন্যান্য কমিউনিটির বেশ কয়েকটি পত্রিকা চালু রয়েছে। কিন্ত আমরা তা পারিনি। এই ব্যর্থতা শুধু প্রথম আলোর নয়, আমাদেরও।
