প্রবাসী বাংলাদেশিরাই হলেন দেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান যোগানদার। বিদেশে বাংলাদেশীরা সৎ উপার্জন করে দেশে অর্থ পাঠান। আর তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সেই ঘোরে দেশের অর্থনীতির চাকা। রপ্তানী থেকে বাংলাদেশের আয় হচ্ছে বছরে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ (৪০ শতাংশ) অর্থাৎ প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার আসে গার্মেন্টস খাত থেকে। কিন্তু বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আসে তার চেয়েও বেশী, ১৬ বিলিয়ন ডলার। এর সুফল ভোগ করছেন দেশের সবাই। দেশে গিয়ে প্রবাসীরা সুফল পাচ্ছেন কতটুকু? একজন প্রবাসী বিদেশ ঘুরে দেশে গিয়ে বিমান বন্দরে পা রাখলেই শুনি অহেতুক ভোগান্তির কথা। এছাড়া বিভিন্ন সরকারী মহলেও কাজের জন্য গিয়ে হয়রানীর শিকার হন প্রবাসীরা।
দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেও ভোটাধিকার অর্জন করতে পারেনি প্রবাসীরা। অন্যান্য বহু দেশের দূতাবাসে প্রবাসী নাগরিকদের ভোট গ্রহনের ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের উন্নয়নে সরাসরি অংশগ্রহন করেও ভোটধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বাংলাদেশের নতুন নাগরিকত্ব আইনে প্রবাসী দ্বৈত নাগরিকরা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, সংসদ সদস্য, বিচারপতি এমনকি স্থানীয় কোন নির্বাচনেও অংশ গ্রহণ করতে পারবেনা। আপাতঃ দৃষ্টিতে দ্বৈত নাগরিকদের ভোটাধিকার রয়েছে বলে মনে হলেও তারা অদৌ ভোট দিতে পারবেন কি না তা আইনে স্পষ্ট উল্লেখ নেই। যদি দ্বৈত নাগরিকরা ভোটেই দাঁড়াতে না পারেন তাহলে তারা ভোট দেবেন কি করে? এই অস্পষ্টতার জন্য প্রবাসীরা সংশয়ে আছেন।
এইতো মাত্র কিছুদিন আগে একজন কাতার প্রবাসী বাংলাদেশী ব্যবসায়ীর পরিবারকে চরম হয়রানীর মুখোমুখি হতে হলো বাংলাদেশে। এ নিয়ে কাতারে বেশ কিছু প্রতিবাদ সভা হয়েছে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও টিভি চ্যানেলেও এই খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তেমন কোনো কাজ হয়েছে বলে মনে হয়না। একজন প্রবাসীর কথা জানি যার দেশের বাড়ী-ঘর, তার আপন চাচা দখল করে ভোগ করছেন। এ নিয়ে কথা তুললে তিনি বলেন, “তুইতো আর দেশে আসবিনা। তাই এসব দিয়ে কি করবি?”। দেশের মানুষ মনে করেন প্রবাসীরা টাকার উপর শুয়ে আছেন এবং নিজেদেরকে এই টাকার একরকম হকদারও ভাবেন তারা। তাই প্রবাসীদের অর্থ কিংবা সম্পদের কিছু ভাগ নিতে দোষের কি?
প্রবাসী কারা? মানুষ কেনো স্বদেশের মাটি ও মায়া ছেড়ে প্রবাসে যায়? এইসব প্রশ্ন আমাদের মত বহু প্রবাসীদের প্রতিক্ষণ তাড়া করে বেড়ায়। স্বদেশ ছেড়ে প্রবাস পাড়ি দেবার পেছনে প্রত্যেকেরই কিছু অন্তর্নিহিত কারন থাকে। কেউ শুধু শখের বশে দেশ ত্যাগ করেনা। তবে কারন যাই হোক না কেনো বিদেশ যাওয়াটা কি অপরাধ? বিদেশে গেলেই কি দেশপ্রেমে ঘাটতি পড়ে যায়?
আমাদের মাতৃভ’মিকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধারাও দেশান্তরী হয়েছিলেন। তার মানে তখন যারা দেশে ছিলেন তাদের সবাইকি স্বাধীনতার বিপক্ষে চলে গিয়েছিলেন? শুধু তাই নয়, দেশ স্বাধীন হবার পর অনেক মুক্তিযোদ্ধাও বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন। স্বাধীনতার সময় চট্টগ্রাম কোতোয়ালী এবং ডবলমুরিং এলাকার মুজিব বাহিনীর গেরিলা কমান্ডার পেশায় ডাক্তার, আমার অগ্রজ ভাই, দীর্ঘদিন প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন। স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের তকমা ব্যবহার করে সুযোগ নিতে চাননি বলে আর্থিক দৈন্যতা কাটিয়ে একটু ভালো জীবনের আশায় তাঁকে বিদেশ পাড়ি দিতে হয়েছিল।
এমন আরো অনেক বিখ্যাত মানুষ আছেন যেমন আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক, প্রয়াত কবি ও মুক্তিযোদ্ধা শহীদ কাদরি সহ বহু সঙ্গীত শিল্পী ও চিত্রকর ইত্যাদি। লিখতে শুরু করলে তালিকা অনেক বড় হয়ে যাবে। কিন্তু বিদেশে থাকলেও এদের দেশপ্রেমে কি কোনো কমতি বা ঘাটতি আছে? প্রবাসে বসেই এরা দেশের পতাকাকে সমুন্নত রেখেছেন। প্রবাসীদের অনেকেই কেউ গভর্নর, পার্লামেন্ট মেম্বার, রাষ্ট্রদূত হয়ে দেশের ভাবমূর্তি বাড়িয়ে দিয়েছেন।
অধিকাংশ প্রবাসীই সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ। কিন্তু দেশের মানুষ কি প্রবাসীদের নিয়ে এমনটা ভাবেন? সম্প্রতি সোস্যাল মিডিয়াতে প্রবাসীরা বুটপালিশ করেন, ঢালাওভাবে করা এমন একটি মন্তব্য নিয়ে তোলপাড় চলছে। এটা সত্য, উচ্চতর ডিগ্রীধারী হয়েও প্রবাসে অনেকে টেক্সি চালান, কেউবা সুপার মাকের্টে, রেস্টুরেন্টে কাজ করেন। কেউবা আবার হকারেরও কাজ করেন। এজন্য একজন মানুষ হিসাবে কি তার মর্যাদা কমে গেলো? সিডনী শহরে একজন ক্লিনারকে দেখেছি, যে ঘর ঘষে-মেজে পরিস্কার করার পর গাউনটা গা থেকে খুলে রেখে দিব্বি বিএমডব্লিউ গাড়ী চালিয়ে বাড়ী চলে গেলো।
প্রবাসে বড় বড় পেশায় যারা চাকরী করছেন তাদের যেমন সন্মান আছে তেমনি অন্যান্য কাজ যারা করেন তারাও সন্মানিত, অবহেলিত নয়। ওই সব দেশে কে কি করলো তাতে খুব একটা যায় আসেনা। বরং মানুষের পরিশ্রমকে যারা তুচ্ছ করে দেখে তাদের মানবিক বৈশিষ্ট ও সুস্থতা নিয়েই মনে প্রশ্ন জাগে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রবাসীরা যে কাজই হাতে পান, কষ্ট ও সততার সাথে সেটা করে পরিবার চালাচ্ছেন, সন্তান মানুষ করছেন। এগুলো দুর্নীতি, প্রতারনা কিংবা ঘুষের উপার্জন নয়। এক্কেবার খাঁটি অর্থাৎ সৎ উপার্জন। এটাই প্রবাসীদের এনে দেয় পরিতৃপ্তি এবং সুখানুভব।
স্বদেশে প্রবাসীদের নিয়ে যারা কটুক্তি করেন, তাদের কাজ নিয়ে তাচ্ছিল্য করেন তারা নিজেরাই পা দিয়ে রেখেছেন দুই নৌকায়। তাদের অনেকেরই রয়েছে বিদেশে বাড়ী কিংবা ব্যবসা। অনেকেই সন্তানদের বিদেশে লেখাপড়া করিয়ে আগে থেকেই ওই সব দেশে নিজেদের যাবার পথ পরিস্কার করে রেখেছেন। যদিও মুখে তাদের দেশপ্রেমের খই ফোটে, দেশের প্রতি প্রবাসীদের আনুগত্য নিয়ে তারা প্রশ্ন করেন অথচ দেশের টাকা বিদেশে পাচার করার ক্ষেত্রে তাদের জুড়ি মেলা ভার।
আমরা যারা পরবাসে দিন কাটাই, তাদের পোষাকী নাম হল প্রবাসী। তবে যে নামেই ডাকা হোকনা কেনো, প্রবাসী বাংলাদেশিরা সবাই হল মনে প্রানে স্বদেশী। বিশ্বের দেশে দেশে প্রধান শহরগুলোতে এই প্রবাসী বাংলাদেশিরাই গড়ে তুলেছেন বাংলা টাউন – স্বদেশের বৈশিষ্ট নিয়ে গড়া ছোট্ট বাংলাদেশ। বাংলা টাউনের চারদিক ভেসে বেড়ায় স্বদেশের মাটির সুবাস। দেশ যে কত মমতাময় তা একমাত্র আমরা যারা প্রবাসে থাকি তারাই অনুভব করতে পারি। তাইতো দেশ থেকে যখন শিল্পীদের দল কিংবা গন্যমান্য মানুষ আসে তখন প্রবাসীরা তাদের আদর-আপ্যায়নের রাখেনা কোনো ত্রুটি।
বাংলাদেশের তারকা শিল্পীরা বছরের অর্ধেকটা সময় থাকেন প্রবাসে, শো করে বেড়ান। এছাড়া দেশে দুর্যোগ-দুর্বিপাকের খবর পেলে সুদূর পরবাসে আমাদের প্রান কেঁদে ওঠে। সে হোক বন্যা কি সাইক্লোন, প্রবাসের সবাই সন্মিলিত হয়ে তহবিল সংগ্রহ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানবতার সেবায়। সম্প্রতি মিয়ারমার সীমান্ত পেরিয়ে আসা লক্ষ লক্ষ বিপন্ন রোহিঙ্গাদের জন্য কাতারের প্রবাসী বাংলাদেশীরা সাহয্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তহবিল সংগ্রহের কাজ চলছে জোরেসোরে।
স্বদেশী, প্রবাসী এই ধরনের বিতর্ক কেবলই অর্থহীন। ঘুষ, চুরি, প্রতারণা করে মানুষকে ঠকিয়ে শুধু দেশে পড়ে থাকলেই দেশপ্রেমিক হওয়া যায়না। নিজেকে সৎ রেখে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য নিরলস কাজ করে যাওয়াটাই হল স্বদেশ প্রেম। আমরা অনেক সময় ভালো কোনো উদ্যোগ বা কাজের স্বীকৃতি দিতে কুন্ঠাবোধ করি। তাই প্রবাসী বাংলাদেশিদের কষ্ট, পরিশ্রম এবং নির্ভেজাল দেশপ্রেম স্বদেশের অনেকেরই চোখে পড়েনা।
১২ অক্টোবর, ২০১৭
