গত ২৫ জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যায় সিডনির প্রায় দেড়  বছরের ঐতিহ্যবাহী Art Gallery of New South Wales-এর ঐতিহাসিক হলরুমে অনুষ্ঠিত হলো অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এক স্মরণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজন। জমকালো এই অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো উন্মোচন করা হলো Museum of Islamic Art Australia (MIAA)-এর বহুল প্রতীক্ষিত নকশা, যা ভবিষ্যতে শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য নয়, বরং সমগ্র অস্ট্রেলিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক নতুন সংযোজন হতে যাচ্ছে।

এই আকনিক স্থাপনাটি গড়ে উঠবে সিডনির পশ্চিমাঞ্চলের গ্র্যানভিল এলাকায়, ব্যস্ত প্যারামাট্টা রোডের ৯৯ নম্বর ঠিকানায়। সংখ্যাটি নেহাত কাকতালীয় নয়,  ইসলামী ঐতিহ্যে আল্লাহর ৯৯টি নাম (আসমাউল হুসনা) এর সঙ্গে যেমন এর মিল আছে ।

মিউজিয়ামের স্থাপত্য নকশার দায়িত্বে আছে প্রখ্যাত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ARM Architecture, যাদের হয়ে এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থপতি জশুয়া মরিন। এরাই মেলবোর্নের ফেডারেশন স্কয়ার, পার্থের WA Museum Boola Bardipসহ অসংখ্য আলোচিত প্রকল্পের নকশাকার।

মক্কার মসজিদুল হারাম, জেরুজালেমের মসজিদুল আকসা, ইস্তাম্বুল, সমরকন্দ, কর্ডোভা ও বিশ্বের অন্যান্য ঐতিহাসিক ইসলামি স্থাপত্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই নকশা। কাবাকে কেন্দ্র করে যেমন মসজিদুল হারামের বৃত্তাকার বিন্যাস, ঠিক তেমনই এক চক্রাকার কেন্দ্রীয় কাঠামোকে ঘিরে সাজানো হয়েছে মিউজিয়ামের লেআউট।

এই নকশা দেখে আমার চোখে ভেসে ওঠে কাতারের বিখ্যাত Museum of Islamic Art-এর কথা, যেটির নকশা করেছিলেন কিংবদন্তি স্থপতি আই. এম. পেই,  যিনি প্যারিসের লুভর জাদুঘরের কাচের পিরামিড এবং হংকংয়ের ব্যাংক অফ চায়না টাওয়ারের মতো বিশ্ববিখ্যাত স্থাপনার রূপকার।

সিডনির নতুন মিউজিয়ামটি যদিও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র নকশার, তবুও এর দর্শন, জ্যামিতিক বিন্যাস এবং আলো-ছায়ার ব্যবহারে ইসলামি স্থাপত্যের চিরন্তন সৌন্দর্যের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে।

অনেকেই হয়তো জানেন না, সিডনির এই মিউজিয়ামই কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম উদ্যোগ নয়। ২০১৪ সালে ভিক্টোরিয়ার Thornbury এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় Islamic Museum of Australia। তবে সিডনির এই নতুন মিউজিয়ামটি হবে নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রথম এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামিক শিল্প ও সভ্যতা বিষয়ক কেন্দ্র।

এই মিউজিয়ামের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রফেসর মেহমেত ওজাল্প, চার্লস স্টার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের Centre for Islamic Studies and Civilisation (CISAC)-এর প্রধান এবং Islamic Sciences and Research Academy (ISRA)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক। । অনুষ্ঠানে তিনি আবেগঘন ভাষায় তুলে ধরেন প্রায় দুই দশকের সংগ্রামের ইতিহাস, কীভাবে অসংখ্য বাধা, অর্থসংগ্রহ, পরিকল্পনা ও মানুষের সমর্থনের মধ্য দিয়ে আজকের এই অর্জনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।

উল্লেখ্য, ISRA থেকে ইসলামিক স্টাডিজের ওপর ব্যাচেলর, মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করা যায় ,  অর্থাৎ ইসলামি শিক্ষা ও গবেষণার জন্য অস্ট্রেলিয়ার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।

জানা গেছে, কাউন্সিলের সব ধরনের অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার পর আগামী বছরের জুলাই মাসে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জমির মূল্যসহ পুরো প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৩৪ মিলিয়ন ডলার। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থের প্রায় ৮২ শতাংশ সংগ্রহ করা হয়েছে। বাকি অর্থ সরকারি অনুদান এবং সাধারণ মানুষের অনুদান থেকে সংগ্রহের আশা করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত থ্রিডি প্রেজেন্টেশন থেকে তোলা কয়েকটি ছবি শেয়ার করলাম, যাতে ভবিষ্যৎ মিউজিয়ামটির সম্ভাব্য রূপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

তবে সততার সঙ্গে বলতে গেলে, এই বিশাল স্বপ্নের জন্য প্যারামাট্টা রোডের এই জায়গাটি কিছুটা সংকীর্ণ মনে হয়েছে। এই মিউজিয়ামটি কেবল মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্যই নয়, বরং দেশি-বিদেশি পর্যটক, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ অস্ট্রেলিয়ানদের জন্যও একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠবে। আর সিডনিতে মুসলিম জনসংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে দর্শনার্থীদের চলাচল, পার্কিংয়ের জায়গার সংকুলান এবং সম্প্রসারণের সুযোগ বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

একটি মিউজিয়াম শুধু দর্শনীয় স্থাপনা নয়, বরং আধ্যাত্মিক প্রশান্তি খোঁজার জায়গাও বটে। — কোলাহলপূর্ণ সড়কের ঠিক পাশে সীমিত পরিসরে সেই প্রশান্তি কতটা ধরা দেবে, সেই প্রশ্নটা থেকেই যায়।

একই বা সামান্য বেশি ব্যয়ে যদি সিডনির শহরতলিতে ৫–১০ একর খোলা জমির ওপর এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেত, তবে হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও বৃহৎ, প্রশস্ত ও নান্দনিক একটি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলা সম্ভব হতো।

তারপরও সমালোচনার চেয়ে বড় সত্য হলো, স্বপ্ন দেখার সাহস। এমন একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগের সঙ্গে যারা যুক্ত থেকেছেন , তাঁদের প্রত্যেককে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।

হয়তো এটাই শেষ নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ায় ইসলামিক শিল্প, ইতিহাস ও সভ্যতাকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এক দীর্ঘ যাত্রার কেবল শুরু।